সিনিয়র শিক্ষক
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:৩৩ অপরাহ্ণ
সৃজনশীল বাংলাদেশ গড়তে চাই সৃজনশীল শ্রেণিকক্ষ
সৃজনশীল বাংলাদেশ গড়তে চাই সৃজনশীল শ্রেণিকক্ষ
সেদিন ঝড় এসেছিল হঠাৎ। টিনের চালায় বৃষ্টির শব্দ এত তীব্র যে আমার কথা শিক্ষার্থীরা শুনতে পাচ্ছিল না। শ্রেণিকক্ষ অন্ধকার, বাইরে ঝড়ো বাতাসের দাপট। পাঠদান অসম্ভব। নিরুপায় হয়ে বললাম, "এই মুহূর্তটাকে দেখো। যা অনুভব করছ, তা লিখে ফেলো — গল্প হোক, কবিতা হোক, যা খুশি।"
সেটা ছিল দশ বছর আগের কথা।
গত ঈদের পরেরদিন সাফিয়া নূর মোকারমা — সেদিনের এক শিক্ষার্থী — আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে বলল, "স্যার, আমার কবি হওয়ার প্রথম পাঠ ছিল সেই ঝড়ের দিনের কবিতা লেখার নির্দেশনা। আজ আমার লেখা কবিতা বিদেশের কাগজেও স্থান পায়।"
আমি অবাক হইনি। কারণ সেদিন আমি কোনো পরিকল্পিত শিক্ষাপদ্ধতি অনুসরণ করিনি। শুধু একটি মুহূর্তকে শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দিয়েছিলাম। আর সেই মুহূর্তই একটি মেয়ের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা কবিকে জাগিয়ে দিয়েছিল।
এই একটি ঘটনাই আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় — সৃজনশীলতার জন্ম কোনো পাঠ্যক্রমের ভেতরে নয়, বরং সেই ফাঁকে, যেখানে শিক্ষার্থী নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পায়।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আর প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং সৃজনশীল মানবসম্পদ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির এই যুগে যে জাতি নতুন চিন্তা করতে পারে, নতুন ধারণা সৃষ্টি করতে পারে, সেই জাতিই এগিয়ে যায়। তাই আজকের প্রশ্ন কেবল শিক্ষিত মানুষ গড়ে তোলা নয়; বরং সৃজনশীল, অনুসন্ধিৎসু ও উদ্ভাবনী মানুষ গড়ে তোলা।
কিন্তু বাস্তবতা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। একদিকে আমরা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল হতে বলি, অন্যদিকে তাদের সামনে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড় করাই, যেখানে মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা এবং নম্বরের প্রতিযোগিতা প্রধান হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা তথ্য সংগ্রহে দক্ষ হলেও স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে কিংবা নতুন কিছু সৃষ্টি করতে প্রায়শই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাদের শেখানো হয় কী ভাবতে হবে; কিন্তু শেখানো হয় না কীভাবে ভাবতে হবে।
সৃজনশীলতা কোনো জাদুকরি ক্ষমতা নয় যা পরীক্ষার খাতায় হঠাৎ প্রকাশ পাবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চর্চার ফল — এবং সেই চর্চার জন্য প্রয়োজন মুক্ত পরিবেশ। সেই পরিবেশ তৈরি করতে পারে শ্রেণিকক্ষই, যদি শিক্ষক চান।
সাহিত্যচর্চা এই পথে অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। একটি গল্প পড়তে গিয়ে শিক্ষার্থী অন্যের জীবনকে অনুভব করতে শেখে; একটি কবিতা তাকে প্রকৃতি ও মানুষকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়। তবে শুধু পড়লেই হবে না — লিখতেও হবে। নিজের দেখা ঘটনা, নিজের অনুভূতি, নিজস্ব মতামত — এগুলো ভাষায় রূপ দেওয়ার অভ্যাসই শিক্ষার্থীকে তার নিজের ভেতরের জগৎ আবিষ্কার করতে সাহায্য করে।
অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের নিয়ে যেতে হবে প্রকৃতির কাছে, নদীর তীরে, ঐতিহাসিক স্থানে। একটি শিক্ষাসফর শেষে যদি বলা হয়, "আজকের সবচেয়ে বিস্ময়কর মুহূর্তটি লিখো" — তখন তারা শুধু তথ্য নয়, অনুভূতি ও বিশ্লেষণও ব্যবহার করে। এভাবেই শিক্ষা জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ভবিষ্যতের জন্য যে দক্ষতাগুলোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, তার মধ্যে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অন্যতম। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এই কাজে শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে কেন্দ্রীয়। একজন শিক্ষক যখন নিজে কৌতূহলী থাকেন, শিক্ষার্থীর প্রশ্নকে স্বাগত জানান এবং ভুলকে শাস্তি নয় বরং শেখার সুযোগ হিসেবে দেখেন — তখন শ্রেণিকক্ষ স্বাভাবিকভাবেই বদলে যায়।
সেদিনের ঝড় থামলে আমি শিক্ষার্থীদের লেখা পড়েছিলাম। কেউ লিখেছিল বৃষ্টির শব্দের কথা, কেউ ভয়ের কথা, কেউ লিখেছিল মায়ের কথা। মোকারমা লিখেছিল একটি কবিতা — এলোমেলো, অপরিণত, কিন্তু সম্পূর্ণ তার নিজের।
সেটাই ছিল আসল শিক্ষা।
একটি সৃজনশীল বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের প্রথমে গড়ে তুলতে হবে সৃজনশীল শ্রেণিকক্ষ — এমন শ্রেণিকক্ষ যেখানে মুখস্থের চেয়ে বোঝার মূল্য বেশি, ভয়ের চেয়ে কৌতূহল বড়, নম্বরের চেয়ে মানুষের বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে একটি ঝড়ও হয়ে উঠতে পারে শিক্ষার উপকরণ — আর একটি অন্ধকার শ্রেণিকক্ষও হয়ে উঠতে পারে একজন কবির জন্মভূমি।
লেখক: মুফিদুল আলম
রামু, কক্সবাজার।
১৫-৬-২০২৬
৫৩
৯২ মন্তব্য