প্রধান শিক্ষক
১৪ জুন, ২০২৬ ০৮:৫৫ অপরাহ্ণ
শাস্তির ভয় নয়, খাতা মূল্যায়নে চাই কাঠামোগত সংস্কার
শাস্তির ভয় নয়, খাতা মূল্যায়নে চাই কাঠামোগত সংস্কার
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ সংকটের মূল কারণ কি শুধুই পরীক্ষকদের অবহেলা? প্রকৃত বাস্তবতা আরও জটিল। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি অকার্যকর, অমানবিক এবং সময়সাপেক্ষ ব্যবস্থার ভেতরেই শিক্ষকদের এই অনাগ্রহের জন্ম। সমস্যার গভীরে না গিয়ে কেবল শাস্তির হুঁশিয়ারি দিলে হয়তো সাময়িক সমাধান হবে; কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসবে না।সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণ: প্রথমত, অধিকাংশ শিক্ষককে দূর-দূরান্ত থেকে নিজ খরচে নিজ নিজ শিক্ষা বোর্ডে গিয়ে খাতা সংগ্রহ করতে হয়। যাতায়াত ব্যয় প্রায় এক বছর পরে পরিশোধ করা হয়, ফলে আর্থিক চাপ তৈরি হয়। শিক্ষকদের নিজস্ব যানবাহন নেই, তাই ঝুঁকি নিয়ে কষ্ট করে আসতে হয় এবং খাতা আনা-নেওয়া করতে হয়। পথিমধ্যে যে কোনো জায়গায় খাতা হারানো বা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
দ্বিতীয়ত, বোর্ড অফিসে গিয়ে খাতা সংগ্রহের অভিজ্ঞতা অনেক সময় সম্মানজনক হয় না। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো, ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া পার হওয়া, বসার জায়গার অভাব এসব অভিযোগ নতুন নয়। এ ছাড়াও কর্মচারীদের অনাকাঙ্ক্ষিত বকশিশ সংস্কৃতি ওপেন সিক্রেট। বলা হয় কর্মচারীদের সরকার বেতন দেয় না, খাতার বকশিশই তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। বকশিশ আদায় করতে হাতাহাতির খবর পত্রিকায় দেখা যায়।
তৃতীয়ত, খাতা বহনের বিষয়টি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। বিশেষ করে নারী শিক্ষক, বয়স্ক বা অসুস্থ শিক্ষকদের জন্য এটি অপমানজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ।চতুর্থত, প্রধান পরীক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন আছে। কম অভিজ্ঞ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রধান পরীক্ষক করে অনেক ক্ষেত্রে সিনিয়র শিক্ষকদের তাদের অধীনে সাধারণ পরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, যা কর্মপরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তোলে।
পঞ্চমত, খাতা মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয় না। ক্লাস চালিয়ে, ব্যক্তিগত দায়িত্ব সামলে রাত-দিন পরিশ্রম করে কাজটি করতে হয়, যা অনেকের কাছে নিরুৎসাহের কারণ।
ষষ্ঠত, সামান্য ভুলের জন্যও গণমাধ্যমে মিডিয়া ট্রায়েল তথা সমালোচনার আশঙ্কা থাকে, অথচ প্রশিক্ষণ বা সহায়তা সীমিত।
সবশেষে, সম্মানী অপ্রতুল এবং সময়মতো প্রদান করা হয় না, যা উৎসাহ কমিয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: বিশ্ব কী বলছে?
পরীক্ষা মূল্যায়ন ব্যবস্থার সংকট কেবল বাংলাদেশের নয়। তবে উন্নত দেশগুলো এই সমস্যার সমাধান করেছে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে, শাস্তির ভয় দেখিয়ে নয়।
ভারতের কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড (CBSE) ২০২৬ সাল থেকে দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অন-স্ক্রিন মার্কিং (OSM) পদ্ধতি চালু করছে। এই ব্যবস্থায় উত্তরপত্র স্ক্যান করে ডিজিটাল রূপে পরীক্ষকদের কাছে পাঠানো হবে এবং পরীক্ষকরা নিজ বিদ্যালয় থেকে অনলাইনে নম্বর দিতে পারবেন। ফলে বড় মূল্যায়ন কেন্দ্রে যাতায়াতের প্রয়োজন থাকবে না, মানবিক ভুলের হার কমবে এবং ফলাফল প্রকাশে সময় সাশ্রয় হবে। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বে অন্যতম সেরা বলে স্বীকৃত। সেখানে OECD-এর TALIS ২০২৪ সমীক্ষা অনুযায়ী শিক্ষকরা গড়ে সপ্তাহে মাত্র ৩ দশমিক ৩ ঘণ্টা খাতা মূল্যায়নে ব্যয় করেন, কারণ মূল্যায়ন ব্যবস্থাটি কাঠামোগতভাবে সহজ ও শিক্ষকবান্ধব। শিক্ষকদের সঙ্গে দ্বন্দ্বমূলক নয়, অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা হয়। শিক্ষকরা সেখানে সমাজে সর্বোচ্চ সম্মানিত পেশাদারদের একজন এবং পেশাগত স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করেন।
যুক্তরাজ্যে AQA ও Edexcel-এর মতো পরীক্ষা বোর্ডগুলো অনলাইনে উত্তরপত্র স্ক্যান করে পাঠায়, ফলে পরীক্ষকদের আর ভারী বান্ডিল বহন করতে হয় না। ই-মার্কিং পদ্ধতিতে একটি খাতা একাধিক পরীক্ষক দেখেন এবং নম্বরের ব্যবধান বেশি হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৃতীয় পরীক্ষকের কাছে যায়।
