Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৯ জুন, ২০২৬ ০৫:৩৭ পূর্বাহ্ণ

কুরাইশের প্রতি আহ্বান - মোঃ মুজিবুর রহমান



কুরাইশের প্রতি আহ্বান

(সূরা আল-কুরাইশের আলোকে)

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানুষ কত কিছু চায় জীবনে,
চায় সম্মান, চায় নিরাপত্তা,
চায় রিজিকের প্রশস্ত দুয়ার,
চায় সুখের অবিরাম বারতা।

কেউ দেখে না কত অগণিত দান,
কত রহমত নীরবে ঝরে,
প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি প্রহর,
করুণাধারা নামে ঘরে ঘরে।

নিয়ামত যখন অভ্যাস হয়ে যায়,
মানুষ তখন ভুলে যায় তা,
যে দান ছিল একদিন বিস্ময়,
আজ মনে হয় স্বাভাবিক কথা।

তাই তো কুরআনের মহান বাণী
জাগায় হৃদয়, ডাকে বারবার
হে মানুষ! স্মরণ করো প্রভুকে,
যিনি তোমার একমাত্র অধিকার।

মক্কার বুকে একদা ছিল
কুরাইশ নামে একটি জাতি,
বাণিজ্যে ছিল তাদের খ্যাতি,
সাহস, সম্মান, গৌরব সাথী।

মরুর দেশে কঠিন জীবন,
চারিদিকে অনিশ্চয়তার ছায়া,
তবু তাদের ভাগ্যের আকাশে
জ্বলত আশার দীপ্তিময় মায়া।

শীতের দিনে দক্ষিণমুখী,
গ্রীষ্ম এলে উত্তরে যাত্রা,
দূর দেশের পথে পথে ছুটত
তাদের বাণিজ্যের বহর মাত্রা।

ইয়েমেনের পথে শীতের সফর,
সিরিয়ার পথে গ্রীষ্মকাল,
পণ্যভর্তি কাফেলা নিয়ে
চলত তারা শত শত মাইল।

মরুভূমির কঠিন বুকে
ছিল না তাদের কোনো ভয়,
অন্যান্যরা যেখানে শঙ্কিত,
সেখানে তারা নির্ভয়ময়।

কার আশীর্বাদে এমন হলো?
কার কৃপায় সম্মান লাভ?
কার রহমতে খুলল তাদের
সৌভাগ্যের অগণিত দ্বার?

মক্কার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে
এক পবিত্র মহান ঘর,
যার ইতিহাস যুগে যুগে
আলোকিত করেছে ধরার পর।

ইবরাহিমের পবিত্র হাতে
উঠেছিল যার প্রথম দেয়াল,
তাওহীদের সেই মহাস্মৃতি
আজও বহে অবিচল কাল।

সাধারণ কোনো ঘর নয় এটি,
নয় কেবল পাথরের গাঁথুনি,
ঘরের সাথে জড়িয়ে আছে
বিশ্বমানবের ঈমানি ধ্বনি।

ঘর মহান রবের ঘর,
ঘর শান্তির প্রতীক,
ঘরের ডাকে যুগে যুগে
জেগেছে সত্যের সুরভিত দিক।

ঘরের কারণেই কুরাইশ পেল
আরব জুড়ে সম্মান ভার,
মানুষ জানত ওরা তো সেবক
পবিত্র কাবার অভিভাবক আর।

তাই তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল,
ছিল নিরাপদ পথের দান,
বাণিজ্যের পথে কেউ সাহস করত না
করতে তাদের অপমান।

একদিন এল দুর্ধর্ষ বাহিনী,
হাতির পিঠে যুদ্ধসাজ,
আবরাহার সেনারা এল
ধ্বংস করতে পবিত্র আজ।

অহংকারে তারা বলল এসে,
ভেঙে দেব কাবার ঘর,”
ক্ষমতার নেশায় ভুলে গেল
আসমানের মহান প্রভুর ডর।

মক্কার মানুষ অসহায় তখন,
ছিল না কোনো যুদ্ধশক্তি,
তাদের চোখে অশ্রুর ধারা,
হৃদয়ে শুধু প্রার্থনার ভক্তি।

কিন্তু যিনি ঘরের রব,
তিনি কি তাঁর ঘর ছাড়েন?
তিনি কি দেখেন অত্যাচার
আর নীরবে তা সহ্য করেন?

