Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ জুলাই, ২০২৬ ০৬:৩০ অপরাহ্ণ

অন্তরের সাক্ষী - মোঃ মুজিবুর রহমান

অন্তরের সাক্ষী

(সূরাঃ আল-আদিয়াত  আয়াতঃ ৬-১১ আলোকে)

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানুষ,
কতদিন আর নিজের কাছে
নিজেকেই লুকিয়ে রাখবে?
কতদিন মুখে আলোর কথা,
অন্তরে অন্ধকার ঢাকবে?

কতদিন বাহিরে হাসির সাজে
ভেতরের কান্না গোপন করবে?
যে সত্য তোমার হৃদয়ে লেখা,
তাকে কোথায় লুকিয়ে রাখবে?

তুমি এসেছিলে একদিন
শূন্য দুই হাত নিয়ে,
নেই ছিল ধন,
নেই ছিল গৌরব,
নেই কোনো পরিচয় পৃথিবীতে।

এক বিন্দু প্রাণ ছিল না তোমার,
ছিলে শুধু রহস্যময় সম্ভাবনা;
রবের অসীম দয়ায়
জেগে উঠেছিল জীবনের প্রথম গান।

তিনি দিলেন প্রথম শ্বাস,
প্রথম আলো,
প্রথম কান্না,
প্রথম হাসি,
প্রথম স্বপ্ন,
প্রথম ভাষা।

তিনি দিলেন চোখ,
যাতে পৃথিবী দেখো;
দিলেন কান,
যাতে সত্য শুনো;
দিলেন হৃদয়,
যাতে ভালোবাসতে শেখো;
দিলেন বিবেক,
যাতে অন্যায় থেকে ফিরতে পারো।

সূর্য প্রতিদিন
নির্ধারিত সময়ে ওঠে,
চাঁদ তার কক্ষপথ ভোলে না,
নক্ষত্রেরা সীমা অতিক্রম করে না।

নদী সাগরের পথ চেনে,
বাতাস জানে কোন দিকে বইতে হয়,
পাখিরা ভোরে জেগে
নিজ নিজ ভাষায়
স্রষ্টারই মহিমা গায়।

পাহাড় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে,
বৃক্ষ ফল দেয়,
মেঘ বৃষ্টি ঝরায়,
মাটি শস্য ফলায়,
ফুল সুগন্ধ বিলায়,
মৌমাছি মধু আনে।

সৃষ্টি যেন এক বিশাল ইবাদতখানা,
যেখানে প্রতিটি কণা
নিজ নিজ দায়িত্বে অবিচল।

শুধু মানুষ—
যে সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ পেয়েছে,
সে-ই কত সহজে
ভুলে যায় দাতাকে!

কত সহজে বলে—
"
এ আমার প্রাপ্য।"

কত সহজে ভাবে—
"
আমিই করেছি সব।"

অথচ
এক মুহূর্তের জন্য
যদি শ্বাস থেমে যায়,
কোথায় যাবে তার অহংকার?

যদি হৃদয়ের স্পন্দন থামে,
কোথায় যাবে তার সমস্ত পরিকল্পনা?

ধন জমে,
অট্টালিকা ওঠে,
ক্ষমতার আসন উঁচু হয়,
কিন্তু মৃত্যুর দরজায়
সব পরিচয় সমান হয়ে যায়।

সেখানে নেই কোনো উপাধি,
নেই কোনো প্রহরী,
নেই কোনো গর্বের পতাকা।

থাকে শুধু
মানুষ আর তার আমল।

অন্তরের যে গোপন অন্ধকার,
যা কেউ দেখেনি,
যে অশ্রু কেউ জানেনি,
যে হিংসা,
যে অহংকার,
যে লোভ,
যে কপটতা,
যে গোপন নেকি,
যে নিঃশব্দ তওবা,
যে অজানা দান,
যে নীরব ক্ষমা—
সব একদিন
প্রকাশিত হবে।

সেদিন
মুখের ভাষা নয়,
অন্তরের ভাষাই কথা বলবে।

কলম থেমে যাবে,
অজুহাত নিঃশেষ হবে,
অহংকার মাটিতে মিশে যাবে।

বিবেক,
যাকে পৃথিবীতে
অসংখ্যবার চুপ করিয়ে রাখা হয়েছিল,
সেদিন সে-ই হবে
সবচেয়ে স্পষ্ট সাক্ষী।

কবরের নীরবতা
চিরদিনের নয়।

মাটির বুকে
যারা ঘুমিয়ে আছে,
একদিন সবাই উঠবে
মহান প্রভুর আহ্বানে।

সেদিন
সময়ের সব পর্দা সরবে,
ইতিহাসের সব পৃষ্ঠা খুলবে,
জীবনের প্রতিটি ক্ষণ
নিজ নিজ ভাষায় সাক্ষ্য দেবে।

