সহকারী অধ্যাপক
০২ জুলাই, ২০২৬ ০৪:৪৮ পূর্বাহ্ণ
অণুরও আছে হিসাব -মোঃ মুজিবুর রহমান
অণুরও আছে হিসাব
(সূরাঃ আয-যিলযাল আলোকে,আয়াতঃ ৮)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
যেদিন কাঁপবে ধরণী প্রবল কম্পন-ঢেউয়ে,
পর্বত হবে ধূলিকণা সময়ের কঠিন বেয়ায়।
সাগর থামবে, বাতাস থমকে তাকাবে বিস্ময়ে,
আকাশ খুলে দেবে তার অজানা সব পরিচয়ে।
যমীন তখন বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখা ভার,
বের করে দেবে একে একে যুগের সকল ধার।
কত ইতিহাস চাপা ছিল স্তরের নিচে গিয়ে,
সবই সেদিন প্রকাশ পাবে রবের আদেশ নিয়ে।
মানুষ তখন অবাক হয়ে বলবে চমকে চেয়ে,
"আজকে তবে পৃথিবীর এই কী হলো হে?"
কেন সে আজ নীরব নয়, কেন তার এই বাণী?
কেন সে আজ সাক্ষী হয়ে খুলছে গোপন খানি?
ধরণী বলবে—"আমি তো নই নিজের ইচ্ছার দাস,
আমার রবের আদেশেই খুলেছি সকল প্রকাশ।
যা কিছু দেখেছি যুগে যুগে বুকের ভাঁজে রেখে,
আজকে সবই বলে যাব সত্যের আলো মেখে।"
আমি দেখেছি শিশুর হাসি, মায়ের স্নেহধারা,
আমি দেখেছি লোভের আগুন, হিংসার অন্ধকার।
আমি দেখেছি গোপন রাতে অশ্রুর ইবাদত,
আবার দেখেছি লোকচক্ষুর আড়ালে বিশ্বাসঘাতকতা।
আমি দেখেছি ক্ষুধার্ত মুখে এক টুকরো আহার,
দানের হাতে ফুটে উঠেছে জান্নাতি অঙ্গার।
আমি দেখেছি মধুর বচন ভেঙেছে শত ক্ষোভ,
একটি হাসি ফিরিয়ে দিয়েছে নিরাশ হৃদয়ের রোশ।
আমি দেখেছি পথের কাঁটা কেউ সরিয়ে দেয়,
অসহায়কে কাঁধ বাড়িয়ে পাশে দাঁড়িয়ে রয়।
এক গ্লাস পানি তৃষ্ণার্তকে দিয়েছে যে প্রাণভরে,
সে দৃশ্য আমি লুকাইনি বুকের গহীন ঘরে।
আমি দেখেছি প্রতিবেশীর দুয়ারে ছোট উপহার,
অতি নগণ্য হলেও তাতে ছিল ভালোবাসার ভার।
একটি খেজুর, এক মুঠো খাদ্য, একটুখানি দান—
রবের কাছে কত অমূল্য, জানে শুধু রহমান।
আমি দেখেছি অনাথ শিশুর মাথায় স্নেহের হাত,
বৃদ্ধ পিতার কাঁপা হাতে সন্তানের মমতার প্রভাত।
একটি ক্ষমা, একটি দোয়া, একটি সত্যবাণী,
এসব দিয়েই আলোকিত হয় মানুষের জীবনী।
আবার দেখেছি কঠিন জিহ্বা বিদ্ধ করেছে প্রাণ,
মিথ্যার আগুন জ্বালিয়েছে শত সম্পর্কখান।
অহংকারের বিষবাষ্পে কালো হয়েছে মন,
ছোট গোনাহ জমে জমে গড়েছে অন্ধ গহন।
কেউ বলেছে—"এ তো সামান্য, এতেই বা কী ক্ষতি?"
