সহকারী অধ্যাপক
১৫ জুন, ২০২৬ ০৬:২১ অপরাহ্ণ
রবের পানে মানুষের যাত্রা (সূরা ইনশিকাক ৬-এর ভাবানুবাদে ) - মোঃ মুজিবুর রহমান
রবের পানে মানুষের যাত্রা
(সূরা ইনশিকাক ৬-এর ভাবানুবাদে )
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
শুরু করি হৃদয়ছোঁয়া এক জাগরণের গান,
যে গান শুনে ভাবতে শেখে নিদ্রিত মানবপ্রাণ।
হে মানুষ! তুমি পথিক এ ধরার ক্ষণিক তীরে,
চলছ সদা অজানার পানে সময়ের স্রোতধীরে।
জন্মের ক্ষণে প্রথম কাঁদন, প্রথম শ্বাসের ডাক,
সেই থেকেই শুরু হয়েছে জীবনের অভিযাত্রার পাক।
মায়ের কোলে হাসির দোলা, বাবার স্নেহছায়া,
ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা, স্বপ্নের রঙিন মায়া।
শৈশব আসে ফুলের মতো নির্মল সুখের বেশে,
কিশোর বয়স ছুটে বেড়ায় অজস্র আশার দেশে।
যৌবন আসে শক্তির ডানা, সাহস ভরা মন,
পৃথিবী জয়ের স্বপ্ন বুকে গড়ে নতুন পণ।
কেউ বা জ্ঞানের দীপ জ্বালায় অধ্যবসায় ভরে,
কেউ বা ধনের পেছনে ছুটে ব্যস্ত নগর ঘিরে।
কেউ খোঁজে সম্মান-প্রতিপত্তি, কেউ খোঁজে ক্ষমতা,
কেউ বা খোঁজে সত্যের আলো, চিরকল্যাণের কথা।
দিনের পরে রাত নেমে আসে, রাতের পরে দিন,
সময়ের চাকা ঘুরে চলে অবিরাম প্রতিক্ষণ।
মানুষ ভাবে, “আমিই কর্তা, আমারই এ জয়,”
ভুলে যায় সে, ক্ষণিক জীবন অনন্ত নয়।
হে মানুষ! তুমি শ্রমিক এক মহাযাত্রার পথে,
ঘাম ঝরে যায় কপাল বেয়ে জীবনসংগ্রাম রথে।
তোমার প্রতিটি চেষ্টা তবে হারায় না নিরুদ্দেশে,
প্রতিটি পদচিহ্ন রয়ে যায় বিধাতারই পরিবেশে।
তুমি চাষ কর মাঠের বুকে সোনালি ধানের আশায়,
তুমি গড়ো অট্টালিকা উচ্চ ভবিষ্যতের ভাষায়।
তুমি লেখো জ্ঞানের পাতা, করো গবেষণা,
তুমি গড়ো সভ্যতার পথে উন্নতির সোপান।
তুমি ভাবো সবই বুঝি মাটির জীবনের তরে,
কিন্তু গোপন সত্যটি রয় অন্তরেরই ঘরে।
তোমার সকল শ্রমের ধারা, সকল কর্মগাথা,
রবের পানে ধাবিত হয় অদৃশ্য নিয়মে যথা।
নদী যেমন সাগর পানে ছুটে চলে নিরন্তর,
মানুষ তেমনি রবের পানে এগোয় অবিরত।
সে জানুক আর নাই-বা জানুক এ যাত্রার রহস্য,
শেষ ঠিকানা রবের কাছে, এটাই চূড়ান্ত সত্য।
কেউ করে সৎকর্ম নীরবে মানবকল্যাণ তরে,
ক্ষুধার্ত মুখে অন্ন তুলে, বিপদে পাশে দাঁড়ায় ঘরে।
কেউ মুছে দেয় এতিমের চোখের নোনাজল,
কেউ ছড়িয়ে দেয় প্রেমের আলো, করে জীবন উজ্জ্বল।
আবার কেউ অন্যায় করে, করে জুলুম ভারী,
মিথ্যা বলে, প্রতারণায় ভরে নিজের ঝুলি।
দুর্বলের হক কেড়ে নেয় শক্তির অহংকারে,
ভুলে যায় সে, বিচার হবে একদিন অবসরে।
