সহকারী অধ্যাপক
০১ জুলাই, ২০২৬ ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ
পাখির কূজন, মানুষের জাগরণ - মোঃ মুজিবুর রহমান
পাখির কূজন, মানুষের জাগরণ
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
ভোরের প্রথম আলোর ছোঁয়ায়
পূবের আকাশ হাসে,
শিশিরভেজা ঘাসের ডগায়
রহমতেরই ভাষে।
ডালে ডালে পাখিরা জাগে
কিচিরমিচির সুরে,
অদৃশ্য কোনো প্রেমের টানে
ডাকে আপন সুরে।
কে শিখিয়েছে তাদের গানে
এমন মধুর তান?
কে দিয়েছে বুকের মাঝে
স্রষ্টার প্রতি টান?
তারা জানে—এক রব আছেন,
দয়াময়, পরম, মহান;
তাঁরই হুকুম মেনে চলে
সারাটি বিশ্বজগৎ প্রাণ।
কেউ বলে না, "আমি স্বাধীন,
মানবো না আর বিধান।"
তারা শুধু নতই থাকে—
এই তো তাদের জ্ঞান।
আকাশ ভরা নীলের বুকে
মেঘের কত সারি,
স্রষ্টার হুকুম পেয়ে তারা
চলে আপন ভারি।
সূর্য ওঠে সময় মেনে,
ডুবে নির্ধারিত ক্ষণে;
চাঁদ-তারারা রাতের বুকে
চলে অনন্ত গুণে।
বাতাস বয়ে জীবন আনে,
নদী সাগর পানে,
পর্বত থাকে দৃঢ় হয়ে
প্রভুর আদেশ মানে।
ফুল ফোটে আর সুবাস ছড়ায়,
ফল ধরে প্রতিক্ষণ,
প্রত্যেক কণায় লুকিয়ে আছে
স্রষ্টারই স্মরণ।
পাতার ফাঁকে মৃদু দোলায়
জিকিরেরই ধ্বনি,
ঝরনাধারা বলে নীরব—
"আল্লাহ মহান ধনি।"
পৃথিবীর প্রতিটি কণায়
তাঁরই নিদর্শন,
তাঁরই দয়ায় টিকে আছে
সমস্ত সৃজন।
আমি তবে কে এই ভুবনে?
কী আমার পরিচয়?
সৃষ্টির সেরা মানুষ আমি—
এ কিসের অহংময়?
আমায় দিলেন জ্ঞান-বিবেক,
সত্য বোঝার মন,
ভুলের পরে ফিরে আসার
তাওবারও আহ্বান।
আমায় দিলেন ভাষার শক্তি,
কলম, চিন্তার ডানা;
তবু কেন ভুলে যাই আমি
দয়াময়ের ঠিকানা?
পাখিরা তো প্রশ্ন করে না—
"কেন মানব আদেশ?"
আমি কেন অজুহাতে
হারাই ঈমানের রেশ?
আমি কেন মিথ্যা বলি?
কেন করি প্রতারণা?
কেন অন্যের হক নষ্ট করি
নিজের সুখের কারণ মানা?
কেন হিংসার আগুন জ্বালি?
কেন করি গীবত?
কেন ভুলে যাই মৃত্যুর পরে
হবে কঠিন হিসাব?
কেন চোখে অন্যায় দেখি,
তবু থাকি চুপ?
কেন হৃদয় অন্ধ হয়ে
হারায় আলোর রূপ?
যে জিহ্বা দিয়ে জিকির হতো,
সেই জিহ্বা দেয় আঘাত;
যে হৃদয়ে প্রেম ফুটত,
সেখানে জমে ক্ষোভের রাত।
যে হাত ছিল দানের জন্য,
সে হাত কেন কাঁপে?
যে পা ছিল সত্যের পথে,
ভুলের পথে ছুটে যায় চাপে।
হে মানুষ, ভেবে দেখো একবার,
কত বড় দান পেয়েছ!
