সহকারী অধ্যাপক
১৯ জুন, ২০২৬ ০৬:০৯ পূর্বাহ্ণ
প্রশান্ত আত্মা ----মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
প্রশান্ত আত্মার আহ্বান
(সূরা আল-ফজরের শেষ আয়াতসমূহ ও সৎসঙ্গের মহিমার আলোকে )
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
জীবনের পথে কতই না মানুষ
স্বপ্ন বুনে দিনরাত,
কেউ খোঁজে ধন, কেউ খোঁজে ক্ষমতা,
কেউ খোঁজে সম্মানের প্রভাত।
কিন্তু সব কিছুর শেষে এসে
যখন থেমে যাবে প্রাণ,
তখন কিসে হবে প্রকৃত সাফল্য,
কিসে মিলবে মুক্তির জ্ঞান?
সেদিন ধন থাকবে না পাশে,
থাকবে না কোনো বাহন,
থাকবে শুধু আমলনামা
আর রবের মহান বিচারক্ষণ।
সেই দিনের জন্য যারা গড়েছে
ঈমান, আমল, চরিত্রখানি,
তাদের জন্য অপেক্ষা করে
রহমতের অফুরন্ত বাণী।
সেদিন বলা হবে ভালোবাসায়—
"হে প্রশান্ত আত্মা, এসো!
ফিরে এসো তোমার প্রভুর কাছে,
সব ভয়-দুঃখ পেছনে ফেলে বসো।
তুমি ছিলে তাঁর সন্তুষ্ট বান্দা,
তিনি তোমাতে সন্তুষ্ট আজ,
তোমার জন্য খুলে গেছে
অনন্ত করুণার দুয়ারসাজ।
এসো তুমি আমার বান্দাদের মাঝে,
এসো প্রিয়জনের সারি,
এসো তুমি জান্নাতের পথে,
শেষ হলো দুঃখের ভারী।"
কী অপূর্ব সে সম্মান হবে,
কী মহিমান্বিত সেই ডাক!
যার জন্য যুগে যুগে মুমিনেরা
অশ্রু ঝরিয়েছে অগণিত পাক।
লক্ষ করো গভীর রহস্য—
প্রথমে জান্নাতের কথা নয়,
আগে বলা হয়, "আমার বান্দাদের মাঝে এসো",
এ নির্দেশের তুলনা কই?
অর্থ যেন এমনই বলে—
"হে আমার প্রিয়জন, শোনো,
যাদের আমি ভালোবেসেছি,
প্রথমে তাদের দলে হও।"
তারপর আসে জান্নাতের ডাক,
তারপর আসে সুখের দেশ,
সৎ বান্দাদের সঙ্গ ছাড়া
পূর্ণ হয় না মুক্তির রেশ।
এ যেন শিক্ষা মানবজাতির,
যুগে যুগে অমলিন বাণী—
সৎসঙ্গ ছাড়া পূর্ণ হয় না
আত্মার প্রকৃত কল্যাণখানি।
সুলাইমান, জ্ঞানের অধিপতি,
রাজ্য যার ছিল অপরূপ,
সেও করেছিলেন বিনয়ভরে
রবের দরবারে নিবেদিত রূপ—
"হে প্রভু আমার! আপনার রহমতে
আমায় করুন সেই দলে স্থান,
যারা আপনার সৎকর্মপরায়ণ
নির্বাচিত বান্দার সম্মান।"
ইউসুফ, সৌন্দর্য ও ধৈর্যের প্রতীক,
যিনি ছিলেন মহিমান্বিত,
সেও চেয়েছিলেন সৎজনের সঙ্গ,
সেই কামনা ছিল অবিচলিত।
তিনি বলেছিলেন আকুল কণ্ঠে—
"আমায় সৎজনদের সাথে মিলাও,"
জীবনের শেষে আলোর পথে
তাদের সাথেই নিয়ে চলো।
ইবরাহীম, খলিলুল্লাহ মহান,
তাওহীদের দীপ্তিমান শিখা,
