সহকারী অধ্যাপক
১৭ জুন, ২০২৬ ০৪:৪৮ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
মানুষ জন্মে পৃথিবীতে, মানুষ হয়ে নয়,
বড় হওয়ার পথটি তার সাধনা-মাখা স্রোতবয়।
শরীর পায় প্রকৃতির দান, প্রাণ পায় নিশ্বাস,
কিন্তু মানুষ হওয়ার জন্য চাই আলোর বিশ্বাস।
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান শুধু জীবনেরই অংশ,
তবু সেখানেই শেষ নয় তো মানবতার বংশ।
আরও আছে অন্তরজুড়ে অমল এক আহ্বান,
সত্য, ন্যায় আর সৌন্দর্যের চিরজাগ্রত গান।
যে গান মানুষ শেখায় এসে নিজের সীমা ভুলি,
অপরের সুখে সুখ খুঁজে নিতে ভালোবাসার তুলি।
সেই গান শেখার বিদ্যালয়ের নামটি শিক্ষা হয়,
শিক্ষার আলো মনুষ্যত্বের দ্বার উন্মুক্ত কয়।
জন্মের সাথে মানুষ পায় সহজ কিছু চাওয়া,
ক্ষুধা মেটানো, নিরাপত্তা, স্বার্থের পথে যাওয়া।
এ প্রবৃত্তি সকল প্রাণীর মাঝেই আছে সমান,
বেঁচে থাকার তাগিদ নিয়ে চলে দিনের গান।
শিশু যেমন কাঁদে শুধু নিজের সুখের তরে,
তেমনি মানুষ স্বার্থ খোঁজে প্রথম জীবনের ঘরে।
নিজের লাভ, নিজের চাওয়া, নিজের সুখের রেশ,
এই পরিধির মাঝেই থাকে অনেক জীবনের শেষ।
কিন্তু যদি মানুষ শুধু এতটুকুতেই থামে,
তবে কেন সে জ্ঞান খুঁজেছে যুগে যুগে অবিরামে?
কেন সে গড়েছে সভ্যতা আর নক্ষত্রপানে চায়?
কেন সে নিজের স্বার্থ ছেড়ে অন্যের পাশে যায়?
প্রকৃতি তাই প্রশ্ন রেখে অন্তরে দেয় দাগ,
মানুষ কি কেবল শরীর, নাকি আরও অনুরাগ?
মানুষের অন্তর-মহলে আরেক সত্তা রয়,
বিবেক নামে জাগ্রত সে, শুভের পথে কয়।
অন্যায়ের মুখোমুখি হলে সে প্রতিবাদ করে,
দুঃখী মানুষের অশ্রু দেখে ব্যথা জাগে অন্তরে।
সে শেখায় ক্ষমা করতে, ভাগ করে নিতে সুখ,
অন্যের বেদনা বুঝতে গিয়ে অশ্রু ঝরে বুক।
সে শেখায় সত্য বলিতে ভয় না পেতে কভু,
ন্যায়ের জন্য দাঁড়াতে হয় ঝড়ের মাঝেও প্রভু।
মানবসত্তা দীপের মতো জ্বলে নীরব আলো,
যেখানে থাকে মনুষ্যত্ব, পৃথিবী লাগে ভালো।
সেখানে নেই হিংসা-বিদ্বেষ, নেই ঘৃণার দেয়াল,
সেখানে মানুষ মানুষ হয়ে গড়ে নতুন কাল।
জীবসত্তার নিচতলা আর মানবসত্তার শিখর,
দুইয়ের মাঝে শিক্ষা যেন সোপান গড়া নিখিল।
মোতাহেরের গভীর বাণী আজও জাগায় প্রাণ,
শিক্ষাই মানুষকে শেখায় মানবতার জ্ঞান।
শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতা মুখস্থ করা নয়,
পরীক্ষাতে নম্বর পেয়ে অহংকারে ভরা নয়।
শিক্ষা হলো সত্য চিনে সত্যপথে চলা,
অন্ধকারে আলোর প্রদীপ হাতে তুলে ধরা।
শিক্ষা শেখায় প্রশ্ন করতে, ভাবতে মুক্ত মনে,
অজানাকে জানার তৃষ্ণা জাগে ক্ষণে ক্ষণে।
শিক্ষা শেখায় কুসংস্কারের শৃঙ্খল ভেঙে ফেল,
জ্ঞান-বিবেকের দীপ জ্বেলে উন্নতির পথে চল।
যেখানে চিন্তা বন্দী থাকে ভয় আর সংকোচে,
সেখানে জ্ঞানের ফুল ফুটে না কোনো বাগিচাতে।
প্রশ্নহীন মন মরুভূমি, জ্ঞানহীন পথ শূন্য,
সত্যের খোঁজে সাহস লাগে, লাগে হৃদয় পুণ্য।
স্বাধীন চিন্তা নদীর মতো বহমান অনন্ত,
তারই জলে ধুয়ে যায় সব অজ্ঞতার আবরণ।
যে শিক্ষা ভয় দেখিয়ে শুধু মুখ বন্ধ রাখতে চায়,
সে শিক্ষা নয়, সে অন্ধকার মানুষের ক্ষতি চায়।
সত্যের পথে চলতে হলে জানতে হবে বেশি,
