সহকারী শিক্ষক
১৮ জুন, ২০২৬ ১১:১৫ অপরাহ্ণ
একনজরে মোহাাম্মদপুর এ. গফুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় মোহাম্মদপুর এ. গফুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ঐতিহ্যবাহী ও সুনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তার, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং সমাজ সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়টি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে এলাকার সামাজিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
বর্তমানে বিদ্যালয়ে মোট ১৬০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত, যার মধ্যে ৬১ জন ছেলে এবং ৯৯ জন মেয়ে। (শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হওয়ার কারণ তিনটি ঐতিহ্যবাহী কওমী মাদ্রাসা রয়েছে। তাছাড়া একই ক্যাচমেন্ট এরিয়া দুইভাগে বিভক্ত হওয়ার অন্য ভাগে আরেকটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ায় ঐ এলাকার শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয়ে আসে না।) শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও সার্বিক বিকাশে নিয়োজিত রয়েছেন ৫ জন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক-কর্মচারী। বিগত তিন বছরে বিদ্যালয়ের গড় উপস্থিতির হার ও ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অনুপাত ৮৫% থেকে ৮৯% বজায় রয়েছে। বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার শূন্য, যা শিক্ষার্থী ধরে রাখা এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণে বিদ্যালয়ের সফলতার প্রমাণ বহন করে।
শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি সৃজনশীলতা, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও সৌন্দর্যবোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিটি শ্রেণিতে ৭৫% থেকে ৮০% শিক্ষার্থীর হাতের লেখা কাঠামোবদ্ধ ও সুন্দর। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে গড় অর্জন ৭৫% থেকে ৮০%, যা বিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মানের প্রতিফলন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জন করে বিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করছে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশগ্রহণে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয় এবং তাদের প্রতিভা বিকাশে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হয়। বিদ্যালয়ে দুটি কাবদল রয়েছে এবং উপজেলা পর্যায়ের সকল কাবিং কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রমও সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো অত্যন্ত সমৃদ্ধ, দৃষ্টিনন্দন এবং শিক্ষাবান্ধব। বিদ্যালয়ে মোট ৩টি ভবন, ১২টি কক্ষ এবং ৭টি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। এছাড়া একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, একটি দপ্তরি কক্ষ, একটি নামাজের কক্ষ এবং একটি উপকরণ কক্ষ রয়েছে। সুসজ্জিত ও রং করা ভবন, নিরাপদ পানীয় জলের পর্যাপ্ত সরবরাহ, পরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, আকর্ষণীয় ফুল বাগান, ছাদ বাগান, পর্যাপ্ত আসবাবপত্র, পরিচ্ছন্ন শ্রেণিকক্ষ, দৃষ্টিনন্দন পতাকা মঞ্চ ও পতাকাদণ্ড, স্থায়ী শহিদ মিনার, অভিভাবকদের জন্য বসার কক্ষ এবং দুটি সমতল খেলার মাঠ বিদ্যালয়কে একটি মনোরম শিক্ষাঙ্গনে পরিণত করেছে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিদ্যালয়টি বিশেষভাবে অগ্রসর। বিদ্যালয়ে স্থানীয় অনুদানে প্রায় ৩৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক সকল সুবিধাসম্বলিত একটি স্মার্ট মাল্টিপারপাস হল রয়েছে, যেখানে একটি সুসজ্জিত মঞ্চ, দর্শক সারি এবং ১০৫টি রিডিং-রাইটিং চেয়ার রয়েছে। হলরুমে স্থানীয় অনুদানে ৫,০০,০০০ টাকা ব্যয়ে একটি ৭৫ ইঞ্চি ডিজিটাল ইন্টারেক্টিভ স্মার্ট বোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য শ্রেণিকক্ষেও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহার করা হয়। বিদ্যালয়ে আইপিএস, ৮টি সিসি ক্যামেরা এবং ওয়াই-ফাই সংযোগ বিদ্যমান, যা আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করেছে।
বিদ্যালয়ের অন্যতম সফল উদ্ভাবনী উদ্যোগ হলো “স্মাইলি প্রোগ্রাম পারফরম্যান্স”। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিখন অর্জন, শৃঙ্খলা, সৃজনশীলতা এবং সামগ্রিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন ও উৎসাহিত করা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা, আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং উৎকর্ষ অর্জনের মনোভাব গড়ে উঠেছে। স্থানীয় অনুদানের মাধ্যমে এ কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী শতভাগ ইউনিফর্ম পরিধান করে এবং শিক্ষার্থীদের ছবিযুক্ত স্মার্ট আইডি কার্ড প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষিকাগণেরও ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র রয়েছে। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি অত্যন্ত সক্রিয় ও দায়িত্বশীল। প্রতিবছর ৮-৯টি সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সভায় গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়। শতভাগ ভর্তি নিশ্চিতকরণ, উপস্থিতি বৃদ্ধি, আপদকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম ও শিক্ষা উপকরণ প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যকর ভূমিকা রয়েছে।
