প্রভাষক
১৮ জুন, ২০২৬ ০৩:৫৬ পূর্বাহ্ণ
ইলমুল ফারায়েজ ও ইলমুল ফারায়েজের হালতসমূহ উল্লেখপূর্বক মাসআলা ধরার নিয়মাবলী
ইলমুল ফারায়েজ
ফারায়েয-এর পরিচয়
ফরায়েয (فَرَائِضُ) শব্দটি আরবি فَرِيْضَةٌ এর বহুবচন। শাব্দিক অর্থ হচ্ছে: ফরয করা হয়েছে এমন বিষয়, আবশ্যকীয় বিষয়, অকাট্যভাবে প্রমাণিত বিষয়। ইসলামী পরিভাষায় فَرَائِض বলা হয়, মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকার সম্পত্তিকে। আর যে বণ্টন পদ্ধতির আলোকে উত্তারাধিকার সম্পত্তি বণ্টন করা হয় তাকে শরীয়তের পরিভাষায় عِلْم الْفَرَائِض বলা হয়।
আল্লামা আইনি রহ. বলেন, উত্তরাধিকার সম্পত্তিকে ইসলামে فَرَائِض নামে নামকরণ করার কারণ হল, শরীয়তে উত্তরাধিকার সম্পত্তির বণ্টন নীতি আল্লাহ তা’লা বিশেষভাবে ফরয করেছেন এবং প্রত্যকের অংশ কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত এবং এর মাঝে কমবেশি করার কোন সুযোগ নেই। তাই উত্তরাধিকার সম্পত্তিকে শরীয়তে فَرَائِض বলা হয়।
ফারায়েযের বণ্টন-পদ্ধতি
ইসলামী শরীয়তে মৃত ব্যক্তির সকল ওয়ারিশদেরকে তিনভাগে ভাগ করা হয়:
(ক) أَصْحَابُ الْفُرُوْض বা নির্ধারিত অংশের হকদার।
(খ) العَصَبَة বা অবশিষ্টভোগী।
(গ) أُوْلُوْ الْأَرْحَام বা মৃতের অন্যান্য নিকটাত্মীয়।
নিচে ধারাবাহিকভাবে এই তিন শ্রেণী ওয়ারিশদের পরিচয় এবং তাদের মাঝে উত্তরাধিকার সম্মত্তি বণ্টনের প্রক্রিয়া উল্লেখ করা হল:
এক. أَصْحَابُ الْفُرُوْض বা নির্ধারিত অংশের হকদার:
কুরআনে কারীমে যে সকল ওয়ারিশদের জন্য মিরাসের অংশ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে তাদেরকে أَصْحَابُ الْفُرُوْض বলা হয়। মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফন, ঋণ পরিশোধ এবং ওসিয়ত পূরণের পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে তা সর্বপ্রথম أَصْحَابُ الْفُرُوْض এর মাঝে তাদের নির্দিষ্ট অংশ অনুযায়ী বণ্টন করা হবে। এরপর যদি কোন সম্পদ অবশিষ্ট থাকে তাহলে পরবর্তী দু শ্রেণী পর্যায়ক্রমে পাবে।
أَصْحَابُ الْفُرُوْض হল মোট ১২ জন। তন্মধ্যে ৪ জন পুরুষ এবং ৮ জন মহিলা।
পুরুষ ৪ জন হল:
১. স্বামী।
২. পিতা।
৩. দাদা (দাদার পিতা, তার পিতা এভাবে ঊর্ধ্বতন পুরষ দাদার অন্তর্ভুক্ত)।
৪. বৈপিত্রেয় ভাই ।
আর নারী ৮ জন হল:
১. মা।
২. স্ত্রী।
৩. কন্যা।
৪. পুত্রের কন্যা (পুত্রের পুত্রের কন্যা- এভাবে পুরুষযোগে অধস্তন সকল
মেয়েই পুত্রের কন্যার অন্তর্ভুক্ত)।
৫. আপন বোন।