অন্যের কথাও শুনতে হবে মুক্ত হৃদয় রাশি।
মতের ভিন্নতা শত্রু নয়, শেখার একটি দ্বার,
এই বোধই মানুষ গড়ার শ্রেষ্ঠ অঙ্গীকার।
শিক্ষার সেরা ফলটি কভু সনদপত্র নয়,
চরিত্র নামের অমূল্য রত্ন শিক্ষার সত্য জয়।
জ্ঞান যদি হয় শক্তিশালী অথচ নীতি ক্ষীণ,
তবে সে জ্ঞান সমাজজুড়ে আনতে পারে ঋণ।
সত্যবাদী মানুষ গড়ে শিক্ষা যদি হয়,
অন্যায়ের সাথে আপস করা তার কাছে অসহ্য হয়।
অমানতের হক আদায়ে থাকে সদা দৃঢ়,
নৈতিকতার পথেই খুঁজে জীবনের মধুর।
বিপদ এলে ধৈর্য ধরে, সাফল্যে বিনয়,
মানুষ হওয়ার এই শিক্ষাই জীবনের পরিচয়।
সম্পদের চেয়ে মূল্যবান সততারই ধন,
চরিত্রহীন বিদ্যা তবে ব্যর্থ আয়োজন।
বিদ্যালয় কেবল নয় তো ইট-পাথরের ঘর,
মানবতার চর্চাস্থল সে, গড়ার মহাপ্রহর।
শিক্ষক সেখানে আলোর বাহক, জ্ঞানের দীপশিখা,
তাঁর আদর্শে জেগে ওঠে অগণিত প্রতিভা।
শিক্ষার্থীও ফুলের মতো সম্ভাবনার বীজ,
পরিচর্যায় ফুটে ওঠে সুগন্ধভরা লীজ।
শ্রদ্ধা, প্রেম ও অনুপ্রেরণার সেতুবন্ধন গড়ে,
শিক্ষাঙ্গন তাই সভ্যতার ভবিষ্যৎ হাতে ধরে।
যে সমাজে মানুষ শুধু নিজের কথাই ভাবে,
সেখানে সুখের বাগান একদিন শুকিয়ে যাবে।
কিন্তু যদি মানুষ মানুষকে আপন ভেবে রয়,
তবে সমাজে শান্তি নামে, উন্নতির পথ হয়।
শিক্ষিত সেই মানুষ নয় যার কেবল ডিগ্রি আছে,
শিক্ষিত সে, মানবকল্যাণ যার হৃদয়ের কাছে।
যে প্রতিবেশীর দুঃখ দেখে এগিয়ে আসে ত্বরায়,
যে দুর্বলের পাশে দাঁড়ায় ন্যায়ের অঙ্গীকারায়।
জাতি তখন উন্নত হয় জ্ঞানে ও মননে,
মানবতার সুবাস ছড়ায় বিশ্বের প্রতিক্ষণে।
শিক্ষা তখন সবার মাঝে সেতুবন্ধন গড়ে,
ভ্রাতৃত্বের গান শোনায় সে বিশ্বমানব ঘরে।
আজকের শিশু আগামী দিনের আলোকিত প্রভাত,
তাদের হাতে গড়ে উঠবে নতুন সভ্যতার ঘাট।
তাই তাদের শিক্ষা হোক সত্য ও নীতির,
মানবতার সৌরভমাখা নির্মল আলোকরীতি।
লোভের কাছে মাথা নত না করে যেন কেউ,
সত্যের জন্য বাঁচতে শেখে প্রতিটি প্রাণ ঢেউ।
শিক্ষা হোক হৃদয়জাগানিয়া মুক্তির মহাগান,
মানুষ গড়ার পবিত্রতম সৃজনের আয়োজন।
শিক্ষা যদি মানুষকে কেবল কর্মী করে গড়ে,
তবে তার পথ থেমে থাকে জীবনেরই তরে।
শিক্ষা যদি মানুষকে সত্য মানুষ বানায়,
তবে সে আলো যুগে যুগে মানবহৃদয় ছায়।
জীবসত্তার নিচতলা থেকে শিখর মানবতার,
শিক্ষাই সেই সোনার সিঁড়ি উন্নত চরিত্রের।
জ্ঞান, বিবেক, প্রেম ও নীতির অমর সমন্বয়,
মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশেই শিক্ষার সত্য জয়।
এসো তবে গাই সকলে আলোর এই গান,
শিক্ষা হোক মানবতার চিরন্তন আহ্বান।
মানুষ যেন মানুষ হয়ে পৃথিবী ভরে রয়—
শিক্ষা আর মনুষ্যত্বের হোক অনন্ত জয়।
***
যেদিন প্রথম মানুষখানি আকাশপানে চায়,
অজানারই রহস্যভেদে প্রশ্নমালা গায়।
সেদিন হতে জ্ঞানের পথে যাত্রা তার শুরু,
অন্ধকারের বুক চিরিয়া আলোর অভিসার।
গুহার ভেতর আগুন জ্বেলে শিখল পথের রীতি,
নদী পেরিয়ে গড়ল পরে সভ্যতারই নীতি।
চক্র আবিষ্কার, লাঙল গড়া, সমুদ্রপথ জয়,
জ্ঞানই ছিল প্রতিটি পদে উন্নয়নের পরিচয়।
তবু শুধু বাহির গড়া জ্ঞানের শেষ নয়,
অন্তর যদি অন্ধ থাকে তবে কিসের জয়?