সেও করেছিলেন হৃদয় খুলে
একই প্রার্থনা নির্ভীক দেখা—
"আমায় দাও প্রজ্ঞা ও হিকমাহ,
সত্যের পথে রাখো স্থির,
আর আমাকে সৎকর্মশীলদের সাথে
মিলিয়ে দাও, হে মহাধীর।"
যে পথে চলে সৎ মানুষেরা,
সে পথ আলোকিত হয়,
সেখানে সত্যের সুবাস ভাসে,
সেখানে কল্যাণময় জয়।
সৎজন যেন দীপশিখা,
অন্ধকারে পথের দিশা,
তাদের পাশে থাকলে মানুষ
খুঁজে পায় জীবনের ভাষা।
তাদের কথা হৃদয় ছোঁয়,
তাদের কাজ দেয় প্রেরণা,
তাদের চরিত্র শেখায় মানুষকে
আত্মশুদ্ধির সোপানগাঁথা।
লোহার পাশে লোহা যেমন
ধীরে ধীরে নেয় রূপ,
সৎজনের পাশে থাকলে তেমনি
জাগে হৃদয়ে আলোর ধূপ।
অন্যদিকে মন্দ সঙ্গীরা
আনে হৃদয়ে কালো ছাপ,
ধীরে ধীরে নষ্ট করে
চরিত্রের পবিত্র মাপ।
প্রথমে আসে ছোট বিচ্যুতি,
পরে বাড়ে পাপের ঢেউ,
একসময় সত্যের পথটি
চোখে আর খুঁজে পায় না কেউ।
বন্ধুর নামে অনেকেই দেয়
ধ্বংসের গোপন দাওয়াত,
তাই তো মুমিন খোঁজে সর্বদা
সৎজনদের সহচরিতার নৈকট্য।
এই পৃথিবী ক্ষণিকের মুসাফিরখানা,
স্থায়ী নয় কোনো ঠিকানা,
আজ যে আছে, কাল সে যাবে,
এটাই তো জীবনের গাথা।
তাই চলার পথে বেছে নিতে হয়
কার সাথে কাটবে সময়,
কারা হবে হৃদয়ের সাথি,
কারা সত্যের পথের পরিচয়।
যাদের মনে আল্লাহর স্মরণ,
যাদের মুখে কল্যাণের বাণী,
যাদের কাজে ফুটে ওঠে
সুন্দর জীবনের গল্পখানি—
তাদের সাথেই গড়ো সম্পর্ক,
তাদের সাথেই কাটাও ক্ষণ,
তাদের ছায়ায় ফুটে উঠবে
তোমার আত্মার প্রস্ফুটন।
প্রশান্ত আত্মা সে তো নয়
যার কাছে কেবল ধন,
বরং সে, যে রবের স্মরণে
খুঁজে পায় জীবনের মন।
বিপদে ধৈর্য, সুখে কৃতজ্ঞ,
পাপে যার অন্তর কাঁদে,
মানুষকে ভালোবাসে সদা,
সত্যের পতাকা হাতে বাঁধে।
সে জানে জীবন পরীক্ষাক্ষেত্র,
সে জানে সবই ক্ষণস্থায়ী,
তাই তো সে রবের সন্তুষ্টিতে
রাখে হৃদয় সদা নিবেদিতই।
একদিন উঠবে মহাসমাবেশ,
মানুষ আসবে দলে দলে,
কারও মুখ উজ্জ্বল নূরের আলোয়,
কারও হৃদয় ভয়ের ছলে।
সেদিন সৎজনেরা একত্র হবে
রহমতের ছায়াতলে,
তাদের সামনে খুলে যাবে
জান্নাতের দ্বার অবহেলে।
ফেরেশতারা বলবে হেসে—
"শান্তি তোমাদের উপর বর্ষিত হোক,"
তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছিলে,
আজ সুখের নদী বহুক।
সেই কাফেলায় থাকতে পারা
হবে সর্বশ্রেষ্ঠ জয়,
যেখানে নবী, শহীদ, সিদ্দীক,
সালেহীনদের সঙ্গময়।
হে পরম দয়াময় আল্লাহ!
