সিনিয়র শিক্ষক
১৮ জুন, ২০২৬ ১২:২৭ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে যুগোপযোগী কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব।
**ডিজিটাল বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে আমরা এখন প্রবেশ করছি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের যুগে। আর এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো আমাদের তরুণ প্রজন্ম। তবে শুধু বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী থাকলেই চলে না, তাদের সময়ের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হয়। এখানেই চলে আসে যুগোপযোগী কারিগরি শিক্ষার অপরিহার্যতা।**
আজকের যুগে কেন প্রথাগত পড়াশোনার চেয়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে আজকের এই ব্লগ।
## কেন সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কারিগরি শিক্ষা এগিয়ে?
আমাদের দেশে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে বের হচ্ছে। কিন্তু বাজারের চাহিদার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অমিল থাকায় অনেকেই কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছে না।
> **একটি নির্মম সত্য:** "শুধু সার্টিফিকেট কখনো কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি দেয় না, কিন্তু বাস্তবমুখী দক্ষতা দেয়।"
>
কারিগরি শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীকে শুধু তত্ত্বীয় জ্ঞান দেয় না, বরং সরাসরি হাতে-কলমে কাজ শেখায়। ফলে পড়াশোনা শেষ করার আগেই একজন শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যায়।
## বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুগোপযোগী কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (4IR) এই সময়ে প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটছে চোখের পলকে। তাই আমাদের কারিগরি শিক্ষাকেও হতে হবে যুগের সাথে তাল মেলানো বা ‘যুগোপযোগী’।
* **বেকারত্ব দূরীকরণ ও আত্মকর্মসংস্থান:** কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন তরুণ কখনোই বেকার বসে থাকে না। চাকরি না পেলেও সে নিজেই একটি ওয়ার্কশপ, আইটি ফার্ম বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান খুলে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে।
* **চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা:** বর্তমান বাজারে শুধু ওয়েল্ডিং বা মেকানিক্সের কাজ জানলেই চলে না। এখন প্রয়োজন—
* আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)
* রোবোটিক্স
* ডেটা সায়েন্স ও ক্লাউড কম্পিউটিং
* সাইবার সিকিউরিটি
* ব্লকচেইন প্রযুক্তি
এসব বিষয়ে যুগোপযোগী কারিগরি জ্ঞান না থাকলে আমরা বৈশ্বিক বাজারে পিছিয়ে পড়ব।
* **বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি:** বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ কর্মী বিদেশে যান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাদের সিংহভাগই যান ‘অদক্ষ’ শ্রমিক হিসেবে। যদি তাদের আধুনিক প্লাম্বিং, ইলেকট্রিক্যাল, ড্রাইভিংসহ বিভিন্ন আধুনিক কারিগরি ট্রেডে দক্ষ করে পাঠানো যায়, তবে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
* **নারীর ক্ষমতায়ন:** কারিগরি শিক্ষা শুধু ছেলেদের জন্য নয়। গ্রাফিক্স ডিজাইন, কোডিং, ফ্যাশন ডিজাইনিং, ই-কমার্স ম্যানেজমেন্টের মতো আধুনিক ট্রেডগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছে।
## আমাদের করণীয় কী?
যুগোপযোগী কারিগরি শিক্ষাকে জনপ্রিয় এবং কার্যকর করতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
1. **সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন:** আমাদের সমাজে এখনও কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার চেয়ে "কম মর্যাদাপূর্ণ" মনে করা হয়। এই মানসিকতা ভাঙতে হবে। কারিগরি পেশাজীবীদের সামাজিক মর্যাদা ও সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
2. **সিলেবাসের আধুনিকায়ন:** বহু বছরের পুরোনো সিলেবাস দিয়ে আজকের যুগের ফ্রিল্যান্সিং বা অটোমেশন সামলানো যাবে না। প্রতিনিয়ত বাজারের চাহিদার সাথে মিল রেখে কারিকুলাম আপডেট করতে হবে।
3. **শিল্প-প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় (Industry-Institute Linkage):** দেশের বড় বড় শিল্পকারখানার সাথে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তি থাকা উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি সরাসরি কারখানায় ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পায়।
## শেষ কথা
উন্নয়নশীল দেশের কাতার থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে চাইলে "সোনার বাংলা" গড়ার কারিগরদের দক্ষ করে তোলার কোনো বিকল্প নেই। ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যার চেয়ে দক্ষ ও কর্মমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ানোই এখন সময়ের দাবি। আসুন, কারিগরি শিক্ষাকে অবহেলা না করে একে আপন করে নিই এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
১
১ মন্তব্য