Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ জুন, ২০২৬ ০৮:৩৪ অপরাহ্ণ

ফলবান বৃক্ষের দুঃখগাথা

ফলবান বৃক্ষের দুঃখগাথা

একদা  জৈষ্ঠ্যের দুপুরে পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হলো।

রাস্তার ধারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুটি আমগাছ।

প্রথম গাছটির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, যেন দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে ফিরে আসা আহত এক সৈনিক। তার ডালপালা ভাঙাচোরা, পাতার চিহ্ন প্রায় মুছে গেছে। গায়ে অসংখ্য ক্ষতের দাগ—কোথাও ইটের আঘাতে ফাটল, কোথাও পাথরের চোটে গভীর দাগ, কোথাও ভাঙা ডালের শুকিয়ে যাওয়া, কালচে ক্ষতচিহ্ন। পুরো গাছটি নীরবে দাঁড়িয়ে আছে—অভিযোগহীন, নিস্তব্ধ, অথচ সম্পূর্ণ ক্ষতবিক্ষত।

পাশের গাছটি একেবারে বিপরীত। অক্ষত, সুঠাম। সবুজ পাতায় ভরপুর, কাণ্ডে একটি আঁচড়ও নেই। তার শাখায় শাখায় ঝকঝকে সতেজতা।

কৌতূহলবশত পাশে দাঁড়ানো এক পথিককে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি মুচকি হেসে বললেন,

“ওই ভাঙাচোরা গাছটায় এবার প্রচুর আম ধরেছিল। পাড়ার ছেলেপিলেরা দিনের পর দিন ইট-পাটকেল ছুড়েছে, ডাল ভেঙেছে, কাঁচা আম পেড়ে নিয়ে গেছে। আর পাশেরটায় আম ছিল কম, মালিকও ছিলেন কড়া। কেউ তাকানোর সাহসই পায়নি।”

লোকটি চলে গেলেন।

দুটি গাছের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হলো, আমি আর গাছের সামনে নই—দুটি ভিন্ন নিয়তির সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

একটি গাছ তার ফল উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। নিজের সেরা সম্পদ আকাশের নিচে ঝুলিয়ে রেখেছিল—পথিকের জন্য, শিশুর জন্য, অপরিচিতের জন্যও। প্রতিদানে সে পেয়েছে শুধু ইট, পাথর আর ভাঙা ডালের আঘাত। তার উদারতার মূল্য চোকাতে হয়েছে নিজের শরীর দিয়ে।

অন্য গাছটি দিয়েছে, কিন্তু সুরক্ষার বেষ্টনীর ভেতর থেকে। তার ফলের অধিকার ছিল নির্দিষ্ট, সীমাবদ্ধ। তাই তার শরীরে কোনো দাগ নেই, কোনো ক্ষত নেই, কোনো স্মৃতিও নেই।

মানুষের এক অদ্ভুত স্বভাব—আমরা ফলকে ভালোবাসি, কিন্তু ফলদানকারীকে নয়। ছায়া চাই, ফল চাই, কিন্তু বৃক্ষের যন্ত্রণা দেখতে চাই না। ফলন্ত গাছের ট্র্যাজেডি ঠিক এখানেই। তার একমাত্র অপরাধ—সে দিয়েছে।

তবে গল্পের আরেকটি দিকও আছে, যা উপেক্ষা করা সহজ নয়।

অক্ষত গাছটি ভুল নয়। পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে সীমারেখা লাগে। উদারতার সঙ্গে প্রজ্ঞা না থাকলে মানুষ শুধু ক্ষয় পায়, কিছু গড়তে পারে না। নদীরও তীর থাকে, আকাশেরও সীমা আছে।

কিন্তু তারপরও—

যে শাখায় সবচেয়ে বেশি ফল ধরে, সেই শাখাই সবচেয়ে বেশি আঘাত পায়। দানের মধ্যে এক ধরনের অনিবার্য ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে, যা না জেনেই মানুষ দিতে শুরু করে। আর একদিন বিস্মিত হয়ে দেখে, তার শরীর ভরে গেছে দাগে, ক্ষতে, স্মৃতিতে।

আমি পথ ছেড়ে চলে এলাম।

কিন্তু ভাঙাচোরা আমগাছটি আমার সঙ্গে রয়ে গেল। মনে হলো, সে নীরবে আমাকে জিজ্ঞেস করছে—

“তুমি কোন জীবন বেছে নেবে? দাগহীন নিরাপত্তা, নাকি ক্ষতবিক্ষত উদারতা?”

আমি উত্তর দিতে পারলাম না।

শুধু বুঝলাম—পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বৃক্ষগুলো কখনো অক্ষত থাকে না। তাদের গায়ে ঝড়ের চিহ্ন থাকে, মানুষের আঘাতের গভীর স্মৃতি থাকে। তবু তারা দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ তারা জানে, ফল দেওয়া বন্ধ করলে বেঁচে থাকাও একদিন অর্থহীন হয়ে যায়।

অক্ষত গাছ বেঁচে থাকে।

ফলন্ত গাছ স্মরণীয় হয়ে থাকে।


— মুফিদুল আলম

রামু, কক্সবাজার

১৪ জুন ২০২৬

মন্তব্য করুন

ব্লগ