আমাদের অন্তর করো পবিত্র,
অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ মুছে
করো জীবন আলোকচিত্র।
সৎজনদের ভালোবাসার
মহান তাওফীক দাও,
তাদের পথের অনুসারী করে
কল্যাণের পথে চিরদিন নাও।
যখন শেষ হবে জীবনের সফর,
থামবে পৃথিবীর সব আয়োজন,
তখন আমরাও শুনতে চাই
সেই মহিমান্বিত সম্বোধন—
"হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে এসো,
তোমার রবের সন্তুষ্টি নিয়ে;
আমার বান্দাদের মধ্যে শামিল হও,
আমার জান্নাতে প্রবেশ করো প্রিয়ে।"
সেই ডাক হোক জীবনের লক্ষ্য,
সেই ডাক হোক হৃদয়ের গান,
সৎজনদের সঙ্গ লাভ করে
পাই যেন জান্নাতের সম্মান।
***
সৎসঙ্গের মহিমা
যারা ছিলেন নবুয়তের দীপ,
মানবতার পথপ্রদর্শক,
যাদের বুকে ওহীর আলো,
সত্যের পতাকা চিরউজ্জ্বলক—
তারাও কিন্তু চেয়েছিলেন সদা
সালেহ বান্দার পবিত্র সঙ্গ,
কারণ সৎসঙ্গ স্বর্গের সুবাস,
আত্মার মুক্তির চিরন্তন রং।
রাজসিংহাসনে বসেও সুলাইমান
ভুলেননি এ সত্যবাণী,
ক্ষমতা, জ্ঞান আর ঐশ্বর্য পেয়েও
চেয়েছেন নেককারের সাথখানি।
তিনি বলেন—
“হে দয়াময়! আপনার রহমতে
আমায় দিন সে মহাসম্মান,
আপনার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের
কাতারে হোক আমার স্থান।”
ইউসুফ নবী, ধৈর্যের প্রতিমা,
সৌন্দর্যের দীপ্তিমান ফুল,
দুঃখের সাগর পাড়ি দিয়েও
রাখেননি হৃদয়কে ভুল।
ক্ষমতার শিখরে পৌঁছে গিয়েও
ছিল তাঁর বিনীত আকুলতা—
“হে রব! আমায় মিলিয়ে দিও
সৎজনদের পবিত্রতা।”
ইবরাহীম, তাওহীদের মহান সূর্য,
যিনি ভেঙেছেন শিরকের প্রাচীর,
তিনিও চেয়েছেন সালেহদের সঙ্গ,
এ আকাঙ্ক্ষা ছিল অটল, ধীর।
তিনি প্রার্থনা করেন—
“প্রজ্ঞা দাও, হে জগতের রব,
দাও সত্যের দৃঢ় জ্ঞান,
আর আমায় মিলিয়ে দিও
সৎকর্মশীলদের মহিমান্বিত প্রাণ।”
সৎ মানুষের সান্নিধ্য যেন
শুষ্ক মরুতে বৃষ্টিধারা,
তাদের কথা হৃদয় জাগায়,
আনে আলোর দিশাহারা।
তাদের চোখে বিনয়ের দীপ্তি,
তাদের মুখে সত্যের বাণী,
তাদের জীবন নিঃশব্দ দাওয়াত,
তাদের চরিত্র অমূল্য খনি।
যে শিশু বেড়ে ওঠে তাদের মাঝে,
সে শেখে মানবতার পাঠ,
যে যুবক চলে তাদের সাথে,
সে পায় সফলতার ঘাট।
যে বৃদ্ধ রাখে তাদের সঙ্গ,
তার হৃদয় থাকে প্রশান্ত,
কারণ সৎজনের সাহচর্যে
আত্মা হয় নির্মল, কান্ত।
সৎসঙ্গ যেন সুবাসিত বাগান,
যেখানে ফুটে ঈমানের ফুল,
যেখানে ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, দয়া
প্রতিদিন করে কোলাহল ভুল।
একদিন যখন শিঙ্গা বাজবে,
কেঁপে উঠবে নভোমণ্ডল,
ভেঙে যাবে অহংকারের প্রাসাদ,
নিভে যাবে গর্বের অনল।
রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র,
সবাই দাঁড়াবে একই সারি,
কেউ খুঁজবে আশ্রয় ব্যাকুল হয়ে,
কেউ হবে ভয়ে ভারী।
সেদিন যারা সৎজনদের সাথে
চলেছিল পৃথিবীর পথে,
তারা পাবে রহমতের ছায়া
মহা বিচারের প্রভাতে।
নবী, সিদ্দীক, শহীদ, সালেহীন—
আলোর কাফেলা হবে প্রস্তুত,
তাদের মুখমণ্ডল জ্যোতিময়,
তাদের অন্তর শান্ত, সুস্ফুট।
সেই কাফেলায় ডাক পড়বে—
“এসো, তোমাদের জন্য সুসংবাদ!