সময় কিন্তু থেমে থাকে না কারো অপেক্ষায়,
যৌবনের দীপ্ত সূর্য ডুবে বার্ধক্যের ছায়ায়।
চোখের জ্যোতি ম্লান হয়ে যায়, কমে দেহের বল,
জীবনসায়াহ্ন মনে করায় পৃথিবী ক্ষণিক চল।
যে হাত ছিল শক্তিশালী কাঁপতে থাকে শেষে,
যে পা ছিল দ্রুতগামী ধীর হয় নিঃশব্দ বেশে।
যে মুখ ছিল গর্বে ভরা নত হয় একদিন,
সময় যেন শিক্ষা দেয়—মানুষ ক্ষণিক ঋণ।
তারপর আসে সেই মুহূর্ত, অনিবার্য যে ক্ষণ,
যখন থেমে যায় পৃথিবীর সব পরিচিত স্পন্দন।
বন্ধ হয় দেহের দুয়ার, স্তব্ধ হয় বাক্যধারা,
আত্মা তখন যাত্রা করে অন্য এক কিনারা।
মুমিন যদি হয় সে মানুষ, ঈমান থাকে প্রাণে,
রবের সন্তুষ্টির সুসংবাদ আসে তারই কানে।
ফেরেশতারা ডেকে বলে, “ভয় করো না আর,
তোমার জন্য প্রস্তুত আছে শান্তিময় সংসার।”
তখন তার হৃদয় ভরে অনির্বচনীয় সুখে,
রবের সাথে সাক্ষাৎ হবে—আনন্দ জাগে বুকে।
সে চায় যেতে প্রভুর কাছে উন্মুখ ভালোবাসায়,
রবও তখন গ্রহণ করেন অসীম অনুগ্রহ ছায়ায়।
আর যে ছিল সত্যবিমুখ অহংকারে ভরা,
অন্যায় করে কাটিয়েছে জীবনের ধারা।
মৃত্যুকালে শুনতে পায় শাস্তির কঠিন বাণী,
ভয়ে তার হৃদয় কেঁপে ওঠে, ম্লান হয় মুখখানি।
তখন সে আর চাইতে পারে না সেই সাক্ষাৎক্ষণ,
কারণ সামনে প্রকাশ পাবে কর্মের প্রতিফলন।
যা করেছে দুনিয়াজুড়ে গোপনে কিংবা প্রকাশে,
সবই তখন সামনে এসে দাঁড়াবে তার পাশে।
কিয়ামতের সেই মহাদিন, ভয়াল বিচারসভা,
কেউ লুকাতে পারবে না আর জীবনের হিসাবখাতা।
পর্বত হবে ধূলিকণা, সাগর হবে উত্তাল,
মানুষ তখন অপেক্ষায় থাকবে বিচারের কাল।
খুলে যাবে কর্মের পাতা, প্রকাশ পাবে সব,
নেই সেখানে মিথ্যার সুযোগ, নেই কোনো আড়াল রব।
যে যতটুকু করেছে কর্ম, ক্ষুদ্র কিংবা বড়,
সবই লেখা রয়েছে সযত্নে, কিছু নয় হারানো পর।
সৎকর্ম যাদের দীপের মতো আলোকিত করেছে পথ,
তাদের মুখে ফুটবে সেদিন শান্তির নির্মল রথ।
তারা বলবে, “রব আমাদের দয়া করেছেন আজ,”
সফল হলো জীবনের সব ধৈর্য, সাধনা, কাজ।
আর যারা সত্য অস্বীকারে কাটিয়েছে দিন,
তারা দেখবে নিজেদেরই কর্মের কঠিন ঋণ।
অনুতাপে কাঁদবে তখন, ফিরবে না সে কাল,
শেষ হয়ে যাবে সুযোগ সব, রুদ্ধ হবে জাল।
হে মানুষ! এখনও সময় আছে জেগে ওঠার তরে,
সত্যের পথে ফিরে আসো হৃদয়ের অন্তরে।
জীবন কেবল ভোগের জন্য নয় যে ক্ষণস্থায়ী,
এ জীবন এক পরীক্ষা, এক আমানত দায়ী।
পরিশ্রম কর, সাধনা কর, সৎপথে অবিচল,
ন্যায় ও সত্য আঁকড়ে ধর, করো হৃদয় উজ্জ্বল।
মানবসেবায় নিজেকে দাও, করো কল্যাণকাজ,