বইয়ের পাতায় হাজার সূত্র, বিজ্ঞানেরই দান,
মানবপ্রেমহীন হৃদয় তবে শুষ্ক মরুপ্রাণ।
জ্ঞানের দীপ জ্বলে যখন বিবেক থাকে সাথে,
মানুষ তখন আলোকিত হয় কর্মে ও প্রভাতে।
শিক্ষা তখন মুক্তি আনে সংকীর্ণতার বাঁধ,
মানুষ তখন বিশ্বজোড়া সৌহার্দ্যের সাধ।
মুক্ত আকাশ ডাকে যেথা পাখির ডানার তরে,
মুক্ত চিন্তা তেমনি ডাকে মানুষের অন্তরে।
যে মন শুধু শুনে চলে, ভাবতে শেখে না,
তারই কাছে সত্য এসে আপন পরিচয় না।
প্রশ্নহীন যে শিক্ষা শুধু মুখস্থ বিদ্যা দেয়,
সৃজনশীলতার দুয়ার সেথা খুলে নাহি রয়।
জিজ্ঞাসাই তো জ্ঞানের বীজ, গবেষণার মূল,
প্রশ্ন করেই মানুষ হয়েছে বিশ্ববিজয়ী ফুল।
নতুন কথা শুনতে শেখো, শিখো যুক্তি মানি,
অন্য মতের ভিন্নতাতে খুঁজে নাও জ্ঞানি।
মুক্ত মনই সত্যিকার শিক্ষার মূল প্রাণ,
সেখানেই তো প্রস্ফুটিত হয় মানবতার জ্ঞান।
মানুষ যদি মানুষকে না বোঝে হৃদয় দিয়ে,
তবে সকলই ব্যর্থ হয়ে যায় অন্ধকারে নেমে।
সহানুভূতি শেখায় শিক্ষা অন্যের ব্যথা জানা,
অপরের সুখে হাসতে শেখা, দুঃখে হওয়া সানা।
ক্ষুধার্ত মুখ, ক্লান্ত চোখ, পথশিশুর কান্না,
জাগিয়ে তোলে মানবপ্রেমের অমল অর্ঘ্যগাথা।
নিজের সুখের সীমানা পেরিয়ে যারা যায়,
মানবতার ইতিহাসে তারাই অমর রয়।
দান নয় শুধু, চাই হৃদয়ের গভীর উপলব্ধি,
মানুষ যেন মানুষ চিনে মানবতার সিদ্ধি।
এই শিক্ষা যে পায় অন্তরে, সেই তো মহীয়ান,
তারই ছোঁয়ায় আলোকিত হয় দেশ, সমাজ, প্রাণ।
শিক্ষিত কে? যাঁর ঘরে শুধু সনদেরই সারি?
নাকি যিনি সত্যের তরে জীবন দিতে পারি?
শিক্ষিত সে, অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়ায়,
সত্যের পথে শত বিপদেও মাথা নত না হয়।
শিক্ষিত সে, ক্ষমা জানে, জানে বিনয়ধারা,
জানে কিভাবে ভালোবেসে আপন করা সারা।
শিক্ষিত সে, মানুষেরই কল্যাণ যার ব্রত,
নিজের সুখের আগে ভাবে সমাজেরই মত।
তার হৃদয়ে জ্ঞানের সাথে নৈতিকতার বাস,
তার জীবনেই ফুটে ওঠে শিক্ষার সুবাস।
তাহার মাঝে জাতি দেখে আগামীরই দিশা,
তাহার মাঝে জেগে থাকে আলোকিত প্রত্যাশা।
একদিন এই পৃথিবী হবে আরও সুন্দর স্থান,
যেদিন শিক্ষা গড়বে সবার মানবিক প্রাণ।
যেদিন জ্ঞান আর নীতিবোধ মিলবে হাতে হাত,
সেদিন ঘুচে যাবে ধরণীর বিভেদেরই রাত।
ধর্ম, বর্ণ, ভাষার ভেদে হবে না আর দূর,
মানবতার সুরে বাঁধা হবে বিশ্বভুবন ভর।
ভালোবাসা হবে তখন সভ্যতারই মন্ত্র,
সত্য ও ন্যায় আলোকিত করবে অন্তর।
সেই দিনেরই স্বপ্ন বুকে শিক্ষা জাগায় আলো,
মানুষ হওয়ার মহাসাধনা শেখায় নিরন্তর ভালো।
জীবসত্তার সীমা পেরিয়ে মানবতার জয়,
মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশেই জীবনের পরিচয়।
শিক্ষা শুধু কর্মের তরে নয় যে অর্জন,
শিক্ষা হলো আত্মার মাঝে আলোকের সৃজন।
শিক্ষা শুধু জীবিকারই সহজ পথের দিশা নয়,
শিক্ষা হলো মানুষ হয়ে ওঠার মহাজয়।
জীবসত্তার অন্ধ ঘর হতে মানবতার দ্বার,
শিক্ষাই সেই সোনার সিঁড়ি, উন্নতির অধিকার।
বিবেক, প্রেম, সত্য, নীতি, সহমর্মিতার বাণী,
শিক্ষার মাঝে বিকশিত হয় মানবতার খনি।
তাই এসো আজ শপথ করি হৃদয় ভরে প্রাণ,
শিক্ষাকে করি মনুষ্যত্বের চিরউজ্জ্বল গান।
মানুষ যেন মানুষ হয়ে আলোক ছড়ায় সর্বত্র,
শিক্ষা হোক মহামুক্তির চিরন্তন পবিত্র মন্ত্র।
