Loading..

ব্লগ

রিসেট

২১ জুন, ২০২৬ ০৯:০৭ অপরাহ্ণ

আমলাতান্ত্রিক অহমিকা বনাম শিক্ষক সমাজের মর্যাদা: সাম্প্রতিক ভাইরাল সংস্কৃতির গভীর ব্যবচ্ছেদ

আমলাতান্ত্রিক অহমিকা বনাম শিক্ষক সমাজের মর্যাদা: সাম্প্রতিক ভাইরাল সংস্কৃতির গভীর ব্যবচ্ছেদ

-মুফিদুল আলম
শিক্ষক,কক্সবাজার

ভূমিকা: এক জাতির ভবিষ্যৎ যেখানে আহত
একটি জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা তার আয়না, আর শিক্ষকরা সেই আয়নার প্রাণপ্রতিম। কিন্তু যখনই কোনো প্রশাসনিক পদচারণা সেই আয়নায় ফাটল ধরে, তখন নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে সমাজের আত্মবিশ্বাস। সম্প্রতি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে—উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসে ক্যামেরার সামনে শিক্ষকদের ‘শাসাচ্ছেন’। এই দৃশ্য নিছক কোনো ‘ভুল বোঝাবুঝি’ নয়; এটি আমাদের আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির এক কালো অধ্যায়ের স্বাক্ষর, যা সোশ্যাল মিডিয়ার জালে ধরা পড়েছে।

ভাইরাল সংস্কৃতি: ক্ষমতার ‘রিয়েলিটি শো’
বর্তমান যুগে ‘ভাইরাল হওয়া’ অনেকের কাছে ‘সফল হওয়ার’ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু প্রশাসক মনে করেন, ক্যামেরার সামনে কঠোর ভাষায় ‘অ্যাকশন’ দেখালেই তিনি ‘সিদ্ধহস্ত প্রশাসক’ — অথচ জনপ্রশাসনের ভিত্তি হলো সেবা, নাটকীয়তা নয়। এই ঘটনায় ইউএনও যে উদ্দেশ্যই দেখান, তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল ‘আমি কতটা ক্ষমতাবান’—তা সমাজমাধ্যমে প্রচার করা। এটি প্রশাসনিক পেশাদারিত্বের চরম লঙ্ঘন। কারণ, কোনো শাসকই ‘রিয়েলিটি শো’-তে প্রতিযোগী নন; তিনি জনগণের বেতনভুক সেবক।

প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচার: একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত
যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের কক্ষ ও তার আসন হলো সেই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে বসার অর্থ সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো।
এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সাবেক মহাপরিচালক ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক স্যারের দৃষ্টান্ত ইতিহাস হয়ে থাকবে। তিনি বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষকদের অনুরোধ সত্ত্বেও প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসেননি; বরং পাশে আলাদা চেয়ার এনে সেখান থেকে পরামর্শ দিয়েছেন। এটি শুধু শিষ্টাচার নয়—এটি ‘ক্ষমতার বিনয়’। অন্যদিকে, ইউএনও যে আচরণ করেছেন, তা ক্ষমতার ‘অহমিকা’—যেখানে প্রতিষ্ঠান নয়, নিজের ‘আমি’ বড় হয়ে ওঠে।

নেপথ্যের মনস্তত্ত্ব: ক্ষোভ যখন ‘উছিলা’ খোঁজে
ঘটনাটির গভীরে তাকালে মনে হয়, এটি আকস্মিক কোনো ‘তদারকি’ নয়। সদ্য সমাপ্ত এসএসসি বা পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ওই বিদ্যালয় ব্যবহৃত হয়েছে—সেখানে কেন্দ্রের সম্মানি, আপ্যায়ন বা প্রোটোকল নিয়ে ইউএনওর সাথে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একটি ‘ঠান্ডা সম্পর্ক’ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে, কোনো কর্মকর্তা যখন ব্যক্তিগত বা আর্থিক স্বার্থে ক্ষুব্ধ হন, তখন তিনি সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ না করে ছোটখাটো প্রশাসনিক ত্রুটিকে ‘অস্ত্র’ বানান। এটাকে বলা যায় ‘ক্ষোভের প্রতিস্থাপন’ (Displacement)—যেখানে প্রকৃত কারণ লুকিয়ে রেখে গৌণ বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতিশোধ নেওয়া হয়। এটি প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক আচরণ।

