সহকারী অধ্যাপক
১৬ জুন, ২০২৬ ০৬:১৫ পূর্বাহ্ণ
ঈমানের আহ্বান (সূরা আল-বাকারা ২৮৫-এর আলোকে) - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
ঈমানের আহ্বান
(সূরা আল-বাকারা ২৮৫-এর আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
শুরু করি শ্রদ্ধাভরে ঈমানের মহাগান,
যে সুর জাগায় অন্তরে আলোর আহ্বান।
আসমানের বিস্তারে, ধরার প্রতিটি কোণে,
রয়েছে রবের নিদর্শন যুগে যুগে, ক্ষণে ক্ষণে।
আল্লাহরই সবকিছু, আকাশ ও ধরনী,
তাঁরই ইশারায় চলে সৃষ্টির প্রতিধ্বনি।
নক্ষত্র, সূর্য, চাঁদ, বাতাসের গীতি,
সবাই বলে—এক আল্লাহ, তিনিই মহাশক্তি।
মানুষের অন্তরের গোপন যত কথা,
অশ্রুর নীরব ধারা, হৃদয়ের ব্যথা,
মুখে যা উচ্চারিত, মনে যা লুকানো,
সবই রবের জ্ঞানে সদা সুপরিচিত জানা।
অন্ধকার রাত যেমন জানে না গোপন,
রবের কাছে তেমনি প্রকাশিত জীবন।
কোনো চিন্তা, কোনো ভয়, কোনো আশা-স্বপ্ন,
তাঁরই জ্ঞানের সামনে হয় না কখনো গোপন।
তিনি হিসাব নেবেন কর্ম আর নিয়তের,
দেখবেন হৃদয়ভরা সত্যতার প্রহর।
যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন দয়ার মহাসাগর,
যাকে ইচ্ছে সতর্ক করেন ন্যায়ের কঠোর প্রহর।
দয়া ও ন্যায়ের মাঝে ভারসাম্যের আলো,
এই শিক্ষা মানুষকে করে মহৎ ভালো।
ক্ষমতা যার হাতে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ,
তাঁরই কাছে নত হয় পৃথিবী ও নভোমণ্ডল।
তারপর আসে সেই মহান ঈমানের বাণী,
যা নবুওয়তের পথে জ্বালিয়েছে প্রাণবাণী।
রাসূল গ্রহণ করলেন রবের অবতীর্ণ আলো,
সত্যের সেই সুধাধারা করল বিশ্ব ভালো।
জিবরীলের ডানায় ভেসে এলো যে কালাম,
মানবতার মুক্তিপথ, সত্যের পয়গাম।
রাসূল বললেন—আমি বিশ্বাস করেছি তাতে,
প্রাণ দিয়ে গ্রহণ করি রবের প্রতিটি কথাতে।
শুধু তিনি নন, মুমিনরাও দিল সাড়া,
ঈমানের পতাকা তুলে এগিয়ে গেল তারা।
হৃদয়ে ধারণ করল সত্যের দীপ্তি,
আত্মায় জাগল আল্লাহভীতির মহাশক্তি।
তারা বলল—আমরা মানি এক আল্লাহকে,
সকল ক্ষমতার উৎস, যিনি রাখেন ডেকে।
যিনি সৃষ্টি করেছেন আকাশ ও ভূমি,
যাঁর দয়ায় বেঁচে থাকে ক্ষুদ্র প্রাণভূমি।
আমরা বিশ্বাস করি ফেরেশতাদের উপর,
যারা সদা পালন করে রবের পবিত্র আদেশবর।
কেউ আনে ওহির বাণী, কেউ রক্ষা করে প্রাণ,
কেউ লেখে মানুষের কর্মের অম্লান বিবরণ।
আমরা বিশ্বাস করি আসমানি কিতাবে,
যা নেমেছিল মানবজাতির কল্যাণের জবাবে।
তাওরাত, যাবুর, ইনজিল, কুরআনের আলো,
মানবতাকে ডেকেছে সত্যের পথে চল।
আমরা বিশ্বাস করি নবীদের সকলকে,
যারা এসেছেন যুগে যুগে পথ দেখাতে মানুষকে।
আদম থেকে নূহ, ইবরাহিমের ডাক,
মূসার সংগ্রাম, ঈসার করুণার ঝলক।
আমরা মানি মুহাম্মাদ ﷺ শেষ নবী মহান,
যাঁর জীবন জুড়ে জ্বলে সত্যের দীপ্তিমান।
তিনি ছিলেন রহমত সকল জগতের তরে,
আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়ালেন মানবঘরে।
মুমিনরা বলে—আমরা করি না পার্থক্য,
নবীদের মাঝে নেই অবজ্ঞার কোনো বাক্য।
সবাই ছিলেন রবেরই প্রেরিত দূত,
সত্যের পথের যাত্রী, কল্যাণের সূত্রসূত।
কেউ মরুভূমিতে ডেকেছেন একত্বের গান,
কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে তুলেছেন আহ্বান।
কেউ ধৈর্যের শিক্ষা দিয়েছেন, কেউ ত্যাগের,
সবাই মানুষকে ডেকেছেন রবের অনুগতের।
ঈমান মানে কেবল মুখের উচ্চারণ নয়,
ঈমান মানে সত্যের পথে নির্ভীক পরিচয়।
ঈমান মানে দায়িত্ব, নৈতিকতার শপথ,
অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর অবিরত রথ।
তখন মুমিন হৃদয় বিনয়ের সাথে কয়,
“আমরা শুনেছি, মান্য করেছি”—এই পরিচয়।
অহংকার নয়, বিদ্রোহ নয়, অবাধ্যতার রীতি নয়,
আনুগত্যেই মুমিনের প্রকৃত মর্যাদা রয়।
শুনেছি আমরা সত্যের আহ্বান,
মেনেছি আমরা কল্যাণের বিধান।
যা বলেছেন রব, তাতেই রয়েছে মঙ্গল,
তাতেই শান্তি, তাতেই জীবনের সম্বল।
হে আমাদের রব, তুমি ক্ষমা করো,
ভুলের অন্ধকার হতে আলোয় ভরো।
আমরা মানুষ, ভুল করি ক্ষণে ক্ষণে,
তোমার ক্ষমাই আশ্রয় আমাদের জীবনে।
ক্ষমার প্রার্থনা মুমিনের অলংকার,
তাওবার অশ্রু করে হৃদয় পবিত্র অপার।
যে মাথা নত করে রবের দরবারে,
সে-ই তো মহীয়ান হয় দয়া-অনুগ্রহধারে।
আমাদের পথচলা তোমারই পানে,
ফিরে যাব একদিন মহাবিচারখানে।
দুনিয়ার সব যশ, সব অহংকার,
একদিন মিলিয়ে যাবে সময়ের পার।
রয়ে যাবে শুধু আমল আর ঈমান,
রয়ে যাবে সত্য ও কল্যাণের দান।
রয়ে যাবে হৃদয়ের নিষ্ঠা ও প্রেম,
রয়ে যাবে রবের সন্তুষ্টির হেম।
হে মানবজাতি, শোনো ঈমানের গান,
এতেই লুকিয়ে আছে জীবনের সম্মান।
ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, ক্ষণিকের গৌরব,
সবই ফুরাবে, থাকবে শুধু রব।
যে হৃদয়ে থাকে আল্লাহর বিশ্বাস,
সেখানে জ্বলে আশার অনির্বাণ আভাস।
দুঃখের ঝড় এলে ভাঙে না সে প্রাণ,
ঈমান তাকে দেয় অবিচল অবস্থান।
যে বলে—“আমরা শুনেছি ও মেনেছি”,
সে-ই সত্যের পথে জীবন গড়েছি।
যে বলে—“হে রব, ক্ষমা করো আমায়”,
রহমতের দুয়ার খুলে যায় তারই ছায়ায়।
তাই আসো গাই আজ ঈমানের জয়গান,
মানবতার শ্রেষ্ঠতম আলোকিত আহ্বান।
আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব ও রাসূলের পথ,
এই তো মুক্তির সোপান, এই তো সত্যরথ।
আসমান-জমিন জুড়ে ধ্বনিত হোক বাণী,
রবের প্রতি বিশ্বাসই জীবনের প্রাণবাণী।
“আমরা শুনেছি, আমরা মেনেছি”—এই হোক পরিচয়,
ক্ষমাশীল রবের দিকে প্রত্যাবর্তনই হোক জীবনের জয়।
***
ঈমানের কবিতা
শুরু করি হৃদয়ছোঁয়া এক পবিত্রতার গান,
জাগুক সত্যের আলোয় নিদ্রিত মানবপ্রাণ।
আসমানের অসীম ছাদ, ধরার বিস্তৃত বুক,
ঘোষে এক মহাসত্য—রবেরই সর্বসুখ।
তাঁরই জন্য সূর্য ওঠে প্রভাতের আকাশে,
তাঁরই হুকুমে সন্ধ্যাতারা মৃদু আলো হাসে।
তাঁরই জন্য নদীর ধারা ছুটে চলে সাগরে,
তাঁরই নামে বনের পাখি গান গায় ভোরের স্বরে।
তাঁরই জন্য মেঘের ভেলা ভাসে নীলিমায়,
তাঁরই জন্য বৃষ্টি ঝরে শুকনো মাঠের গায়।
তাঁরই দানে শস্য ফলে কৃষকেরই ক্ষেতে,
তাঁরই রহমত ছড়িয়ে থাকে জীবনের প্রতিক্ষেতে।
আসমানে যা কিছু আছে, জমিনে যা রয়,
সবকিছুই তাঁর অধীন, তাঁরই মহিমাময়।
রাজা কিংবা ভিক্ষুক, ধনী কিংবা দরিদ্র,
সকলেই তাঁর বান্দা, সকলেই তাঁর নিদর্শ।
মানুষ ভাবে—“গোপন কথা রবে না কি ঢাকা?”