জ্ঞান যেখানে প্রেমের সাথে গাঁথে অমর মালা,
সেইখানেই মনুষ্যত্বের সূর্য ওঠে জ্বালা।
যুগে যুগে মানবসভ্যতা গাইবে একই জয়—
শিক্ষা আর মনুষ্যত্বের হোক অনন্ত জয়।
মানুষ শুধু রক্ত-মাংসে গড়া কোনো দেহ নয়,
তারও ঊর্ধ্বে লুকিয়ে থাকে অমর পরিচয়।
চোখে যাহা দেখা যায় না, তবু সত্য যার,
সেই মনুষ্যত্ব গড়ে তোলে জীবনের অধিকার।
প্রাসাদ গড়ে, সেতু গড়ে, গড়ে নগর-গ্রাম,
তবু মানুষ পূর্ণ নহে যদি না থাকে ধাম—
যেখানে জ্বলে বিবেকদীপ, করুণারই আলো,
যেখানে সত্যের আহ্বানে হৃদয় ওঠে ভালো।
সেই মন্দির ইটের নহে, নহে পাথরখানি,
সেই মন্দির মানুষেরই নির্মল আত্মবাণী।
শিক্ষা তারই ভিত্তিপ্রস্তর, জ্ঞান তারই দ্বার,
প্রেম, সহানুভূতি, সততা তার অলংকার।
যে শিক্ষা শুধু প্রতিযোগী করে মানুষ গড়ে,
স্বার্থসিদ্ধির ক্ষুদ্র ঘরে বন্দী রাখে পরে;
সে শিক্ষা নয়, সে তো কেবল জীবিকার আয়োজন,
মানুষ গড়ার মহাশিল্পে তার নাহি প্রয়োজন।
সত্য শিক্ষা শেখায় মানুষ বিশ্বকে আপন ভাবতে,
ক্ষুদ্র স্বার্থের বেড়া ভেঙে মহাসমুদ্রে যেতে।
নিজের মাঝে অন্যেরে আর অন্যের মাঝে নিজ,
এই বোধেতে ফুটে ওঠে মানবতার বীজ।
যেখানে শিশু শিখবে আগে মানুষ হতে হয়,
সেই বিদ্যালয় জাতির শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল হয়।
সেখানে জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে হৃদয় জাগে ধীরে,
সৌন্দর্যের গান বেজে ওঠে প্রতিটি অধীরে।
শিক্ষক তখন পথপ্রদর্শক, আলোকিত দিশারি,
জীবনযুদ্ধের অন্ধকারে নক্ষত্রসম ভারী।
তাঁর আদর্শ শিখায় কেবল তথ্যের ভাণ্ডার নয়,
মানুষ হয়ে বাঁচার মাঝে সত্যিকার পরিচয়।
যে শিক্ষার্থী সত্য ভালোবাসে প্রাণের গভীর তলে,
সে-ই একদিন দাঁড়ায় গিয়ে মানবতার দলে।
ক্ষমা যার শক্তি হয় আর বিনয় যার মান,
তারই মাঝে প্রস্ফুটিত হয় মনুষ্যত্বের গান।
লোভের কাছে মাথা নত করে না যে প্রাণ,
অন্যায়ের মুখোমুখি যে রাখে দৃঢ় জ্ঞান;
ক্ষমতার মোহ ভুলে গিয়ে সত্যকে যে চায়,
শিক্ষার মহাফল তাহার জীবনজুড়ে রয়।
যুগে যুগে মহামানব এসেছেন এ ধরায়,
শিক্ষার এই মহামন্ত্রই তাঁদের পথ দেখায়।
নিজের সুখের চেয়ে বড় মানুষের কল্যাণ,
এই আদর্শে দীপ্ত হয়েছে ইতিহাসের প্রাণ।
তাই এসো আজ গড়ে তুলি অন্তরের সে ঘর,
যেখানে থাকবে না কোনো হিংসা-বিদ্বেষ-ডর।
শিক্ষার আলো হাতে নিয়ে চলি সকলজন,
মনুষ্যত্বের মহামন্দির হোক হৃদয়-ভুবন।
সত্য হোক ভিত্তি তার, প্রেম হোক শিখর,
করুণা হোক প্রাঙ্গণ জুড়ে প্রস্ফুটিত নিরন্তর।
জ্ঞান হোক তার চূড়ার দীপ, নীতি হোক প্রহরী,
মানবতার মহাগানে জাগুক ধরণী ভরি।
যেদিন শিক্ষা মনুষ্যত্বে মিলাবে আপন হাত,
সেদিন ঘুচে যাবে বিশ্বের অজ্ঞতার রাত।
সেদিন মানুষ মানুষ হবে, খুলবে শুভ দ্বার,
সেদিনই পূর্ণ হবে জীবনের অধিকার।
সভ্যতার নির্মাতা**
সভ্যতার যে দীর্ঘপথে মানুষ চলেছে ধীরে,
শিক্ষা ছিল প্রদীপ হয়ে প্রতিটি যুগের তীরে।
অরণ্যের অন্ধকার হতে নগরীর আলোকধারা,
জ্ঞানই গড়েছে উন্নয়নের ইতিহাস অপারা।
লাঙলের ফলায় শস্য ফলে, জাহাজ ভাসে সাগর,
বিজ্ঞান নিয়ে পৌঁছে মানুষ নক্ষত্রলোকের ঘর।
তবু এসব অর্জন কেবল বাহ্য রূপের জয়,
মনুষ্যত্বের দীপ্তি ছাড়া পূর্ণতা কোথায় রয়?