সেই সামান্য ফোঁটা ফোঁটা হয়েছে পাপের স্মৃতি।
এক ফোঁটা জল যেমন গড়ে সাগরেরই ঢেউ,
ক্ষুদ্র গোনাহ জমে তেমনি ভয়ংকর হয় ঢেউ।
একটি তির্যক দৃষ্টি, একটি কটু বাক্য,
এক বিন্দু প্রতারণাতে নষ্ট কত ভাগ্য।
একটি অন্যায় স্বাক্ষর, এক ফোঁটা অবহেলা,
অণুসমান হলেও সেসব হারায় না একবেলা।
সেদিন মানুষ দলে দলে উঠবে কবর ছেড়ে,
কেউ দাঁড়াবে আশা বুকে, কেউ ভয়ে কাঁপবে ঘিরে।
কোনো পরিচয় কাজে লাগবে না সেদিন আর,
আমলই হবে একমাত্র সত্যের অধিকার।
ধন যাবে না, মান যাবে না, যাবে না উপাধি,
থাকবে শুধু কর্মফল আর জীবনের সাধনা-বাধি।
ক্ষমতা, অহং, প্রভাব, যশ—সব হবে নিশ্চুপ,
সত্যের সামনে খুলে যাবে জীবনের প্রতিরূপ।
যে দিয়েছিল একটি হাসি বিষণ্ণ মানুষের তরে,
সে দেখবে তার প্রতিদান নূরের স্রোতধারে।
যে মুছিয়েছিল কারও চোখের নীরব অশ্রুধারা,
তারই আমল জ্বলবে সেদিন দীপ্তিময় তারা।
যে ক্ষমা করেছিল কষ্ট পেয়ে প্রতিশোধ না নিয়ে,
যে সত্য বলেছিল ভয়কে অন্তরে হারিয়ে,
যে রবের ভয়ে গোপন রাতে কেঁদেছিল নিরালায়,
তার প্রতিটি অশ্রুবিন্দু ফুটবে জান্নাত-মালায়।
আর যে ভেবেছিল—"ছোট্ট পাপে কিছুই হবে না",
আজ সে দেখবে একেকটি কাজ কত ভয়ংকর জানা।
অণুর মতো ক্ষুদ্র ছিল যে অন্যায়ের দাগ,
আজ তা যেন পাহাড়সম দাঁড়ায় তারই ভাগ।
রবের বিচারে হারায় না কোনো ভালো কাজ,
হারায় না কোনো মন্দ কাজ, যত ক্ষুদ্রই আজ।
তাঁর জ্ঞানে ঢাকা থাকে না হৃদয়েরও কথা,
তিনি জানেন নীরব দীর্ঘশ্বাস, গোপন ব্যথা।
তাই হে মানুষ, ক্ষুদ্র বলে অবহেলা কোরো না,
একটি সৎকাজও কখনো তুচ্ছ মনে ধরো না।
একটি ভালো কথা হতে পারে মুক্তির দ্বার,
একটি দানেই মুছে যেতে পারে অন্ধকার।
একটি সালাম, একটি দোয়া, একটি স্নেহস্পর্শ,
একটি ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো—অশেষ মহামূল্য রশ্মি।
একটি ক্ষমা, একটি ধৈর্য, একটি সত্য বাক্য,
রবের কাছে লিখে রাখে অফুরন্ত সৌভাগ্য।
তেমনি একটি মিথ্যা কথা, একটি গোপন ছল,
একটি কটু ভাষা জ্বালিয়ে দেয় সম্পর্কের ফল।
একটি অবিচার জমে গিয়ে গড়ে অশান্তি-ঢেউ,
ক্ষুদ্র আগুন থেকেই তো জ্বলে বনভূমি ঢেউ।
চলো তবে আজ থেকেই করি হৃদয়ের হিসাব,
কোথায় আলো, কোথায় আঁধার, কোথায় জীবনের জবাব।
প্রতিটি ক্ষণ আমানত, প্রতিটি শ্বাস দান,
প্রতিটি কর্ম লিখে রাখে দয়াময় রহমান।
যেন জিহ্বা বলে সত্য বাণী, হাত বাড়ায় দানে,
চোখ নত থাকে রবের ভয়ে, মন থাকে ঈমানে।
যেন ক্ষুদ্র সৎকাজগুলো ফুল হয়ে ফোটে প্রাণে,
আর ক্ষুদ্র পাপও স্থান না পায় জীবনের আঙিনায়।
যেদিন কাঁপবে পৃথিবী, খুলবে সব ইতিহাস,
সেদিন যেন লজ্জা নয়—মেলে রহমতের সুবাস।
অণু পরিমাণ নেক আমলও হোক মুক্তির সেতু,
রবের সন্তুষ্টিই হোক জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য।
হে পরম দয়াময়!
