Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৭ জুন, ২০২৬ ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

কোরআন বিশুদ্ধ তেলাওয়াতের গুরুত্ব এত বেশি কেন


কোরআন মাজিদ মহান আল্লাহর কালাম। রাসুলের সর্বশ্রেষ্ঠ মোজেজা। হেদায়েতের চিরন্তন গ্রন্থ এবং পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। নিকট অতীতের বিখ্যাত দার্শনিক ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) যথার্থই বলেছেন, ‘কোরআন প্রতিটি যুগের উপযোগী গ্রন্থ।’ (শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি, আল-ফাওজুল কাবির ফি উসুলিত তাফসির, পৃ. ৪২, মাকতাবাতুল বুশরা, করাচি, ২০০৮)

স্বয়ং আল্লাহ–তাআলা এর শব্দ ও অর্থের সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন—‘নিশ্চয়ই আমি এই কোরআন নাজিল করেছি এবং আমিই এর রক্ষক।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ৯)

এ কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে গেলেও এর একটি অক্ষর বা হরকতেও বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। কেয়ামত পর্যন্ত কোরআন এভাবেই সংরক্ষিত থাকবে, ইনশাআল্লাহ। কোরআন পুরো মানবজাতির জন্য জীবনবিধান, অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত।

হজরত ইকরামা (রা.) যখন কেলাওয়াত করতেন, আবেগে আত্মহারা হয়ে পড়ে যেতেন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর মুখ থেকে বের হতো, ‘হাযা কালামু রব্বি’ (এটি আমার প্রতিপালকের বাণী)। (ইবনে আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ৭/১৮০, মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ, ২০০৪)

প্রকৃতপক্ষে, এটি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর সরাসরি বাণী। কোরআনের চর্চা সবচেয়ে পবিত্র কাজ এবং এর তেলাওয়াত সওয়াবের আধার; রুহানি প্রশান্তি ও হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জনের সর্বোত্তম মাধ্যম।

কোরআন নাজিলের যুগে মক্কা মুকাররমায় শিক্ষিতের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তবুও সাহাবিরা কোরআন নাজিলের সঙ্গে সঙ্গেই তা মুখস্থ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। নবুয়তের সেই স্বর্ণযুগ থেকে আজ পর্যন্ত উম্মত প্রতিটি যুগে কোরআন শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।

যেভাবে তারা কোরআনের শব্দাবলি আয়ত্ত করেছে, তেমনি এর মর্মার্থ সঠিকভাবে বোঝার প্রতিও পূর্ণ সচেষ্ট থেকেছে। কোরআন শিক্ষা ও শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে রাসুলের ঘোষণা হলো, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭)

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাম্মদ জাকারিয়া (রহ.) লিখেছেন, ‘পবিত্র কোরআনই যেহেতু আমাদের মূল ধর্ম এবং এর স্থায়িত্ব ও প্রচারের ওপরই ধর্মের অস্তিত্ব নির্ভরশীল, তাই এর শিক্ষা ও প্রচার-প্রসারের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট। কোরআনের শিক্ষার পূর্ণতা হলো এর অর্থ ও উদ্দেশ্যসহ শেখা, আর প্রাথমিক পর্যায় হলো অন্তত এর শব্দগুলো সঠিকভাবে শেখা।’ (মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্ধলভি, আওজাজুল মাসালিক ইলা মুয়াত্তা মালেক, ৪/৪১৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৩)

কোরআন তেলাওয়াত

যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মর্যাদা অনুযায়ী তার আদব ও অধিকারও বেশি থাকে। কোরআনের মর্যাদা যেহেতু মানুষের চিন্তাশক্তির ঊর্ধ্বে, তাই এর হক বা অধিকার পুরোপুরি আদায় করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। তবে এর কিছু বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আদব রয়েছে, যা মেনে চললে এই পবিত্র কিতাব থেকে উপকৃত হওয়া সহজ হয়।

