সহকারী অধ্যাপক
১৭ জুন, ২০২৬ ০৮:০৮ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, নাট্যকার এবং সমাজ সংস্কারক। তাঁর অসাধারণ সাহিত্যকর্ম, দেশপ্রেম, সাম্যবাদী চিন্তাধারা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি “বিদ্রোহী কবি” নামে সমধিক পরিচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় চেতনা গঠনে তাঁর সাহিত্য ও সংগীত বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। তাই তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। শৈশবে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন, কিন্তু পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে তাঁকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। ছোটবেলায় তিনি মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন এবং লেটো দলে যোগ দিয়ে গান ও নাটক রচনা করেছেন।
নজরুলের সাহিত্য জীবন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও নাটক রচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘অগ্নিবীণা’, ‘সর্বহারা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘প্রলয়োল্লাস’ এবং ‘চক্রবাক’ উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচিত “বিদ্রোহী” কবিতা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই কবিতায় তিনি অন্যায়, অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন।
নজরুল শুধু বিদ্রোহের কবি ছিলেন না, তিনি মানবতার কবিও ছিলেন। তিনি সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করেছেন। তিনি ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর লেখায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির চেতনা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সকল মানুষ সমান এবং মানবতাই সর্বোচ্চ ধর্ম।
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সংগীত জগতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তিনি প্রায় চার হাজারেরও বেশি গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন। তাঁর গানগুলো “নজরুল সঙ্গীত” নামে পরিচিত। প্রেম, প্রকৃতি, ভক্তি, দেশপ্রেম এবং মানবতার নানা বিষয় তাঁর গানে স্থান পেয়েছে। আজও তাঁর গান বাঙালির হৃদয়ে সমানভাবে জনপ্রিয়।
নজরুলের সাহিত্য ও গান ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর রচনায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বহু গান ও কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তাঁকে বাংলাদেশে আনা হয় এবং জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করা হয়।
জীবনের শেষ পর্যায়ে নজরুল একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। আজও তাঁর সমাধি অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের স্থান।
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সাম্য, মানবতা এবং স্বাধীনতার চেতনাকে তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর রচনা আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং ন্যায় ও সত্যের পথে চলার শিক্ষা দেয়। বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে তিনি বাঙালি জাতির গর্ব এবং চিরকাল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
৫৩
৯২ মন্তব্য