আমাদের অন্তরকে করো সত্যের আলোকিত ঘর।
ক্ষুদ্র সৎকাজকে অবহেলা না করার তাওফীক দাও,
ক্ষুদ্র গোনাহকেও তুচ্ছ না ভাবার তাকওয়া দাও।
যেদিন যমীন বলবে আমাদের জীবনের সব কথা,
সেদিন যেন সে সাক্ষ্য দেয়—
"এই বান্দা চেষ্টা করেছে তার রবকে সন্তুষ্ট রাখতে।"
আর তোমার অসীম রহমতে আমাদের হিসাব সহজ করো।
আমীন।
অণুরও আছে সাক্ষী
যখন প্রচণ্ড কম্পনে কেঁপে উঠবে ধরণী,
ভেঙে যাবে অহংকারের শত শত কারাগারখানি।
পর্বত হবে তুলোর মতো, সাগর হবে স্তব্ধ,
সময়ের বুক চিরে তখন উঠবে সত্য নিঃশব্দ।
যমীন খুলে দেবে তার অগণিত গোপন পাতা,
যুগের পরে যুগ যে কথা রেখেছিল নীরবতা।
মানুষ বলবে—"কী হয়েছে? কেন এ অদ্ভুত রূপ?"
ধরণী তখন সত্য বুকে খুলে দেবে সব কূপ।
সে বলবে না নিজের ইচ্ছায়, বলবে না আপন মনে,
রবের দেওয়া নির্দেশ মেনে সত্যেরই আহ্বানে।
যা কিছু ঘটেছে আমার বুকে, যা কিছু দেখেছি আমি,
আজকে তারই সাক্ষ্য দেব, লুকাব না কিছুই আর আমি।
আমি দেখেছি নীরব রাতে সিজদায় ভেজা নয়ন,
দেখেছি আবার অন্যায়ে কঠিন হওয়া মন।
দেখেছি ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে তুলে দেওয়া আহার,
দেখেছি কৃপণ হৃদয় কত ফিরিয়েছে অধিকার।
আমি দেখেছি একটি হাসি ফিরিয়ে দিয়েছে প্রাণ,
একটি ভালো কথায় মুছে গেছে শত অভিমান।
একটি সালাম, একটি দোয়া, একটি সান্ত্বনার বাণী,
রহমতেরই সুবাস হয়ে ভরিয়েছে জীবনী।
আমি দেখেছি পথের কাঁটা সরিয়ে দিয়েছে কেউ,
ক্লান্ত পথিক হেসে বলেছে—"আল্লাহ রাখুন ঢেউ।"
আমি দেখেছি তৃষ্ণার্ত মুখে এক পেয়ালা জল,
ক্ষুদ্র হলেও সে কাজ ছিল জান্নাতমুখী ফল।
আমি দেখেছি অনাথ শিশুর মাথায় স্নেহের হাত,
বৃদ্ধ পিতার পাশে বসে কাটিয়েছে যে রাত।
আমি দেখেছি প্রতিবেশীর দুয়ারে সামান্য দান,
রবের কাছে অমূল্য হয়ে উঠেছে সেই মান।
আমি দেখেছি এক টুকরো খেজুর ভাগ করে খাওয়া,
অভাবের মাঝেও অন্যকে আগে স্থান দেওয়া।
একটি খুর, একমুঠো খাদ্য, সামান্য উপহার,
রহমতের পাল্লায় সেসব অমূল্য অঙ্গার।
আমি দেখেছি হাসিমুখে ভাইকে করা সম্ভাষণ,
ক্লান্ত হৃদয়ে জাগিয়েছে নতুন আশার স্পন্দন।
আমি দেখেছি নীরব ক্ষমা প্রতিশোধকে হারায়,
ক্ষমাশীল হৃদয়ের উপর রহমতের ছায়া ঝরায়।
কিন্তু দেখেছি অন্য ছবিও, অন্ধকারের ঢেউ,
একটি মিথ্যা, একটি কটু কথা, বিষের মতো বয়ে যায় ঢেউ।
একটি গীবত, একটি ছলনা, একটি তুচ্ছ পাপ,
জমতে জমতে গড়ে তোলে অশুভ অন্ধ চাপ।
যে বলেছিল—"এ তো সামান্য, এতে হবে কী?"
