সিনিয়র শিক্ষক
১১ জুন, ২০২৬ ১১:১৪ অপরাহ্ণ
কর বাড়ালেই কি দূষণ কমবে? প্রণোদনা, অবকাঠামো ও বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া পরিবেশ সুরক্ষা অসম্ভব: ২০২৬–২৭ বাজেটের আলোকে বাংলাদেশের বাস্তবতা
কর বাড়ালেই কি দূষণ কমবে?
প্রণোদনা, অবকাঠামো ও বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া পরিবেশ সুরক্ষা অসম্ভব: ২০২৬–২৭ বাজেটের আলোকে বাংলাদেশের বাস্তবতা
ভূমিকা:
একটি সাহসী পদক্ষেপ, কিন্তু যথেষ্ট কি?
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির সংকট যখন মানবসভ্যতার অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, তখন পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়—এটি জাতীয় দায়িত্ব। বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক সংকটের বাইরে নয়। বিশ্বের সর্বাধিক দূষিত বায়ুর দেশগুলোর মধ্যে ধারাবাহিকভাবে স্থান পাওয়া এই দেশে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ এখন জনস্বাস্থ্যের এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যানবাহনে করভার বৃদ্ধি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনে (EV) ব্যাপক কর ছাড়ের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি সাহসী পদক্ষেপ। তবে পরিবেশ অর্থনীতির মৌলিক শিক্ষা হলো—কর একটি হাতিয়ার, সমাধান নয়। কর যদি বিকল্প প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে সমন্বিত না হয়, তাহলে তা দূষণ না কমিয়ে কেবল জনজীবনের ব্যয়ভার বাড়ায়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত জরুরি।
বাজেটের দ্বৈত দর্শন: শাস্তি ও প্রণোদনার সমন্বয়
২০২৬–২৭ বাজেটে সরকার একদিকে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলচালিত যানবাহনে করভার প্রায় ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে, অন্যদিকে বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারে উল্লেখযোগ্য কর ছাড় ঘোষণা করেছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহনকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর চিহ্নিত করে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসারে গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রস্তাব অনুযায়ী ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়িতে মোট করভার ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের গাড়িতে ৮০ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে—যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। স্থানীয়ভাবে EV উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানিতে প্রায় সব শুল্ক মওকুফ, ২০৪০ সাল পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি এবং ব্যাটারি উৎপাদনে বিশেষ কর সুবিধাও রাখা হয়েছে।
নীতিগতভাবে এই দ্বৈত কৌশল—দূষণকারীকে নিরুৎসাহিত করা এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্পকে উৎসাহিত করা—সঠিক দিকেই এগোচ্ছে। প্রশ্ন হলো, বাস্তবায়নের মাটি কতটা প্রস্তুত।
পরিবহন খাতের চিত্র: দ্রুত বৃদ্ধি, ধীর রূপান্তর
গত এক দশকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে—২০১০ সালের ১৪ লাখ থেকে এখন ৪৫ লাখেরও বেশি। কিন্তু এই বৃদ্ধির চরিত্র উদ্বেগজনক: মোট যানবাহনের তিন-চতুর্থাংশই মোটরসাইকেল (প্রায় ৩১ লাখ), আর কোটি মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের ভরসা মাত্র ৪৭ হাজারের কিছু বেশি বাস।
এই বৈষম্য নিজেই একটি নীতিব্যর্থতার আখ্যান। ব্যক্তিগত যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি এবং গণপরিবহনের পশ্চাৎপদতা একসঙ্গে চলেছে। পরিণামে পরিবহন খাত এখন দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৬৩ শতাংশ গ্রাস করছে এবং সড়ক পরিবহন থেকেই আসছে কার্বন নিঃসরণের সিংহভাগ। এই কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে কেবল করনীতির পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি ফল আশা করা কঠিন।
পুরোনো যানবাহন: দূষণের অদৃশ্য উৎস
নতুন গাড়ির করনীতি নিয়ে যখন আলোচনা তুঙ্গে, তখন পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিষয়টি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। অথচ দেশে প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার নিবন্ধিত যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই, আর অনিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা অগণনীয়।
একটি পুরোনো ইঞ্জিন নতুনের তুলনায় অনেক বেশি জ্বালানি পোড়ায় এবং কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও ক্ষতিকর সূক্ষ্ম কণা (PM2.5) বহুগুণ বেশি নির্গত করে। ফলে নতুন গাড়িতে কর বাড়িয়ে পুরোনো দূষণকারী যানবাহন সড়কে রাখা মানে এক হাতে বাঁধ দিয়ে অন্য হাতে ছিদ্র খোলা রাখা। উপরন্তু নতুন আমদানি নীতিতে পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ সম্প্রসারণের আলোচনা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
কর বৃদ্ধির অর্থনৈতিক অভিঘাত: কার ঘাড়ে চাপে?
