Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ জুন, ২০২৬ ১০:৪৩ অপরাহ্ণ

মহররম মোঃ মুজিবুর রহমান



মহররম

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মহররম এলো নীরব পায়ে,
নতুন বছরের প্রথম প্রহর,
আকাশ জুড়ে স্মৃতির আলো,
জাগে ইতিহাসের অমর স্বর।

সময়ের বুকে খোদাই করা
এক মহিমান্বিত পবিত্র নাম,
সম্মানের মুকুট মাথায় নিয়ে
এসেছে আবার সেই পয়গাম।

মহররম অর্থ সম্মানিত,
মহিমান্বিত পুণ্যের মাস,
চারটি পবিত্র মাসের মাঝে
এর রয়েছে বিশেষ সুবাস।

আল্লাহ যেদিন সৃষ্টি করেন
অসীম এই বিশ্বভুবন,
সেদিন থেকেই নির্ধারিত হয়
বারো মাসের শুভ গণন।

তন্মধ্যে চারটি মাসকে তিনি
করেছেন অধিক মর্যাদাময়,
ইবাদতের পথে আহ্বান জানায়,
পাপ থেকে মানুষ দূরে রয়।

মহররম তাই শ্রদ্ধার মাস,
আত্মশুদ্ধির দীপ্ত সময়,
হৃদয়জুড়ে তাকওয়ার বাণী
সত্যের পথে মানুষ লয়।

হিজরতের সেই মহাগাঁথা
জড়িয়ে আছে এ মাস জুড়ে,
ত্যাগের শিক্ষা, ধৈর্যের দীপ
জ্বলে আজও যুগে যুগে।

মক্কার বুকে অত্যাচার যখন
সীমা ছাড়িয়ে উঠল ভয়,
সত্যের পথে অবিচল থেকে
নবী দিলেন ত্যাগের পরিচয়।

স্বদেশ ছেড়ে প্রিয়জন ছেড়ে
চলে গেলেন মদিনায়,
আল্লাহর প্রেম, দ্বীনের তরে
সর্বস্ব বিলালেন হেলায়।

হিজরতের সেই অমর স্মৃতি
জাগায় প্রেম ও অনুপ্রেরণা,
কঠিন পথে এগিয়ে চলার
দেয় অবিচল প্রজ্ঞা ও প্রেরণা।

হিজরি সনের প্রথম প্রহরে
জাগুক নতুন শপথ আজ,
সত্য, ন্যায় আর মানবতার
হোক জীবনের মহাসাজ।

মহররম শুধু নতুন বছর নয়,
এ আত্মসমালোচনার কাল,
কতটুকু পথ চলেছি সঠিক,
কতটুকু হয়েছে অবহেলার জাল।

হিসাব নিকাশ করি নিজেকে,
দেখি অন্তরের আয়না,
ভুলের পথে কত দূর গেছি,
কত দূরে সত্যের ঠিকানা।

আশুরা আসে মহররমে,
দশম দিনের পবিত্র নাম,
অসংখ্য ঘটনার মহিমায় ভরা
ইতিহাসের উজ্জ্বল ধাম।

সেই দিনে আদম (আ.) পেলেন
সৃষ্টির প্রথম সম্মান,
মানবজাতির সূচনালগ্নে
খুলল নতুন সম্ভাবনার দান।

সেই দিনে নুহ (আ.)-এর তরী
ভেসে এলো নিরাপদ তীরে,
প্রলয়ের ঢেউ থেমে গিয়েছিল
রহমতের আলো ঘিরে।

দীর্ঘ পরীক্ষার আগুন পেরিয়ে
ইবরাহিম (আ.) হলেন মুক্ত,
অগ্নিকুণ্ডও হার মানল তখন
রবের হুকুমে হলো নত।

ইউনুস (আ.) মাছের উদর হতে
পেলেন মুক্তির শুভ ক্ষণ,
তওবার অশ্রু, ধৈর্যের শক্তি
জয় করেছিল সকল বাঁধন।

আঠারো বছরের কঠিন রোগে
আইয়ুব (আ.) ছিলেন ধীর,
আশুরার সেই বরকতময় দিনে
হলেন সুস্থ, প্রশান্ত, স্থির।

হারানো রাজ্য ফিরে পেয়েছিলেন
সুলাইমান (আ.) মহিমায়,
রবের কৃপায় শাসন করলেন
ন্যায় ও জ্ঞানের মহোদয়ায়।