না, তিনি পাঠালেন তাঁর সৈন্য,
পাখির ঝাঁকে আসমান ভরে,
সত্যের শক্তি প্রকাশ পেল
অলৌকিক এক দৃশ্য ঘিরে।

পাথরের কণা হয়ে উঠল
অহংকারের মহাবিনাশ,
মুছে গেল শক্তির গর্ব,
শেষ হলো অত্যাচারের উল্লাস।

তখন সবাই দেখল স্পষ্ট
ক্ষমতার চেয়ে বড় যে রব,
যার এক নির্দেশে মুহূর্তে বদলে যায়
পৃথিবীর সকল হিসাব।

ক্ষুধা বড় কঠিন পরীক্ষা,
ভেঙে দেয় মানুষের প্রাণ,
অন্নহীন চোখের ভাষা
বুঝে কেবল দয়াময় মহান।

মরুর দেশে শস্য কম,
চারদিকে রুক্ষ প্রান্তর,
তবু কুরাইশ বঞ্চিত হয়নি,
খুলে ছিল রিজিকের অন্তর।

দূর দেশ হতে আসত পণ্য,
আসত খাদ্য, ফলের ভাণ্ডার,
মহান রবের ইচ্ছাতেই
ভরতো তাদের জীবন-ঘর।

তারা কি নিজের শক্তিতে পেয়েছে?
না কি নিজের বুদ্ধির জোরে?
না, সবই ছিল আল্লাহর দান,
করুণার অবারিত ঘোরে।

যিনি দেন প্রতিদিন অন্ন,
যিনি ভরান শূন্য থালা,
তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে
মানুষ কেমন করে চলে?

ভয় মানুষের চিরসঙ্গী,
অজানার পথে অন্ধকার,
ভীত হৃদয়ে শান্তি নামে
যখন থাকে প্রভুর অধিকার।

আরব ছিল সংঘাতে ভরা,
গোত্রে গোত্রে রক্তের ঋণ,
আজকের বন্ধু কালকে শত্রু,
অশান্ত ছিল দিন দিন।

কিন্তু কুরাইশ ছিল নিরাপদ,
সম্মানিত ছিল তাদের নাম,
পথের দস্যু, শত্রু, আক্রমণ
সবই যেন হতো অবসান।

কার কৃপায় এই নিরাপত্তা?
কার ছায়ায় এই মর্যাদা?
একজনই দিয়েছেন সব
মহান আল্লাহ, সৃষ্টির দাতা।

তিনি ভয়কে শান্তিতে বদলান,
তিনি অস্থিরতায় দেন স্থিরতা,
তিনি দুর্বলকে শক্তি দেন,
তিনি আঁধারে জ্বালেন দীপ্ততা।

তাই কুরআনের অমর ডাক
ইবাদত করো সেই রবের,”
যিনি দিয়েছেন সকল নিয়ামত
করুণাধারার অপরূপ ঢেউয়ের।

না মূর্তির কাছে, না মানুষের কাছে,
না ধনসম্পদের অহংকারে,
নত হও কেবল সেই মহান রবের
সত্যের উজ্জ্বল দ্বারে।

ইবাদত শুধু নামাজ নয়,
ইবাদত কৃতজ্ঞতার ভাষা,
ইবাদত হলো সত্যের পথে
জীবন গড়ার পবিত্র আশা।

ইবাদত হলো ন্যায়কে ধরা,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো,
মানবতার কল্যাণে নিজেকে
সতত নিবেদন করা।

ইবাদত হলো হৃদয় ভরে
প্রভুর প্রতি ভালোবাসা,
প্রতিটি কাজে তাঁর সন্তুষ্টি
খোঁজার মহান প্রত্যাশা।