৬. বৈমাত্রেয় বোন।
৭. সৎ বোন।
৮. দাদী ও নানী (পিতার মা, পিতামহের মা- এভাবে পুরুষযোগে ঊর্ধ্বতন সকল দাদী এবং মাতার মা, মাতার নানী- এভাবে নারীযোগে ঊর্ধ্বতন সকল নানী যথাক্রমে দাদী এবং নানীর অন্তর্ভুক্ত) ।
দুই. العَصَبَة বা অবশিষ্টভোগী।
العَصَبَة বা অবশিষ্টভোগী। মৃত ব্যক্তির এমন আত্মীয়-স্বজন যাদের কোন অংশ শরীয়ত কর্তৃক নির্দিষ্ট করা হয়নি। তবে أَصْحَابُ الْفُرُوْض তাদের নির্দিষ্ট অংশ পাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে কিংবা أَصْحَابُ الْفُرُوْض এর অবর্তমানে তাদের সমুদয় সম্পত্তির যারা মালিক হয় তাদেরকে العَصَبَة বা অবশিষ্টভোগী বলা হয়। আসাবাদের মাঝে সম্পত্তি বণ্টনের পদ্ধতি হল الأقرب فالأقرب অর্থাৎ প্রথমে মৃতের নিকটাত্মীয়রা পাবে। এরপর অবশিষ্ট থাকলে দূরের আত্মীয়রা পাবে।
তিন. أُوْلُوْ الْأَرْحَام বা মৃতের অন্যান্য নিকটাত্মীয়।
একনজরে ফারায়েজের
হালতসমূহ
|
ওয়ারিশ |
প্রথম হালত |
দ্বিতীয় হালত |
তৃতীয় হালত |
চতুর্থ হালত |
পঞ্চম হালত |
ষষ্ঠ হালত |
সপ্তম হালত |
|||||
|
স্বামী |
সন্তান না থাকলে ১/২
|
সন্তান থাকলে ১/৪ |
স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামীর দুই অবস্থা
|
|
|
|
|
|||||
|
পিতা |
ছেলেসন্তান থাকলে ১/৬ |
১/৬ আসাবা কোন ছেলে সন্তান না থাকে কোন কন্যা সন্তান থাকলে |
আসাবা সন্তান না থাকলে |
সন্তান মারা গেলে পিতার তিন অবস্থা
|
|
|
|
|||||
|
দাদা |
ছেলেসন্তান থাকলে ১/৬ |
১/৬ আসাবা কোন ছেলে সন্তান না থাকে কোন কন্যা সন্তান থাকলে |
আসাবা সন্তান না থাকলে |
বঞ্চিত مَحْذُوْف মৃত ব্যক্তির পিতা জীবিত থাকলে দাদা বঞ্চিত হবে
|
|
|
|
|||||
|
বৈপিত্রেয় ভাই একই মায়ের সন্তান কিন্তু বাবা ভিন্ন |
শুধুমাত্র একজন থাকলে১/৬ |
একাধিক থাকলে ১/৩ |
বঞ্চিত مَحْذُوْف মৃত ব্যক্তির পুত্র, কন্যা, নাতি-নাতনী বা অধস্তন কেউ কিংবা পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ বা ঊর্ধ্বতন কেউ জীবিত থাকলে
|
|
|
|
|
|||||
|
স্ত্রী |
সন্তান না থাকলে ১/৪ |
সন্তান থাকলে ১/৮ |
স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর দুই অবস্থা
|
|
|
|
|
||||
|
মাতা |
কোন সন্তান কিংবা একাধিক ভাইবোন থাকলে১/৬ |
স্বামী বা স্ত্রীর অংশ দেয়ার পর বাকি সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ পাবেন ১/৩ |
অবশিষ্টের ১/৩ |
(কোন সন্তান না থাকে বা ভাইবোন ২ জনের কম থাকে এবং স্ত্রী কিংবা স্বামী জীবিত না থাকে তাহলে মা সমুদয় সম্পত্তির ১/৩ অংশ (এক তৃতীয়াংশ) পাবেন) |