ইয়াকুব (আ.) ফিরে পেলেন
প্রিয় ইউসুফকে দীর্ঘ পর,
বিরহের রাত শেষ হয়েছিল
মিলনের আনন্দঘন ভোর।

ঈসা (আ.)-এর জন্মস্মৃতি
জড়িয়ে আছে এই দিন,
আল্লাহর অশেষ কুদরতে
উজ্জ্বল হলো সত্যের ঋণ।

এভাবেই আশুরার দিন
বহন করে মহা শিক্ষা,
ধৈর্য, তওবা, কৃতজ্ঞতা আর
আল্লাহভীতির পবিত্র দীক্ষা।

রোজার মাঝে লুকিয়ে আছে
আত্মার শুদ্ধি, নূরের আলো,
ক্ষুধার ভেতর জেগে ওঠে
মানবতার নির্মল ভালো।

একদিনের সেই আশুরার রোজা
কত যে মহিমাময় দান,
নবীজি দিলেন সুসংবাদ—
ক্ষমা হবে বিগত বছরের গুনাহখান।

তবু তিনি শিক্ষা দিলেন
ভিন্নতারও সুন্দর রীতি,
একদিন আগে কিংবা পরে
রাখতে হবে রোজার প্রীতি।

কারণ মুসলিম স্বাতন্ত্র্যের মাঝে
রয়েছে জ্ঞানের দীপ্তি,
অন্ধ অনুকরণ নয় কখনো,
সত্যের পথে হোক অগ্রগতি।

মহররম শেখায় ধৈর্যের পাঠ,
বিপদে না হতে নিরাশ,
রবের উপর ভরসা রেখে
অতিক্রম করতে সব সর্বনাশ।

মহররম শেখায় বিনয় হতে,
শেখায় আত্মসমর্পণ,
ক্ষমার দরজা খোলা রয়েছে,
করো না হৃদয় কঠোর পাষাণ।

মহররম শেখায় ন্যায় প্রতিষ্ঠা,
অন্যায়ের সাথে নয় আপস,
সত্যের জন্য দৃঢ় থাকো,
হোক না সামনে শত বিপদ-ফাঁস।

শেখায় তওবা, শেখায় ইখলাস,
শেখায় সেবার মহান ব্রত,
মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াক,
ভালোবাসায় গড়ুক জগত।

আজও যখন বিভেদ বাড়ে,
অহংকারে মন হয় ভার,
মহররম এসে মনে করিয়ে দেয়—
মানুষ হও, হও উদার।

আজও যখন লোভের আগুন
পুড়িয়ে ফেলে বিবেকবোধ,
মহররম বলে, ফিরে এসো,
রবের পথে করো রুজু সদ্যোদ্ভূত।

আজও যখন অন্যায় দেখে
নীরব থাকে বহু প্রাণ,
মহররম তখন সাহস জাগায়—
সত্যের পথে হও অবিচল মহান।

এসো তবে নতুন বছরে
নতুন করে করি অঙ্গীকার,
ইবাদতে হবো আরও যত্নবান,
ত্যাগে হবো আরও উদার।

পিতা-মাতার সেবা করব,
রাখব আত্মীয়তার বন্ধন,
অসহায়ের পাশে দাঁড়াব,
করব মানবতার স্পন্দন।

হৃদয় ভরব কুরআনের আলোয়,
সুন্নাহ হবে জীবনের পথ,
সততা, ন্যায় আর করুণায়
সাজাবো প্রতিটি রথ।

মহররমের পবিত্র প্রভাতে
উঠুক দোয়া আকাশ ভরে—
হে আল্লাহ! তুমি কবুল করো
আমাদের সব অশ্রুধারে।

ক্ষমা করো সকল গুনাহ,
শুদ্ধ করো অন্তর প্রাণ,
সত্য ও ন্যায়ের পথে রেখো,
দাও তাকওয়ার মহাসম্মান।

হিজরতের শিক্ষা জীবনে দাও,
দাও ত্যাগের দৃঢ় মন,
আশুরার নূরে আলোকিত হোক
আমাদের প্রতিটি ক্ষণ।

মহররম হোক জাগরণের ডাক,
হোক আত্মশুদ্ধির মহাযাত্রা,
মানবতার দীপ জ্বালিয়ে
গড়ি শান্তিময় বিশ্বপাত্র।