রবের সন্তুষ্টিই হোক জীবনের মহাসাজ।
কারণ তুমি পথিক মাত্র, স্থায়ী নও এখানে,
একদিন ফিরতেই হবে সৃষ্টিকর্তার সনে।
তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাস তাই অর্থবহ হোক,
সৎকর্মের সুবাসে ভরে উঠুক জীবনলোক।
হে মানুষ! তোমার যাত্রাপথ রবের দিকেই ধায়,
তোমার সকল কষ্টসাধনা তাঁর কাছেই যায়।
অবশেষে তাঁরই সামনে দাঁড়াবে নিশ্চয়,
সেদিন হবে প্রকাশিত জীবনের পরিচয়।
তাই এসো আজ সত্যের ডাকে জাগাই অন্তরপ্রাণ,
রবের পথে চলার হোক নতুন অঙ্গীকারের গান।
যেন তাঁর সাক্ষাৎলাভে হৃদয় থাকে প্রস্তুত,
ঈমান, আমল, ন্যায় ও প্রেমে জীবন হয় সমৃদ্ধ।
শেষ করি আশা ভরা এক প্রার্থনার সুরে,
রব যেন রাখেন আমাদের সত্যের আলোকপুরে।
যেদিন হবে তাঁর সাক্ষাৎ, বিচার হবে সবার,
সেদিন যেন হাসিমুখে দাঁড়াই তাঁর দরবার।
***
শুরু করি হৃদয়ছোঁয়া এক চিরসত্যের গান,
যে সত্য জাগায় নিদ্রিত প্রাণ, জাগায় বিবেক-প্রাণ।
আসমানের নীল গম্বুজে, নক্ষত্রভরা রাতে,
এক আহ্বান ধ্বনিত হয় যুগে যুগে মানবজাতে।
হে মানুষ! কোথায় তোমার গর্ব, কোথায় অহংকার?
কোথায় তোমার শক্তি, ধন, প্রাসাদ অগণন ভার?
কোথায় তোমার জ্ঞানের দীপ, সভ্যতার আয়োজন?
সবকিছুরই শেষে আছে এক মহান সমাপন।
তুমি এসেছ ক্ষণিক তরে পৃথিবীর এ বুকে,
হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা, সুখ-দুঃখের সুখে।
জন্মমুহূর্ত হতে শুরু অদৃশ্য এক পথ,
সময়ের স্রোতে ভেসে চলে জীবনরথ অবিরত।
মায়ের কোলে প্রথম হাসি, প্রথম ভাষার ডাক,
শৈশব যেন শিশিরভেজা নির্মল প্রভাত-পাক।
তারপর আসে তারুণ্যের দীপ্ত সূর্যকিরণ,
স্বপ্নমাখা দুচোখ জুড়ে ভবিষ্যতের আয়োজন।
কেউ চলে জ্ঞানের সন্ধানে, কেউ সম্পদের তরে,
কেউ সম্মানের মুকুট খোঁজে ব্যস্ত নগরঘরে।
কেউবা ন্যায়ের পতাকা ধরে সত্যের পথে রয়,
কেউবা মিথ্যার আঁধারপথে হারিয়ে ফেলে ভয়।
তবু সবার গন্তব্য এক, সবার একই ধারা,
ভিন্ন ভিন্ন পথ বেয়ে চলে এক মহাযাত্রা।
কেউ জানে না, তবু সে চলে বিধানেরই টানে,
প্রতিটি প্রাণ ধাবিত হয় আপন প্রতিপালকের পানে।
কৃষক যখন রৌদ্রদাহে চাষ করে মাঠজুড়ে,
শ্রমিক যখন ঘাম ঝরায় ইটের ভারী বোঝা কাঁধে তুলে,
জ্ঞানী যখন রাত জেগে লেখে জ্ঞানের ইতিহাস,
সৈনিক যখন রক্ষা করে জাতির গৌরব-আবাস—
সবার শ্রম, সবার সাধনা, সবার কর্মধারা,
অদৃশ্য স্রোতে মিলিত হয় রবেরই কিনারা।
মানুষ ভাবে—“আমার জন্য এ সকল আয়োজন”,
রব বলেন—“আমার দিকেই তোমার প্রত্যাবর্তন”।