আকাশ ছুঁয়ে জ্ঞান অর্জনের
অসীম দুয়ার পেয়েছ।
তোমার জন্য নবী এসেছেন,
নাজিল হয়েছে কিতাব;
তোমার জন্য জান্নাতের সুখ,
সতর্ক করেছে আজাব।
তুমি যদি হও কৃতজ্ঞ বান্দা,
খুলবে রহমতের দ্বার;
তুমি যদি হও অবাধ্য তবে
বাড়বে ক্ষতির ভার।
আজও সময় ফুরায়নি ভাই,
ফিরে এসো রবের কাছে;
করুণা তাঁর সাগরের মতো,
ক্ষমা অফুরন্ত আছে।
চোখের জলে ভিজুক সেজদা,
কাঁপুক অন্তর প্রাণ;
বলুক মুখ—
"হে প্রভু আমার, ক্ষমা করুন, রহমান।"
পাখির মতো আমরাও যেন
শিখি বিনয়ভরে,
অহংকারের মুকুট খুলে
নত হই তাঁর দ্বারে।
নদীর মতো চলি অবিরাম
সত্যের সাগর পানে,
সূর্যের মতো আলো বিলাই
মানুষের কল্যাণে।
বাতাস যেমন শীতল করে
ক্লান্ত প্রাণের ক্ষত,
আমরাও তেমনি ভালোবাসায়
মুছি দুঃখের রত।
ফুলের মতো সুবাস ছড়াই
আচরণ আর বচনে,
ক্ষমা, ধৈর্য, ন্যায়ের আলো
জ্বালাই প্রতিক্ষণে।
কোনো প্রাণে দিই না কষ্ট,
করি না অবিচার;
মানবতার সেবার মাঝে
খুঁজি প্রভুরই দ্বার।
জীবন ক্ষণিক, পথও ক্ষণিক,
থাকবে না কিছুই সাথে;
থাকবে শুধু আমলনামা
হাশরের সেই প্রাতে।
সেদিন পাখিরা সাক্ষী দেবে—
"আমরা মানতাম হুকুম।"
মানুষ তখন কী-ই বা বলবে
লঙ্ঘন করে কত বিধান!
তাই আজ থেকেই প্রতিজ্ঞা হোক—
সত্য হবে পথের সাথি;
আল্লাহর ভয়ে নম্র হৃদয়,
নেক আমল হবে সাথি।
কিচিরমিচির পাখির গানে
জাগুক ঘুমন্ত প্রাণ,
প্রতিটি শ্বাসে উচ্চারিত হোক—
রবেরই পবিত্র নাম।
হে দয়াময়, হে পরওয়ারদিগার!
আমাদের দিন হিদায়াত;
অহংকারের সব অন্ধকারে
জ্বালিয়ে দিন ঈমানের বাতি।
নাফরমানির শৃঙ্খল ভেঙে
ইবাদতে দিন স্থান;
পাখির মতো আপনার জিকিরে
ভরে উঠুক প্রাণ।
শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত যেন
আপনাকেই ভালোবাসি;
আপনারই হুকুম মানতে মানতে
হাসিমুখে জীবন ভাসি।
সকল সৃষ্টি গায় যে গান—
আমরাও গাই সেই সুর:
"আপনিই আমাদের রব,
আপনিই চির-মহান, চির-নূর।"
আমীন।
***
কিচিরমিচির তাসবীহ, মানুষের জাগরণ
ভোরের বেলা পূর্ব আকাশে
আলোর হাসি ফোটে,
শিশিরভেজা সবুজ ঘাসে
রহমতেরই নোটে।
ডালে ডালে পাখিরা জাগে
কিচিরমিচির রবে,
আপন রবের গুণগান যেন
তুলে নীরব ভবে।
কে শিখিয়েছে সেই সুরেলা
অমলিন আহ্বান?
কে ভরিয়েছে ক্ষুদ্র বুকে
অটল আনুগত্য-প্রাণ?
