Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৭ জুন, ২০২৬ ০২:০১ অপরাহ্ণ

যাঁদের অনুপ্রেরণা আমার শক্তি।

যাঁদের অনুপ্রেরণা আমার শক্তি। 

ভূমিকা

শিক্ষকতা নিছক জ্ঞান বিতরণের নাম নয়—এটি জীবনকে গ্রহণ ও বরণ করার এক পরম ব্রত। আজ আমি একজন বিজ্ঞান শিক্ষক; তবে এই পরিচয় কেবল আমার একার অর্জন নয়। আমার পেছনে প্রাচীরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক অনন্য শিক্ষকমণ্ডলী। তাঁদের প্রতিটি কথা, আচরণ ও দীক্ষা আমার হৃদয়ে সোনার অক্ষরে গেঁথে গেছে। তাঁদের সেই অনুপ্রেরণাই আজ আমার শিক্ষকতার মূলমন্ত্র—যে মন্ত্রে জাগ্রত হয়েছে বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা, আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনন।

প্রাথমিক বিদ্যালয় : বীজ বপনের সময়

তৃতীয় শ্রেণির ক্লাসরুমে সেলিম স্যার একদিন বলেছিলেন, "পড়াশোনা করলে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে পারবে, মানুষ হওয়ার সুযোগ পাবে, দেশকে কিছু দেওয়ার সুযোগ পাবে।" গ্রামের ছোট্ট শিশুর কাছে 'দেশকে দেওয়া' শব্দটির গভীরতা তখন স্পষ্ট ছিল না; কিন্তু স্যারের চোখের ভেতরের সেই স্বপ্নিল আগুন দেখে বুঝেছিলাম—এটি এক মহৎ আহ্বান, যা আমাকে আজও জাগ্রত রাখে।

ইউসুফ স্যার আমাকে প্রথম অক্ষর চিনিয়েছেন এবং শৃঙ্খলার পরম মূল্য শিখিয়েছেন। আর খলিল স্যার—তিনি আমার জ্ঞানপিতা। আজও তিনি আমাকে পরম স্নেহে 'অপুত' বলে ডাকেন। তাঁর কাছ থেকেই প্রথম উপলব্ধি করি, জ্ঞানের সম্পর্ক কখনো কখনো রক্তের সম্পর্ককেও ছাপিয়ে যেতে পারে। এই তিন শিক্ষকই আমার জীবনের প্রথম প্রেরণার উৎস—যাঁরা অজ্ঞতার অন্ধকারে প্রথম আলো জ্বালিয়েছিলেন।

মাধ্যমিক বিদ্যালয় : বুদ্ধি, উদারতা ও আদর্শের মিলনস্থল

রমিজ স্যার কখনো আমাদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতেন না, বরং কীভাবে সঠিক প্রশ্ন করতে হয় তা শিখিয়েছিলেন। একদিন ক্লাসে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল, "স্যার, এই সূত্রটা এল কোথা থেকে?" তিনি উত্তর না দিয়ে পাল্টা বললেন, "তুমি কী মনে করো?" সেদিন বুঝেছিলাম—বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা 'কেন' ও 'কীভাবে' খোঁজার অন্তহীন কৌতূহলের মধ্যে লুকিয়ে আছে।

জহির স্যার আমাদের উদারতার পাঠ দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, "বিজ্ঞান সবার জন্য। বিদ্যা কখনো গোপন রাখতে নেই।" সফি স্যার, শহিদুর রহমান স্যার ও সহিদ স্যার আমাদের মনে আদর্শ ও নৈতিকতার বীজ বুনে দিয়েছিলেন। আর আলম স্যার দিয়েছিলেন ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা—যা বিজ্ঞানকে মানবতার সেবায় নিয়োজিত করতে শেখায়। মাধ্যমিকের এই দেয়ালগুলোই গড়ে তুলেছিল আমার চিন্তার ভিত্তি।

উচ্চ মাধ্যমিক : দিগন্ত প্রসারণ

উচ্চ মাধ্যমিকে পা দিতেই অনুভব করলাম—বিজ্ঞান এখন শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়, এটি একটি জীবনদর্শন।

