সহকারী শিক্ষক
১৯ জুন, ২০২৬ ০৩:৫৭ অপরাহ্ণ
কাস্তের মতো বেঁকে যাওয়া জীবন: বিশ্ব সিকেল সেল দিবসের আলোয় সচেতনতার আহ্বান
রক্ত আমাদের শরীরে অক্সিজেনের স্রোত বইয়ে দিয়ে জীবনের স্পন্দন টিকিয়ে রাখে। কিন্তু সেই রক্তের মূল উপাদান লোহিত কণিকাই যদি কখনো শরীরের স্বাভাবিক চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে জীবন থমকে যেতে বাধ্য। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এমনই এক জটিল ও জন্মগত সমস্যার নাম সিকেল সেল অ্যানিমিয়া বা কাস্তে-কোষ রক্তাল্পতা। এই রোগটি সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করতে এবং আক্রান্তদের অধিকার ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে প্রতি বছরের ১৯শে জুন পালিত হয় বিশ্ব সিকেল সেল দিবস। আমাদের চারপাশে অলক্ষ্যেই এই রোগটি বহু মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত দুর্বিষহ করে তুলছে, অথচ সামান্য সচেতনতাই পারে এই কষ্টের বৃত্ত থেকে আমাদের মুক্তি দিতে।
সাধারণত সুস্থ মানুষের শরীরের লোহিত রক্তকণিকাগুলো গোল ও নরম হয়, যা খুব সহজেই সরু রক্তনালীর ভেতর দিয়ে অক্সিজেন বহন করে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সিকেল সেল রোগে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে এই কোষগুলো শক্ত হয়ে যায় এবং দেখতে অনেকটা ধান কাটার কাস্তের মতো বাঁকা রূপ ধারণ করে। এই অস্বাভাবিক আকৃতির কারণে কোষগুলো রক্তনালীতে আটকে গিয়ে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করে। ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না, যা থেকে শুরু হয় হাড়, বুক কিংবা পেটে তীব্র ও অসহ্য যন্ত্রণা। শুধু তাই নয়, এই কাস্তে আকৃতির কোষগুলো খুব দ্রুত ভেঙে যায় বলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সারাজীবন তীব্র রক্তশূন্যতা, চরম ক্লান্তি, হাত-পা ফুলে যাওয়া এবং ঘন ঘন বিভিন্ন বিপজ্জনক ইনফেকশনে ভুগে থাকেন।
আমাদের সমাজে এই রোগটি নিয়ে নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো এটিকে ছোঁয়াচে মনে করা। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্ট বলে, এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, বরং সম্পূর্ণ একটি বংশগত বা জিনগত সমস্যা। বাবা এবং মা উভয়ের শরীরেই যদি এই রোগের সুপ্ত জিন বা বৈশিষ্ট্য থাকে, তবেই কেবল তাদের সন্তানের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যদি কোনো একজন বাহক হন, তবে সন্তান হয়তো নিজে অসুস্থ হয় না, কিন্তু সে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এই রোগের বাহক হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই উন্নত বিশ্বে বিয়ের আগে কিংবা সন্তান ধারণের পূর্বে রক্ত পরীক্ষার ওপর এতটা জোর দেওয়া হয়।
বিশ্ব সিকেল সেল দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও সামাজিক সহমর্মিতা। রক্তের একটি সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমেই খুব সহজে জেনে নেওয়া সম্ভব যে কেউ এই জিনের বাহক কিনা। বিয়ের আগে এই পরীক্ষাটি করার মানসিকতা তৈরি হলে আমরা আগামী প্রজন্মকে এই যন্ত্রণাদায়ক রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখতে পারি। একই সাথে, যারা ইতিমধ্যে এই রোগ নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন, তাদের অবহেলা না করে সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক সহযোগিতা দেওয়া আমাদের মানবিক দায়িত্ব। সিকেল সেল কোনো অভিশাপ নয়, বরং সঠিক সচেতনতা আর ভালোবাসায় আক্রান্ত ব্যক্তিকেও একটি সুন্দর ও দীর্ঘ জীবন উপহার দেওয়া সম্ভব।
৫৩
৯২ মন্তব্য