নদী যেমন সাগরপানে ছুটে চলে অবিরাম,
ঝরনা যেমন খুঁজে ফেরে মহাসাগরের নাম,
মানুষ তেমনি জীবনভর কর্মের ভার বয়ে,
চলে শুধু রবের পানে অজান্তে কিংবা জেনে।
কঠোর সাধনা, অশ্রু, ঘাম, সংগ্রামের প্রতিক্ষণ,
হারিয়ে যায় না কিছুই, থাকে লিপিবদ্ধ তখন।
ক্ষুদ্রতম সৎকর্মও নয় বিস্মৃতির অতলে,
অন্যায়েরও প্রতিটি দাগ রয়ে যায় অম্লান ফলে।
একদিন সূর্য নিভে যাবে, স্তব্ধ হবে কাল,
ভেঙে পড়বে পর্বতমালা, বদলে যাবে জগৎচাল।
আকাশ হবে বিদীর্ণ সেদিন, তারারাও ঝরিবে,
মহাবিচার দিবস এসে সত্য সকল খুলিবে।
মানুষ তখন দেখবে নিজেই জীবনের ইতিহাস,
যা করেছে গোপনে কিংবা প্রকাশ্য পরিবেশে সর্বনাশ।
যা বলেছে, যা ভেবেছে, যা করেছে অন্তরে,
সবকিছুই উপস্থিত হবে বিচারেরই মঞ্চঘরে।
মুমিন যদি হয় সে বান্দা ঈমান যার প্রাণে,
রহমতেরই সুসংবাদ আসবে তার কানে।
ফেরেশতারা বলবে এসে—“ভয় করো না আর,
তোমার জন্য উন্মুক্ত আজ শান্তিময় সংসার।”
তখন তার হৃদয় হবে আনন্দে উদ্বেল,
দীর্ঘ জীবনের সাধনাগাথা হবে সেদিন সফল।
সে বলবে—“আজ পূর্ণ হলো সকল আশা-স্বপ্ন,
আজ আমি ফিরছি প্রিয় রবের সান্নিধ্যের আপন।”
আর যে ছিল অবাধ্য, সত্য থেকে দূরে,
অহংকারের মুকুট পরে চলেছিল গর্বভরে,
সে দেখবে তার কর্মফল জ্বলন্ত আয়নার মতো,
অনুতাপের অশ্রু ঝরবে, ফিরবে না সময় ততো।
হে মানুষ! এখনও আছে সুযোগ ফিরে আসার,
সত্যের পথে নিজেকে গড়ার, অন্তর আলোকিত করার।
কারণ জীবন ক্ষণিক ছায়া, মুসাফিরের পথ,
চিরস্থায়ী আবাস কেবল আখিরাতের রথ।
তাই পরিশ্রম করো তুমি, কিন্তু ভুলে যেও না,
শ্রমের শেষে রবের সাথে সাক্ষাৎ আছে জানা।
তোমার সকল চেষ্টা শেষে, সকল দিনের পরে,
দাঁড়াতে হবে একদিন তোমার প্রতিপালকের দ্বারে।
সেদিন যেন মুখ উজ্জ্বল হয় ঈমানের আলোয়,
সেদিন যেন নাম ডাকা হয় সফলদেরই দলে।
এই প্রার্থনায় শেষ করি প্রথম সর্গের গান—
রবের প্রেমে জাগ্রত হোক সমগ্র মানবপ্রাণ।
***
দুনিয়া যেন রঙিন মেলা, ক্ষণিক সুখের গান,
মোহের জালে বন্দী করে সরল মানবপ্রাণ।
ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, যশ, সৌন্দর্যের ডালি,
চোখের সামনে সাজিয়ে রাখে মায়ার রঙিন জালি।
মানুষ তখন ভুলে যায় সে পথিক ক্ষণিককাল,
চিরস্থায়ী ভেবে বসে এ জগতের জাল।
অট্টালিকার চূড়া ছুঁয়ে আকাশ দেখে হাসে,
মনে করে সুখের নদী চিরদিনই ভাসে।
কিন্তু সময় নীরব স্রোতে বদলে দেয় সব,
রাজমুকুট ধূলায় মেশে, নিভে যায় গর্বরব।
যা ছিল গতকাল আপন, আজ তা পরের হাতে,
এভাবেই দুনিয়া শেখায় অনিত্যতার প্রাতে।
