Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ জুন, ২০২৬ ০৭:৩১ পূর্বাহ্ণ

খোলস ও ম্যান্টল: সামাজিক মুখোশের নিচে লুকানো কুপ্রবৃত্তির চিরন্তন সত্য প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর পাঠ

খোলস ও ম্যান্টল: সামাজিক মুখোশের নিচে লুকানো কুপ্রবৃত্তির চিরন্তন সত্য

প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর পাঠ
সমুদ্রতীরে একটি শামুককে দেখুন। তার পিঠের শক্ত, প্যাঁচানো খোলসটি দেখে মনে হয় — এটাই তার সত্তা। কিন্তু খোলসের ভেতরে থাকে কোমল, স্পর্শকাতর ম্যান্টল। শামুকের প্রকৃত অস্তিত্ব সেখানেই। খোলস কেবল আড়াল।
মানুষের বেলায় ব্যাপারটা উল্টো — কিন্তু পরিণতি একই।
সমাজের চাপে মানুষ নিজের চারপাশে গড়ে তোলে এক শক্ত খোলস — ভদ্রতা, নৈতিকতার বুলি, ধর্মীয় আচার, মিষ্টি হাসি। এই খোলসই তাকে 'ভালো মানুষ' বলে চিহ্নিত করে। কিন্তু ভেতরে? লোভ, হিংসা, প্রতিহিংসা, ক্ষমতার নেশা — সুযোগের অপেক্ষায় নিঃশব্দে বসে থাকে।
এই প্রবন্ধ সেই অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি।

খোলস — সভ্যতার নির্মিত প্রাচীর
আদিম মানুষের খোলস ছিল না। সে ক্ষুধার্ত হলে ছিনিয়ে নিত, রাগ হলে মারত। কিন্তু দলবদ্ধ জীবনে টিকতে হলে লুকোতে হয় — এটা সে বুঝল। তখন থেকেই খোলসের শুরু।
সে শিখল বলতে:
"পরের মাল ছুঁই না" — আর ভেতরে লোভকে পুষে রাখল।
"সবাইকে শ্রদ্ধা করি" — আর মনে মনে হিসাব রাখল কাকে কতটা ঘৃণা করে।
"সৎ থাকাই ধর্ম" — আর সুযোগের অপেক্ষায় রইল।
এই খোলস সমাজকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু খোলস কখনো ভেতরকে বদলায়নি — কেবল ঢেকে রেখেছে। দমন বিনাশ নয়।
শামুকের ম্যান্টল যেমন চিরকাল কোমল থাকে, মানুষের কুপ্রবৃত্তিও চিরকাল অমর।

ম্যান্টল — সুযোগের অপেক্ষায় আগ্নেয়গিরি
ম্যান্টল কখনো নিষ্ক্রিয় নয়। সে ঘুমায়, কিন্তু স্বপ্ন দেখে।
কোনো শিশুকে লোভ শেখাতে হয় না — সে নিজেই অন্যের খেলনা দেখে টানে। কোনো কিশোরকে হিংসা শেখাতে হয় না — প্রতিযোগীর সাফল্যে সে নিজেই জ্বলে ওঠে। এগুলো শেখানো নয়, সহজাত।
তবু আমরা এসব স্বীকার করি না। নাম দিই 'পাপ', 'দুর্বলতা', 'শয়তানের প্ররোচনা' — যেন এটা বাইরে থেকে এসেছে। আসলে এটা আমাদের নিজেরই অংশ।
পার্থক্য কেবল সুযোগে।
যে মানুষটি সারাজীবন সৎ থেকেছে — সে কি আসলেই সৎ, নাকি সুযোগ পায়নি? যে মানুষটি কখনো মারেনি — সে কি অহিংস, নাকি কখনো এমন কোণঠাসা হয়নি যেখানে মারতে ইচ্ছে করে?
এই প্রশ্ন অস্বস্তিকর। কিন্তু সৎ।

যখন সুযোগ আসে
শামুকের ম্যান্টল বেরোয় সিক্ত পরিবেশে, খাবারের গন্ধে। মানুষের ম্যান্টল বেরোয় তিনটি পরিস্থিতিতে —
ক্ষমতা পেলে।ক্ষমতা খোলস ভাঙার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতুড়ি। মানুষ যখন ভাবে "আমাকে কেউ প্রশ্ন করবে না", তখন দশকের জমানো ম্যান্টল একসাথে বেরিয়ে আসে। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য — ক্ষমতার মাপ বদলায়, ম্যান্টলের স্বভাব বদলায় না।
পরিচয় লুকোতে পারলে।অনলাইনে নাম গোপন রেখে মানুষ যা করে — গালি দেয়, হুমকি দেয়, ঘৃণা ছড়ায় — সেটাই তার ম্যান্টল। স্ক্রিনের আড়াল তার খোলসটুকু সরিয়ে দেয়।
শাস্তির ভয় না থাকলে।যেখানে বিচার নেই, সেখানে 'ভালো মানুষ'ই সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কারণ সে দীর্ঘদিন চাপা দিয়ে রেখেছিল।
একবার ম্যান্টল বেরিয়ে গেলে থামানো কঠিন। কারণ তখন আর খোলস থাকে না — থাকে কেবল প্রবৃত্তির উল্লাস।

ভণ্ডামির শিকড়
এই সত্য আমাদের ভেতরে কাঁপন ধরায়। কারণ আমরা জানি — আমার ভেতরেও সেই ম্যান্টল আছে।
সমাজের সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ সে নয়, যে নিজের কুপ্রবৃত্তি জানে। বিপজ্জনক সে, যে নিজেকেই বিশ্বাস করিয়ে ফেলেছে যে তার ম্যান্টল নেই।
সে ভাবে: "আমি সৎ। আমি ন্যায়পরায়ণ। আমি ধার্মিক।"
এই আত্মপ্রবঞ্চনা এতটাই গভীর যে, সুযোগ পেয়ে অন্যায় করার পরেও সে বলে — "আমি বাধ্য হয়েছিলাম। এটা আমার স্বভাব নয়।"
খোলস তখন আর শুধু অন্যকে ঠকায় না — নিজেকেও ঠকায়।

শামুকের চেয়ে বড় হওয়ার দাবি
শামুকের বিবেক নেই। তার ম্যান্টল বেরোয় খাবারের টানে, বাঁচার স্বার্থে — সে জানেও না।
মানুষ জানতে পারে। এখানেই পার্থক্য।
কিন্তু জানার সুযোগ তখনই আসে, যখন আমরা স্বীকার করি — ম্যান্টল আছে। লোভ আছে। হিংসা আছে। সুযোগ পেলে আমিও টলতে পারি।
এই স্বীকারোক্তি দুর্বলতা নয় — এটাই একমাত্র সততা।
যে মানুষ নিজের ম্যান্টলকে চেনে, সে সুযোগ তৈরি করে না। যে অস্বীকার করে, সে একদিন নিজেই অবাক হয় — "আমি এটা করলাম কীভাবে?"
প্রকৃত সভ্যতা সেই নয় যেখানে কুপ্রবৃত্তি নেই — তা কখনো সম্ভব নয়। প্রকৃত সভ্যতা সেই, যেখানে মানুষ নিজের ম্যান্টলকে চেনে এবং তাকে শাসন করে।
পশুকে অস্বীকার করে নয় — পশুকে পথ দেখিয়ে।

মুফিদুল আলম
শিক্ষক, রামু, কক্সবাজার

মন্তব্য করুন