আজ নেই কোনো ভয় কিংবা শোক,
আজ পূর্ণ হবে সকল সাধ।”
তারপর আসবে সে মহাক্ষণ,
যার জন্য সাধক করে অপেক্ষা,
যার জন্য অশ্রুসিক্ত রাতে
বান্দা রাখে প্রার্থনার রচনা।
করুণাময় রব ডাক দেবেন—
“হে প্রশান্ত আত্মা, এসো কাছে,
তুমি ছিলে আমার সন্তুষ্ট বান্দা,
আজ সুখের দুয়ার তোমারই মাঝে।
ফিরে এসো তুমি শান্ত হৃদয়ে,
সন্তুষ্টচিত্তে, সম্মান নিয়ে,
আমার প্রিয় বান্দাদের সাথে
চিরকল্যাণের পথে গিয়ে।
আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও,
তাদের সাথে মিলাও প্রাণ,
আর প্রবেশ করো আমার জান্নাতে—
যেখানে অনন্ত শান্তির স্থান।”
হে আল্লাহ! আমাদের জীবন হোক
সৎজনদের ভালোবাসায় ভরা,
তাদের চরিত্র হোক আমাদের পথ,
তাদের আদর্শ হোক ধ্রুবতারা।
যেন আমরা ধন নয়, মান নয়,
খুঁজি আপনার সন্তুষ্টি,
যেন আমরা অহংকার নয়,
বেছে নিই বিনয় ও পবিত্রতা।
যখন শেষ হবে জীবনের যাত্রা,
বন্ধ হবে পৃথিবীর দ্বার,
তখন আমরাও শুনতে চাই
সেই অনন্ত সুখের আহ্বান অপার—
“হে প্রশান্ত আত্মা!
ফিরে এসো তোমার রবের প্রতি,
সন্তুষ্টচিত্তে, সন্তোষভাজন হয়ে;
আমার বান্দাদের মধ্যে শামিল হও,
আর প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।”
সেই ডাক হোক জীবনের লক্ষ্য,
সেই ডাক হোক হৃদয়ের গান,
সালেহীনদের সঙ্গ লাভ করে
পাই যেন চিরজীবনের সম্মান।
আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।
মানবজীবন নদীর মতো,
বহমান তার গতি,
কখনো সুখের সবুজ তীরে,
কখনো দুঃখের স্মৃতি।
কেউ হারিয়ে যায় মোহের ঘোরে,
কেউ খুঁজে নেয় সত্যের পথ,
কেউ আঁধারে গড়ে আপন ঘর,
কেউ আলোর সাথে করে রত।
যারা বেছে নেয় সৎজনদের,
তাদের জীবন হয় আলোকিত,
তাদের হৃদয়ে জাগে এমন দীপ,
যা থাকে চিরপ্রজ্বলিত।
সালেহীনরা চলমান কুরআন,
চরিত্রে সত্যের ব্যাখ্যা,
তাদের জীবন শেখায় মানুষকে
ধৈর্য, দয়া, ন্যায়ের শিক্ষা।
তাদের কাছে বসলে মনে হয়,
নেমে এসেছে শান্তির নীল,
অশান্ত হৃদয় ফিরে পায়
প্রশান্তির নির্মল ঝিল।
তাদের চোখে থাকে বিনয়,
কথায় থাকে মধুরতা,
কর্মে থাকে নিষ্ঠার ছাপ,
হৃদয়ে থাকে পবিত্রতা।
তারা কারও প্রতি ঘৃণা পোষে না,
অহংকারে হয় না মত্ত,
তারা জানে—মানুষের গৌরব
রবের নিকট আনুগত্য।
এই জন্যই নবীগণও
চেয়েছেন তাদের সান্নিধ্য,
কারণ সৎজনের সাহচর্যে
বাড়ে ঈমানের সমৃদ্ধি।
সালেহীনদের কাফেলা যেন
আকাশভরা নক্ষত্রমালা,
যে তাদের পথ অনুসরণ করে,
সে পায় মুক্তির আলোকজ্বালা।
বন্ধুত্ব যদি গড়তেই হয়,
গড়ো তাদের সাথে প্রাণ,