হঠাৎ একদিন শিঙ্গা বাজে, কেঁপে ওঠে ধরা,
নিভে যায় সব মিথ্যা স্বপ্ন, থামে জীবনের ধারা।
খুলে যায় কর্মের খাতা, প্রকাশ পায় সব,
নেই সেখানে গোপন কিছু, নেই কোনো আড়াল রব।
হাতের ডানে পাবে কেউ তার সাফল্যের দলিল,
আনন্দে তার হৃদয় ভরে, উজ্জ্বল হবে মনিল।
আর কেউ পাবে বাম হাতে বা পেছন দিক হতে,
অনুশোচনার আগুন জ্বলবে তার অন্তরজুড়ে।
যে কথাটি তুচ্ছ ভেবে বলেছিল একদিন,
সেটিও লেখা রইল সযত্নে সময়ের অমলিন।
যে অশ্রুবিন্দু মুছে দিয়েছিল অসহায়ের গালে,
তার প্রতিদানও লিপিবদ্ধ অমর মহাকালে।
যারা রবের পথে ছিল অবিচল নির্ভীক,
সত্যের ডাকে সাড়া দিয়ে করেছে জীবন ঠিক,
তাদের কাছে আসবে সেদিন রহমতের সংবাদ,
ফুটে উঠবে মুখে তাদের শান্তির আভাস।
ফেরেশতারা বলবে এসে, “ভয় করো না আর,
দুঃখের রাত শেষ হয়েছে, উন্মুক্ত সুখদ্বার।”
দীর্ঘ জীবনের ত্যাগ-তিতিক্ষা সফল হবে আজ,
রবের দয়া ছায়া হয়ে ঘিরে ধরবে সাজ।
তারা বলবে—“প্রশংসা সব বিশ্বজগতের রবের,
তিনি পূর্ণ করেছেন আশা অন্তরের গভীরে।”
আনন্দধ্বনি উঠবে তখন জান্নাতের পথ ধরে,
শান্তির আলো ঝলমলাবে অপরূপ ভুবনে।
যারা সত্যের আলো দেখে ফিরিয়ে নিল মুখ,
অন্যায়ের পথে কাটিয়েছে জীবনের সব সুখ,
তাদের সামনে উন্মোচিত হবে কঠিন ফল,
অহংকারের প্রাসাদ ভেঙে পড়বে অবিরল।
ধন তখন আর কাজে আসবে না কোনোদিন,
ক্ষমতাও হবে অসহায়, হারাবে তার ঋণ।
বন্ধুরা কেউ পাশে থাকবে না সেদিনকার ভোরে,
প্রত্যেকে ব্যস্ত নিজের ভাগ্য নিয়ে ভয়ে ঘোরে।
তারা চাইবে ফিরে যেতে পৃথিবীর জীবনে,
একটি সৎকর্ম করতে আবার সুযোগের ক্ষণে।
কিন্তু সময় পেরিয়ে গেছে, বন্ধ হয়েছে দ্বার,
অতীত আর ফিরবে না যে কোনোদিন আর।
মহামহিম বিচারসভা স্থাপিত হবে সেদিন,
নিঃশব্দে দাঁড়াবে সবে, থেমে যাবে রঙ্গরিন।
রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, জ্ঞানী কিংবা সাধারণ,
এক কাতারে উপস্থিত হবে সকল মানবজন।
রবের ন্যায়বিচারের সামনে নেই পক্ষপাত,
ক্ষুদ্রতম সৎকর্মও পাবে মর্যাদার প্রভাত।
অন্যায়েরও প্রতিটি দাগ স্পষ্ট হয়ে রয়,
সত্যের পাল্লা ভারী হবে, মিথ্যার হবে ক্ষয়।
মানুষ তখন বুঝতে পারবে জীবনের মানে,
কেন এসেছিল পৃথিবীতে ক্ষণিক সময়খানে।
প্রকাশ পাবে কর্মফলের চূড়ান্ত পরিচয়,
ন্যায়ের সামনে মিথ্যা সকল নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
অবশেষে খুলবে দ্বার শান্তিময় আবাস,
যেখানে নেই কোনো দুঃখ, নেই বেদনার নিশ্বাস।
নদী বহে স্নিগ্ধ সুরে, বাগান ভরা ফুল,
