প্রধান শিক্ষক
১৯ জুন, ২০২৬ ০৮:৩৮ অপরাহ্ণ
নিয়ন্ত্রিত শিক্ষক আর অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষার্থী
নিয়ন্ত্রিত শিক্ষক আর অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষার্থী
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সিঙ্গাপুরের শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিগত পনেরো-ষোল বছর ধরে কিশোরদের আচরণগত অবনতি এবং তা নিয়ন্ত্রণে আমরা উল্টো পথে হেঁটেছি। উল্লেখ্য, এ নিবন্ধে ‘কিশোর’ শব্দটা দিয়ে কিশোরীদেরও বোঝানো হবে এবং তা ঢালাওভাবে সবার জন্য প্রযোজ্য হবে না; ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে।বাংলাদেশে শিক্ষাক্রম নিয়ে কথা উঠলেই শোনা যায়, আমাদের শিক্ষাক্রম হবে সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড বা জাপানের মতো। বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা এসব দেশের শিক্ষাক্রম অনুসরণ করতে চাচ্ছি বটে কিন্তু তাদের সামাজিক কাঠামো বিবেচনা করতে চাচ্ছি না। তাদের ভৌগলিক অবস্থান, জলবায়ু, অর্থনীতি, জনসংখ্যা, সংস্কৃতি, জীবিকা, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ, এমনকি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ধরন পর্যন্ত আমাদের থেকে আলাদা। আমাদের দেশের মানুষের শারীরিক গঠন, চরিত্র, আবেগ এবং পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গেও এই দেশগুলোর কোনো সামঞ্জস্য নেই। অথচ বছরের পর বছর ধরে আমরা তাদের আদলে নিজেদের গড়তে চেয়েছি! ফলে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় আমরা না হতে পেরেছি তাদের মতো, না হতে পেরেছি নিজেদের মতো। আমাদের এই দুরবস্থা আমাদের কিশোরদের আচরণ এবং সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের শিক্ষার প্রধান তিনটি স্তরের মধ্যে সবচেয়ে জটিল অংশ হচ্ছে মাধ্যমিক স্তর–ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি; যেখানে শিক্ষার্থীদের বয়স সাধারণত ১১ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে থাকে। এই সময়েই কিশোরদের বয়ঃসন্ধি, মানসিক পরিবর্তন, আবেগের অস্থিরতা ও আচরণগত রূপান্তর ঘটে। যারা প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে এ সব শিক্ষার্থীর মুখোমুখি হন, কেবল তারাই জানেন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কতটা কঠিন। মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষককে প্রতিদিন শ্রেণিতে যে সব অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত, ক্ষেত্রবিশেষে ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা একজন প্রাথমিক বা উচ্চশিক্ষা স্তরের শিক্ষকের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন।
মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বর্তমান সময়ে শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ। কিছু শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত কথা বলা, ইচ্ছাকৃত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা সহপাঠীদের বিরক্ত করার কারণে পুরো শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষকদের হাতে বর্তমানে এমন কোনো কার্যকরী উপায় নেই, যার মাধ্যমে তারা এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ফলে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই লেখকের এমফিল গবেষণার তথ্য সংগ্রহের সময়ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তরফ থেকে এই অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এটা ঠিক যে কম বয়সীদের অবাধ্যতা আগেও ছিল; কিন্তু পরিস্থিতি এত ভয়াবহ ছিল না। প্রশ্ন হলো, কোন সময় থেকে এই সংকট তীব্র হতে শুরু করল? খেয়াল করলে দেখব, বিগত পনেরো-ষোলো বছরের কয়েকটি ঘটনা ও সিদ্ধান্ত এই সংকটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। তন্মধ্যে, ২০২০ সালে কভিড পরিস্থিতির সময় শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোনে আসক্ত হয়ে যাওয়া অন্যতম। এরপর ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০২২’ নামে এমন এক পদ্ধতি চালু হয়, যেখানে ব্যক্তিগত অধ্যয়ন, প্রতিযোগিতা ও দায়িত্ববোধের জায়গা কমে গিয়ে দলভিত্তিক কাজ ও সম্মিলিত মূল্যায়ন গুরুত্ব পায়। যখন কোনো শিক্ষার্থী দেখে যে, সে না শিখলেও অনায়াসে দলগতভাবে সমান নম্বর পেয়ে যাচ্ছে তখন তার মধ্যে পড়াশোনার প্রতি অনীহা তৈরি হয়। অন্যদিকে, কোনো অগ্রসর শিক্ষার্থী যখন দেখে যে, তার মেধা ও পরিশ্রমের ফলে প্রাপ্ত নম্বর অন্য শিক্ষার্থীরা এমনিতেই পেয়ে যাচ্ছে, তখন তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
কিন্তু মূল পতনের সূত্রপাত ঘটে তারও অনেক আগে। আমাদের মনে থাকবে, ২০১১ সালের ২১ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিতকরণ নীতিমালা’ নামে একটি পরিপত্র জারি করেছিল। মূলত এই নীতিমালা জারির পর থেকেই শিক্ষকদের হাতে শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের প্রায় সব উপায়ই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। পরিপত্রে শারীরিক শাস্তির একটি দীর্ঘ তালিকা দেওয়া হয়, যার মধ্যে বেত্রাঘাত, রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরে টানা বা ওঠবস করানো অন্যতম। সে সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মিডিয়া পরিপত্রটি এত ফলাও করে প্রচার করে যে মুহূর্তেই দেশের সব কিশোর জেনে যায়, এখন থেকে শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নিতে পারবে না।
পরিপত্রে বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়ার জন্যই শ্রেণিকক্ষে যান। বাস্তবতা হলো, কোনো শিক্ষকই বিনা কারণে শিক্ষার্থীদের শাসন করেন না। একজন শিক্ষক যখন দেখেন যে, বারবার নিষেধ সত্ত্বেও কোনো শিক্ষার্থী ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কোনো আচরণ করছে, যা তার নিজের, সহপাঠীদের বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর, কেবল তখন তিনি শাসন করেন। শিক্ষকের এ শাসনের উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়; বরং শিক্ষার্থীকে বোঝানো যে, অন্যায় বা অপরাধের একটি বাস্তব পরিণতি আছে। এই উপলব্ধি থেকেই শিক্ষার্থীর মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে একই ভুলের পুনরাবৃত্তির প্রবণতা কমে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় বোঝা জরুরি–শাসন ও নির্যাতন এক নয়। একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের অপ্রত্যাশিত আচরণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিলে তা নির্যাতন নয়। অথচ বাংলাদেশে ধীরে ধীরে এমন ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে, শিক্ষার্থীর অন্যায় বা অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতা দেখানোই যেন অপরাধ! শিক্ষককে এমন এক জায়গায় দাঁড় করানো হয়েছে, যেখানে তিনি এসবের বিরুদ্ধে কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন না; অথচ শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব তারই! এদিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বুঝে গেছে, শিক্ষক তাদের বিরুদ্ধে কার্যত অসহায় এবং তারা অন্যায় বা অপরাধ করলেও শাস্তি পাওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়ম অমান্য করার প্রবণতা বেড়েছে। বর্তমানে অনেক কিশোর-তরুণদের মধ্যে যে বুলিং বা যৌন হয়রানির প্রবৃত্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, খোঁজ নিলে দেখবেন এর শুরুটা তাদের অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির মধ্যেই হয়েছে।
মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুন্ড ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন, আইন, কর্তৃত্ব, অপরাধবোধ এবং শাস্তির ভয়ের দ্বারা মানুষের আগ্রাসী প্রবৃত্তি সংযত থাকার কারণেই সভ্যতা টিকে থাকে। তিনি যুক্তি দেন যে, ‘সমাজ পাশবিক শক্তিকে সম্মিলিত আইন ও শাস্তি দ্বারা প্রতিস্থাপন করে। অভ্যন্তরীণ নৈতিক সংযম (সুপারইগো) এবং বাহ্যিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া আগ্রাসী এবং সমাজবিরোধী প্রবৃত্তিগুলো উদ্ভূত হতে পারে।’ অর্থাৎ, কেবল নৈতিক শিক্ষাই যথেষ্ট নয়, সামাজিক কাঠামো, আইন ও শাস্তির ধারণাও মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণে অপরিহার্য। আর কিশোরদের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ এখনও পরিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি। আমরা যদি শৈশবেই নিয়ন্ত্রণের শিকল ছিঁড়ে ফেলি, তবে বড় হয়ে তারা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে।
পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আইনের শাসন এবং শাস্তির ভয় ছাড়া মানুষের আগ্রাসী প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়ম ভঙ্গের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেই শৃঙ্খলা টিকে আছে। মানুষ কেবল নৈতিক বোধ দিয়েই আইন মানে না; সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, শাস্তির আশঙ্কা এবং জবাবদিহিও তার আচরণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি কিশোর যদি ছোটবেলা থেকেই শিখে যে, নিয়ম ভাঙলে তার বাস্তব পরিণতি নেই, তাহলে তার মধ্যে দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠা কঠিন। এটা অনস্বীকার্য যে, শাস্তি হতে হবে সীমিত, ন্যায়সঙ্গত ও নিয়ন্ত্রিত। তবে শাস্তির ধারণাই যদি অস্বীকার করা হয়, তাহলে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেই নীতিমালার উদ্দেশ্য হয়তো মহৎ ছিল, কিন্তু এর প্রায়োগিক ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ। পরিপত্র জারি করে শিক্ষার্থীদের জানিয়েই তাদের শাসন করতে নিষেধ করার প্রভাব তাদের পরিবারেও পড়েছে। এরপর থেকে বাবা-মায়েদের পক্ষেও সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যাদের ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সী সন্তান রয়েছে, তারা সহজেই অনুভব করতে পারছেন যে, সন্তানদের আচরণের নেতিবাচক পরিবর্তন কতটা ভয়াবহ। এখন এই বয়সী অনেক শিক্ষার্থী তাদের বাবা-মায়ের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা বা ভয় পোষণ করছে না। পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহের পাশাপাশি সবকিছুর প্রতি একটা ‘ডেম-কেয়ার’ মনোভাব তৈরি হয়েছে। কিশোররা মনে করছে, তারা যা খুশি তা-ই করতে পারে এবং এর জন্য তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। এখন আমরা যদি তাদের এই পরিবর্তনকে কেবল ‘জেনারেশন গ্যাপ’ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি তাহলে বাস্তব সংকট আড়াল করা হবে।
বর্তমানে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে বাবা-মা, শিক্ষক, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও কিশোরদের শাসন করতে ভয় পান। ফলাফল হচ্ছে, সমাজে শৃঙ্খলার জায়গা দখল করেছে অবাধ্যতা। কিছু অতি-প্রগতিশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কথা শুনলে মনে হয়, নিজ সন্তানকে শাসন করাও যেন অপরাধ! অথচ কিশোরদের মানসিক বিকাশে তাদের আচরণের সীমারেখা টানা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ যদি একযোগে সেই সীমারেখা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা নিজেদের আচরণের পরিণতি বোঝার ক্ষমতা হারাতে পারে। আজ রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অনলাইন জগতে যে বেপরোয়া আচরণ আমরা দেখছি, তার পেছনে এই শাসনহীনতার বড় ভূমিকা রয়েছে। এবং উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বেপরোয়া আচরণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাম্প্রতিক দুটি ঘটনার দিকে তাকালে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। গত ১৭ মে চট্টগ্রামে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পরপরই এক বিদ্যালয়ের দুই পরীক্ষার্থীর ওপর অন্য বিদ্যালয়ের ১০-১২ জন পরীক্ষার্থী ধারালো ক্ষুর ও অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। পরবর্তীতে সাধারণ লোকজন চিৎকার করে