Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৯ জুন, ২০২৬ ০৮:২৬ পূর্বাহ্ণ

সমুদ্রের পানি কেন মিষ্টি হলো না?

সমুদ্রের পানি কেন মিষ্টি হলো না?

কখনো কি সমুদ্রের এক ফোঁটা পানি ভুল করে মুখে পড়েছে? তীব্র নোনতা আর তেতো স্বাদে পুরো মুখটা কেমন যেন হয়ে যায়, তাই না? তেষ্টায় বুক ফেটে গেলেও সাগরের এই পানি আমরা এক ফোঁটাও পান করতে পারি না।

কখনো কি সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন—আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর তিন ভাগ পানিই কেন এমন তীব্র লবণাক্ত করে রাখলেন? কেন এটাকে আমাদের পানের যোগ্য মিষ্টি পানি বানালেন না?

জানলে অবাক হবেন, এই তীব্র লবণাক্ততাই আসলে এই পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকার চাবিকাঠি!

সাগরের পানি যদি সাধারণ মিষ্টি পানি হতো, তবে কোটি কোটি জলজ প্রাণীর বর্জ্য আর সমুদ্রে পড়া যাবতীয় ময়লা-আবর্জনার কারণে এত বিশাল জলরাশি পচে দুর্গন্ধ ছড়াত। পুরো পৃথিবী একটা নরককুণ্ডে পরিণত হতো, কোনো মানুষ বা প্রাণী পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিতে পারত না। সমুদ্রের এই অতি উচ্চ মাত্রার লবণই আসলে পুরো সাগরের পানিকে পচন থেকে বাঁচিয়ে রাখছে, প্রাকৃতিক ‘অ্যান্টিসেপটিক’ হিসেবে কাজ করছে।

সবচেয়ে অবিশ্বাস্য তথ্যটি কী জানেন? আমাদের মনে হতে পারে পৃথিবীর সিংহভাগ অক্সিজেন আসে সুন্দরবন বা আমাজনের মতো বিশাল জঙ্গল থেকে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, আমাদের নেওয়া প্রতি ১০টি শ্বাসের ৮টি অক্সিজেনই আসে সমুদ্রের উপরিভাগে থাকা অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক ধরণের উদ্ভিদ ‘ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন’ (Phytoplankton) থেকে!

সাগরের পানি লবণাক্ত না হলে এই ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনগুলো বাঁচতে পারত না। তারা মারা গেলে সমুদ্রের সব মাছ ও প্রাণী মারা যেত এবং পুরো পৃথিবীর অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে আমরা সবাই এক নিমেষে দম আটকে মারা যেতাম। অর্থাৎ, সাগরের যে নোনা পানিকে আমরা অপ্রয়োজনীয় ভাবি, তারই কল্যাণে আমরা প্রতিদিন বুক ভরে নিখরচায় অক্সিজেন নিচ্ছি!

গল্পটা এখানেই শেষ নয়। দয়াময় রবের ভালোবাসার কারিশমা দেখুন—এই যে সাগরের তেতো নোনা পানি, একেই যখন আমাদের পানের জন্য মিষ্টি পানি বানানোর প্রয়োজন হয়, তখন প্রকৃতিতে চালু হয়ে যায় এক অলৌকিক ‘ওয়াটার ফিল্টার’।

সূর্যের তাপে সাগরের পানি যখন বাষ্প হয়ে আকাশে ওড়ে, তখন রবের এক অদ্ভুত নিয়মে সব বিষাক্ত লবণ আর ক্ষতিকারক উপাদান নিচে জমা পড়ে থাকে। কেবল খাঁটি, বিশুদ্ধ ও পরিষ্কার পানিটুকুই বাষ্প হয়ে মেঘে পরিণত হয়। এরপর ল্যাবরেটরির সবচেয়ে আধুনিক ফিল্টারের চেয়েও নিখুঁতভাবে, পৃথিবীর বিশুদ্ধতম ‘পাতিত পানি’ (Distilled Water) হয়ে তা পৃথিবীতে শান্তিময় বৃষ্টিরূপে ঝরে পড়ে।

যে পানি লবনের জন্য মুখে দেয়া যায় না, তাকেই আমাদের জন্য মিষ্টি পানি বানিয়ে দিলেন কে?

আসলে, প্রকৃতির এই জাদুকরী ভারসাম্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—তিনিই ‘আল-লাতিফ’। যাঁর দয়া আর কাজের কৌশল অত্যন্ত সূক্ষ্ম, গভীর এবং নিখুঁত। যিনি মানুষের চোখের আড়ালে, অত্যন্ত গোপনে ও সূক্ষ্ম উপায়ে তাঁর সৃষ্টির জন্য পরম অনুগ্রহের ব্যবস্থা করে রাখেন।

আমাদের জীবনটাও মাঝে মাঝে এই সাগরের নোনা পানির মতোই তেতো আর কঠিন সমস্যায় ঘেরাও হয়ে যায়। আমরা হতাশ হয়ে ভাবি, "আমার সাথেই কেন এমন হলো?" কিন্তু আমরা জানি না, রবের সুনিপুণ পরিকল্পনায় সেই কষ্টের ভেতরই লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যতের কোনো বড় কল্যাণ কিংবা নতুন কোনো সুসংবাদের বৃষ্টি।

মন্তব্য করুন