সম্মানিত এই পবিত্র মাস
বয়ে আনুক কল্যাণধারা,
আল্লাহর প্রেমে উদ্ভাসিত হোক
মানবজীবনের প্রতিটি পারা।

মহররমের চাঁদ উঠুক মনে,
ইমানের আলো জ্বলুক প্রাণে;
ত্যাগ, তওবা, ধৈর্য, আমলে—
জীবন হোক রবের সন্তোষখানে।

***

মহররম এলো নীরব ডাকে,
চাঁদের কিরণ মেখে আকাশে,
নতুন বছরের প্রথম প্রহর
দাঁড়ায় ইতিহাসের পাশে।

সময়ের নদী বহমান স্রোতে
কত যুগ গেল হারিয়ে দূরে,
তবু কিছু দিন অমর হয়ে
জেগে থাকে মানব-সুরে।

মহররম তেমন এক মাস,
সম্মানের দীপ্ত মহীয়ান নাম,
যার প্রতিটি দিন স্মরণ করায়
আল্লাহর অনন্ত কালাম।

বারো মাসের মাঝে তিনি
চারটিকে দিলেন বিশেষ মান,
রজব, জিলকদ, জিলহজ আর
মহররম পেল সম্মান।

তাই তো এ মাস পুণ্যের বাগান,
তাই তো এ মাস নূরের দ্বার,
তাই তো এ মাস হৃদয় জাগায়
তাকওয়ার সুমহান আহ্বান আর।

এ মাস এলে স্মরণে আসে
হিজরতের সেই গৌরবগাঁথা,
ত্যাগের রক্তে লেখা হয়েছিল
ঈমানের এক অমর কথা।

মক্কার পথে অত্যাচারের
কালো মেঘে ঢেকেছিল দিগন্ত,
সত্যের বাণী থামাতে চেয়েছিল
জাহেলিয়াতের অহংকার-অন্ত।

কিন্তু নবীর দৃঢ় পদক্ষেপ
হার মানেনি কোনো ঝড়ে,
আল্লাহর ভরসা বুকে নিয়ে
চলেছেন সত্যের পথ ধরে।

স্বদেশ ছেড়েছেন, ঘর ছেড়েছেন,
প্রিয়জন থেকেছেন বহু দূর,
তবু দ্বীনের তরে করেছেন কুরবানি,
তাই আজও তাঁর শিক্ষা ভরপুর।

হিজরতের সেই স্মৃতি আজও
মানুষকে দেয় নতুন আলো,
বিপদের মুখে ভেঙে না পড়ে
এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় ভালো।

মহররম শুধু ক্যালেন্ডারের
প্রথম মাসের পরিচয় নয়,
এ আত্মজাগরণ, আত্মসমীক্ষা,
ভুলের পথ হতে ফিরে রয়।

নিজেকে জিজ্ঞাসা করো আজ,
কতটুকু আমল হলো সঠিক?
কতটুকু সময় কেটে গেল
গাফিলতির আঁধারে নির্দ্বিধিক?

কত নামাজ হলো কাজা,
কত দোয়া রইল অপূর্ণ,
কত সুযোগ হারিয়ে ফেলেছি
অবহেলায় হয়ে শূন্য?

এসো তবে নতুন বছরে
নতুন করে করি শুরু,
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে
হই আল্লাহভীরু।

এরই মাঝে আসে আশুরা,
দশম দিনের পবিত্র নাম,
ফজিলত যার আকাশসম,
অগণিত যার মহিমান্বিত ধাম।

কত নবীর স্মৃতি জড়ানো
আশুরার এ পুণ্য দিনে,
কত রহমতের দ্বার উন্মুক্ত
করুণার সুধা বর্ষণে।

আদম (আ.) পেলেন সৃষ্টি-সম্মান,
মানবতার হলো সূচনা,
আল্লাহর কুদরতের নিদর্শনে
খুলল জীবনের অঙ্গনা।

নুহ (আ.)-এর নৌকা ভিড়ল
দীর্ঘ প্লাবনের অবসানে,
ধৈর্যের বিজয় ঘোষিত হলো
রহমতের অপর আহ্বানে।

ইবরাহিম (আ.) অগ্নিকুণ্ডে
অবিচল ছিলেন ঈমান নিয়ে,
আগুনও হলো শীতল তখন
রবের আদেশ বুকে দিয়ে।