নিশীথ রাতে বুকের মাঝে রাখে কত ফাঁকা।
কত আশা, কত ভয়, কত অশ্রু-স্মৃতি,
কত নীরব দীর্ঘশ্বাস, কত ব্যথার গীতি।
কিন্তু যিনি সৃষ্টি করেছেন অন্তরের গভীরতা,
তাঁর কাছে গোপন নয় কোনো চিন্তার বারতা।
মুখে যা বলি প্রকাশ করে হৃদয়ের অল্প অংশ,
অন্তরজুড়ে লুকিয়ে থাকে ভাবনার অগণন রংশ।
রব জানেন সবই সদা, প্রকাশ কিংবা গোপন,
তাঁর জ্ঞানের সামনে কিছুই নয় কখনো অব্যক্ত বা অদৃশ্য গহন।
চোখের কোণের অশ্রুবিন্দু, হৃদয়ের কম্পন,
সবই ধরা পড়ে তাঁর অসীম জ্ঞানের স্পন্দন।
যেদিন হবে মহাবিচার, খুলবে আমলনামা,
প্রকাশ পাবে মানুষের সব কর্মের উপাখ্যানখানা।
শুধু বাহির নয়, অন্তরেরও হবে বিচার সেদিন,
নিয়তের ওজনেই তখন নির্ধারিত হবে দিন।
তবু তিনি পরম দয়ালু, করুণার আধার,
ক্ষমার দুয়ার খোলা রাখেন বারবার অপরিসীম ধার।
যে ফিরে আসে অনুতাপে, চোখে তাওবার জল,
তার জন্য রহমতের পথে জ্বলে আশার মশাল।
আবার যিনি সীমা লঙ্ঘন করে চলে অহংকারে,
সত্যকে ছেড়ে মিথ্যার পথে হারায় অন্ধকারে,
ন্যায়ের বিধান স্মরণ করে তাকে সতর্ক করেন,
অন্যায়ের ফল একদিন অবশ্যই প্রকাশ করেন।
এই ভয় আর আশার মাঝে মুমিন গড়ে প্রাণ,
রহমতের প্রত্যাশাতে গায় আনুগত্যের গান।
ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দয়ার পথে ধায়,
রবের সন্তুষ্টি লাভে জীবন উজাড় চায়।
এরপর আসে ঈমানের সেই মহিমান্বিত বাণী,
যা বদলে দেয় যুগে যুগে মানবতার কাহিনি।
রাসূল পেলেন প্রভুর পক্ষ হতে পবিত্র আলো,
যে আলোয় মুছে গেল অজ্ঞতার কালো।
হেরা গুহার নিস্তব্ধতায় যে শুরু হয়েছিল যাত্রা,
সেই আলোয় জেগে উঠল মানবমুক্তির মাত্রা।
ওহির বাণী নেমে এলো সত্যের মহারথে,
মানুষকে আহ্বান জানাল কল্যাণেরই পথে।
রাসূল বললেন—“আমি মানি প্রভুর সব বাণী,”
এই বিশ্বাসেই উজ্জ্বল তাঁর জীবনখানি।
বিপদ, শত্রু, দুঃখ, কষ্ট—কিছুই পারেনি থামাতে,
সত্যের পতাকা উঁচু রেখেছেন জীবনভর হাতে।
শুধু তিনি নন, মুমিনরাও সাড়া দিল তায়,
ঈমানের দীপ জ্বেলে সত্যের পথে ধায়।
তারা বলল—“আমরা মানি এক আল্লাহ মহান,
সকল শক্তির উৎস যিনি, সকল সৃষ্টির প্রাণ।”
“আমরা মানি ফেরেশতাদের, নূরের পবিত্র দল,
যারা পালন করে সদা রবের আদেশবল।
কেউ নিয়ে আসে ওহির বাণী, কেউ রক্ষা করে প্রাণ,
