Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ জুন, ২০২৬ ০৫:২৩ পূর্বাহ্ণ

দুনিয়ার জীবন : যেন শেষ বিকেলের রোদ

বিকেলের শেষ রোদে এক ধরনের অদ্ভুত সৌন্দর্য থাকে। সূর্যের আলো তখন আর মধ্যাহ্নের মতো তীব্র নয়; কোমল, ম্লান ও বিষণœ হয়ে আসে। চারদিকে সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের ভেতর লুকিয়ে থাকে বিদায়ের ইঙ্গিত। কিছুক্ষণ পরই অন্ধকার নেমে আসবে। মানুষের জীবনও অনেকটা তেমন। জন্মের উজ্জ্বল সকাল, যৌবনের তপ্ত দুপুর পেরিয়ে একসময় জীবন পৌঁছে যায় শেষ বিকেলের আলোয়। তখন মানুষ বুঝতে শুরু করে যা কিছু নিয়ে এত অহংকার, এত ব্যস্ততা, এত প্রতিযোগিতা, সবই আসলে ক্ষণস্থায়ী।
মানুষ পৃথিবীতে আসে চিরদিন থাকার স্বপ্ন নিয়ে, অথচ পৃথিবী কাউকে স্থায়ী ঠিকানা দেয় না। একটি শিশু জন্ম নেয়, তার হাসিতে পরিবার আনন্দে ভরে ওঠে। ধীরে ধীরে সে বড় হয়, স্বপ্ন দেখে, সংগ্রাম করে, সফলতা খোঁজে। একসময় সে নিজেই পরিবারের কর্তা হয়। তারপর হঠাৎ করেই আয়নায় দেখতে পায় চুলে পাক ধরেছে, মুখে বয়সের রেখা। যৌবনের তেজ কোথায় হারিয়ে গেল, সে নিজেও জানে না। যেন দুপুরের প্রখর সূর্য অজান্তেই বিকেলের শেষ আলোতে রূপ নিয়েছে।