উড়ন্ত ডানায় লিখে চলে
আদেশ মানার গান,
নেই অহংকার, নেই অবাধ্য—
শুধুই প্রভুর মান।
আকাশজুড়ে সূর্য ওঠে
নির্ধারিতই ক্ষণে,
চাঁদের হাসি, তারার মেলা
চলে বিধান মানে।
নদী ছুটে সাগরপানে,
বাতাস বহে ধীর;
পর্বত অটল, সাগর গভীর,
সবই তাঁর অধীর।
পাতার দোলে, ফুলের গন্ধে,
বৃষ্টিধারার সুরে,
সৃষ্টিজগত স্মরণ করে
আপন রবকে নীরে।
কুরআন বলে—সব সৃষ্টি তাঁর
তাসবীহে রত সদা;
আমরা শুধু বুঝতে পারি না
সেই ভাষার ব্যঞ্জনা।
তবু আমি—মানুষ নামে
আহসানি তাকভীম,
জ্ঞান-বিবেক, চিন্তা, বোধে
পেয়েছি শ্রেষ্ঠ মর্যাদার সীম।
আমার হাতে কলম দিলেন,
দিলেন জ্ঞানের আলো;
সত্য-মিথ্যা বেছে নেওয়ার
অমূল্য শক্তি ভালো।
আমার জন্য নবী এলেন,
নাজিল হলো কিতাব;
হালাল-হারাম বুঝিয়ে দিলেন,
জান্নাত-জাহান্নামের হিসাব।
তবু কেন এই অবহেলা?
কেন এ নাফরমানি?
কেন ভুলে যাই রবের দান,
কেন এত অজ্ঞানি?
পাখি যদি না ভোলে রবকে,
আমি কেন ভুলি?
দুনিয়ার ক্ষণিক মোহের টানে
কেন হৃদয় খুলে তুলি?
যে জিহ্বা ছিল জিকিরের তরে,
কেন বলে কটু বাণী?
যে চোখ ছিল সত্যের খোঁজে,
কেন দেখে না সত্যখানি?
যে হাত ছিল দানের জন্য,
কেন বাড়ে জুলুমে?
যে পা ছিল সরল পথে,
কেন চলে অন্য ভূবনে?
হে অন্তর! জেগে ওঠো আজ,
ফিরে চলো রবের দ্বার;
তাঁর রহমত সীমাহীন,
ক্ষমা তাঁর অপার।
অশ্রুসজল সিজদায় নত
হোক প্রাণের অহংকার;
তাওবার ডাকে ভরে উঠুক
প্রতিটি রাত-দুপুর।
পাখির কূজন স্মরণ করাক—
ইবাদতেরই পথ;
আকাশ-বাতাস শেখাক এসে
আনুগত্যের রথ।
মানুষ যদি মানুষ হয়,
জাগে যদি ঈমান,
তবেই হবে সার্থক তার
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সম্মান।
হে আল্লাহ, দাও সেই হৃদয়
যেখানে নেই গর্ব;
দাও সে জিহ্বা, যে জিহ্বাতে
তোমার জিকির সর্বদা।
দাও সে চোখ, যে চোখ দেখে
তোমার নিদর্শন;
দাও সে মন, যে মন খোঁজে
তোমারই সন্তোষণ।
দাও সে জীবন, ইবাদতে যার
প্রতিটি ক্ষণ ভরা;
দাও সে মৃত্যু, ঈমান নিয়ে
যাব তোমারই ধরা।
যেদিন উঠব হাশর-মাঠে
শেষ বিচারের তরে,
আমলনামা ডান হাতে দিও
তোমার অশেষ কৃপা ভরে।
সেদিন যেন লজ্জায় নয়,
কৃতজ্ঞতায় ভাসি;
তোমার রহমত লাভের আশায়
চিরসুখের পথে হাসি।
পাখির কিচিরমিচির ধ্বনি
প্রতিদিন দিক ডাক—
"হে মানুষ! রবকে স্মরণ করো,
এখনও আছে ফাঁক।"
আসো সবাই হাতে হাত রেখে
সত্যের পথে চলি;
আল্লাহর প্রেম, রাসূলের সুন্নাহ—
জীবনের মূল বুলি।
সকল সৃষ্টি গাইছে যাঁর
মহিমারই গান,
আমরাও হই তাঁর অনুগত—
এই হোক জীবনের প্রাণ।
১৪
২৪ মন্তব্য