ভাষা ও প্রকাশে হায়দার স্যার আমার অন্তর্গত বিস্ময়কে ভাষা দিতে শিখিয়েছিলেন। 

রসায়নে মঞ্জুরুল করিম স্যার ছিলেন এক অসাধারণ শিল্পী। রসায়নের কঠিন সমীকরণগুলো তাঁর মুখে যেন কবিতার ছন্দ পেত। তাঁর কাছেই প্রথম বুঝি—বিজ্ঞান জানলেই চলে না, বিজ্ঞানকে বলতেও জানতে হয়।

তিনি রসায়নের সাথে আবৃত্তি ও সাহিত্যের এমন অপূর্ব সমন্বয় ঘটাতেন যে, পর্যায় সারণির মৌলগুলোও যেন জীবন্ত হয়ে উঠত। অহিদ স্যার পরীক্ষাগারে হাতেকলমে দেখিয়েছেন—বিজ্ঞান শুধু বইয়ের পাতায় আবদ্ধ নয়, তা বেঁচে থাকে প্রতিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার উৎসাহে।

জীববিজ্ঞানের ভিত্তি রচনা করেছিলেন মির্জা স্যার। তাঁর পাঠে জীবসম্প্রদায় নামের জগৎটাকে প্রথমবার চেনা জায়গা মনে হয়েছিল।

প্রিন্সিপাল ওমর ফারুক স্যার ছিলেন আমাদের প্রকৃত পথপ্রদর্শক। তাঁর সান্নিধ্যে এসে প্রথম বুঝেছিলাম—শিক্ষকতা কোনো সাধারণ পেশা নয়, এটি এক বিরাট সামাজিক দায়িত্ব, যা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগরি।

স্নাতক পর্যায় : তাত্ত্বিক জ্ঞানের পরিপক্বতা

স্নাতকে এসে জ্ঞান পেল গভীরতা, আর ভাষা পেল পরিপক্বতা।

ভাষা শিক্ষায় জয় সেন স্যার, সাইফুদ্দীন স্যার ও নুরুল হক স্যার শিখিয়েছেন বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বকে প্রাণবন্ত ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করতে। তাঁদের হাত ধরেই বুঝেছি—বিজ্ঞানের কাঠিন্যের ভেতরেও এক অনাবিল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে, যা প্রকাশের জন্য প্রয়োজন সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি।

রসায়নে অহিদ স্যার আমাকে শিখিয়েছেন গভীর যৌক্তিক বিশ্লেষণ—কীভাবে একটি বিক্রিয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির অমোঘ যুক্তি।

জীববিজ্ঞানে মির্জা স্যারের রোপণ করা বীজ ফারুকী স্যার, পারভিন ম্যাম ও সুনীল স্যারের পরম পরিচর্যায় আজ এক বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। সেই বৃক্ষের সুবাস আজ ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ—সহ দেশের নানাপ্রান্তের সফল শিক্ষার্থীদের মাঝে। এই সাফল্যই তাঁদের শিক্ষার সার্থকতার প্রমাণ।

বি.এড : শিক্ষাদর্শন ও শিক্ষকতার ভিত্তি

খালেক স্যারের কাছে আমি শিক্ষাদর্শনের অমোঘ শক্তি শিখেছি। তিনি শিখিয়েছিলেন—বিদ্যার চেয়ে তার সঠিক ব্যবহারবিধি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক হয়ে ওঠা মানে শুধু বইয়ের পাতা উল্টানো নয়, বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনের পাতা উল্টে তার ভেতরের আলোটাকে জাগিয়ে তোলা। শিক্ষা দান নয়, শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মপ্রত্যয় সৃষ্টি করাই প্রকৃত শিক্ষকতার লক্ষ্য—এই দর্শন তিনি আমার অন্তরে গেঁথে দিয়েছেন।

শিক্ষকতার শৈলী ও কারিগরি রূপায়ণ

ফারুকী স্যার, পারভিন ম্যাম ও সুনীল স্যার শুধু তত্ত্বই শেখাননি; তাঁরা ছিলেন আমার শিক্ষকতার দক্ষতার মূল স্থপতি। তাঁরা শিখিয়েছিলেন—বিজ্ঞানের সূত্র শুধু মুখস্থ করার বিষয় নয়, প্রতিটি সমীকরণের পেছনে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানীদের আজীবন সংগ্রামের ইতিহাস, তাদের আবিষ্কারের উৎসব ও ব্যর্থতার গ্লানি—এসবই শিক্ষার্থীর সামনে তুলে ধরতে হয়।