কোরআন প্রেমাষ্পদের কালাম। একজন প্রেমিকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে যে সে তার রবের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে? আল্লাহ–তাআলাও অত্যন্ত মমতা ও মনোযোগের সঙ্গে তাঁর বান্দার তেলাওয়াত শোনেন।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ–তাআলা কোনো কিছুকে এত মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করেন না, যতটা তিনি একজন সুমধুর-কণ্ঠ নবীর কোরআন তেলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করেন, যখন তিনি উচ্চস্বরে কোরআন পাঠ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৫৪৪)

তেলাওয়াতের প্রথম আদব হলো সুন্দর ও সুললিত কণ্ঠে পাঠকরা। আরবি উচ্চারণের সঠিক মান বজায় রেখে অত্যন্ত আগ্রহ ও মনোযোগের সঙ্গে পড়া, যাতে সুরের আতিশয্যে এর গাম্ভীর্য নষ্ট না হয়।

রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা আরবের সুর ও ভঙ্গিতে কোরআন তিলাওয়াত করো।’ (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, ৪/৫১১, মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ, ২০০৩)

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘সুন্দর আওয়াজ দিয়ে কোরআনকে সুশোভিত করো; কারণ সুন্দর আওয়াজ কোরআনের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৪৬৮)

আরবি ভাষা অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং মার্জিত। তাই অনারবদের জন্য এর শব্দগুলো সঠিকভাবে উচ্চারণ করা নিয়মিত অনুশীলনের দাবি রাখে। প্রতিটি হরফের মাখরাজ (উচ্চারণস্থল), গুন্নাহ এবং তাজবিদের নিয়মাবলি মেনে চলা একান্ত জরুরি।

হজরত উম্মে সালমাকে (রা.) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসুল (সা.) কীভাবে তেলাওয়াত করতেন? তিনি বলেছিলেন, ‘তিনি প্রতিটি হরকত স্পষ্ট করে উচ্চারণ করতেন এবং প্রতিটি হরফ আলাদাভাবে বোঝা যেত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৯২৭)

কোরআন পাঠ শুদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা

কোরআন ও সুন্নাহর সঠিক অনুধাবনের জন্য যেসব শাস্ত্র গড়ে উঠেছে, তার মধ্যে ‘ইলমে তাজবিদ ও কেরাত’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম প্রজন্ম থেকে আজ পর্যন্ত যারা এই শাস্ত্রের সেবা করেছেন, তারা পুরো উম্মতের পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব পালন করেছেন।

‘তাজবিদ’-এর আভিধানিক অর্থ হলো সুন্দর ও উত্তম করা। আর ‘তারতিল’ মানে হলো থেমে থেমে স্পষ্ট করে পড়া। সহজ কথায়, রাসুল (সা.) যেভাবে কোরআন পড়েছেন এবং যেভাবে সাহাবিরা তাঁর থেকে শিখেছেন, ঠিক সেই উচ্চারণে কোরআন পড়াই হলো তাজবিদ।

এই পদ্ধতিতে কোরআন পড়া প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক। আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আর কোরআনকে তারতিল বা থেমে থেমে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে পড়ো।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ৪)

আল্লামা ইবনে জাজারি (রহ.) বলেন, ‘তাজবিদসহ কোরআন পড়া অত্যন্ত আবশ্যক; যে তাজবিদ মেনে পড়ল না সে পাপী। কারণ আল্লাহ এভাবেই এটি নাজিল করেছেন।’ (শামসুদ্দিন ইবনুল জাজারি, আল-মুকাদ্দিমা আল-জাজারিয়্যাহ, পৃ. ১১, মাকতাবাতুল গাউসানি, দামেস্ক, ২০০৪)।

কোরআন শুদ্ধ করার গুরুত্ব বুঝতে পেরে সব মাদ্রাসায় তাজবিদ বিভাগ খোলা হয়েছে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। আলেম ও তালবে এলেমরাই যদি কোরআন শুদ্ধ করার প্রতি এত যত্নশীল হন, তবে একজন সাধারণ মুসলমানের জন্য এটি কতটা জরুরি, তা সহজেই অনুমেয়।

মন্তব্য করুন