চিরবসন্ত হাসিমুখে মুছে দেয় সব ভুল।
নেই সেখানে ভয় কিংবা মৃত্যুর আশঙ্কা,
নেই কোনো হিংসা-বিদ্বেষ, নেই কোনো শঙ্কা।
রবের সন্তুষ্টি হবে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার,
যার তুলনায় ম্লান হয়ে যায় পৃথিবীর অহংকার।
মুমিনেরা বলবে সেথা কৃতজ্ঞতার বাণী,
“প্রভু! তোমার দয়ায় আজ পূর্ণ হলো প্রাণী।”
অনন্ত সুখের সাগর বেয়ে চলবে জীবনধারা,
রবের নৈকট্যে পূর্ণ হবে সকল আশা-তারা।
হে মানুষ! তোমার জীবন ক্ষণিক সফরপথ,
রবের পানে চলছ তুমি দিনরাত অবিরত।
তাই সৎকর্মে গড়ো জীবন, সত্যকে কর সাথী,
যেন শেষের সেই সাক্ষাতে মুখ হয় আলোকময় মাতি।
পরিশ্রমের প্রতিটি ক্ষণ বৃথা যাবে না কভু,
সবকিছুরই হিসাব রাখেন বিশ্বজগতের রব।
তাঁরই পানে যাত্রা সবার, তাঁরই কাছে ফেরা,
এই সত্যেই জাগুক মানবতার নতুন ভোরের সেরা।
***
শুরু করি হৃদয়ছোঁয়া এক চিরন্তন গান,
যে গান জাগায় যুগে যুগে নিদ্রিত মানবপ্রাণ।
যে গান বলে—জীবন কেবল ক্ষণিক পথচলা,
অন্তিম প্রহরে সবার হবে আপন ঘরে ফেরা।
আকাশজোড়া সূর্য-চন্দ্র, নক্ষত্রের মেলা,
পাহাড়-নদী, বনানী, সাগর—স্রষ্টার অপার খেলা।
প্রতিটি সৃষ্টি সাক্ষ্য দেয় এক মহান বিধানের,
প্রতিটি প্রাণ ধাবিত হয় নির্ধারিত গন্তব্যের পানে।
শিশুর প্রথম কান্নাধ্বনি, বৃদ্ধের শেষ নিশ্বাস,
সবই যেন এক মহাযাত্রার অধ্যায়ের ইতিহাস।
জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত দিনরাতের পথ,
মানুষ চলে অদৃশ্য ডাকে, বহে জীবনের রথ।
কেউ খোঁজে ধন, কেউ খোঁজে যশ, কেউ সম্মানের মালা,
কেউবা সত্যের সন্ধান করে আলোর দীপশিখা জ্বালা।
কেউ জ্ঞানের পথে নিরলস, কেউ মানবসেবায় রত,
কেউবা আবার ভ্রান্তির স্রোতে হারায় সঠিক মত।
তবু সকল পথের শেষে একটিই মহাসত্য—
মানুষ ফিরে যাবে সেদিন আপন প্রতিপালকের নিকট।
কর্মের বীজ যে বপন করে জীবনের মাঠজুড়ে,
ফল তারই ফুটে উঠবে আখিরাতের ভোরে।
সেদিন খুলবে কর্মখাতা, হবে হিসাব সব,
গোপন কিছু রবে না আর বিশ্বজগতের রব।
সৎকর্ম হবে আলোর মতো, অন্যায় হবে ভার,
ন্যায়বিচারের পাল্লায় হবে চূড়ান্ত বিচার।
মুমিন পাবে শান্তির বাণী, জান্নাতের সুসংবাদ,
অবাধ্য দেখবে কর্মফল, হারাবে মিথ্যা সাধ।
শেষে খুলবে চিরশান্তির অনন্ত সুখদ্বার,
যেখানে রবের সন্তুষ্টিই সর্বোচ্চ উপহার।
এই কাব্য সেই যাত্রারই মহাগাথা মহান,
মানুষ থেকে রবের পানে প্রত্যাবর্তনের গান।
আসুন তবে শুনি সবাই হৃদয় মেলে আজ,
জীবনের এই মহাসফরের অমর কাব্যসাজ।
৫৩
৯২ মন্তব্য