এর বাইরে ব্র্যাক শিক্ষাপ্রোগ্রামের একঝাঁক রিসোর্স শিক্ষক আছেন, যাদের শিক্ষাদান কৌশল আমাকে মুগ্ধ করেছে ও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁরা দেখিয়েছেন কীভাবে সীমিত সম্পদে অসীম সৃজনশীলতা প্রয়োগ করতে হয়।

আমার সরাসরি শিক্ষক না হলেও গোলাম মোস্তফা স্যার, সফি স্যার, ছলিম স্যার ও মৌলভী ইউসুফ স্যারের দিকনির্দেশনা আমার সঠিক পথের দিশা হিসেবে কাজ করেছে। তাদের সান্নিধ্যে আমি মানুষ হতে শিখেছি।

আজকের শিক্ষক মফিদুল আলমের ক্লাসরুমে যা কিছু প্রশংসিত, তা মূলত তাঁদের কাছ থেকেই ধার করা:

— কঠিন বিষয়কে সহজ, সাবলীল ও আকর্ষণীয় করে তোলার কৌশল—শিখেছি সেলিম স্যার ও হায়দার স্যারের কাছ থেকে।

— শিক্ষার্থীর চোখের ভাষা পড়ে তার মনের সুপ্ত ব্যাকুলতা বোঝার দক্ষতা—পেয়েছি রমিজ স্যার ও খালেক স্যারের সান্নিধ্যে।

— শ্রেণিকক্ষকে এক আনন্দময় ও প্রাণবন্ত উৎসবে পরিণত করার শিল্প—আয়ত্ত করেছি ফারুকী স্যার, পারভিন ম্যাম ও সুনীল স্যারের পাঠচক্রে।

আমার প্রতিটি শ্রেণি আজ তাঁদেরই তৈরি সেই দক্ষতার আবাদি ক্ষেত—যেখানে বিজ্ঞানের চারা গজায়, বেড়ে ওঠে এবং ফল দেয়।

উপসংহার

আজ যখন আমি শ্রেণিকক্ষে চক-ডাস্টার হাতে দাঁড়াই, তখন আমি একা দাঁড়াই না। আমার পেছনে অদৃশ্য আস্থার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ। আমি শুধু একজন বিজ্ঞান শিক্ষক নই—আমি আমার সকল শিক্ষকের আদর্শের এক জীবন্ত সমষ্টি, তাঁদের চিন্তার প্রতিফলন, আর তাঁদের ভালোবাসার ফসল।

তাঁদের প্রত্যেকের একটি আলোকময় অংশ আমার ভেতর প্রতিদিন বেঁচে থাকে। আজ যদি আমি কোনো শিক্ষার্থীর মনে বিজ্ঞানের প্রতি সামান্যতম অনুরাগ বা কৌতূহল জাগাতে পারি, তবে তা তাঁদেরই বোনা বীজের সোনালী ফসল—যে ফসল প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে নতুন করে সোনালি হয়ে ওঠে।

এই প্রবন্ধটি আমার সেই আলোকবর্তিকাদের চরণে উৎসর্গিত—যাঁরা আমাকে আলো দেখিয়েছেন এবং অন্ধকার ভেদ করে সত্যের সন্ধান করতে শিখিয়েছেন।

আমার প্রতিটি সাফল্য—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে হোক বা রামুর কোনও প্রাথমিক স্কুলের ক্লাসরুমে—সেই মহান শিক্ষকদের প্রতি নিবেদিত অর্ঘ্য। তাঁরা যদি একদিন জানতে পারেন, তাঁদেরই একজন শিক্ষার্থী আজ বিজ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে কক্সবাজারের উপকূলে—সেটাই হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কৃতজ্ঞতার মুহূর্ত।


মুফিদুল আলম

রামু, কক্সবাজার।

১৭ জুন ২০২৬

মন্তব্য করুন