|
|
|
||||
|
কন্যা |
শুধুমাত্র একজন থাকলে ১/২ |
একাধিক থাকলে ২/৩ |
পুত্র এবং কন্যা একসাথে থাকলে পুত্র-কন্যা ২:১ অনুপাতে পাবে |
(ক) যদি শুধুমাত্র একজন কন্যা থাকে এবং কোন পুত্র না থাকে তাহলে সে সম্পত্তির ১/২ অংশ (অর্ধেক) পাবে। (খ) আর কন্যা যদি একাধিক থাকে এবং কোন পুত্র না থাকে তাহলে সবাই ২/৩ অংশ (দুই তৃতীয়াংশ) পাবে। |
|
|
|
||||
|
ছেলের কন্যা/ পৌত্রী |
একজন থাকলে১/২ |
একাধিক থাকলে ২/৩
|
কোন পুত্র না থাকলে একজন মাত্র কন্যা থাকলে এবং সাথে এক বা একাধিক পৌত্রী থাকলে ১/৬ |
পৌত্র এবং পৌত্রী একসাথে থাকলে পৌত্র-পৌত্রী ২:১ অনুপাতে পাবে |
বঞ্চিত مَحْذُوْف একাধিক কন্যা থাকলে / কোন পুত্র থাকলে |
|
|
||||
|
সহোদর বোন/ আপন বোন |
একজন থাকলে১/২ |
একাধিক থাকলে ২/৩
|
আপন ভাই না থাকলে একজন মাত্র কন্যা থাকলে আপন বোনেরা ১/৬ অংশ পাবেন আর একাধিক কন্যা থাকলে বোন আসাবা হিসেবে পাবে |
ভাই এবং বোন একসাথে থাকলে ভাই-বোন ২:১ অনুপাতে পাবে |
বঞ্চিত مَحْذُوْف পুত্র কিংবা পিতা থাকলে |
|
|
||||
|
বৈপিত্রেয় বোন একই মায়ের সন্তান কিন্তু বাবা ভিন্ন |
একজন থাকলে ১/৬ |
একাধিক থাকলে ১/৩
|
বঞ্চিত مَحْذُوْف পুত্র-কন্যা বা অধস্তন কেউ কিংবা পিতা-দাদা বা ঊর্ধ্বতন কেউ জীবিত থাকলে |
|
|
|
|
||||||
|
বৈমাত্রেয় বোন বাবা এক কিন্তু মা ভিন্ন |
একজন থাকলে ১/২ |
একাধিক থাকলে ২/৩ |
আপন বোন একাজন থাকলে ১/৬ |
আসাবা বৈমাত্রেয় ভাই-বোন ২:১ অনুপাতে পাবে |
আসাবা কোন কন্যা, কন্যার কন্যা বা অধস্তন কেউ থাকলে এবং আপন বোন না থাকলে |
বঞ্চিত مَحْذُوْف একাধিক আপন বোন থাকলে / কোন পুরুষ ওয়ারিশ জীবিত থাকলে
|
|
||||||
|
দাদী / নানী |
পিতা-মাতা, দাদা বা ঊর্ধ্বতন কেউ যদি জীবিত না থাকলে ১/৬ |
বঞ্চিত مَحْذُوْف পিতা জীবিত থাকলে দাদী বঞ্চিত হবে কিন্তু নানী যথারীতি ১/৬ অংশ (এক ষষ্ঠাংশ) পাবে |
বঞ্চিত مَحْذُوْف মা জীবিত থাকলে দাদী এবং নানী উভয়ে বঞ্চিত হবে
|
|
|||||||||
ফারায়েজে মাসআলা ধরার নিয়মাবলী নিচে দেওয়া হলো:
১. ওয়ারিশদের অংশ অনুযায়ী মাসআলা নির্ধারণ:
ওয়ারিশদের অংশ নির্ধারণের পর, তাদের অংশীদারিত্বের হরগুলোর লসাগু বের করে মাসআলা ধরা হয়।
১/২ (অর্ধেক) থাকলে: মাসআলা হবে ২।
১/৪ (এক-চতুর্থাংশ) থাকলে: মাসআলা হবে ৪।
১/৮ (এক-অষ্টমাংশ) থাকলে: মাসআলা হবে ৮।
১/৩ বা ২/৩ থাকলে: মাসআলা হবে ৩।
১/৬ (ছয় ভাগের এক ভাগ) থাকলে: মাসআলা হবে ৬।
২.
