সিনিয়র শিক্ষক
২৬ জুন, ২০২৬ ০৩:৩৬ অপরাহ্ণ
দৃশ্যপটের মায়াবনে মননের অন্ত্যেষ্টি: ডিজিটাল যুগে শিক্ষার সংকট ও উত্তরণের ইশতেহার
দৃশ্যপটের মায়াবনে মননের অন্ত্যেষ্টি: ডিজিটাল যুগে শিক্ষার সংকট ও উত্তরণের ইশতেহার
ভূমিকা
প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করি; সন্ধ্যায় ফিরে বসি লেখার টেবিলে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যবর্তী নীরব সেতুতেই আজকাল আমাকে সবচেয়ে বেশি তাড়া করে একটি প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই জ্ঞানের যুগে প্রবেশ করেছি, নাকি তথ্যের অবিরাম স্রোতে চিন্তার শক্তিকেই বিসর্জন দিচ্ছি?
আমরা এমন এক ডিজিটাল উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষের মস্তিষ্কের আকার কমছে না, কিন্তু মনোযোগের পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সূর্যোদয়ের আগেই মোবাইলের নীল আলো আমাদের চোখ ভিজিয়ে দেয়; অথচ সেই আলো জ্ঞানের দীপশিখা জ্বালানোর পরিবর্তে অনেক সময় কেবল মনোযোগের বিচ্ছুরণ ঘটায়। মনে রাখার ক্ষমতা ক্রমশ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে; অনুভব, বিশ্লেষণ ও আত্মসমালোচনার জায়গা দখল করে নিচ্ছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা এবং ‘ভিউ’-নির্ভর আত্মপরিচয়।
চারদিকে ক্লিকবেটের কোলাহল, অথচ গভীর নীরবতার জন্য মানুষের ধৈর্য যেন বিলুপ্তপ্রায়। চিন্তার দীর্ঘ পথ আজ প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে ষাট সেকেন্ডের উত্তেজনার কাছে।
শ্রেণিকক্ষ ও লেখার টেবিল—উভয় ক্ষেত্র থেকেই আমার পর্যবেক্ষণ একটি সতর্ক সংকেত উচ্চারণ করে। জঁ বোদ্রিয়ারের ভাষায়, আমরা এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছি, যেখানে প্রতিরূপ অনেক সময় বাস্তবের চেয়েও অধিক প্রভাবশালী। সেই বাস্তবতার মধ্যেই শিক্ষা, সাহিত্য ও মানবিক বোধের অবস্থান নতুন করে মূল্যায়নের দাবি জানাচ্ছে।
১. চিন্তার গভীর কূপে শ্যাওলা
একজন শিক্ষক হিসেবে লক্ষ্য করি, অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রেখে কোনো জটিল বিষয় অনুধাবনের প্রবণতা কমে যাচ্ছে। হার্বার্ট মার্কিউজ যে একমাত্রিক মানুষের কথা বলেছিলেন, ডিজিটাল সংস্কৃতির কিছু দিক যেন সেই একমাত্রিকতাকেই আরও ত্বরান্বিত করছে।
আজ "কেন" কিংবা "কীভাবে" প্রশ্ন করার পরিবর্তে অনেকেই খোঁজে—"সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশটি কোথায়?" সাহিত্য, দর্শন কিংবা ইতিহাসের জটিল আলোচনা ধৈর্যের দাবি করে; কিন্তু অ্যালগরিদমনির্ভর দ্রুত বিনোদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সেই ধৈর্য ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
শিক্ষা যখন অনুসন্ধানের পরিবর্তে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, আর পাঠ যখন উপলব্ধির পরিবর্তে সারাংশ মুখস্থ করার অনুশীলনে পরিণত হয়, তখন চিন্তার গভীর কূপে শ্যাওলা জন্মায়। কাফকার সতর্কবাণী আজও প্রাসঙ্গিক—পাঠহীনতা কেবল জ্ঞানের অভাব নয়; তা আত্মপরিচয়েরও সংকট সৃষ্টি করে।
২. দৃশ্যমানতার সংস্কৃতি ও নৈতিকতার অবক্ষয়
ডিজিটাল যুগ মানুষের সামনে আত্মপ্রকাশের অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সেই সুযোগ যখন কেবল জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন মূল্যবোধের জায়গায় স্থান নেয় দৃশ্যমানতার লালসা।
অনেক তরুণ সৃজনশীলতার পরিবর্তে ভাইরাল হওয়ার শর্টকাট খোঁজে। কখনও ব্যক্তিগত বেদনা, কখনও পারিবারিক সম্পর্ক, কখনও সামাজিক শালীনতাকেও কনটেন্টে পরিণত করা হয়। ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়—যা বেশি দেখা যায়, সেটিই বেশি মূল্যবান।
এই প্রবণতা কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়; এটি সাংস্কৃতিক রুচিরও অবক্ষয়। কারণ সভ্যতার শক্তি জনপ্রিয়তায় নয়, চরিত্রে; করতালিতে নয়, বিবেকে।
৩. সৃজনশীলতার মরুভূমি