ইউনুস (আ.) গভীর অন্ধকারে
মাছের উদরে করলেন মিনতি,
তওবার অশ্রু, ধৈর্যের আলো
খুলে দিল মুক্তির গতি।

আইয়ুব (আ.) দীর্ঘ পরীক্ষায়
অটল ছিলেন বছরের পর বছর,
আশুরার দিনে পেলেন শিফা,
মুছে গেল দুঃখের প্রহর।

ইয়াকুব (আ.)-এর অশ্রুসিক্ত চোখে
ফিরল ইউসুফের হাসি,
বিরহের মরুভূমি পেরিয়ে
মিলনের ফুল ফুটল খাঁটি।

সুলাইমান (আ.) ফিরে পেলেন
হারানো রাজ্যের মহিমা,
আল্লাহর দানেই মানুষ পায়
সম্মান, শক্তি ও প্রতিভা।

মুসা (আ.) পেলেন বিজয়,
ডুবে গেল ফেরাউনের দম্ভ,
সত্যের শক্তি চিরদিনই
মিথ্যার প্রাচীর করে ভঙ্গ।

নীল নদীর বুক চিরে তখন
মুক্তির পথ হয়েছিল খোলা,
আল্লাহর কুদরতের সামনে
ক্ষমতা সব হয়েছিল ভোলা।

এই কারণেই আশুরার দিনে
রোজা রাখত ইহুদির দল,
নবীজি বললেন—আমরাই অধিক
মুসার উত্তরাধিকারী সফল।

তাই তিনি দিলেন শিক্ষা,
স্বাতন্ত্র্যের এক সুন্দর রীতি,
দশের সাথে নয় কিংবা এগারো,
রাখো রোজা ভরে প্রীতি।

আশুরার রোজা মহামূল্যবান,
ফজিলত যার অপরিসীম,
এক বছরের সগিরা গুনাহ
মাফের আশা করেন রহিম।

তাই এ দিনে শুধু উপবাস নয়,
হোক আত্মার পরিশুদ্ধি,
হোক হৃদয়ে আল্লাহপ্রেম,
হোক তাকওয়ার সমৃদ্ধি।

মহররম শেখায় ধৈর্যের ভাষা,
শেখায় বিপদে না হার মানতে,
আল্লাহর প্রতি অটল ভরসায়
ঝড়ের মাঝেও পথ চিনতে।

মহররম শেখায় বিনয়ের দীপ,
অহংকার হতে দূরে থাকা,
মানুষকে মানুষ জেনে সদা
ভালোবাসার হাত বাড়ানো শেখা।

মহররম শেখায় ক্ষমার কথা,
হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে যেতে,
শেখায় দয়া, শেখায় মমতা,
অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে।

মহররম শেখায় সত্যের পথে
অটল থাকার মহাশপথ,
মিথ্যার সাথে আপস না করে
ধরে রাখতে ন্যায়ের রথ।

আজও পৃথিবীর পথে পথে
জুলুম, লোভ আর বিভেদ রয়,
তাই মহররম বারবার এসে
মানবতাকে নতুন ডাক দেয়।

হৃদয় যদি কলুষে ভরে,
ধুয়ে ফেলো তওবার জলে,
অন্ধকার যদি গ্রাস করতে চায়,
কুরআনের আলো জ্বালো মনে।

নামাজ হোক জীবনের শক্তি,
কুরআন হোক পথের দিশা,
সুন্নাহ হোক কর্মের মানদণ্ড,
তাকওয়া হোক শ্রেষ্ঠ দীক্ষা।

পিতা-মাতার সেবায় থাকুক
সন্তানের শ্রদ্ধার পরশ,
আত্মীয়তার বন্ধন হোক দৃঢ়,
ভালোবাসায় কাটুক বর্ষ।

প্রতিবেশীর সুখে সুখী হব,
দুঃখে হব সহমর্মী,
মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াক,
এ হোক জীবনের কর্মধর্মী।

মহররমের নবচাঁদ দেখে
উঠুক দোয়া হৃদয় ভরে—
হে আল্লাহ! আমাদের জীবন
রেখো তোমার রহমত ঘিরে।