যে সভ্যতা শক্তির গর্বে দুর্বলকে করে ক্ষয়,
সে সভ্যতা টেকে না কভু, পায় না সত্য জয়।
যে সভ্যতা মানবকল্যাণে জ্ঞানের দীপ জ্বালে,
সেই সভ্যতা অমর হয়ে ইতিহাসে কালে কালে।
শিক্ষা তাই শেখায় মানুষ শক্তিকে সেবায় দিতে,
জ্ঞানকে করে মানবতার কল্যাণমুখী নীড়ে নিতে।
নিজের সুখে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্বমাঝে,
মানুষ যেন মানুষেরই পাশে এসে সাজে।
সভ্যতার শ্রেষ্ঠ পরিচয় অট্টালিকার সারি নয়,
মানুষের হৃদয় যত বড়, সভ্যতার তত জয়।
করুণা, ন্যায়, সহমর্মিতা, সত্যের মহিমান,
এই সম্পদেই সমৃদ্ধ হয় মানবসভ্য প্রাণ।
মানুষ শুধু যুক্তির ধারা, এমন কথা মিথ্যা,
হৃদয়েরও আপন ভাষা আছে দিবা-নিশিথ্যা।
গানের সুরে, কবির বাণী, চিত্রকলার রঙ,
মানুষ খুঁজে আত্মার মাঝে সৌন্দর্যের সঙ্গ।
শিক্ষা শেখায় ফুলের মাঝে সৃষ্টির মধুর রূপ,
শিশিরভেজা প্রভাত দেখে জাগে অন্তর ধূপ।
আকাশভরা নক্ষত্রমালা, নদীর কলতান,
এসব দেখে বিস্ময় জাগে, জাগে কৃতজ্ঞ প্রাণ।
সংস্কৃতি তাই জাতির প্রাণ, মানবতার শিখা,
এতে থাকে পূর্বপুরুষের অভিজ্ঞতার দীক্ষা।
যে শিক্ষা নিজ সংস্কৃতির মূল্য দিতে জানে,
সে-ই পারে বিশ্বসংস্কৃতিকে আপন করে মানে।
সৌন্দর্যবোধ মানুষকে দেয় নির্মলতার পাঠ,
হিংসা-ঘৃণার মরুভূমিতে আনে সবুজ ঘাট।
যে হৃদয়ে সৌন্দর্যের দীপ জ্বলে অবিরাম,
সেই হৃদয়ে মানবতার বাগান পায় নাম।
শিক্ষা তাই কেবল নয় তো সূত্র কিংবা গণনা,
শিক্ষা মানে সৌন্দর্যের গভীর অনুধ্যান।
জ্ঞান ও রুচি হাতে হাতে যখন চলে পথ,
মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ তখনই হয় রত্ন।
দায়িত্বের দীপ
অধিকার আর দায়িত্ব দুটি জীবনের ডানা,
একটি ছাড়া অন্যটি হয় অসম্পূর্ণ গাথা।
শিক্ষা শেখায় অধিকারকে মর্যাদা দিতে,
দায়িত্বকেও সমানভাবে হৃদয়ে স্থান দিতে।
পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা, শিক্ষকের সম্মান,
দেশ ও সমাজের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ।
নিজ কর্মে সততা রাখা, প্রতিশ্রুতি পালন,
এইসব গুণেই গড়ে ওঠে চরিত্রেরই ভুবন।
যে শিক্ষিত দায়িত্বহীন, সে পথভ্রষ্ট প্রায়,
জ্ঞান তার বোঝা হয়ে গিয়ে সমাজে ক্ষতি ছড়ায়।
দায়িত্বশীল জ্ঞানী মানুষ আলোকিত এক দীপ,
নিজে জ্বলে, অন্যের পথও করে আলোকস্নাত নীপ।
প্রতিটি কাজ আমানত যেন—এই বোধ যার মাঝে,
সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে সে উঠে মহাকাশে।
কর্মক্ষেত্র, পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের অঙ্গনে,
দায়িত্ববোধই মানুষকে মহান করে ক্ষণে।
শিক্ষার সত্য পরিণতি দায়িত্বশীল প্রাণ,
যার কর্মে ফুটে ওঠে মানবতার গান।
নিজের চেয়ে বৃহত্তর যে কল্যাণের স্বপ্ন দেখে,
ইতিহাস তার নাম লিখে শ্রদ্ধার অক্ষরে রেখে।
পৃথিবী শুধু দেশে দেশে বিভক্ত কোনো মানচিত্র নয়,
মানুষেরই মিলনভূমি, মানবতার মহাজয়।
বর্ণ, ভাষা, ধর্মভেদে বহুরূপে বিভাজন,
তবু সকলের অন্তরজুড়ে এক মানবিক স্পন্দন।
একই সূর্য আলো বিলায় পর্বত, নদী, সাগর,