অংশীদারদের ক্যাটাগরি অনুযায়ী সাধারণ মাসআলা:
সাধারণত ফারায়েজের মাসআলা ৬, ১২ বা ২৪ দ্বারা শুরু হয়:
যদি শুধুমাত্র ১/২ থাকে—মাসআলা ২।
যদি ১/২ ও ১/৩ থাকে—মাসআলা ৬।
যদি ১/৪ ও ১/৩ থাকে—মাসআলা ১২।
যদি ১/৮ ও ১/৩ থাকে—মাসআলা ২৪।
৩.
তামাছুল, তদাখুল, তাওয়াফুক
ও তাবায়ুন নীতি:
যদি একাধিক ওয়ারিশের অংশের হর ভিন্ন হয়, তবে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে মাসআলা ধরা হয়:
তামাছুল (সমান): হরগুলো সমান হলে একটি নিলেই হয়। (যেমন- ১/৩, ১/৩ = মাসআলা ৩)।
তদাখুল (ছোটটি দিয়ে বড়টিকে ভাগ করা গেলে): ছোটটি বাদ দিয়ে বড়টি নিতে হয়। (যেমন- ১/২, ১/৪, ১/৮ থাকলে ৮ হবে মাসআলা)।
তওয়াফুক (সাধারণ বিভাজক থাকলে): দুই হরের গুণফলকে তাদের সাধারণ বিভাজক দিয়ে ভাগ করতে হয়। (যেমন- ১/৬ ও ১/৪ থাকলে মাসআলা = ১২)
তাবায়ুন (কোনো মিল না থাকলে): দুই হরের গুণফলই মাসআলা হবে। (যেমন- ১/৩ ও ১/৪ থাকলে মাসআলা ৩ ৪ = ১২)।
৪. বিশেষ ক্ষেত্রসমূহ
৪. ১. আউল (عَول):
যদি ওয়ারিশদের প্রাপ্য অংশের যোগফল মূল মাসআলার চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তবে মাসআলার সংখ্যা বাড়িয়ে যোগফলের সমান করা হয়। যেমন- মাসআলা ৬ হলে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৭, ৮, ৯, ১০ বা ১৩ হতে পারে।
৪. ২. রাদ্দ (رَدّ) নীতি:
যদি অংশীদারদের দেওয়ার পর সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে এবং আসাবা বা অবশিষ্টভোগী কেউ না থাকে, তবে অবশিষ্ট সম্পত্তি আনুপাতিক হারে অংশীদারদের মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে সম্পত্তি বন্টনের প্রক্রিয়াকে রাদ্দ বা হ্রাস বলে। এক্ষেত্রে মাসআলা কমে আসে।
مَسْأَلَةُ
الرَّدِّيَّةِ
যখন কোন মাসআলায় রদ্দ হবে , তখন মাসআলাটি নিচের চারটির যে কোন একটি অবস্থায় থাকবে এবং উক্ত অবস্থার আলোকে মাসআলার সমাধান করতে হবে।
|
1. |
স্বামী/স্ত্রী না থাকলে |
এক শ্রেণির ওয়ারিশ থাকলে |
ওয়ারিশ সংখ্যা হবে মাসআলা। |
|
2. |
|
একাধিক শ্রেণির ওয়ারিশ থাকলে |
সকলের প্রাপ্ত অংশের সমষ্টি হবে মাসআলা। |
|
3. |
|
এক শ্রেণির ওয়ারিশ থাকলে |
1. স্বামী/স্ত্রীর অংশের হর হবে মাসআলা। 2. স্বামী/স্ত্রীকে 1 দেওয়ার পর বাকি অংশ একশ্রেণির ওয়ারিশ পাবে। |
|
4. |
স্বামী/স্ত্রী থাকলে |
একাধিক শ্রেণির ওয়ারিশ থাকলে |
1. স্বামী/স্ত্রীর অংশের হর হবে মাসআলা। 2. স্বামী/স্ত্রীকে 1 দিতে হবে । 3. বাকি অংশ ওয়ারিশদের মধ্যে سُدُسٌ হিসেবে বন্টন করতে হবে। |
৫৩
৯২ মন্তব্য