Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ জুন, ২০২৬ ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

পাঠ্যবই পরিমার্জন : ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে আসছে পরিবর্তন

সম্প্রতি বগুড়ায় অনুষ্ঠিত পরিমার্জন কমিটর আবাসিক এ কর্মশালায় এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় পরিমার্জন কমিটির একাধিক সভা হয় এনসিটিবিতে। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিনের উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা হয়। বর্তমানে বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে জানা গেছে।

সূত্রমতে, নবম-দশম শ্রেনির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ বইয়ের একাদশ অধ্যায় অর্থাৎ ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ অধ্যায়ে পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়েছে এনসিটিবি। সে অনুযায়ী, ভাষা আন্দোলনের পটভূমির অংশটি কিছুটা সংক্ষিপ্ত হতে পারে। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন 

পরিকল্পিত ভাষা আন্দোলনের পটভূমি: ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বেই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা প্রশ্নে বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুলাই আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর জিয়াউদ্দিন এক বক্তৃতায় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মতামত প্রকাশ করেন। পূর্ববঙ্গ থেকে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর প্রতিবাদ জানান এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার পক্ষে তাঁর যুক্তি তুলে ধরেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগঠন তমুদ্দুন মজলিস গঠিত হয় ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর। এই সংগঠনই ভাষা আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকা 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু' প্রকাশ করে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর। এই পুস্তিকাটিতে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার নানান যুক্তি তুলে ধরা হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করাচিতে পাকিস্তানের প্রথম শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে পাকিস্তানের সাধারণ ভাষা এবং লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে উর্দুর প্রস্তাব করা হয়। এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাকা মেডিক্যালের পাশে) শিক্ষার্থীরা প্রথম প্রতিবাদ সমাবেশ করে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তাঁর এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য হয়। প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্ররা ধর্মঘট পালন করে এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। এই পরিষদ ১১ মার্চ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ছাত্রদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হন এবং তাদের দাবিসমূহ মেনে নেয়ার আশ্বাস দেন। এর অল্পকিছুদিন পরই পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম ও শেষবারের মতো পূর্ববঙ্গ সফর করেন। ২১ মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় তিনি ঘোষণা দেন ‘পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হবে উর্দু - অন্য কোনো ভাষা নয়।’ জিন্নাহর ঢাকা ত্যাগের পর ভাষা আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায়। তাঁর জনপ্রিয়তা ও তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের অগাধ শ্রদ্ধাবোধের কারণে অনেকেই আন্দোলন থেকে সরে পড়ে। তবে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রতি বছর ছাত্ররা ১১ মার্চ পালন করতো। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বাঙালী শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান বাংলাকে আরবি বা রোমান অক্ষরে লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ হলে তাঁর এই উদ্যোগ সফল হয়নি।

ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় নিয়ে পরিকল্পিত অংশ: পাকিস্তানের রাজনৈতিক পালাবদলে খাজা নাজিমুদ্দীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদ লাভ করেন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পূর্ববঙ্গ সফরে এসে তিনি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতোই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে বলে ঘোষণা দেন। তাঁর এই ঘোষণার ফলে ভাষা আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠে। খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ৩০ জানুয়ারি সভা ও ছাত্র ধর্মঘটের আহ্বান করে। ৩১ জানুয়ারি আওয়ামী মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সর্বদলীয় সভায় 'সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়। সংগ্রাম পরিষদ ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য নানান কর্মসূচি শুরু করে।

পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন এতে ভীত হয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরনের সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল নিষিদ্ধ করেন। এই অবস্থায় করণীয় ঠিক করতে ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বৈঠকে বসে। সভার মূল আলোচ্যসূচি ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে, না হবে না। এ নিয়ে ভিন্নমত দেখা দিলে বিষয়টি সমাধানের জন্য ভোটের ব্যবস্থা করা হয়। উপস্থিত ১৬ জনের মাধ্যে ১১ জন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে মতামত প্রদান করেন এবং ১ জন ভোটদানে বিরত থাকেন। শামসুল আলম, আবদুল মতিন, অলি আহাদ, গোলাম মাউলা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে মত দেন। অবশেষে অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে সভাটি ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে আব্দুল মতিন এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন। ঢাকা হল, ফজলুল হক হল এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে। এই অবস্থায় ২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ১১ জন ভাষা সৈনিক ২০ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে ফজলুল হক হল ও ঢাকা হলের মাঝখানে পুকুর পাড়ে একটি গোপন সভায় বসেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে কীভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। পরিকল্পনা অনুসারে ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় সমবেত হতে থাকে। দুপুর হবার আগেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী সভাস্থলে উপস্থিত হয়। সকাল সাড়ে ১১টায় গাজিউল হকের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় কতিপয় ছাত্র নেতা ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার জন্য শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করে। তবে আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে উত্তেজিত ছাত্র জনতা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রথমে ছোট ছোট কয়েকটি দল তৎকালীন কলাভবনের গেটের বাইরে গেলে তাদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়। পরে সম্মিলিতভাবে হাজার হাজার ছাত্র জনতা গেটের বাইরে চলে আসে এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” স্লোগান দিয়ে মিছিল করতে থাকে। পুলিশ মিছিলের উপর লাঠিচার্জ করে এবং কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে সমবেত হয়ে গণপরিষদরে দিকে গ্রসর হতে থাকলে মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। ২১ ফেব্রুয়ারি এবং পরবর্তী ঘটনা প্রবাহে কমপক্ষে ৬ জন শহীদ হয়েছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ হন রফিকউদ্দিন আহমেদ ও আবুল বরকত। আবদুস সালাম ২১ ফেব্রুয়ারিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৭ এপ্রিল মৃতুবরণ করেন। এতো আন্দোলন এবং হতাহতের পরেও ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে উর্দুর পাশাপাশি বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংবিধানে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

মন্তব্য করুন