আমাদের শৈশবের খেলার মাঠ, পাঠাগার, সাহিত্যসভা, বিজ্ঞান ক্লাব—এসব ছিল কল্পনা ও সৃজনশীলতার উর্বর ভূমি। আজ সেগুলোর অনেকগুলোই নীরব।
একটি গল্প লিখতে মাসের পর মাস শ্রম দিতে হয়; একটি গবেষণা সম্পন্ন করতে বছরের পর বছর অধ্যবসায় প্রয়োজন। অথচ কয়েক সেকেন্ডের চটকদার বিনোদন মুহূর্তেই লাখো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।
এই তাৎক্ষণিক পুরস্কারের সংস্কৃতি মানুষের মস্তিষ্ককে দীর্ঘমেয়াদি সাধনার আনন্দ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে অপেক্ষা, অধ্যবসায় এবং গভীর মনোনিবেশ—যে তিনটি গুণ সৃজনশীলতার ভিত্তি, সেগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
আমার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই—আমরা যেন সোনার খনি ছেড়ে কাঁচের টুকরো সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি।
৪. তথ্যের বিষবাষ্প ও গুজবের বিস্তার
ডিজিটাল প্রযুক্তি তথ্যপ্রাপ্তিকে গণতান্ত্রিক করেছে; কিন্তু একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও বহুগুণ বাড়িয়েছে।
যাচাইহীন পোস্ট, বিকৃত ছবি, সম্পাদিত ভিডিও এবং অসম্পূর্ণ তথ্য মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেক সময় আবেগ যুক্তির ওপর প্রাধান্য পায়; সত্য অপেক্ষা দ্রুততা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বার্ট্রান্ড রাসেলের পর্যবেক্ষণ আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক—অজ্ঞতা প্রায়ই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস জন্ম দেয়, আর প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়।
তাই ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে জরুরি দক্ষতা কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়; বরং তথ্য যাচাই করার সক্ষমতা।
উত্তরণের পথ: কলম হোক বিবেকের প্রতিরোধ
শুধু প্রযুক্তিকে দায়ী করলেই সমাধান আসবে না। প্রযুক্তি যেমন সংকট তৈরি করতে পারে, তেমনি সঠিক ব্যবহারে জ্ঞানের নতুন দিগন্তও উন্মোচন করতে পারে। প্রয়োজন দায়িত্বশীল ব্যবহার, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং মানবিক শিক্ষা।
প্রথমত, শিক্ষাক্রমে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিবারে স্ক্রিন ব্যবহারের পাশাপাশি বইপড়া, আলোচনার সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ে সাহিত্যচর্চা, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে আবার প্রাণবন্ত করতে হবে।
চতুর্থত, লেখক, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের এমন লেখা সৃষ্টি করতে হবে, যা কেবল ভিউ নয়, দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে; কেবল বিনোদন নয়, বিবেককে জাগিয়ে তোলে।
পঞ্চমত, আমাদের তরুণদের সামনে প্রকৃত নায়কদের তুলে ধরতে হবে—যারা গবেষণাগারে, পাঠাগারে, মাঠে কিংবা সমাজসেবায় নীরবে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছেন।
পরিশেষ
এই ‘ভিউ-পিশাচ’ হয়তো আমাদের সময়ের এক জটিল সামাজিক জ্বর। কিন্তু প্রতিটি জ্বরেরই প্রতিষেধক আছে।
আমাদের সেই প্রতিষেধকের নাম—গভীর পাঠ, মুক্তচিন্তা, নৈতিক শিক্ষা, প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং সৃজনশীল শ্রম।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন স্বাধীন চিন্তার সাহস, নজরুল শিখিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, লালন শিখিয়েছেন আত্মঅন্বেষণ, আর জীবনানন্দ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন মাটির গভীর নীরবতায়। এই শেকড়ের আলো নিয়েই আমাদের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে।
কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার স্ক্রিনের উজ্জ্বলতায় নয়, তার মননের দীপ্তিতে।
আসুন, ভিউয়ের নয়—বিবেকের আলোয় আলোকিত একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যয়ে আমরা আবার কলম ধরি।
মুফিদুল আলম
রামু, কক্সবাজার
২৬ জুন ২০২৬
১৪
২৪ মন্তব্য