সিঙ্গাপুরে পরীক্ষা মূল্যায়নে কেন্দ্রীয় সমন্বয় কক্ষ থাকে যেখানে পরীক্ষকরা একসঙ্গে বসে কাজ করতে পারেন, সরাসরি সহায়তা পান এবং নির্দিষ্ট মডারেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থিরতা নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশ এই মডেল থেকেও শিক্ষা নিতে পারে।
সমাধানের পথ: দায় নয়, দায়িত্বের পুনর্বিন্যাস
এই বাস্তবতায় শিক্ষা বোর্ডগুলোর উচিত শিক্ষকদের সহযোগী হিসেবে দেখা, অভিযুক্ত হিসেবে নয়। শিক্ষকরা এই ব্যবস্থার বা কর্তৃপক্ষের শত্রু নন, তারা এই ব্যবস্থার চালিকাশক্তি।
প্রথমত, উত্তরপত্র বিতরণ ও সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বোর্ড নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে খাতা সংশ্লিষ্ট স্কুল-কলেজে পৌঁছে দিতে পারে এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে তা সংগ্রহ করতে পারে। এতে হাজারো শিক্ষকের অগণিত কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে।
দ্বিতীয়ত, পরীক্ষকদের জন্য নির্ধারিত দায়িত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা মনোযোগ দিয়ে মূল্যায়ন করতে পারেন।
তৃতীয়ত, নম্বর ইনপুট সম্পূর্ণভাবে অনলাইনে করতে হবে, QR কোড বা সফটওয়্যারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে।
ত্রিপল পরীক্ষক পদ্ধতি: ন্যায়সংগত মূল্যায়নের রূপরেখা
বর্তমান একক বা সীমিত পর্যায়ের মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তে ত্রিপল পরীক্ষক ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে একটি খাতা পর্যায়ক্রমে তিনজন পরীক্ষক মূল্যায়ন করবেন। প্রত্যেকে সর্বোচ্চ ৫০টি খাতা এবং ৭ দিনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করবেন।
প্রথম ও দ্বিতীয় পরীক্ষক খাতায় কোনো কালি ব্যবহার করবেন না, নির্ধারিত ছকে নম্বর দিয়ে QR কোডের মাধ্যমে অনলাইনে জমা দেবেন। তৃতীয় পরীক্ষক খাতায় লাল কালি দিয়ে চূড়ান্ত নম্বর বসাবেন এবং অনলাইনে তা আপলোড করবেন।
তিন পরীক্ষকের নম্বরের গড় করে চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করা হবে। যদি নম্বরের ব্যবধান ১০-এর বেশি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের যারা ওভার মার্কিং কিংবা লো মার্কিং করেছেন তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এই পদ্ধতিটি মূলত যুক্তরাজ্যের ই-মার্কিং কাঠামোর অনুরূপ, যা দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে প্রয়োগ হচ্ছে।
খাতার কভার পেজে পরীক্ষার্থী ও তিন পরীক্ষকের জন্য পৃথক অংশ থাকবে, যা স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হবে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে।
সহায়ক সংস্কার
শুধু মূল খাতা মূল্যায়নই নয়, কয়েকটি পরিপূরক সংস্কারও জরুরি। ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষায় বিস্তারিত সংখ্যাসূচক নম্বরের বদলে উত্তীর্ণ বা অনুত্তীর্ণ কিংবা সীমিত গ্রেড বিন্যাস প্রবর্তন করা যেতে পারে, যা মূল্যায়নকে সহজ ও বস্তুনিষ্ঠ করবে।
পরীক্ষায় মূল খাতার সাথে একাধিক অতিরিক্ত উত্তরপত্র প্রদানের প্রথা বাতিল করে মূল খাতায় অতিরিক্ত পাতা সংযোজনের ব্যবস্থা করা হলে খাতার ভার ও জটিলতা দুটিই কমবে।
নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্রের ক্ষেত্রে সফটওয়্যারভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নসেট প্রবর্তন করলে কেন্দ্রে পরীক্ষার শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহজ হবে। বর্তমান সিস্টেমে ৪ সেট প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়, পরীক্ষার হলে এক আঙুল দুই আঙুল দেখিয়ে উত্তর লেনদেন হয়, যা কোনোভাবে প্রত্যবেক্ষকরা ঠেকাতে পারেন না।
শেষ কথা
বিশ্বের সফল শিক্ষাব্যবস্থাগুলো প্রমাণ করেছে, শিক্ষকদের ভয় দেখিয়ে নয়, তাদের সম্মান দিয়ে এবং কাজের পরিবেশ উন্নত করেই গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব। ফিনল্যান্ড শিক্ষকদের পেশাগত স্বায়ত্তশাসন দিয়ে বিশ্বসেরা হয়েছে। যুক্তরাজ্য প্রযুক্তি দিয়ে মূল্যায়নের ভার কমিয়েছে। ভারত ২০২৬ সাল থেকে অন-স্ক্রিন মার্কিং চালু করে ডিজিটাইজেশনে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাংলাদেশেও সেই পথ খোলা আছে। শিক্ষকদের ওপর দায় চাপিয়ে নয়, বরং তাদের কাজের পরিবেশ উন্নত করে, প্রযুক্তি যুক্ত করে এবং ন্যায়সংগত মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তুলেই এই সংকটের সমাধান সম্ভব।
শাস্তির ভয় নয়, সম্মান, সহায়তা এবং কাঠামোগত সংস্কারই পারে খাতা মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে একটি বিশ্বাসযোগ্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে।
লেখক: শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা।
৩
৩ মন্তব্য