আমাদের গুনাহ মাফ করো,
ক্ষমা করো ভুল ও ত্রুটি,
হৃদয় ভরাও ঈমান-নূরে,
দাও আমলের মহাসমৃদ্ধি।

হিজরতের শিক্ষা দাও প্রাণে,
ত্যাগের শক্তি দাও অন্তরে,
আশুরার নূর জাগুক সদা
আমাদের প্রতিটি প্রহরে।

মহররম হোক নবজাগরণ,
মহররম হোক আত্মশুদ্ধি,
মহররম হোক ন্যায়ের পতাকা,
মহররম হোক সত্যবুদ্ধি।

মহররম হোক ধৈর্যের আলো,
মহররম হোক প্রেমের গান,
মহররম হোক কল্যাণধারা,
মহররম হোক শান্তির দান।

চাঁদের মতো নির্মল হোক
আমাদের প্রতিটি প্রাণ,
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে
কাটুক জীবনের প্রতিক্ষণ।

মহররমের পবিত্র বারতা—
তওবা, তাকওয়া, ধৈর্য আর দান;
আশুরার রোজা, হিজরতের শিক্ষা—
এতেই উজ্জ্বল মুমিনের প্রাণ।

সম্মানিত এই মহিমান্বিত মাস
আনুক রহমত, বরকত, কল্যাণ;
আল্লাহর প্রেমে উদ্ভাসিত হোক
মানবতার সমগ্র বিশ্বভুবন।

***

আবার এলো মহররম,
নববর্ষের প্রথম ভোর,
আকাশজুড়ে নীরব সুরে
বাজে ইতিহাসের মধুর ঝংকার।

চাঁদের কাস্তে উঠেছে আজ
সময়ের নতুন দিগন্তে,
বয়ে আনে সে স্মৃতির বার্তা
অতীতের গৌরব-অলিন্দে।

এ মাস শুধু মাসের নাম নয়,
এ এক পবিত্র আহ্বান,
মানুষকে ফিরিয়ে আনে
রবের সান্নিধ্যের সম্মান।

আল্লাহর সৃষ্ট মহাকালের
বারো মাসের মাঝে,
চারটি মাস বিশেষ মর্যাদায়
উজ্জ্বল অনুপম সাজে।

রজব, জিলকদ, জিলহজ,
আর মহররম মহান,
এদের বুকে বর্ষিত হয়
রহমতের অফুরান দান।

মহররম মানে সম্মান,
মহররম মানে নূরের পথ,
মহররম মানে আত্মশুদ্ধি,
সত্যের দিকে দৃঢ় রথ।

এ মাস এলেই মনে পড়ে
হিজরতের সে মহাযাত্রা,
যেখানে ত্যাগের দীপ জ্বেলে
জেগেছিল ইসলামের প্রভাতরা।

মক্কার পথে নির্যাতনের
অন্ধকারে ঘেরা দিন,
তবু নবী ছিলেন অবিচল,
অটুট ছিল ঈমান-চিন।

স্বদেশ ছেড়ে, ঘর ছেড়ে,
প্রিয়জনের মায়া ত্যাগ,
আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের তরে
করেছিলেন সর্বোচ্চ রাগ।

মদিনার পথে সেই যাত্রা
ছিল না কোনো সাধারণ গমন,
তা ছিল মানব ইতিহাসে
সত্যের মহিমান্বিত জয়গান।

তাই তো হিজরি নববর্ষ এলে
জাগে হৃদয়ে নতুন আলো,
অতীত ভুলে নয়, শিক্ষা নিয়ে
আগামীর পথে চলা ভালো।

এসো আজ আত্মাকে জিজ্ঞেস করি—
কেমন কাটল বিগত কাল?
ইবাদতের বাগান কি শুকিয়েছে,
নাকি ফুটেছে আমলের জাল?

কতবার ভুল করেছি আমরা,
কতবার পথ হয়েছে ক্ষীণ,
কতবার দুনিয়ার মোহে পড়ে
ভুলেছি আখিরাতের ঋণ?