যারা তোমায় রবের পথে ডাকে,
যারা জাগায় কল্যাণ।
কারণ কিয়ামতের কঠিন দিনে
ভেঙে যাবে স্বার্থের বাঁধ,
শুধু ঈমানী বন্ধুত্ব তখন
দেবে শান্তির মধুর সাধ।
সেদিন বন্ধু বন্ধুর শত্রু হবে,
স্বার্থের সব হিসাব ফুরায়,
কিন্তু আল্লাহভীরু সৎজনেরা
পরস্পরের পাশে দাঁড়ায়।
তাই হে মানুষ! আজই খুঁজে নাও
সৎজনদের পবিত্র দল,
যাদের সঙ্গ তোমাকে নিয়ে যাবে
জান্নাতের অনন্ততল।
যাদের দেখে স্মরণ জাগে
মহান রবের অশেষ দান,
যাদের কথা শুনলে হৃদয় জুড়ে
বেজে ওঠে ঈমানের গান।
কারণ মুক্তির পথ একাকী নয়,
এ শিক্ষা দিয়েছেন নবীগণ,
সালেহীনদের কাতার ধরেই
পৌঁছায় মানুষ সফল গন্তব্যে অনুক্ষণ।
হে আল্লাহ! আমাদেরও করো
সেই সৌভাগ্যের অধিকারী,
সালেহীনদের পথে চলতে চলতে
হই যেন আপনারই প্রিয়জন ভারী।
***
সৎসঙ্গের অমর আহ্বান
মানুষ একা জন্ম নিলেও
একা চলে না কোনোদিন,
পথের বাঁকে সাথি লাগে,
লাগে হৃদয়ের আপন ঋণ।
শৈশব হতে বার্ধক্য পর্যন্ত
জীবন চলে সঙ্গের টানে,
কেউ শেখায় সত্যের মহিমা,
কেউ ডাকে বিভ্রান্ত গানে।
তাই তো সঙ্গের প্রশ্নটি শুধু
সময় কাটানোর বিষয় নয়,
সঙ্গের মাঝেই লুকিয়ে থাকে
পতন কিংবা মহাবিজয়।
একটি বীজ যেমন গজিয়ে ওঠে
উর্বর মাটির সান্নিধ্যে,
তেমনি মানুষ বিকশিত হয়
সৎজনদের মহামৈত্র্যে।
যে হৃদয়ে ছিল অন্ধকার,
সৎসঙ্গে পায় আলোর দিশা,
যে প্রাণ ছিল পথভ্রষ্ট,
সৎসঙ্গে খুঁজে পায় দিকনির্দেশনা।
কত মানুষ বদলে গেছে
একজন নেক মানুষের ছোঁয়ায়,
কত হৃদয়ে জেগেছে ঈমান
সত্যবান কারো কথামালায়।
কারণ সৎজনেরা শুধু মানুষ নয়,
তারা যেন চলমান শিক্ষা,
তাদের নীরব আচরণও দেয়
জীবন গড়ার সঠিক দীক্ষা।
তাদের হাসিতে থাকে মমতা,
কথায় থাকে কল্যাণধ্বনি,
তাদের চোখে বিনয়ের দীপ্তি,
অন্তরে রবের প্রেমধনী।
তারা মানুষকে ছোট করে না,
অহংকারে করে না বিভাজন,
তাদের হৃদয় আকাশসম বিস্তৃত,
তাদের প্রাণে দয়ার স্পন্দন।
তাই তো আল্লাহর প্রিয় বান্দারা
ছিলেন সৎজনপ্রেমী সদা,
তাদের হৃদয়ের প্রার্থনাতেও
এই আকাঙ্ক্ষা জ্বলেছে নিরবধা।
রাজ্যের মালিক সুলাইমানও
করেছিলেন যে মিনতি,
“হে প্রভু! সৎ বান্দাদের মাঝে
দাও আমায় স্থান অমিতি।”
ইউসুফ নবী জীবনের শেষে
করেছিলেন যে আবেদন,
“সালেহীনদের সাথে মিলিয়ে দিও,
এটাই আমার শেষ সাধন।”
ইবরাহীমও চেয়েছিলেন
প্রজ্ঞা আর নেককারের সঙ্গ,
তাওহীদের সেই মহান সূর্যও
এ কামনায় ছিলেন অনুরঙ্গ।
যদি নবীদের মতো মহামানব
সৎসঙ্গের জন্য করেন দোয়া,
তবে আমরা কীভাবে ভাবি
এ শিক্ষা আমাদের নয় গো?