কেউ লিখে রাখে কর্মের চিরস্থায়ী বিবরণ।”
“আমরা মানি আসমানি সব কিতাবের আলো,
যা মানুষকে ডেকেছে সত্যের পথে চল।
তাওরাতের শিক্ষা আছে, যাবুরের প্রার্থনাধ্বনি,
ইনজিলের করুণাবাণী, কুরআনের চিরবাণী।”
“আমরা মানি সকল নবী, সকল রাসূলগণ,
যারা যুগে যুগে এসেছেন সত্যের আহ্বান।
আদম ছিলেন মানবজাতির প্রথম পথপ্রদর্শক,
নূহ ছিলেন ধৈর্যের প্রতীক, সত্যের মহারক্ষক।
ইবরাহিম ত্যাগের দীপ, তাওহিদের মহানায়ক,
মূসা ছিলেন জুলুমবিরোধী সংগ্রামের আলোকায়ক।
ঈসা এনেছিলেন করুণার সুধাধারা,
আর মুহাম্মাদ ﷺ পূর্ণ করলেন নবুওয়তের ধারা।”
“আমরা করি না কারও মাঝে অবজ্ঞার বিভাজন,
সবাই ছিলেন রবেরই প্রেরিত মহাপ্রেরণ।
সকলেই মানুষকে ডেকেছেন এক রবের পানে,
সকলেই পথ দেখিয়েছেন মুক্তিরই ঠিকানায়।”
তখন ধ্বনিত হলো এক অমর আনুগত্যের বাণী—
যা যুগে যুগে মুমিন হৃদয়ের শ্রেষ্ঠ পরিচয়খানি—
“আমরা শুনেছি, আমরা মেনেছি।”
কত সংক্ষিপ্ত বাক্য এটি, অথচ কত মহান!
এতেই লুকায় আত্মসমর্পণ, ঈমানের সম্মান।
অহংকারের বিদ্রোহ নয়, নয় অবাধ্যতার পথ,
রবের আদেশ মানাই মুমিনের শ্রেষ্ঠ রথ।
শুনেছি আমরা সত্যের ডাক,
মেনেছি আমরা কল্যাণের হাক।
যা বলেছেন রব, তাতেই মঙ্গল,
তাতেই জীবনের সত্য সম্বল।
হে আমাদের রব! আমরা চাই তোমার ক্ষমা,
ভুলে ভরা জীবনে দাও দয়ার মহিমা।
আমরা মানুষ, দুর্বল, ক্ষণিকের পথিক,
তোমার রহমত ছাড়া কে-ই বা আমাদের সাথী ঠিক?
আমরা জানি, একদিন ফিরব তোমারই পানে,
সব পথের শেষ গন্তব্য তোমার দরবারখানে।
দুনিয়ার যশ, ক্ষমতা, সম্পদ, সম্মান,
সবই মিলিয়ে যাবে সময়ের অবসান।
রয়ে যাবে শুধু ঈমান, রয়ে যাবে আমল,
রয়ে যাবে সত্যের তরে করা কর্মসম্বল।
রয়ে যাবে চোখের জলে করা তাওবার গান,
রয়ে যাবে আল্লাহভীতির পবিত্র সম্মান।
তাই হে মানবজাতি, শোনো ঈমানের আহ্বান,
এতেই লুকিয়ে আছে জীবনের প্রকৃত জ্ঞান।
আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব ও রাসূলের পথ,
এই তো মুক্তির সোপান, এই তো সত্যরথ।
আসমান-জমিন জুড়ে উঠুক সেই বাণী,
রবের প্রতি বিশ্বাসই জীবনের প্রাণখানি।
“আমরা শুনেছি, আমরা মেনেছি”—এই হোক পরিচয়,
রবের ক্ষমা ও সন্তুষ্টিতেই হোক জীবনের বিজয়।
৫
৫ মন্তব্য