আজ সে দেখে সেই সামান্যই কত ভয়ংকর দিক।
ধূলিকণার মতো ক্ষুদ্র ছিল যে অপরাধখানি,
আজ তা যেন পাহাড়সম দাঁড়ায় তারই বাণী।
অণু পরিমাণ নেক আমল হারিয়ে যায় না কভু,
রবের জ্ঞানে অগোচর নয় কোনো ক্ষুদ্র তবু।
অণু পরিমাণ অন্যায়ও মুছে যায় না হেলায়,
বিচার দিবস স্মরণ করে জাগো মানব মেলায়।
একটি ভালো কথা যদি কারও প্রাণে আলো জ্বালে,
সে আলো গিয়ে পৌঁছাবে আখিরাতের কালে।
একটি সত্য ন্যায়ের পক্ষে সাহসী উচ্চারণ,
হতে পারে মুক্তির পথে মহামূল্য আহ্বান।
একটি বিনয়, একটি ধৈর্য, একটি নীরব দান,
একটি চোখের অশ্রুবিন্দু রবেরই সন্তোষ জ্ঞান।
একটি আন্তরিক দোয়া যদি ওঠে হৃদয় ভরে,
ফিরে আসে রহমতের সুধা অনন্তেরই দ্বারে।
তেমনি একটি কটু ভাষা, একটি অবজ্ঞা-হাসি,
কত হৃদয় ভেঙে দেয় যে, রেখে যায় সর্বনাশী।
একটি প্রতারণা, একটি অন্যায় বিচার,
মানবজীবন অন্ধকারে করে দেয় যে ভার।
তাই হে মানুষ, ছোট বলে কোনো নেকি ফেলো না,
অণুর চেয়েও ক্ষুদ্র হলেও তাকে অবহেলা কোরো না।
আজ যে ফুলটি রোপণ করবে করুণারই তরে,
কাল সে ফুটবে জান্নাতের সুগন্ধি উপবনে।
আর ছোট পাপ ভেবে কখনো দিও না তার ঠাঁই,
ফোঁটা ফোঁটা বিষেই কিন্তু মৃত্যুর দুয়ার পাই।
একটি স্ফুলিঙ্গ থেকেই যেমন দাবানল জ্বলে,
ক্ষুদ্র গোনাহ জমে তেমনি হৃদয় কালো করে।
চলো তবে আজই করি আত্মার পরিশুদ্ধি,
সত্যকে ভালোবাসি সবাই, ত্যাগ করি সব দুষ্টি।
জিহ্বায় রাখি সত্য বাণী, চোখে রাখি লাজ,
হাতে রাখি দানের অভ্যাস, মনে তাকওয়ার সাজ।
প্রতিটি শ্বাস আমানত, প্রতিটি ক্ষণ দান,
প্রতিটি কর্ম লিখে রাখেন দয়াময় রহমান।
মানুষ ভুলে, সময় মুছে, স্মৃতি হারায় শেষে,
রবের কাছে কিছুই তবে হারিয়ে যায় না শেষে।
যেদিন কেঁপে উঠবে যমীন, খুলবে আমলনামা,
সেদিন যেন লজ্জায় নত না হয় আমাদের মাথা।
অণুর মতো নেক আমলও হোক নূরের প্রদীপ,
রবের রহমত হোক আমাদের চিরজীবনের সঙ্গী দীপ।
হে পরম করুণাময়!