আজও মানুষ কুরাইশের মতো
পায় অগণিত অনুগ্রহ,
তবু কত সহজে ভুলে যায়
রবের প্রতি কৃতজ্ঞতার পথ।

আমরা পাই খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান,
পাই পরিবার, শিক্ষা, জ্ঞান,
পাই নিরাপত্তা, স্বপ্ন, আশা
সবই তো প্রভুর মহাদান।

তবু কতবার ভুলে যাই আমরা
সেই দানের প্রকৃত উৎ,
নিয়ামতের মাঝে থেকেও করি
অকৃতজ্ঞতার দুঃখজনক স্পর্শ।

কুরাইশের ইতিহাস তাই
শুধু অতীতের গল্প নয়,
প্রতিটি যুগের প্রতিটি মানুষের
জন্য এক জাগরণময় বাণী হয়।

হে আমাদের প্রতিপালক,
তুমি সকল নিয়ামতের দাতা,
তোমারই রহমতে জীবন ভরে,
তুমিই সকল আশার বারতা।

ক্ষুধায় তুমি আহার দাও,
ভয়ে তুমি নিরাপত্তা,
অন্ধকারে তুমি আলো জ্বালাও,
বিপদে তুমি একমাত্র ভরসা।

তাই আমরা নত হই তোমার কাছে,
তোমারই করি ইবাদত,
তোমারই পথে জীবন গড়ি,
তোমারই সন্তুষ্টি হোক সাধ্য।

যতদিন সূর্য আলো ছড়াবে,
যতদিন চাঁদ উঠবে আকাশে,
ততদিন ধ্বনিত হোক আহ্বান

ইবাদত করো সেই মহান রবের,
যিনি ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন,
আর ভয় থেকে নিরাপদ করেছেন।

এই বাণী চিরন্তন সত্য,
এই বাণী মানবতার জয়গান,
এই বাণী কৃতজ্ঞ হৃদয়ের শপথ,
এই বাণী ঈমানের মহাসংগীত মহান।

***

মানুষ বড়ই বিস্মৃত প্রাণ,
পেলে নেয়, ভুলে যায় দান,
সুখের ছায়ায় বসে থেকে
ভুলে যায় কৃতজ্ঞতার গান।

যে বাতাসে প্রাণ জাগে,
যে সূর্য আলো ঢালে,
যে বৃষ্টিধারা শস্য ফলে
সবুজ স্বপ্নের ডালে

কত সহজে মানুষ ভাবে,
তো আমার প্রাপ্য ছিল!
কত সহজে ভুলে যায় সে,
কার কৃপাতে জীবন মিলল।

তাই তো নামে আসমান হতে
সতর্কতার মহাবাণী
হে মানব! স্মরণ করো,
কার হাতে তোমার জীবনের টানি।

বিস্তীর্ণ মরুর নিঃসঙ্গ বুকে,
শুষ্ক বালুর অশেষ ঢেউ,
দিগন্তজোড়া নির্জন প্রান্তর,
উত্তপ্ত রবি, দহন বায়ু বয়ে।

না ছিল নদী, না ছিল বন,
না ছিল শস্যের প্রাচুর্য,
তবু সেখানে জেগে উঠল
ইতিহাসের এক মহাসৌরভ।

সে নগরীর নাম মক্কা,
সে নগরীর বুকে এক ঘর,
যার দিকে চেয়ে যুগে যুগে
নত হয়েছে কোটি অন্তর।

সে ঘর শুধু ইটের দেয়াল নয়,
নয় কেবল পাথরের স্তূপ,
সে ঘর সত্যের দীপশিখা,
ঈমানের অনন্ত রূপ।

বিচ্ছিন্ন ছিল আরবভূমি,
গোত্রে গোত্রে বিভক্ত জন,
ক্ষমতার নেশায় অন্ধ সবাই,
চলত প্রতিশোধের আয়োজন।

কুরাইশও ছিল তাদের মতো,
একটি ক্ষুদ্র মানবগোষ্ঠী,
ছিল না রাজ্য, ছিল না সেনা,
ছিল না ক্ষমতার বৃহৎ সৃষ্টি।

কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন
তারা পেল এক বিরল মান,
কা'বার সেবার পবিত্র দায়িত্ব
করল তাদের সম্মানিত মহান।

ঘরের পাশে বসতি গড়ে
একত্র হলো তাদের প্রাণ,
ছড়িয়ে পড়ল সুনাম তাদের
সমগ্র আরবের প্রতিটি স্থান।

মানুষ বলল ওরা তো সেবক
আল্লাহর পবিত্র ঘরের,
ওদের প্রতি অসম্মান মানে
অসম্মান করা ঘরের রবের।

শীতের দিনে ইয়েমেনমুখী,
গ্রীষ্মে সিরিয়ার পথে,
উটের পিঠে পণ্য বোঝাই
চলত তারা শত রথে।

পাহাড় পেরিয়ে, মরু পেরিয়ে,
দূর দিগন্তের দেশে,
ব্যবসার ডাকে যেত কাফেলা
আশার প্রদীপ মেখে।

কোথাও ডাকাত, কোথাও যুদ্ধ,
কোথাও শত্রুর ভয়,
তবু কুরাইশের কাফেলাগুলো
নিরাপদে ফিরত সদাই।

নিরাপত্তা কোথা হতে?
কার রহমতের ফল?
কার করুণায় খুলে গেল
সমৃদ্ধির অগণিত পথচল?

হঠাৎ একদিন কালো মেঘের
মতো এলো ভয়ংকর দল,
আবরাহার বিশাল বাহিনী,
হাতির পিঠে যুদ্ধজ্বল।

অহংকারে তারা বলল
ভেঙে দেব কা'বার দেয়াল,
আজকে মুছে যাবে ঘরের
হাজার বছরের গৌরবকাল।

মক্কাবাসী কাঁদল তখন,
কোথায় তাদের যুদ্ধশক্তি?
অস্ত্র নেই, নেই সেনাবাহিনী,
আছে কেবল প্রভুর ভক্তি।

তারা গেল সেই রবের কাছে,
যিনি ঘরের অধিপতি,
আরশ হতে নেমে এল তখন
কুদরতের এক মহাশক্তি।

আকাশজুড়ে পাখির ঝাঁক,
ঠোঁটে বহন করে পাথর,
মুহূর্তে ভেঙে দিল তারা
অহংকারের লৌহদ্বার।

পড়ে রইল শক্তির গর্ব,
ধূলির মতো পথে,
বিশ্ব দেখল মহান আল্লাহ
কীভাবে রক্ষা করেন নিজ ঘরকে।

ক্ষুধা যখন হৃদয় পোড়ায়,
স্বপ্নগুলো যায় মরে,
অন্নহীন শিশুর কান্না
আকাশ বাতাস কাঁপায় ঘরে।

মরুর দেশে শস্য কোথায়?
কোথায় নদীর কলতান?
তবু কুরাইশ পেয়েছিল
রিজিকের অফুরন্ত দান।

দূর দেশ হতে আসত খাদ্য,
আসত ফলের সম্ভার,
আল্লাহর দয়া ছড়িয়ে দিত
বরকতের অশেষ ধার।

যে রব ক্ষুধিতকে খাওয়ান,
শূন্য হাতে দেন সম্বল,
তাঁর কৃপা ছাড়া কি কখনো
পূর্ণ হয় জীবনের ফল?