একই বায়ু প্রাণ জোগায় সকল জীবের ঘর।
একই ব্যথায় কাঁদে মানুষ, একই সুখে হাসে,
একই স্বপ্ন ভবিষ্যতের আলো হয়ে ভাসে।
শিক্ষা শেখায় এই পৃথিবী সবার আপন নীড়,
সীমারেখার ঊর্ধ্বে আছে বৃহত্তর এক ভুবনবীথি।
যে শিক্ষা মানুষকে শুধু নিজের মাঝে রাখে,
সে শিক্ষা নয়; সত্য শিক্ষা বিশ্বকে বুকে ডাকে।
দূর দেশেরও ক্ষুধার্ত শিশু আমার আপন ভাই,
অন্যায়ের শিকার মানুষও আমার আপন ঠাঁই।
এই বোধ যখন জাগে অন্তর, খুলে শুভ দ্বার,
বিশ্বমানবতার পথে তখন শুরু অভিযাত্রা।
যুদ্ধ, ঘৃণা, হানাহানি, বিভেদের অন্ধ রাত,
মানবতার সূর্য উঠলে হারায় আপন প্রভাত।
শিক্ষা তখন শান্তির বাণী ছড়িয়ে দেয় ধরা,
ভালোবাসার বন্ধনে গড়ে বিশ্ব সংসার সারা।
সাগরপারের অচেনা জন হয় হৃদয়ের আপন,
শিক্ষিত মন বুঝতে শেখে মানবতার স্পন্দন।
বিশ্বজুড়ে মানুষ মানুষে গড়ুক মৈত্রীর সেতু,
এই হোক শিক্ষা-দীক্ষার শ্রেষ্ঠতম কৃতিত্ব।
জ্ঞান যদি হয় সূর্যের আলো, নীতি তারই দীপ,
একটি ছাড়া অন্যটি হয় অসম্পূর্ণ অনুপম রূপ।
জ্ঞান দেয় শক্তি, দেয় ক্ষমতা, দেয় উন্নতির পথ,
নৈতিকতা পথ না দেখালে আসে কত বিপদ।
বিজ্ঞান যখন মানবহিতের ব্রত নিয়ে চলে,
ধরণীতে সুখের ফসল ফলে দলে দলে।
আর যদি সে বিবেকহীন শক্তির মোহে মাতে,
মানবতার অশ্রুধারা ঝরে বিশ্বপ্রান্তে।
শিক্ষা তাই শেখায় আগে মানুষ হওয়া চাই,
জ্ঞানের আগে হৃদয়খানি নির্মল হওয়া ভাই।
প্রযুক্তিরও প্রয়োজন আছে, গবেষণার জয়,
তবু নীতি ছাড়া সে অর্জনে স্থায়িত্ব কোথায় রয়?
সত্যের সাথে জ্ঞানের যখন হয় শুভ মিলন,
তখন গড়ে কল্যাণময় উন্নত সভ্যতাবন।
করুণা যখন যুক্ত হয় শক্তির মহিমায়,
তখন মানুষ আশীর্বাদ হয়ে পৃথিবীতে ধায়।
বিবেকহীন বিদ্যা যেন ধারালো এক তরবারি,
ভুল প্রয়োগে ক্ষত-বিক্ষত করে ধরণী ভারী।
বিবেকময় জ্ঞান আবার শীতল নদীর ধারা,
অন্ধকারে পথহারা জনে দেয় আলোর ইশারা।
তাই শিক্ষা হোক জ্ঞান ও নীতির যুগল সেতুবন্ধ,
সত্য, প্রেম ও দায়িত্ববোধে হোক জীবন আনন্দ।
মানুষ যেন শক্তির সাথে শুভবোধও পায়,
এই সমন্বয়েই শিক্ষার শ্রেষ্ঠ সার্থকতা রয়।
***
শিক্ষা ও মনুষ্যত্বের বিজয়গাথা
দীর্ঘ পথের শেষে এসে ফিরে দেখি আজ,
শিক্ষার মাঝে লুকিয়ে আছে জীবনেরই সাজ।
জন্মলগ্নের জীবসত্তা স্বার্থসীমায় বাঁধা,
মনুষ্যত্বের মহাকাশে শিক্ষা খুলে সাধা।
অজ্ঞতার অন্ধকারে প্রথম যে দীপ জ্বলে,
শিক্ষার সেই আলো ধীরে অন্তরপথে চলে।
জ্ঞান দেয় চোখ, নীতি দেয় দিশা, প্রেম দেয় গতি,
এই ত্রিবেণীর মিলনধারায় পূর্ণ মানবস্মৃতি।
শিক্ষা শুধু মুখস্থ বিদ্যা, সনদ কিংবা মান,
এ ধারণা ক্ষুদ্র করে মানুষের সম্মান।
শিক্ষা হলো আত্মবিকাশ, চরিত্রগঠন সাধ,
সত্য ও শুভের পথে চলার চিরন্তন উন্মাদ।
শিক্ষা শেখায় প্রশ্ন করতে, সত্য খুঁজতে সদা,
অন্যায়ের মুখোমুখি হতে অটল দৃঢ় পদা।
শিক্ষা শেখায় ক্ষমা করতে, ভাগ করে নিতে সুখ,
মানবতার অশ্রুবিন্দু মুছতে বাড়াতে বুক।
যে শিক্ষা মানুষকে দেয় উদারতার ডানা,
সেই শিক্ষা ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ ঠিকানা।