সমাজ সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়টি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুধীজন ও সাধারণ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে বিশেষ সভা, উঠান বৈঠক, র্যালি এবং নিয়মিত মা/অভিভাবক সমাবেশ আয়োজন করা হয়। বিদ্যালয় উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। গত ১০ বছরে স্থানীয় অনুদান হিসেবে মোট ৬৬,২২,৬৩৮ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে প্রায় ৬৬ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত আর্থিক অনুদান প্রদান করে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা করে থাকেন।
বিদ্যালয়ের বর্তমান খেলার মাঠটি পূর্বে একটি পুকুর ছিল। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও শারীরিক বিকাশের জন্য উপযোগী মাঠ তৈরির লক্ষ্যে স্থানীয় অনুদানে পর্যায়ক্রমে ২০১৬ সালে ৩,০২,৩৫৯ টাকা, ২০১৭ সালে ৫,৯৭,৭০০ টাকা এবং ২০২৬ সালে ২,৭২,৭৫০ টাকা ব্যয়ে মাটি ভরাট করা হয়েছে। খেলার মাঠ উন্নয়নে মোট ১১,৭২,৮০৯ টাকা ব্যয় হয়েছে, যার সম্পূর্ণ অর্থ স্থানীয় অনুদানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে মাঠটিতে নিয়মিত খেলাধুলা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া খেলার মাঠে একটি স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে বিদ্যালয়ের নামে দুটি স্থায়ী ওয়াকফ তহবিল গঠন করা হয়েছে, যা বর্তমানে সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে একটি ২৫,০০০ টাকা এবং অপরটি ১,০০,০০০ টাকার তহবিল। উভয় তহবিলের মুনাফা প্রতিবছর ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের হিসাবে জমা হয়। ২৫,০০০ টাকার ওয়াকফ তহবিলের বার্ষিক মুনাফা বিদ্যালয়ের পাঠাগার উন্নয়ন ও শিশুতোষ বই ক্রয়ে ব্যয় করা হয়, যার ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস ও জ্ঞানচর্চা সমৃদ্ধ হচ্ছে। অপরদিকে ১,০০,০০০ টাকার ওয়াকফ তহবিলের বার্ষিক মুনাফা অসচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম, শিক্ষা উপকরণ, চিকিৎসা সহায়তা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানে ব্যয় করা হয়। এই মানবিক ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থী কল্যাণ সাধন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা বাস্তবায়নের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বিদ্যালয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ দিবসসমূহ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়। মহান শহিদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, জাতীয় গণহত্যা দিবস, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস, শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস, মহান বিজয় দিবস, বাংলা নববর্ষসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপন করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক ও মূল্যবোধভিত্তিক অনুষ্ঠান নিয়মিত আয়োজন করা হয়।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিদ্যালয়টি অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ফুল ও ফলজ বাগান পরিচর্যা, ছাদ বাগান এবং পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হয়। বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ১০০টিরও বেশি বই রয়েছে এবং রেজিস্টারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বই সরবরাহ করা হয়। প্রাক-প্রাথমিক নির্দেশিকা অনুসারে শ্রেণিকক্ষ আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো হয়েছে এবং পাঠদান কার্যক্রমে শিক্ষাসামগ্রী নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। বিদ্যালয়ের সকল রেজিস্টার, ফাইল, পাঠ্যবই, শিক্ষক সহায়িকা, নির্দেশিকা এবং অন্যান্য নথিপত্র সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ ও নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। নোটিশ বোর্ড, অভিযোগ বক্স এবং মনিটরিং বোর্ড নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়।
সর্বোপরি, দীর্ঘ ৫৯ বছরের ঐতিহ্য, শূন্য ঝরে পড়া, উচ্চ উপস্থিতি হার, মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, স্মার্ট মাল্টিপারপাস হল, ডিজিটাল ইন্টারেক্টিভ স্মার্ট বোর্ড, উদ্ভাবনী “স্মাইলি প্রোগ্রাম পারফরম্যান্স”, স্থায়ী ওয়াকফ তহবিল, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম, স্থানীয় জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ধারাবাহিক সাফল্য, বিভিন্ন গণমাধ্যমে ইতিবাচক প্রচার, দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো, সবুজ ও পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস, শক্তিশালী বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে বহুমাত্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে মোহাম্মদপুর এ. গফুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি শ্রেষ্ঠ, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, সৃজনশীল, মানবিক ও আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে নিজস্ব স্বকীয়তা ও সুনাম প্রতিষ্ঠা করেছে।
৫
৫ মন্তব্য