ভয় মানুষের পুরোনো সাথী,
রাত্রির মতো ঘন,
কখন আসে বিপদের ঝড়
কেউ জানে না কোনোক্ষণ।

আরবভূমি ছিল অশান্ত,
যুদ্ধ ছিল নিত্যকার,
তবু কুরাইশ নিরাপদ ছিল
আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহধার।

যে পথে অন্যরা শঙ্কিত,
সে পথে তারা নির্ভয়,
রবের দেওয়া নিরাপত্তা
ছিল তাদের সবচেয়ে বড় জয়।

তাই তো নেমে এলো ঘোষণা,
চিরসত্যের অমর বাণী

অতএব ইবাদত করো
ঘরের মহান রবকেই।

যিনি দিয়েছেন সম্মান তোমায়,
দিয়েছেন জীবিকার পথ,
দিয়েছেন নিরাপদ জীবন,
দিয়েছেন কল্যাণের রথ।

যিনি ক্ষুধাকে বদলেছেন
প্রাচুর্যের আনন্দে,
যিনি ভয়কে রূপান্তর করেছেন
শান্তির স্নিগ্ধ ছন্দে।

তাঁকেই সিজদা, তাঁকেই ভালোবাসা,
তাঁকেই হৃদয়ের স্থান,
তাঁকেই মানা জীবনের লক্ষ্য,
তাঁকেই উৎসর্গ প্রাণ।

আজও আমরা কুরাইশের মতো
অগণিত নিয়ামতে ঘেরা,
তবু কতবার ভুলে যাই
রবের দয়ার সোনালি ধারা।

আমাদের ঘরে অন্ন আছে,
মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ,
প্রতিদিন জেগে ওঠে সূর্য,
প্রতিদিন পাই জীবনের স্বাদ।

তবু কি আমরা স্মরণ করি
সেই মহান দয়াময় রবকে?
যিনি অনন্ত করুণায়
ঘিরে রেখেছেন আমাদের সবকে?

এসো তবে কৃতজ্ঞ হই,
নত করি হৃদয়ের দ্বার,
কা'বার রব, জগতের রব,
তোমারই করি ইবাদত বারবার।

যতদিন সূর্য আলো ছড়াবে,
যতদিন চাঁদ উঠবে নভে,
ততদিন ধ্বনিত হোক আহ্বান

ইবাদত করো সেই মহান রবের,
যিনি ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন,
আর ভয় থেকে নিরাপদ করেছেন।

এই বাণী শুধু কুরাইশের নয়,
সমস্ত মানবজাতির তরে;
কৃতজ্ঞতা, তাওহীদ আনুগত্যের
চিরন্তন আলোকশিখা হয়ে রবে।

***

হে কুরাইশ! স্মরণ করো আজ,
কোথা ছিল তোমাদের স্থান?
কোথা ছিল সে মর্যাদা,
কোথা ছিল সম্মানের গান?

বিক্ষিপ্ত ছিলে মরুর বুকে,
গোত্রে গোত্রে বিভক্ত প্রাণ,
নেই কোনো রাজ্য, নেই কোনো শক্তি,
নেই কোনো গৌরবের নিশান।

তারপর আল্লাহ দান করলেন
তোমাদের মাঝে পবিত্র ঘর,
তাওহীদের সে চিরপ্রতীক,
যার রব এক, মহান রব।

কা'বার ছায়ায় মিলল তোমরা,
এক পতাকার নিচে এসে,
বিভেদের দেয়াল ভেঙে গেল
ঐক্যের আলোকরশ্মি মেখে।

ঘরের জন্য এলো সম্মান,
ঘরের জন্য এলো মান,
ঘরের জন্য উন্মুক্ত হলো
ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিশাল স্থান।

যে পথে ডাকাত ত্রাস ছড়াত,
যে পথে ঝরত রক্তধারা,
সে পথে তোমাদের কাফেলা চলত
নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে, সারা।

কি তোমাদের শক্তির ফল?
কি কেবল বুদ্ধির জয়?
না, ছিল মহান রবের দান,
যিনি দূর করেছেন সকল ভয়।

তাই তো কুরআনের আহ্বান আসে
ভুলে যেও না দাতার নাম,
নিয়ামতের পেছনে যিনি আছেন,
তাঁরই হোক সকল সালাম।

হে মানুষ! নিয়ামত দেখে
যদি ভুলে যাও দয়াময়কে,
তবে শুকিয়ে যাবে হৃদয়ভূমি
অকৃতজ্ঞতার অন্ধ শোকে।