আমাদের অন্তরে সত্যের আলো জ্বালিয়ে দাও।
ক্ষুদ্র নেক আমলকে ভালোবাসার তাওফীক দাও,
ক্ষুদ্র গোনাহ থেকেও বেঁচে থাকার তাকওয়া দাও।
যেদিন পৃথিবী সাক্ষ্য দেবে,
যেদিন আমল হবে একমাত্র পরিচয়,
সেদিন তোমার অসীম দয়ার ছায়ায়
আমাদের স্থান দিও—
তোমার সন্তুষ্ট বান্দাদের কাতারে।
আমীন।
***
অণু পরিমাণ
যখন প্রচণ্ড কম্পনে কেঁপে উঠবে ধরার বুক,
ভেঙে যাবে পর্বতশিখর, থেমে যাবে জীবনের সুখ।
আকাশ হবে স্তব্ধ নিথর, সাগর হবে নীরব,
সৃষ্টিজগৎ বুঝবে সেদিন—এসেছে বিচার-প্রভাত।
যমীন খুলে দেবে তার সহস্র বছরের স্মৃতি,
বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখা মানুষের সব গতি।
কত অশ্রু, কত দীর্ঘশ্বাস, কত গোপন পাপ,
কত নীরব সৎকর্ম ছিল অন্ধকারের চাপ।
মানুষ বলবে—"কী হয়েছে? কেন এ বিস্ময় আজ?
নীরব ধরণী কেন হলো সত্যবাণীর সাজ?"
ধরণী বলবে—"আমার নয় এ সাক্ষ্যের উচ্চারণ,
আমার রবই দিয়েছেন আজ সত্য বলার নির্দেশ।"
আমি দেখেছি রাতের শেষে সিজদাভেজা মুখ,
দেখেছি আবার অহংকারে হারিয়ে যাওয়া সুখ।
দেখেছি ক্ষুধার্ত শিশুটিকে অর্ধেক রুটি দান,
দেখেছি তৃষ্ণার্ত পথিক পেয়েছে এক পেয়ালা পান।
আমি দেখেছি বৃদ্ধ মায়ের কাঁপা হাতের স্পর্শ,
সন্তান তার ভালোবেসে করেছে সেবার হর্ষ।
দেখেছি একটি সালামের মাঝে ভ্রাতৃত্বের আহ্বান,
একটি হাসির বিনিময়ে মুছে গেছে অভিমান।
আমি দেখেছি অনাথ শিশুর মাথায় স্নেহের হাত,
দেখেছি বিধবার চোখে মুছে গেছে কান্নার রাত।
একটি খেজুর, একমুঠো খাদ্য, সামান্য উপহার,
রহমানের দরবারে তার অপরিসীম যে ভার।
আমি দেখেছি পথের কাঁটা সরিয়ে দিয়েছে কেউ,
অপরিচিত মানুষের তরে খুলে দিয়েছে ঢেউ।
একটি ভালো কথা কত ভাঙা হৃদয় জোড়ে,
একটি দোয়া আশার আলো জ্বালায় অন্তর ঘরে।
তবু দেখেছি অন্য দৃশ্য—অবহেলার ক্ষত,
একটি মিথ্যা, একটি গীবত, একটি নিষ্ঠুর রথ।
একটি তুচ্ছ বিদ্রূপবাণী বিদ্ধ করেছে প্রাণ,
একটি অন্যায় আচরণে ভেঙেছে সম্মান।
যে বলেছিল—"এ তো ক্ষুদ্র, এতে কী-বা হয়?"
আজ সে দেখে ক্ষুদ্র বীজেই মহাবৃক্ষের পরিচয়।
বিন্দু বিন্দু জলে যেমন ভরে ওঠে সাগর,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোনাহ তেমনি ডেকে আনে অন্ধকার।
আবার বিন্দু বিন্দু নেকি গড়ে নূরের দীপ,
অণু অণু সৎকর্মেই জ্বলে মুক্তির সোনার সীপ।
একটি ক্ষমা, একটি ধৈর্য, একটি সত্যবাক্য,
রবের কাছে লিখে রাখে অনন্ত সৌভাগ্য।
হে মানুষ!