পরিবহন খাতে করবৃদ্ধির প্রভাব কেবল গাড়ির মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—তা পণ্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে কৃষিপণ্য থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পর্যন্ত প্রায় সবকিছু সড়কপথে পরিবহন হয়। ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ অনিবার্য।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত করের ভার সবচেয়ে বেশি পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর—কৃষকের উৎপাদন খরচে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পরিবহন বিলে, শিক্ষার্থীর যাতায়াত ব্যয়ে। যে কর পরিবেশ রক্ষার নামে আরোপিত হচ্ছে, সেটি যদি জনজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে, তাহলে পরিবেশনীতির প্রতি জনসমর্থন ক্ষয় পাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
চার্জিং অবকাঠামো: বৈদ্যুতিক রূপান্তরের পূর্বশর্ত
বিশ্বের যেসব দেশ বৈদ্যুতিক যানবাহনে সফল রূপান্তর ঘটিয়েছে, তারা কর ছাড়ের পাশাপাশি চার্জিং অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ভর্তুকির সমন্বিত ব্যবস্থা গড়েছে। বাংলাদেশে আজও চার্জিং স্টেশন নেটওয়ার্ক রাজধানীর গণ্ডি পেরোয়নি। অধিকাংশ জেলায় বিশ্বাসযোগ্য চার্জিং সুবিধার অনুপস্থিতিতে কর ছাড় পেয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনলেও একজন ক্রেতা ব্যবহারিক সমস্যায় পড়বেন।
ভর্তুকি এবং কর সুবিধার প্রলোভন তখনই কার্যকর হয় যখন কেনার পরেও গাড়িটি চালানো যায়। অবকাঠামো ছাড়া EV নীতি হবে কাগজের নৌকা—দেখতে সুন্দর, বাস্তবে ডুববে।
বিশ্ব থেকে শিক্ষা: সমন্বিত নীতিই সাফল্যের চাবিকাঠি
সফল দেশগুলো কখনো শুধু কর বাড়িয়ে দূষণ কমায়নি। তারা অনুসরণ করেছে "Carrot and Stick"—প্রণোদনা ও নিয়ন্ত্রণের যুগপৎ কৌশল।
নরওয়ে EV-তে ভ্যাট ও আমদানি কর প্রায় সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করেছে এবং দেশজুড়ে চার্জিং নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছে। আজ দেশটির নতুন গাড়ির বিক্রয়ের ৯০ শতাংশেরও বেশি বৈদ্যুতিক।
চীন ব্যাটারি শিল্পে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও ব্যাপক ভর্তুকির মাধ্যমে EV উৎপাদনে বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জন করেছে।
ভারত "FAME" কর্মসূচির আওতায় বৈদ্যুতিক বাস ও দুই-চাকার যানবাহনে সরাসরি ভর্তুকি দিয়ে গণপরিবহন ও নিম্নমধ্যবিত্ত ব্যবহারকারীদের রূপান্তরে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে এবং সেই সুযোগ এখনই কাজে লাগানো প্রয়োজন।
পথ কোনটি? পাঁচটি অগ্রাধিকার
বাংলাদেশের বাস্তবতায় কার্যকর পরিবেশনীতির জন্য নিচের পাঁচটি পদক্ষেপ অপরিহার্য—
১. পুরোনো যানবাহন স্ক্র্যাপেজ কর্মসূচি: ফিটনেসবিহীন যানবাহন জমা দিলে মালিককে আর্থিক প্রণোদনা বা পরিবেশবান্ধব যান কেনায় সহজ ঋণ প্রদান করতে হবে। দূষণের উৎসমুখ বন্ধ না করে নতুন যানবাহনে করভার চাপানো যুক্তিসঙ্গত নয়।
২. গণপরিবহনে অগ্রাধিকার বিনিয়োগ: পুরোনো ডিজেলচালিত বাসের জায়গায় বৈদ্যুতিক বাস নামালে একসঙ্গে দূষণ কমবে এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে।
৩. জাতীয় চার্জিং স্টেশন নেটওয়ার্ক: প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পর্যায়ক্রমে চার্জিং স্টেশন স্থাপন করতে হবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কর সুবিধা দিতে হবে।
৪. পরিবেশ করের রাজস্ব পরিবেশেই ব্যয়: জ্বালানি ও যানবাহন কর থেকে অর্জিত অতিরিক্ত অর্থ সরাসরি গণপরিবহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে ব্যয়ের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত।
৫. দূষণমাত্রাভিত্তিক করনীতি: সব যানবাহনে একই হারে কর না চাপিয়ে নির্গমনের মাত্রা অনুযায়ী ভিন্ন হারে কর আরোপ করলে নীতির ন্যায্যতা ও কার্যকারিতা—দুটোই নিশ্চিত হয়।
উপসংহার: রাজস্ব নয়, টেকসই রূপান্তরই হোক লক্ষ্য
পরিবেশ রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তবে সেই দায়িত্ব পালনের উপায় হতে হবে ন্যায়সঙ্গত ও বাস্তবসম্মত। কর একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু একা সে সমাধান দিতে পারে না। দূষণ কমাতে দরকার উন্নত গণপরিবহন, বিস্তৃত চার্জিং অবকাঠামো, পুরোনো যানবাহন অপসারণ এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্পকে সত্যিকার অর্থে সহজলভ্য করে তোলা।
বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ আজ দূষিত বায়ুর ঝুঁকিতে বাস করছে। এই সংগ্রামে সাধারণ মানুষ শত্রু নয়, অংশীদার। তাই পরিবেশনীতি যেন কেবল রাজস্ব বৃদ্ধির আবরণ না হয়ে ওঠে—বরং তা হোক একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক রূপান্তরের রোডম্যাপ, যেখানে পরিবেশের সুরক্ষা এবং নাগরিকের কল্যাণ একই লক্ষ্যে মিলিত হয়।
মুফিদুল আলম
শিক্ষক,
রামু, কক্সবাজার
১০
১২ মন্তব্য