সিনিয়র শিক্ষক
১৮ জুন, ২০২৬ ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষার চাকা থামলে জাতি স্থির হয় : একটি জাগরণের ডাক
শিক্ষার চাকা থামলে জাতি স্থির হয় : একটি জাগরণের ডাক
যখন মন্ত্রী নিজেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন
জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার প্রধান স্তম্ভ শিক্ষা যখন স্থবির হয়ে পড়ে, তখন তা আর শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের সমস্যা থাকে না — এটি পুরো জাতির আত্মপরীক্ষার বিষয়ে পরিণত হয়। সম্প্রতি সংসদে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক শূন্যপদ রয়েছে এবং আদালতের মামলাজনিত জটিলতার কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে আছে। এই স্বীকারোক্তি আমাদের সামনে শিক্ষাব্যবস্থার এক গভীর সংকট উন্মোচিত করেছে।
শূন্য পদের বোঝা
বর্তমান তথ্য অনুসারে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৩৪,০০০ প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। MPOভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে শূন্যপদের সংখ্যা প্রায় ৬০,২৯৫। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদ প্রায় ২,৮৪২। এছাড়া আইনি জটিলতায় প্রায় ৮৭,০০০ শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি আটকে আছে।
এই শূন্যপদগুলো শুধু সংখ্যা নয়। প্রতিটি শূন্যপদ মানে শত শত শিক্ষার্থীর অপূর্ণ শিক্ষা, দুর্বল মানসম্মত শিক্ষাদান এবং ভবিষ্যতের সুযোগ হারানো। শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে শ্রেণিকক্ষ অসম্পূর্ণ থেকে যায়, বিজ্ঞান ও সৃজনশীলতার চর্চা বাধাগ্রস্ত হয় এবং নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে প্রতিষ্ঠান প্রধানের প্রায় ১৫,০০০ পদ শূন্য। এর অর্থ প্রায় ১৫,০০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ চালকবিহীন গাড়ির মতো চলছে — গন্তব্যহীন, দিকভ্রষ্ট। অথচ সেখান থেকেই আমরা প্রত্যাশা করি মানসম্মত শিক্ষা, সুনাগরিক, উন্নত জাতি।
দায়িত্ব কার?
এই সংকট কোনো একটি পক্ষের একার তৈরি নয়, কিন্তু সমাধানও একার পক্ষে সম্ভব নয়।
মন্ত্রণালয়কে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে, আইনি বিকল্প খুঁজতে হবে এবং মামলা চলাকালীন জনস্বার্থে অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিচার বিভাগকে মনে রাখতে হবে, শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত প্রতিটি মামলায় বিলম্বের মানে লক্ষ শিশুর শেখার সময় নষ্ট হওয়া। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এই মামলাগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া এখন নৈতিক দায়িত্ব। আর অভিভাবক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের নীরবতা এই সংকটকে আরও গভীর করবে — তাদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বরই পারে ব্যবস্থাকে নাড়া দিতে।
সংকটের শিকড়
শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা, মামলা এবং প্রশাসনিক বিলম্বই এই সংকটের মূল কারণ। বিভিন্ন মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় হাজার হাজার পদ পূরণ করা যাচ্ছে না। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহিহীন বিলম্ব এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছে।
ভারতের কিছু রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগ-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত শিক্ষা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে, যা মামলা নিষ্পত্তির গড় সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার সময় এসেছে।
যাদের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি
এই সংকটে তিনটি পক্ষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
বছরের পর বছর প্রস্তুতির পরও নিয়োগ না পাওয়া চাকরিপ্রার্থী যুবক-যুবতীরা স্বপ্নের দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। শিক্ষকের অভাবে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা এমন একটি ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে যেখানে তাদের সম্ভাবনা কখনো পূর্ণ বিকশিত হয়নি। আর কর ও ফি দিয়েও সন্তানের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারা অভিভাবকরা প্রতিদিন এক নিঃশব্দ হতাশা বহন করছেন।
এই তিনটি অসহায়ত্ব আলাদা নয় — এগুলো একই সংকটের তিনটি মুখ।
সমাধানের বাস্তব পথ
শিক্ষাকে সকল রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে রেখে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ এখনই নেওয়া জরুরি।
শিক্ষক নিয়োগ ও সংশ্লিষ্ট বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত শিক্ষা ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট শিক্ষা-সংক্রান্ত মামলাগুলোকে বিচারিক অগ্রাধিকার দিতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ডিজিটালাইজেশন ও সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে যাতে দুর্নীতি ও বিলম্বের সুযোগ না থাকে। এবং সুশীল সমাজ ও অভিভাবকদের ঐক্যবদ্ধ সচেতন দাবি প্রশাসনকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাতে পারে।
প্রযুক্তি ব্যবহার:
শিক্ষক নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া (আবেদন, পরীক্ষা, ভাইভা, দাবি-আপত্তি) একটি স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল পোর্টালের মাধ্যমে করলে স্বচ্ছতা আসবে এবং মামলার কারণ কমবে।
সাধারণত অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলা হয় চাকুরী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে। আমি মনে করি মামলা সমাধানের পথ নয়। উভয় পক্ষের ইতিবাচক মনোভাবের মাধ্যমে এই মামলা সংষ্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
স্থিরতা ভাঙার সময় এসেছে
একটি জাতির কারখানা তার বিদ্যালয়, আর সেই কারখানার প্রধান কারিগর শিক্ষক। যখন হাজার হাজার শ্রেণিকক্ষ শিক্ষকশূন্য থাকে, তখন শুধু একটি চাকরি খালি থাকে না—খালি থাকে জাতির ভবিষ্যৎ, থমকে যায় উন্নয়নের চাকা, নিভে যেতে থাকে সম্ভাবনার প্রদীপ।"
শুন্যপদ পূরণ করে, আইনি জটিলতা দূর করে এবং সকল পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষার চাকা আবার সচল করতে হবে।
মন্ত্রী, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষক, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজ — সবাই মিলে এই জাতীয় দায়িত্ব পালন করলে আমরা একটি শিক্ষিত, সচেতন ও সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে পারব।
আমরা কি সেই পরিবর্তনের সাহস দেখাতে প্রস্তুত?
মুফিদুল আলম
রামু, কক্সবাজার
১৮ জুন ২০২৬
৫৩
৯২ মন্তব্য