সৎকাজকে ক্ষুদ্র ভেবে ফিরিয়ে দিও না।
একটি হাসি, একটি দোয়া, একটি খোঁজখবর,
একটি সহানুভূতির বাক্য—
হয়তো সেগুলোই হবে তোমার মুক্তির সম্বল।
আর পাপকেও ছোট ভেবে স্থান দিও না মনে,
স্ফুলিঙ্গ থেকেই দাবানল জ্বলে বনের কোণে।
আজ যে গোনাহ তুচ্ছ মনে অবহেলায় কর,
কাল সে-ই হবে লজ্জার কারণ বিচার-অঙ্গন ভর।
ধন যাবে না, মান যাবে না, যাবে না পরিচয়,
ক্ষমতার সব প্রাসাদ সেদিন হবে ক্ষয়।
থাকবে শুধু কর্মের খাতা, সত্যের আলোকরেখা,
যেখানে কিছুই হারাবে না—সবই থাকবে লেখা।
যিনি অণুর চেয়েও ক্ষুদ্র নেকিকে করেন মূল্যবান,
তিনিই ক্ষুদ্র পাপকেও রাখেন বিচারের সম্মান।
তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয় ধূলিকণার নাচন,
নয় হৃদয়ের গোপন ব্যথা, নয় অশ্রুর ভাষণ।
তাই এসো, প্রতিটি সকাল করি নতুন শপথ,
সত্য হবে পথের সাথী, ন্যায় হবে জীবনের রথ।
জিহ্বায় রাখি কল্যাণবাণী, হাতে দানের ফুল,
অন্তরে রাখি তাকওয়ার আলো, ঈমান অটুট মূল।
যেদিন পৃথিবী বলবে এসে জীবনের ইতিহাস,
যেন সে বলে—"এই মানুষটি ভালোবাসত সুবিচার।
অণু পরিমাণ নেকিকেও করেনি কখনো তুচ্ছ,
অণু পরিমাণ পাপকেও ভেবেছে ভীষণ গুরুতর।"
হে পরম দয়াময়!
আমাদের এমন জীবন দাও,
যেখানে প্রতিটি ক্ষুদ্র সৎকাজ
তোমার সন্তুষ্টির পথে এক একটি আলোকশিখা হয়;
আর প্রতিটি ক্ষুদ্র গোনাহ থেকে
তোমার ভয় ও ভালোবাসায়
আমরা দূরে থাকতে পারি।
আমীন।
অণুর চেয়েও ক্ষুদ্র
যখন কাঁপবে ধরণী মহাপ্রলয়ের ভীষণ কম্পনে,
ভেঙে পড়বে পর্বতশিখর আপন ভারের চাপে।
আকাশ জুড়ে স্তব্ধতা নেমে আসবে নিঃশব্দ স্রোতে,
সাগরও যেন থেমে যাবে অদৃশ্য কোনো ভয়ে।
যমীন তখন খুলে দেবে বুকের লুকানো পৃষ্ঠা,
যুগে যুগে জমে থাকা সকল কর্মের দৃষ্টান্ত।
মানুষ তখন বিস্ময়ভরা চোখে বলবে কেঁপে,
"ধরণী! আজ তোমার এমন ভাষা এলো কবে?"
যমীন বলবে—
"আমি তো নই নিজের ইচ্ছার বক্তা,
আমার প্রতিটি শব্দই রবের আদেশে উচ্চারিত।
যা কিছু বহন করেছি যুগের পর যুগ,
আজ তার কিছুই আর গোপন রাখার অধিকার নেই।
আমি দেখেছি—
রাতের নির্জনে অশ্রুভেজা সিজদা,
আবার দেখেছি অহংকারে কঠিন হওয়া হৃদয়।
দেখেছি নীরব দানের হাত,
দেখেছি লোভে প্রসারিত অন্যায়ের হাত।
দেখেছি একটি খেজুর ভাগ করে দেওয়া,
দেখেছি ক্ষুধার্ত মুখে এক লোকমা আহার।
দেখেছি তৃষ্ণার্ত পথিককে
এক মগ পানি এগিয়ে দেওয়ার নির্মল ভালোবাসা।
দেখেছি ক্লান্ত মানুষের পাশে
একটি মমতার হাসি।
দেখেছি একটি সালামের উষ্ণতায়
দুই হৃদয়ের বরফ গলে গেছে।
দেখেছি প্রতিবেশীর দরজায়
সামান্য উপহার রেখে ফিরে যাওয়া।
দেখেছি এতটুকু দানেও
রবের সন্তুষ্টির সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে।
আমি দেখেছি—
একটি ভালো কথা
একটি ভাঙা হৃদয়কে বাঁচিয়ে তুলেছে।
একটি ক্ষমা
শত বছরের শত্রুতাকে মুছে দিয়েছে।
একটি দোয়া
নৈরাশ্যের অন্ধকারে সূর্যের মতো আলো ছড়িয়েছে।
আবার আমি দেখেছি—
একটি মিথ্যা
বিশ্বাসের প্রাসাদ ভেঙে দিয়েছে।
একটি গীবত
বন্ধুত্বের বাগান শুকিয়ে ফেলেছে।
একটি অবজ্ঞার হাসি
কারও অন্তরকে রক্তাক্ত করেছে।
দেখেছি—
মানুষ বলেছে,
'এ তো খুব ছোট পাপ!'
