Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৯ জুন, ২০২৬ ০৬:৫১ অপরাহ্ণ

সবুজ পৃথিবীর শেষ চিঠি!



সবুজ পৃথিবীর শেষ চিঠি!

নিলয় যখন চিঠিটা প্লাস্টিকের একটা বায়ুরুদ্ধ ক্যাপসুলে ভরছিল, তখন তার হাত দুটো কাঁপছিল। ২০২৬ সালের মানুষের কাছে এই চিঠি কোনোদিন পৌঁছাবে কি না, সে জানে না। কিন্তু মা বলতেন, "চেষ্টা করতে দোষ কী? মানুষ যদি জানতে পারে তারা কী হারাতে চলেছে, হয়তো তারা শুধরে যাবে।"

আজ ২০৯৬ সাল। নিলয় তার ভাঙা জানালার পাশে বসে ধূসর আকাশের দিকে তাকাল। এখানে আকাশ নীল হয় না, মেঘগুলো সবসময় বিষাক্ত হলদেটে রঙের। নিচে রইল সেই চিঠি, যা সে লিখেছে অতীতের সেই মানুষদের উদ্দেশ্যে, যারা একদিন এই পৃথিবীকে সুন্দর দেখতে পেত।

তারিখ: ২৩ মে, ২০৯৬

স্থান: ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র ৪, সেক্টর-বি

প্রিয় অতীতের মানুষ,

কেমন আছেন আপনারা?

আমি জানি না এই চিঠি কোনোদিন আপনাদের হাতে পৌঁছাবে কি না। টাইম ক্যাপসুলের প্রযুক্তিটা এখনো পুরোপুরি সফল নয়, কিন্তু তীব্র এক অসহায়ত্ব থেকে আপনাদের এই চিঠি লিখছি। আমার নাম নিলয়। আমার বয়স এখন বারো বছর। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলেছেন, দূষিত বাতাস আর কৃত্রিম অক্সিজেনের অভাবে আমার ফুসফুস আর বেশিদিন টিকবে না।

আজ আপনাদের একটা গল্প বলি। আমার মা যখন ছোট ছিলেন, তাঁর নানি নাকি তাঁকে 'সবুজ বন' আর 'বৃষ্টির' গল্প শোনাতেন। মা আমাকে বলতেন, আপনাদের সময়ে নাকি আকাশ থেকে টুপটুপ করে বিশুদ্ধ পানি পড়ত, যে পানিতে ভিজলে শরীর জুড়িয়ে যেত! আপনারা নাকি গাছের ছায়ায় বসে বাতাস খেতেন? মা যখন বলতেন, "নিলয়, জানিস, গাছে লাল-নীল-হলুদ রঙের ফুল ফুটত, সেখানে প্রজাপতি উড়ত," আমি তখন শুধু হা করে তাকিয়ে থাকতাম।

আমি কোনোদিন প্রজাপতি দেখিনি। আমি কোনোদিন সত্যিকারের একটা সবুজ গাছও ছুঁয়ে দেখিনি।

আমাদের পৃথিবীটা এখন পুরোপুরি ধূসর। আপনাদের সেই আমাজন, সেই সুন্দরবন—সব নাকি আপনারা কেটে শহর বানিয়েছিলেন? আপনারা যখন গাছ কাটছিলেন, আপনারা কি একবারও ভাবেননি আমাদের কথা? আপনারা যখন বুক ভরে তাজা বাতাসে শ্বাস নিতেন, তখন কি একবারও মনে হয়নি যে, ভবিষ্যতের একটা শিশু অক্সিজেনের এক একটা সিলিন্ডারের জন্য ছটফট করবে?

আজ আমাদের এখানে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস নেই। বাইরে বের হতে হলে আমাদের ভারী স্পেস-স্যুটের মতো পোশাক আর অক্সিজেন মাস্ক পরতে হয়। তাও বিষাক্ত গ্যাস চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। নদীগুলোর পানি এখন কালো আর ঘন এসিডের মতো। তীব্র তাপদাহে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, আবার পরক্ষণেই এমন অ্যাসিড বৃষ্টি হয় যে প্লাস্টিকের ছাতাও গলে যায়।

মাঝে মাঝে রাতে আমি আর মা মাটির নিচে বসে কাঁদি। মা বলেন, "আমাদের পূর্বপুরুষেরা খুব লোভী ছিলেন নিলয়। তারা শুধু আজকের কথা ভেবেছেন, আগামীকালের কথা ভাবেননি।"

আমি আপনাদের দোষ দিতে চাই না। কিন্তু আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে—যখন আপনারা বুঝতে পারছিলেন যে প্লাস্টিকের বর্জ্যে সাগর বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে, যখন দেখছিলেন মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের স্তর বাড়ছে, যখন দেখছিলেন তীব্র গরমে পৃথিবী পুড়ছে—তখন কেন আপনারা থামলেন না? আপনাদের আরাম, আপনাদের বড় বড় গাড়ি আর কলকারখানার ধোঁয়া কি আমাদের এই ছোট্ট জীবনটার চেয়েও দামী ছিল?

আমরা তো কোনো অন্যায় করিনি। তবে কেন প্রকৃতির এই ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ আমাদের সইতে হচ্ছে? কেন আমার মতো হাজারো শিশুকে প্রতিদিন একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে?

আপনারা যখন এই চিঠিটা পড়ছেন, তখন হয়তো আপনাদের চারপাশে এখনো কিছু গাছ বেঁচে আছে। আকাশে হয়তো এখনো সাদা মেঘ ওড়ে। পাখির ডাক হয়তো এখনো শোনা যায়। আপনাদের কাছে আমার একটাই আকুতি—দয়া করে ওই শেষ গাছটাকে কেটে ফেলবেন না। দয়া করে নদীটাকে বিষাক্ত করবেন না।

আপনারা চাইলেই পারেন এই ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে। আপনাদের একটা ছোট পরিবর্তন, একটা গাছ লাগানো, প্লাস্টিক বর্জন করা—হয়তো আমার এই ধূসর পৃথিবীকে আবার সবুজ করে তুলতে পারে। হয়তো আমার মতো কোনো শিশুকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। আমাদের আর কোনো বাড়ি নেই, এই পৃথিবীটাই আমাদের একমাত্র ঘর ছিল। সেটাকে এভাবে ধ্বংস করে দেবেন না।

নিজের জন্য না হলেও, আমাদের জন্য একটু ভাবুন। আমাদের একটু বাঁচতে দিন।

ইতি,

ভবিষ্যতের এক অভাগা শিশু,

নিলয়

চিঠিটা শেষ করে নিলয় ক্যাপসুলের ঢাকনাটা শক্ত করে আটকে দিল। তারপর ঘরের এক কোণে রাখা ছোট্ট একটা কাঁচের পাত্রের দিকে তাকাল। সেখানে কৃত্রিম আলোয় পরম যত্নে সে বাঁচিয়ে রেখেছে একটা মরণাপন্ন, শুকিয়ে যাওয়া ঘাসের টুকরো।

নিলয় আলতো করে কাঁচের ওপর হাত রাখল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে ফিসফিস করে বলল, "ওদের বলো... আমরা শ্বাস নিতে পারছি না। প্লিজ, ওদের বলো..."



মন্তব্য করুন