ছুটে এলে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। তারও আগে গত ২১ এপ্রিল এসএসসি পরীক্ষার পর কিছু পরীক্ষার্থী ক্যামেরার সামনে শিক্ষামন্ত্রীকে ইঙ্গিত করে যেসব মন্তব্য করেছে, তা আমরা সকলেই দেখেছি। একজন শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে প্রকাশ্যে অশোভন আচরণ করার রুচি ও সাহস যদি শিক্ষার্থীরা পায়, তাহলে বাবা-মা বা শিক্ষকদের প্রতি তারা কেমন আচরণ করতে পারে, সেটি সহজেই অনুমেয়। বলা বাহুল্য, শিক্ষার্থীদের এহেন আচরণের পেছনে ২০১১ সালের ২১ এপ্রিল জারি করা সেই পরিপত্রের বড় ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষকরা যদি বিগত দিনে এসব শিক্ষার্থীদের আচরণগত সীমারেখা ভঙ্গের জন্য শাস্তি দিতে পারতেন, তাহলে আজ আমাদের এই দৃশ্য দেখতে হতো না।
অনেকে বলেন, উপদেশ দিয়েই কিশোরদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তব সমাজ থেকে আমরা কি তার প্রমাণ পাই? না, পাই না। শুধু উপদেশেই যদি মানুষ সঠিক আচরণ করতো, তাহলে রাষ্ট্রে আইন, পুলিশ, আদালত কিংবা কারাগারের প্রয়োজন হতো না। কভিড মহামারির সময় আমরা দেখেছি, সরকার প্রথমে মানুষকে উপদেশ, অনুরোধ ও পরামর্শের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল; কিন্তু বাস্তবে বহু শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সেই নির্দেশনা মানেননি। বাধ্য হয়ে সরকারকে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী, এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালত পর্যন্ত ব্যবহার করতে হয়েছে। যেখানে প্রাপ্তবয়স্করাই শাস্তির ভয় ছাড়া আচরণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন, সেখানে অপ্রাপ্তবয়স্করা শুধু উপদেশে নিয়ন্ত্রিত থাকবে–এমন প্রত্যাশা সুদূরপরাহত।
কিশোর অপরাধবিষয়ক বহু মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্বল নৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ শৃঙ্খলা কিশোর অপরাধ বাড়াতে ভূমিকা রাখে। গবেষকরা বলছেন, শৈশবে নিয়মের ধারাবাহিকতা না থাকলে এবং ভুল আচরণের পরিণতি না থাকলে সমাজবিরোধী প্রবণতা শক্তিশালী হতে পারে। একটি শিশু বা কিশোর যদি ছোটবেলা থেকেই বুঝে যায় যে কোন নেতিবাচক আচরণের জন্যই তাকে জবাবদিহি করতে হবে না, তাহলে ধীরে ধীরে তার মধ্যে সীমালঙ্ঘনের প্রবণতা বাড়ে। আর এ কারণেই অপরাধবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানে ‘অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘বাহ্যিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ–উভয়কেই গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে গেলে কিশোরদের মধ্যে সহিংসতা, অবাধ্যতা ও দায়িত্বহীনতা বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে কিশোরদের মধ্যে যে আচরণগত সংকট দেখা যাচ্ছে, তা এই বিশ্লেষণের সঙ্গেও মিলে যায়।
মানুষ স্বভাবগতভাবে সবসময় আইন মানে না; বরং আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও শাস্তির আশঙ্কাই তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। ধরা যাক, হঠাৎ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশকে জানিয়ে দিল, এখন থেকে তারা আর কোনো নাগরিকের ওপর বল প্রয়োগ করতে পারবে না; এবং একই সঙ্গে এই তথ্য পুরো সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। তখন কী ঘটবে–সবাই কি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইন মেনে চলবে? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, না। কারণ, মানুষের একটি বড় অংশ আইন মানে মূলত শাস্তির ভয়ে। এখানে অনেকে বলতে পারেন, প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে। কথা সত্যি; কিন্তু আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মূল যুক্তি একই। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি আইন না মানলে শাস্তির ভয় অনুভব করেন, তাহলে বয়ঃসন্ধিকালের একজন কিশোর কেন তার বাইরে থাকবে?
(চলবে)
লেখক: এমফিল রিসার্চ স্কলার (মাধ্যমিক শিক্ষা)
৫৩
৯২ মন্তব্য