আইনি প্রেক্ষাপট: কোন বিধি লঙ্ঘিত হলো?
শুধু নৈতিক নয়, আইনগত দিক থেকেও এই ঘটনা প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ৩(১) ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে জনগণের সাথে বিনয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে হবে। জনসম্মুখে শিক্ষকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো তা লঙ্ঘন করে। তাছাড়া, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন নির্দেশিকা বলছে—পরিদর্শককে সহযোগী মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে, ‘শাসকের’ ভূমিকা নয়। এই ঘটনায় ইউএনও তার ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন ‘হেনস্তার হাতিয়ার’ হিসেবে, যা চাকরির শৃঙ্খলাবিরোধী অপরাধ।

শিক্ষক সমাজের ওপর আঘাত: মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা ও সামাজিক পতন
ক্যামেরার সামনে জনসমক্ষে শিক্ষকদের অপদস্থ করা মানে শুধু দুই-চারজন শিক্ষক নয়; বরং গোটা শিক্ষক সমাজের আত্মসম্মানে আঘাত করা।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষকদের প্রতি অবজ্ঞা সমাজের শিক্ষা-আগ্রহ কমিয়ে দেয়। যে সমাজ শিক্ষককে হেয় করে, সেই সমাজে তরুণ প্রজন্ম শিক্ষকতা পেশায় আসে না—ফলে শিক্ষার মান পড়তে থাকে। আর প্রশাসনে তৈরি হয় স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা, যেখানে কর্মকর্তা নিজেকে ‘প্রভু’ মনে করেন। এটি একটি দেশের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক লক্ষণ।

যা হওয়া উচিত ছিল বনাম যা হলো
দিক যা হওয়া উচিত যা হয়েছে
আসন প্রধান শিক্ষককে সম্মান জানিয়ে আলাদা চেয়ার প্রধান শিক্ষকের চেয়ার দখল
শিক্ষকদের প্রতি গঠনমূলক পরামর্শ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শাসানো
প্রচার অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন ক্যামেরায় ধারণ করে ভাইরাল করা
মনোভাব সহযোগিতা প্রতিহিংসা

উত্তরণের পথ: উন্নত প্রোটোকল ও মানসিকতা পরিবর্তন
এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ জরুরি—
১. পরিদর্শন প্রোটোকল জারি: শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি নির্দেশিকা তৈরি করুক, যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে—পরিদর্শনে গেলে প্রধান শিক্ষকের চেয়ার ব্যবহার করা যাবে না, এবং কোনো শিক্ষককে ক্যামেরার সামনে অপদস্থ করা যাবে না।
২. মানসিকতা পরিবর্তনে প্রশিক্ষণ: ইউএনও ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের জন্য ‘পেশাদার আচরণ ও শিষ্টাচার’ বিষয়ক বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।
৩. শিক্ষকের অভিযোগ নিষ্পত্তি কক্ষ: প্রতিটি জেলায় শিক্ষকদের জন্য একটি ন্যায্য অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রশাসনের দাপট থেকে তারা সুরক্ষিত থাকবেন।
৪. ভাইরাল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সচেতনতা: প্রশাসনিক কাজ ক্যামেরাবন্দি করে ভাইরাল করার প্রবণতা রোধে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

উপসংহার: মর্যাদা রক্ষা করা জাতীয় দায়িত্ব
শিক্ষকদের সম্মান রক্ষা করা কোনো একক বিদ্যালয়ের বিষয় নয়; এটি পুরো জাতির আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। ইউএনওর এই আচরণ যদি শাস্তিহীন থেকে যায়, তবে আগামীকাল অন্য কোনো কর্মকর্তাও একই কৌশল অনুসরণ করবেন।
আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে—যেখানে ক্ষমতা অহমিকা নয়, বিনয়ের বাহন হয়। ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক স্যারের মতো ব্যক্তিত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেন, প্রকৃত আভিজাত্য হলো ছোট হতে পারা, বড় হতে দেখা নয়।
শেষ প্রশ্ন পাঠকের জন্য: আপনি কি মনে করেন, প্রশাসনিক তদারকির নামে এই ধরনের আচরণ কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে? যদি না হয়, তবে এর প্রতিকার কী হওয়া উচিত—
কমেন্টে জানান।
২১ জুন ২০২৬

মন্তব্য করুন