এসো তবে নতুন বছরে
নতুন করে করি অঙ্গীকার,
আল্লাহর পথে জীবন গড়ব,
হবে না আর অবহেলার ভার।

এরই মাঝে আসে আশুরা,
মহররমের দশম দিন,
যার ইতিহাস জ্বলজ্বল করে
যুগের পরে যুগের ঋণ।

আদম (আ.)-এর সৃষ্টি-গাঁথা,
নুহ (আ.)-এর তরীর জয়,
ইবরাহিমের অগ্নি-পার,
সবই আশুরার মহিমাময়।

ইউনুস (আ.) মুক্তি পেলেন
অন্ধকারের গভীর তল,
আইয়ুব (আ.) রোগমুক্ত হলেন,
শেষ হলো দুঃখের জল।

ইয়াকুব পেলেন ইউসুফকে,
মিলনের সে অনুপম ক্ষণ,
সুলাইমান ফিরে পেলেন
হারানো রাজ্যের সম্মান।

মুসা (আ.)-এর বিজয়গাথা
জাগে আশুরার মহাদিনে,
ফেরাউনের অহংকার ডুবে
ইতিহাসের গভীর ঋণে।

নীল নদীর উত্তাল বুকে
খুলে গেল মুক্তির দ্বার,
আল্লাহর কুদরতের সামনে
মুছে গেল অত্যাচারের ভার।

তাই তো আশুরার রোজা
শুধু ক্ষুধার পরীক্ষা নয়,
এ আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি,
তাকওয়ার অনুপম পরিচয়।

নবীজি দিলেন সুসংবাদ—
আশার আলো ভরা বাণী,
এক বছরের গুনাহ মাফের
রহমত এতে দান করেছেন তিনি।

তাই এ দিনে রোজা রাখো,
নয় কিংবা দশ ও এগারো,
সুন্নতের পথে জীবন গড়ে
আল্লাহর প্রেমে হৃদয় ভরো।

মহররম শেখায় ধৈর্যের গান,
ঝড়ের মাঝে দাঁড়াবার শক্তি,
শেখায় তওবা, শেখায় বিনয়,
শেখায় ইখলাসের ভক্তি।

শেখায় সত্যকে ভালোবাসতে,
শেখায় অন্যায় রুখে দাঁড়াতে,
শেখায় মানুষের দুঃখে সাড়া দিয়ে
ভালোবাসার হাত বাড়াতে।

আজও যখন পৃথিবীজুড়ে
হিংসা, লোভ আর বিভেদ রয়,
মহররম তখন নীরব কণ্ঠে
মানবতাকে নতুন ডাক দেয়।

বলে—ফিরে এসো স্রষ্টার পথে,
ফিরে এসো নূরের দ্বারে,
ক্ষমা, দয়া, প্রেমের আলো
ছড়িয়ে দাও সংসার ভরে।

নামাজ হোক জীবনের প্রাণ,
কুরআন হোক পথের দিশা,
সুন্নাহ হোক কর্মের আলো,
তাকওয়া হোক শ্রেষ্ঠ শিক্ষা।

পিতা-মাতার সেবায় হোক
আমাদের জীবনের জয়,
প্রতিবেশীর মুখে ফুটুক হাসি,
মানবতা হোক পরিচয়।

অসহায়ের অশ্রু মুছিয়ে
হই কল্যাণের পথিক,
মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিই
সৌহার্দ্যের অমল বার্তালিপি।

মহররমের নবচাঁদ দেখে
উঠুক দোয়া গভীর প্রাণে—
হে আল্লাহ! রাখো আমাদের
তোমার রহমতের ছায়াতলে।

ক্ষমা করো সব অপরাধ,
মুছে দাও অন্তরের কালিমা,
ঈমান, আমল, ইখলাস দিয়ে
ভরিয়ে দাও জীবনের সীমা।

হিজরতের শিক্ষা দাও অন্তরে,
আশুরার নূর দাও প্রাণে,
সত্য, ত্যাগ আর তাকওয়ার পথে
চলতে দাও আমৃত্যু টানে।

মহররম হোক জাগরণের নাম,
মহররম হোক কল্যাণের গান,
মহররম হোক ন্যায়ের পতাকা,
মহররম হোক ঈমানের প্রাণ।

মহররমের চাঁদ উঠুক মনে,
তাকওয়ার সুবাস ভাসুক প্রাণে;
আশুরার রোজা, হিজরতের শিক্ষা—
আলোকিত করুক জীবনখানে।

সম্মানিত এ পবিত্র মাস
আনুক রহমত, বরকত, শান্তি;
আল্লাহর প্রেমে উদ্ভাসিত হোক
মানবতার চিরন্তন কান্তি।

মন্তব্য করুন

ব্লগ