নদী যদি উৎ ভুলে যায়,
শুকিয়ে যাবে তারই ধারা,
মানুষ যদি রবকে ভুলে,
হারাবে জীবনের দিশাহারা।

তাই এসো সবাই কৃতজ্ঞ হই,
নত করি অহংকারের শির,
যিনি আকাশ করলেন উচ্চ,
যিনি করলেন ধরাকে স্থির।

যিনি মরুকে করলেন নিরাপদ,
যিনি ক্ষুধাকে করলেন দূর,
যিনি দুর্বলকে শক্তি দিলেন,
যিনি সত্যকে করলেন নূর।

তাঁরই ইবাদত হোক জীবনের
প্রথম কথা, শেষের গান,
তাঁরই সন্তুষ্টি হোক লক্ষ্য,
তাঁরই পথে উৎসর্গ প্রাণ।

কা'বার রব, জগতের রব,
সকল নিয়ামতের আধার,
তাঁরই নামে জাগুক ধরণী,
তাঁরই নামে হোক উদ্ভাসিত সংসার।

যতদিন বয়ে যাবে বাতাস,
যতদিন উঠবে রবি,
ততদিন ধ্বনিত হোক বাণী
আল্লাহই সকল দানের অধিপতি।

ক্ষুধার মাঝে যিনি আহার,
ভয়ের মাঝে যিনি আশ্রয়,
সকল প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য,
তাঁরই ইবাদতে মুক্তির জয়।

শিক্ষা কেবল কুরাইশের নয়,
শিক্ষা সকল যুগের তরে,
কৃতজ্ঞতা, তাওহীদ আনুগত্যের
অমর প্রদীপ হয়ে জ্বলে।

***

যে পেয়েছে সম্মানের মুকুট,
সে কি ভেবেছে কতবার?
কোথা হতে মর্যাদা এলো,
কে খুলেছে সৌভাগ্যের দ্বার?

যে পেয়েছে নিরাপদ পথ,
যার কাফেলা ফিরেছে ঘরে,
সে কি কখনো ভেবেছে বসে
কোন শক্তি ছিল অন্তরে?

শুধু কি তার নিজের বুদ্ধি,
শুধু কি তার নিজের জ্ঞান?
শুধু কি তার কৌশল-মেধা
এনেছে সফলতার দান?

না, সফলতার পেছনেও থাকে
অদৃশ্য এক মহাশক্তি,
যাঁর ইচ্ছাতে ফুল ফোটে,
যাঁর ইচ্ছাতে জাগে ভক্তি।

যাঁর হুকুমে সূর্য ওঠে,
যাঁর হুকুমে নামে রাত,
যাঁর হুকুমে সমুদ্র গর্জে,
যাঁর হুকুমে শান্ত প্রভাত।

হে কুরাইশ! তোমরা দেখো,
কত নিয়ামত ঘিরে রয়,
শীতের সফর, গ্রীষ্মের যাত্রা,
প্রতিটি পথে নিরাপদ জয়।

যে মরুভূমি ছিল ভয়ের,
যেখানে ছিল মৃত্যুর ছায়া,
সেই পথেই তোমাদের কাফেলা
ফিরে এসেছে আশার মায়া।

যে জাতি ছিল বিক্ষিপ্ত আগে,
ছিল না কোনো বিশেষ মান,
আজ তাদের নাম উচ্চারিত
সম্মানের সাথে প্রতিক্ষণ।

কি কেবল কালের খেলা?
কি শুধু ভাগ্যের দান?
না, এর পেছনে ছিল সদা
রহমতের মহান আহ্বান।

কা'বার পাশে যারা রইল,
কা'বার সেবায় হলো ধন্য,
আল্লাহ তাদের দিলেন মর্যাদা,
করলেন সবার মাঝে গণ্য।

তাই তো কুরআনের আহ্বান
অতল সত্যের মতো গভীর
ভুলো না তোমার রবকে,
ভুলো না তাঁর অনুগ্রহ-নদীর।

কারণ মানুষ যখন পায়,
তখন ভুলে যায় পাওয়ার কথা,
অভ্যাস যখন নিয়ামত ঢাকে,
মুছে যায় কৃতজ্ঞতার ব্যথা।