কিন্তু সেই ছোট পাপই
দিনের পরে দিন,
রাতের পরে রাত,
পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে উঠেছে।
যেমন ধূলিকণা মিলেই মরুভূমি,
ফোঁটা ফোঁটা জলেই সাগর,
তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোনাহ
জমে গড়ে তোলে ধ্বংসের অন্ধকার প্রাচীর।
আবার অণু অণু নেকি মিলেই
নূরের অট্টালিকা নির্মিত হয়।
একটি হাসি,
একটি সালাম,
একটি খোঁজ নেওয়া,
একটি সান্ত্বনার বাক্য,
একটি ক্ষমা,
একটি সত্য উচ্চারণ—
সবই লেখা থাকে
রহমানের অবিনশ্বর দিওয়ানে।
হে মানুষ!
অণুকে তুচ্ছ ভেবো না।
অণুর মধ্যেও লুকিয়ে থাকে
চিরন্তন বিচার।
একটি সৎকাজ হয়তো
তোমার অজান্তেই
রবের সন্তুষ্টি অর্জনের কারণ হবে।
আবার একটি ক্ষুদ্র গোনাহ,
যাকে তুমি অবহেলায় হেসে উড়িয়ে দিলে,
সেটিই হয়তো
তোমার অনুশোচনার দীর্ঘতম অধ্যায় হবে।
সেদিন কেউ কারও বোঝা বহন করবে না।
রাজা থাকবে না,
প্রজা থাকবে না,
ক্ষমতা থাকবে না,
সম্পদ থাকবে না,
রূপ থাকবে না,
বংশের অহংকার থাকবে না।
থাকবে শুধু—
আমল,
সত্য,
আর ন্যায়বিচার।
যিনি ধূলিকণার ওজন জানেন,
তিনি হৃদয়ের ওজনও জানেন।
যিনি অণুর হিসাব রাখেন,
তিনি অশ্রুরও হিসাব রাখেন।
তাঁর কাছে
হারিয়ে যায় না
নীরব কান্না,
গোপন ইবাদত,
অদেখা দান,
অপ্রকাশিত ভালোবাসা।
তেমনি হারিয়ে যায় না
গোপন প্রতারণা,
নিভৃত অন্যায়,
অদৃশ্য অহংকার,
অপ্রকাশিত বিদ্বেষও।
এসো—
আজ থেকেই জীবনকে
হিসাবের জন্য প্রস্তুত করি।
জিহ্বাকে সত্যের অলংকারে সাজাই।
হৃদয়কে তাকওয়ার আলোয় ভরি।
হাতকে দানের অভ্যাসে অভ্যস্ত করি।
চোখকে লজ্জা ও সংযমে নত রাখি।
কারণ,
আজকের ক্ষুদ্রতম নেকি
আগামীকালের অনন্ত সুখ।
আজকের ক্ষুদ্রতম গোনাহ
আগামীকালের অনন্ত অনুশোচনা।
যেদিন পৃথিবী সাক্ষ্য দেবে,
যেদিন আমলনামা খুলে যাবে,
যেদিন অণুরও হিসাব হবে,
সেদিন যেন আমাদের মুখে
লজ্জার অন্ধকার না নামে।
হে দয়াময় রব!
আমাদের এমন অন্তর দাও,
যেখানে ছোট নেকিও বড় হয়ে ওঠে,
আর ছোট গোনাহও
ভয় জাগায় বিবেকের গভীরে।
আমাদের জীবনকে
সত্যের আলোয় আলোকিত করো,
আমাদের মৃত্যু দাও ঈমানের উপর,
আর হাশরের ময়দানে
তোমার রহমতের ছায়াতলে
আমাদের স্থান দাও।
আমীন, ইয়া রাব্বুল আলামীন।
১৪
২৪ মন্তব্য