যে শিক্ষা মানুষকে করে পরের দুঃখে কাতর,
সেই শিক্ষা সত্যিকার অর্থে মহত্তম অম্বর।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সমাজ, পরিবার,
সকলের সম্মিলনে গড়ে আলোকিত অধিকার।
মানুষ গড়ার এই সাধনা চলুক যুগে যুগে,
সত্য, ন্যায় আর সৌন্দর্যের সুধা নিয়ে বুকে।
আসুক এমন দিন ধরণীতে, ঘুচুক সকল ক্ষয়,
মানুষ যেন মানুষ হয়ে পায় সত্যের জয়।
বিবেক, প্রেম, জ্ঞান ও নীতি মিলুক হাতে হাত,
অমানিশার শেষে ফুটুক শুভ্র প্রভাত।
জীবসত্তার নিচতলা হতে শিখর মানবতার,
শিক্ষাই সেই সোনার সোপান উন্নত চরিত্রের।
মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ শিক্ষার চরম ফল,
এই বাণীই যুগে যুগে হোক মানবতার সম্বল।
এসো তবে শপথ করি হৃদয় ভরা প্রাণ,
শিক্ষাকে করি মানবতার চিরজাগ্রত গান।
বিশ্বজুড়ে মানুষ যেন মানুষকেই চায়,
শিক্ষা ও মনুষ্যত্বের হোক অনন্ত জয়।
জ্ঞান যেখানে প্রেমের সাথে গাঁথে অমর মালা,
সত্য যেখানে নীতির সাথে জ্বালে আলোর জ্বালা,
সেইখানেই ভবিষ্যতের স্বর্ণদুয়ার খোলে,
সেইখানেই মনুষ্যত্বের সূর্য ওঠে দোলে।
যুগে যুগে কাব্য, ইতিহাস, সভ্যতার পরিচয়—
একই বাণী উচ্চারিত হোক:
শিক্ষা ও মনুষ্যত্বের হোক অনন্ত জয়,
মানবতার হোক অনন্ত জয়।
***
মনুষ্যত্বের মহাপ্রভাত
অনেক যুগের অন্ধকারে অনেক পথের শেষে,
মানুষ আসে আলোর দ্বারে অভিজ্ঞতার বেশে।
শৈশব হতে বার্ধক্য অবধি জীবনের প্রতিক্ষণ,
শিক্ষার মাঝে খুঁজে ফেরে আপন পরিচয়-গঠন।
জীবসত্তার ক্ষুদ্র ঘর থেকে যাত্রা শুরু হয়,
স্বার্থ, চাওয়া, প্রয়োজনের মাঝেই প্রথম রয়।
পরে ধীরে জাগে অন্তর, জাগে শুভবোধ,
মানুষ তখন জানতে শেখে জীবনের আসল রোধ।
শিক্ষা এসে হাত বাড়িয়ে বলে মৃদুস্বরে,
“উঠে এসো মানবতার সেই উচ্চতর ঘরে।
যেখানে নেই হিংসা-বিদ্বেষ, নেই অহংকার,
যেখানে সত্য ও করুণাই জীবনের অলংকার।”
জ্ঞান তখন আর তথ্য নয়, হয় প্রজ্ঞার আলো,
শক্তি তখন সেবার পথে ব্যবহার হয় ভালো।
সাফল্য তখন নিজের মাঝে সীমাবদ্ধ না রয়,
মানুষের সুখে সুখ খুঁজে পায় জীবনের জয়।
বিদ্যালয়ের ছোট্ট বেঞ্চে যে স্বপ্ন জাগে মনে,
সেই স্বপ্নই সভ্যতা গড়ে যুগে যুগে ক্ষণে ক্ষণে।
একজন সত্য শিক্ষক যেমন আলোর পথ দেখান,
একজন সত্য শিক্ষার্থী তেমনি ভবিষ্যৎ গড়ান।
মানুষ যদি মানুষকে ভালোবাসতে শেখে,
দুঃখীর চোখের জল মুছাতে হাত বাড়িয়ে রেখে,
তবে শিক্ষা সার্থক হবে, সার্থক হবে প্রাণ,
তবেই ফুটবে পৃথিবীজুড়ে মনুষ্যত্বের গান।
আসুক এমন দিন ধরায়, ঘুচুক সকল ভয়,
মানুষ যেন মানুষ হয়, এ হোক চূড়ান্ত জয়।
জ্ঞান, নীতি, প্রেম, সহমর্মিতা মিলুক হাতে হাত,
শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হোক মহাপ্রভাত।
শিশুর হাসি, তরুণ স্বপ্ন, প্রবীণের অভিজ্ঞতা,
সবাই মিলে গড়ে তুলুক মানবতার ঐক্যতা।
সীমাহীন এই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক বাণী—
“শিক্ষার চেয়ে মহৎ শক্তি নেই মানবজীবনখানি।”
তাই আজও কালের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় সেই সুর,