গ্রামের মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে গেলে বিকেলের শেষ রোদে এক ধরনের নীরবতা অনুভূত হয়। মাঠ থেকে কৃষক ফিরে আসে, গরুগুলো ধীরে ধীরে গোয়ালমুখী হয়, পাখিরা বাসায় ফেরে। সেই দৃশ্য যেন মানুষকে মনে করিয়ে দেয় প্রতিটি প্রাণীকেই একসময় ফিরে যেতে হয়। দুনিয়ার সমস্ত ব্যস্ততার শেষ আছে। মানুষ যত দূরেই যাক, শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরে আসতে হয় মাটির কাছেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘পার্থিব জীবন তো কেবল ধোঁকার সামগ্রী।’ (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)। এই আয়াতের গভীরতা মানুষ তখনই উপলব্ধি করে, যখন জীবনের শেষ বিকেল সামনে এসে দাঁড়ায়। যুবক বয়সে মানুষ ভাবে, তার হাতে অনেক সময় আছে। সে নামাজ পরে পড়বে, ভালো কাজ পরে করবে, পরিবারকে সময় পরে দেবে, অন্যায়ের জন্য পরে তওবা করবে। কিন্তু সময় কাউকে অপেক্ষা করে না। বিকেলের সূর্য যেমন দ্রুত অস্ত যায়, জীবনও তেমনি দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য হলো সময় সবকিছু বদলে দেয়। একসময় যে স্কুল মাঠে শিশুরা চিৎকার করে খেলত, আজ সেখানে নীরবতা। যে বাড়িতে একসময় উৎসব হতো, আজ সেখানে তালা ঝুলছে। যে মানুষ একসময় ক্ষমতার অহংকারে অন্যকে তুচ্ছ করত, আজ সে কবরের নিচে নিশ্চুপ। সময় যেন এক অদৃশ্য নদী, যা সবকিছুকে ধীরে ধীরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, সে দুনিয়াকে স্থায়ী মনে করে। সে বাড়ি বানায় এমনভাবে যেন চিরকাল সেখানে থাকবে। সম্পদ জমায় এমনভাবে যেন মৃত্যু কখনো আসবে না। অথচ মৃত্যু মানুষের সবচেয়ে নিশ্চিত সঙ্গী। কবরস্থানে গেলে এই সত্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে ধনী-গরিব, নেতা-শ্রমিক, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই একই মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে। কবর কোনো পরিচয় মানে না। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তুমি দুনিয়ায় এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন পথিক বা মুসাফির।’ এই হাদিস মানুষের জীবনের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে। মানুষ এই পৃথিবীর মালিক নয়; সে কেবল অস্থায়ী যাত্রী। কিন্তু মানুষ যাত্রী হয়েও নিজেকে মালিক ভাবতে শুরু করে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় অহংকার, হিংসা, লোভ ও অন্যায়।
আজকের সমাজে মানুষ সময়ের মূল্য ভুলে গেছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থের প্রতিযোগিতা ও ভোগবাদ মানুষের মনকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, সে নিজের আত্মাকেও ভুলে যাচ্ছে। পরিবারে একসঙ্গে বসে কথা বলার সময় নেই, সন্তানকে আদর্শ শেখানোর সময় নেই, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে বসার সময় নেই। সবাই ব্যস্ত, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে সেটি কেউ জানে না।
ইসলাম মানুষকে বিনয় শেখায়। যেন সে বুঝতে পারে তার জীবন শেষ বিকেলের রোদের মতো ক্ষণস্থায়ী, সে কখনো অহংকার করতে পারে না। কবরের নীরবতা মানুষকে যে শিক্ষা দেয়, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তা দিতে পারে না। সেখানে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সম্পদ নয়, তার আমল। একজন মানুষ মৃত্যুর পর তার ব্যাংক ব্যালেন্স সঙ্গে নিতে পারে না, কিন্তু তার ভালো কাজ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। একজন শিক্ষক তার ছাত্রদের মধ্যে বেঁচে থাকেন। একজন সৎ মানুষ মানুষের দোয়ায় বেঁচে থাকেন। একজন মা তার সন্তানের চরিত্রে বেঁচে থাকেন। কিন্তু যে মানুষ শুধু সম্পদ আর অহংকারের পেছনে ছুটেছে, মৃত্যুর পর খুব দ্রুতই সে বিস্মৃত হয়ে যায়।
বিকেলের আলো মানুষকে মুগ্ধ করে, কিন্তু সেই আলো ধরে রাখা যায় না। পৃথিবীর সুখও তেমন। মানুষ যতই সুখ ধরে রাখতে চায়, সময় তা কেড়ে নেয়। তাই প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে এই ক্ষণস্থায়ী জীবনকে চিরস্থায়ী জীবনের প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবহার করে। আখিরাতের ধারণা মানুষকে দায়িত্বশীল করে তোলে। সে জানে, এই জীবনের প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে। তাই সে অন্যায় থেকে দূরে থাকে, মানুষের উপকার করার চেষ্টা করে, সময়কে মূল্য দেয়। কারণ সে বুঝে—শেষ বিকেলের রোদ বেশিক্ষণ থাকে না।
আজ প্রয়োজন মানুষকে আবার সময় ও মৃত্যুর বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। কারণ যে সমাজ মৃত্যুকে ভুলে যায়, সে সমাজ নৈতিকতাও হারিয়ে ফেলে। তখন দুর্নীতি বাড়ে, মানুষ নিষ্ঠুর হয়, সম্পর্ক ভেঙে যায়। মৃত্যুচিন্তা মানুষকে কোমল করে, মানবিক করে, দায়িত্বশীল করে। শেষ বিকেলের রোদ যখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, তখন আকাশে অন্ধকার নামে। মানুষের জীবনও একদিন তেমনি থেমে যাবে। তখন আর কোনো পদ-পদবি, সম্পদ বা অহংকার কাজে আসবে না। কাজে আসবে শুধু সৎকর্ম, মানুষের ভালোবাসা এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। তাই মানুষের উচিত জীবনের এই ক্ষণস্থায়ী বিকেলকে অর্থবহ করে তোলা। সময়কে অপচয় না করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পরিবারকে ভালোবাসা, সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকা। কারণ দুনিয়ার জীবন সত্যিই শেষ বিকেলের রোদের মতো সুন্দর, মায়াময়, কিন্তু খুব অল্প সময়ের জন্য।

মন্তব্য করুন

ব্লগ