সৎসঙ্গ মানে শুধু মিলন নয়,
এ এক আত্মিক অভিযাত্রা,
যেখানে হৃদয় শিখে নেয়
সত্য, ধৈর্য, প্রেমের মাত্রা।
সৎসঙ্গ মানে আলোর নদী,
সৎসঙ্গ মানে শান্তির বন,
সৎসঙ্গ মানে ঈমানী সুবাস,
সৎসঙ্গ মানে নির্মল মন।
যে ঘরে থাকে নেক মানুষেরা,
সেই ঘরে বরকতের ছায়া,
যে সমাজে থাকে সৎজনেরা,
সেই সমাজে শান্তির মায়া।
আর যেখানে অসৎ সঙ্গের
অবাধ বিচরণ ঘটে,
সেখানে ধীরে ধীরে বিবেক হারায়,
মানুষ সত্য ভুলে যেতে থাকে।
প্রথমে আসে সামান্য ছাড়,
পরে আসে বড় আপস,
একসময় পাপ হয়ে ওঠে অভ্যাস,
হারিয়ে যায় নৈতিক স্পর্শ।
তাই হে পথিক! সময় থাকতে
বেছে নাও তোমার সাথি,
যারা তোমাকে রবের দিকে ডাকে,
যারা সত্যপথের যাত্রী।
যাদের দেখে মনে পড়ে
পরকালের অনন্ত ঠিকানা,
যাদের কথা শুনলে জেগে ওঠে
আত্মার সুপ্ত প্রার্থনা।
যারা তোমার ভুলে কাঁদবে,
সফলতায় করবে না হিংসা,
যারা তোমার কল্যাণ চায়,
দেবে না বিভ্রান্ত দিশা।
কারণ কিয়ামতের কঠিন দিনে
সব বন্ধুত্ব যাবে ভেঙে,
স্বার্থের দেয়াল ধসে পড়বে
সমস্ত হিসাব রেঙে।
শুধু থাকবে ঈমানী সম্পর্ক,
শুধু থাকবে নেককার সাথি,
যারা পৃথিবীতে আল্লাহর জন্য
গড়েছিল ভালোবাসার গাঁথি।
সেদিন তারা দাঁড়াবে একত্র
রহমতের সুবিশাল ছায়ায়,
তাদের মুখ হবে পূর্ণিমার মতো,
তাদের প্রাণ প্রশান্তিময় মায়ায়।
আর তখনই ধ্বনিত হবে
অতুলনীয় সেই আহ্বান—
“হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে এসো,
শেষ হয়েছে পরীক্ষার স্থান।
তুমি সন্তুষ্ট ছিলে তোমার রবেতে,
তোমার রবও সন্তুষ্ট আজ,
এসো তুমি আমার আপনজনদের মাঝে,
এসো অনন্ত সুখের সাজ।
আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও,
তাদের সাথেই থাকো চিরকাল,
তারপর প্রবেশ করো জান্নাতে,
যেখানে নেই বিচ্ছেদ, নেই অবসানকাল।”
সেই আহ্বানই জীবনের লক্ষ্য,
সেই আহ্বানই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান,
সেই আহ্বানের আশাতেই মুমিন
করেছে যুগে যুগে সাধন।
হে আল্লাহ!
আমাদের হৃদয় করো প্রশান্ত,
আমাদের জীবন করো পবিত্র,
সালেহীনদের ভালোবাসায়
করো আত্মাকে সমুজ্জ্বল, চরিত্রমিত্র।
আমাদেরও শামিল করো
আপনার প্রিয় বান্দাদের দলে,
যেন শেষ নিশ্বাসে শুনতে পাই
সেই ডাক অনন্ত কলে—
|
“হে প্রশান্ত আত্মা!
|
৩
৩ মন্তব্য