মানুষ হবার শিক্ষা ছাড়া সকল অর্জন দূর।
জীবসত্তা হতে উঠে মানবতার শিখরপ্রান্তে,
শিক্ষাই দেয় পথের দিশা সত্য ও শুভকান্তে।
যতদিন এই পৃথিবীতে উদিত হবে ভোর,
যতদিন মানবহৃদয়ে জ্বলবে আশার ঘোর,
ততদিন উচ্চারিত হবে অমল অক্ষয় জয়—
শিক্ষা ও মনুষ্যত্বের জয়,
মানবতার জয়,
সত্য ও সুন্দরের জয়।
***
অমর আলোর শপথ
শেষ নয় এ, শেষের মাঝে শুরু লুকায়িত,
মানুষ হবার সাধনাতে পথ থাকে প্রসারিত।
যতদিন প্রাণ জাগে বুকে, ততদিন এ গান,
শিক্ষা আর মনুষ্যত্বের চিরজাগ্রত আহ্বান।
নদী যেমন সাগরপানে বহে নিরবধি,
জীবন তেমনি ছুটে চলে সত্যের অন্বেষণধী।
প্রতিটি ভোর শেখায় এসে নতুন করে বাঁচা,
অন্ধকারের বুক চিরিয়া আলোর পথে নাচা।
জ্ঞান যদি হয় দীপশিখা, মনুষ্যত্ব তার জ্যোতি,
দুইয়ের মিলনেই বিকশিত হয় জীবনের গতি।
একটি ছাড়া অন্যটি যেন অসম্পূর্ণ সুর,
দুইয়ে মিলে রচনা করে মহামানবের নূর।
শিক্ষা মানে কেবল নয় তো অক্ষর শেখার পাঠ,
শিক্ষা মানে হৃদয়জুড়ে নির্মলতার ঘাট।
শিক্ষা মানে সত্য বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ,
শিক্ষা মানে কল্যাণমুখী মহৎ জীবনের সাধ।
যে শিশু আজ বই হাতে নেয় স্বপ্নভরা চোখে,
আগামী দিনের ইতিহাস সে-ই লিখবে বুকে।
তারই মাঝে জেগে উঠুক মানবতার দীপ,
তারই মাঝে ফুটে উঠুক করুণার সুনীপ।
শিক্ষক হোন আলোর মশাল, পথের মহাদিশা,
শিক্ষার্থী হোক জ্ঞানসাধনায় দীপ্ত প্রত্যাশা।
বিদ্যালয় হোক মানবতার প্রথম পুণ্যক্ষেত্র,
যেথায় গড়ে আগামী দিনের শুভ্র চরিত্র।
ধন নয়, মান নয়, নয় ক্ষমতার অহংকার,
সত্য ও নীতির মহিমাতেই মানুষের অধিকার।
যে হৃদয়ে প্রেমের ধারা বহে নিরন্তর,
সেই হৃদয়েই জেগে থাকে মানবতার ঘর।
এসো তবে হাতে হাত রাখি, গড়ি নতুন কাল,
যেথায় নেই বিভেদের দেয়াল, নেই হিংসার জাল।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক সৌহার্দ্যের বাণী,
মানুষ হোক মানুষেরই শ্রেষ্ঠ পরিচয়খানি।
জ্ঞান হোক মুক্ত, চিন্তা হোক উদার আকাশসম,
নীতি হোক জীবনের পথে ধ্রুবতারা অনুপম।
প্রেম হোক সকল কর্মের অন্তরস্থ প্রেরণা,
মনুষ্যত্ব হোক পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সেরেনা।
যুগে যুগে যত মহাপুরুষ এসেছেন ধরায়,
এই বাণীই তাঁদের জীবন আলোকিত করায়।
মানুষ আগে, পরে সকল পরিচয়ের স্থান—
এই সত্যেই নিহিত আছে সভ্যতার সম্মান।
তাই আজ কালের প্রাঙ্গণে উচ্চারিত হোক জয়,
অজ্ঞতার পরাজয় আর জ্ঞানের মহাজয়।
স্বার্থের ক্ষুদ্র সীমা পেরিয়ে শুভ্র মানবতায়,
উদ্ভাসিত হোক বিশ্বভুবন শিক্ষার মহিমায়।
যতদিন সূর্য উঠবে পূর্বাকাশের কোলে,
যতদিন শিশির ঝরবে সবুজ ঘাসের দোলে,
যতদিন মানুষ খুঁজবে সত্য, সৌন্দর্য আর ন্যায়—
ততদিন ধ্বনিত হবে এই অমর মহাজয়—
***
শিক্ষার জয়!
মনুষ্যত্বের জয়!
মানবতার জয়!
সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের জয়!
এই হোক আমাদের শপথ,
এই হোক আগামী দিনের পথ,
এই হোক ভবিষ্যৎ সভ্যতার পরিচয়—
শিক্ষা ও মনুষ্যত্বের অনন্ত জয়।
৫৩
৯২ মন্তব্য