Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৯ জুন, ২০২৬ ০৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ

কে শোনে শিক্ষকদের আর্তনাদ

"আরেহ! আপনাদের তো দারুণ জীবন! দিনে মাত্র দুই-একটা ক্লাস নেন, বাকি সময় তো আরাম আর ছুটি!"


​চাকরি জীবনে বা আড্ডায় এই কথাটা শোনেননি, এমন শিক্ষক হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না। বাইরে থেকে দেখলে আসলেই মনে হয়—শিক্ষকতা মানেই ডেস্কে বসে থাকা, কয়েকটা ক্লাস নেওয়া, আর বছরের অর্ধেক সময় ছুটি কাটানো।


​কিন্তু পর্দার পেছনের আসল সত্যিটা কতটা নির্মম, তা কদিন আগে সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার কথা শুনে আরও ভালো করে উপলব্ধি করলাম। উনি বলছিলেন: "আমার মা শিক্ষক ছিলেন, আমি জানি শিক্ষকতার কী প্যারা! ঠিক টাইমে উপস্থিত থাকতেই হবে। একটা ছুটি নিলে কত সমস্যা, ক্লাস কে নেবে? এমনিতেই শিক্ষার্থীদের সামলানো, সিলেবাস শেষ করা, পড়া আদায় করা—কত ঝামেলা! তার ওপর অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান প্রধান, শিক্ষা কর্মকর্তা... সব দিক থেকে চাপ। এসব দেখেই আমার আর শিক্ষকতা করার ইচ্ছে হয়নি। অন্য সেক্টরে চলে এসেছি। আলহামদুলিল্লাহ, এখানে অন্তত ওই লেভেলের মানসিক চাপটা নেই।"


​একজন অন্য পেশার মানুষ যখন শিক্ষকতার এই অদৃশ্য চাকার নিচে পিষ্ট হওয়ার গল্পটা বোঝেন, তখন আমাদের মতো যারা প্রতিদিন এই খাতার পাতা আর চক-ডাস্টারের পেছনে নিঃশব্দে ক্ষয় হচ্ছেন, তাদের ভেতরের রক্তক্ষরণটা ঠিক কতটা তীব্র?


​একটা ৪৫ মিনিটের ক্লাস নেওয়ার পেছনে একজন শিক্ষককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা করতে হয়, লেকচার প্ল্যান সাজাতে হয়। ক্লাস শেষ মানেই কিন্তু কাজ শেষ নয়, শত শত শিক্ষার্থীর খাতা মূল্যায়নের পেছনে চলে যায় রাতের পর রাত।

কোনো শিক্ষার্থী কেন ক্লাসে আসছে না, কেন ঝরে পড়ছে—তা জানতে শিক্ষকরা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি ছোটেন, অভিভাবকের সাথে কাউন্সেলিং করেন।

ম্যানেজিং কমিটি, অর্থ কমিটি, সাংস্কৃতিক কমিটি, ক্রীড়া কমিটি, শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি—একটা স্কুল চালাতে যত রকমের প্রশাসনিক ও কাঠামোগত কমিটি লাগে, তার প্রতিটার কাজের মূল বোঝা এই শিক্ষকদের কাঁধেই থাকে।


জাতীয় দিবস, নির্বাচন, আদমশুমারি, ভোটার তালিকা প্রণয়ন থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন জাতীয় কর্মসূচি সফল করার মূল চালিকাশক্তি কিন্তু এই শিক্ষকরাই। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মাঠপর্যায়ের এই কাজগুলো তারা হাসিমুখে সামলান।


​শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো বিরোধ হলে, যেকোনো শালিস-বিচারে শিক্ষকদের ডাক পড়বেই। নিরপেক্ষ বিচারক হিসেবে সেই গুরুদায়িত্বও তাদের মাথা পেতে নিতে হয়।


​প্রতিষ্ঠান প্রধানের তাগিদ, ঊর্ধ্বতনের ফাইলের চাপ, আর সবশেষে কিছু কিছু অভিভাবকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রতিনিয়ত নিজের যোগ্যতার পরীক্ষা দেওয়া। ক্লাসের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া ছাত্রটিকে টেনে তোলার মানসিক শ্রমের কোনো 'ওভারটাইম' বা আলাদা পারিশ্রমিক হয় না।


​শিক্ষকতা ৯টা-৫টার সাধারণ ডে-জব মনে হয় আসলে এটা ২৪ ঘণ্টার এক সামাজিক ও মানসিক দায়িত্ব। শারীরিক ক্লান্তি তো এক রাতের ঘুমে দূর করা যায়, কিন্তু প্রতিদিনের এই যে বহুমুখী মানসিক টানাপোড়েন—তা একজন শিক্ষকের ভেতরটাকে একটু একটু করে ফাঁপা করে দেয়।


​ভাগ্যের লিখন কে জানে! নিজের জীবনের সোনালী সময়গুলো এই খাতার পাতাতেই বিলিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু চারপাশের এই অবমূল্যায়ন আর অন্তহীন মানসিক চাপের দেওয়াল দেখে আজ খুব দ্বিধাহীনভাবেই বলতে ইচ্ছে করে—আমি অন্তত আমার উত্তরসূরিদের এই পেশায় আসার জন্য আর কোনোদিন উৎসাহ দেবো না। কিছু কিছু নীরব আত্মত্যাগ শুধু এক প্রজন্মের পিঠেই চড়ে যাক!


​তাই পরের বার কোনো শিক্ষককে দেখে "খুব তো আরামে আছেন" বলার আগে একটু ভাববেন—তারা শুধু দু-একটা ক্লাস নেন না, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রকে সচল রাখার এক একজন নিঃশব্দ কারিগর।


​শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পৃথিবীর সকল শিক্ষকদের প্রতি। ❤️


সংগ্রহ 

মন্তব্য করুন

ব্লগ