কিন্তু মুমিনের হৃদয় জাগে
নিয়ামতের অন্তরালে,
সে খুঁজে নেয় দাতার চিহ্ন
প্রতিটি সুখের জোয়ারে-ভাটায়।

সে জানে অন্নের পেছনে আছেন
রিজিকদাতা মহান রব,
নিরাপত্তার পেছনে আছেন
সকল শক্তির মহাসূত্রধর।

তাই সে নত হয় বিনম্র চিত্তে,
তাই সে কৃতজ্ঞ প্রাণ,
তাই সে বলে হে প্রতিপালক,
তুমিই সকল দানের প্রাণ।

ইবাদত শুধু ঠোঁটের বুলি নয়,
শুধু আনুষ্ঠানিক আচরণ নয়,
ইবাদত হলো অন্তর জাগরণ,
সত্যের পথে অবিচল জয়।

ইবাদত মানে বিশ্বাস রাখা
ঝড়ের মাঝেও রবের ওপর,
ইবাদত মানে ভরসা করা
অন্ধকারেও তাঁরই নূরের ওপর।

ইবাদত মানে সত্য বলা,
যদিও তাতে ক্ষতি আসে,
ইবাদত মানে ন্যায়কে ধরা,
যদিও সবাই বিপরীতে ভাসে।

ইবাদত মানে মানুষের মাঝে
কল্যাণের আলো ছড়ানো,
অসহায়ের মুখে হাসি ফোটানো,
দুঃখীর পাশে দাঁড়ানো।

ইবাদত মানে কৃতজ্ঞ থাকা
প্রতিটি ক্ষুদ্র অনুগ্রহে,
ইবাদত মানে রবকে দেখা
জীবনের প্রতিটি প্রহরে।

যে হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা নেই,
সে হৃদয় শুষ্ক মরুভূমি,
যেখানে ফোটে না ভালোবাসা,
জাগে না ঈমানের ভূমি।

কিন্তু যে হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা আছে,
সেখানে শান্তির ফুল,
সেখানে আলোর দীপ জ্বলে,
সেখানে সত্য অমলিন কূল।

কুরাইশ আজ ইতিহাসের পাতা,
কিন্তু শিক্ষা আজও জীবন্ত,
মানুষ বদলায়, যুগ বদলায়,
সত্যের বাণী থাকে অনন্ত।

আজও মানুষ রিজিক পায়,
আজও পায় নিরাপদ ঘর,
আজও সূর্য আলো বিলায়,
আজও দয়াময় সেই রব।

আজও শিশুর হাসি ফোটে,
আজও শস্যে ভরে মাঠ,
আজও বৃষ্টি নামে নীরবে,
আজও জাগে সোনার প্রভাত।

তাই এসো আমরা স্মরণ করি
সকল নিয়ামতের উৎ,
অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা হোক
জীবনের শ্রেষ্ঠ স্পর্শ।

নত হোক প্রাণ এক আল্লাহর তরে,
নম্র হোক অন্তরখানি,
যিনি ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন,
ভয়ের মাঝে দিয়েছেন নিরাপদ বাণী।

যতদিন আকাশ থাকবে নীল,
যতদিন সাগরে উঠবে জোয়ার,
ততদিন ধ্বনিত হোক আহ্বান

অতএব তারা ইবাদত করুক
এই ঘরের রবেরই,
যিনি তাদের ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন
এবং ভয় থেকে নিরাপদ করেছেন।

এই বাণী শুধু কুরাইশের নয়,
প্রতিটি যুগের প্রতিটি প্রাণের,
এই বাণী কৃতজ্ঞতার দীপশিখা,
এই বাণী তাওহীদের জয়গানের।

এই বাণী মানবতার পথপ্রদীপ,
এই বাণী মুক্তির দিশা,
এই বাণী হৃদয়ের গভীর থেকে
উঠে আসা চিরন্তন প্রার্থনা।

মন্তব্য করুন

ব্লগ