হাত বলবে—
আমি কী করেছি।

চোখ বলবে—
কোথায় তাকিয়েছি।

জিহ্বা বলবে—
কী উচ্চারণ করেছি।

পা বলবে—
কোন পথে চলেছি।

হৃদয় বলবে—
কাকে ভালোবেসেছি,
কাকে ভয় করেছি,
কার জন্য বেঁচেছি।

সেদিন
একটি অণুও হারাবে না,
একটি দীর্ঘশ্বাসও
হিসাবের বাইরে থাকবে না।

যে নেকি
অন্ধকার রাতে
কেউ না জেনে করা হয়েছিল,
সেটিও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

যে অন্যায়
মানুষের চোখ এড়িয়েছিল,
সেটিও গোপন থাকবে না।

কারণ
যিনি সৃষ্টি করেছেন অন্তর,
তিনি অন্তরের প্রতিটি স্পন্দনের খবর রাখেন।

যিনি চোখ দিয়েছেন,
তিনি দৃষ্টিরও খবর জানেন।

যিনি ভাষা দিয়েছেন,
তিনি নীরবতারও অর্থ বোঝেন।

যিনি জীবন দিয়েছেন,
তিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব জানেন।

তাই হে মানুষ,
অহংকার নয়,
কৃতজ্ঞতা শেখো।

লোভ নয়,
সন্তুষ্টি শেখো।

প্রতারণা নয়,
সততা শেখো।

অন্যায় নয়,
ন্যায়কে আপন করো।

মনে রেখো—
ধন একদিন রেখে যেতে হবে,
ক্ষমতা একদিন ফুরিয়ে যাবে,
সৌন্দর্য মলিন হবে,
যৌবন নিঃশেষ হবে,
জীবনের প্রদীপ একদিন নিভে যাবে।

কিন্তু
সৎকর্মের আলো নিভবে না,
সত্যের সুবাস শুকাবে না,
বিশ্বাসের দীপ নিভে যাবে না কখনও।

আজও সময় আছে।

আজও আকাশ খোলা।

আজও তওবার দরজা উন্মুক্ত।

আজও করুণার বাতাস বইছে
পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে।

এসো,
অকৃতজ্ঞতার অন্ধকার ছেড়ে
কৃতজ্ঞতার আলোয় ফিরি।

লোভের শৃঙ্খল ভেঙে
মানবতার পথে চলি।

অন্তরকে শুদ্ধ করি,
বিবেককে জাগিয়ে তুলি,
সত্যকে আপন করি।

যেন সেই মহাদিবসে
লজ্জায় নয়,
আশায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি।

যেন অন্তরের সাক্ষী
আমাদের বিরুদ্ধে নয়,
আমাদের পক্ষেই কথা বলে।

যেন করুণাময় প্রতিপালকের সন্তুষ্টিই
হয় জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

কারণ
তিনি সব দেখেন,
সব জানেন,
সব শোনেন,
সব হিসাব রাখেন।

আর তাঁর ন্যায়বিচারের সামনে
কোনো সত্য হারিয়ে যায় না,
কোনো অশ্রু বৃথা ঝরে না,
কোনো নেকি বিস্মৃত হয় না,
কোনো অন্যায় চিরকাল গোপন থাকে না।

সেই বিশ্বাসেই
জীবনের প্রতিটি প্রভাত হোক কৃতজ্ঞতার,
প্রতিটি নিশি হোক আত্মসমালোচনার,
প্রতিটি কর্ম হোক সত্যের,
প্রতিটি শ্বাস হোক
পরম প্রতিপালকের সন্তুষ্টির সন্ধানে।

অন্তরের সাক্ষী

শূন্য হাতে এসেছিল মানুষ,
নেই ছিল নামের পরিচয়;
অদেখা এক রহস্যভোরে
খুলেছিল জীবনের বিজয়।

নিভৃত আঁধার মাতৃগর্ভে
কে দিল প্রাণের আলো?
কার নির্দেশে রক্তধারায়
জাগল জীবনের ভালো?

কে গড়ে দিল দুটি নয়ন,
স্বপ্ন দেখার তরে?
কে দিল শ্রবণ, ভাষার শক্তি,
ডাক শুনিবার ঘরে?

কার ইশারায় প্রথম শ্বাস
বুকের মাঝে বাজে?
কার করুণায় শিশুর হাসি
মায়ের মুখে সাজে?

তুমি কি তবে নিজেই গড়েছ
হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন?
নিজের হাতে লিখেছ নাকি
জীবনের প্রথম বন্দন?

নিজের শক্তিতে ফুটিয়েছ কি
শস্যভরা সবুজ ক্ষেতে?
নিজের ডাকে বর্ষা নেমে
নদী ভরেছে স্রোতের রেতে?

সূর্য ওঠে নির্দিষ্ট ক্ষণে,
চাঁদ চলে আপন পথে;
অগণিত তারা জ্বলে নীরব
প্রভুর বিধানরথে।

পাহাড় দাঁড়ায় ধৈর্যের মতো,
সাগর রাখে সীমা;
বাতাস বহে আদেশ মেনে,
ভোলে না কোনো নিয়ম।

অরণ্যের গভীর নীরবতা,
পাখির ভোরের গান,
সবই যেন এক সুরে গেয়ে
মহিমাময় রহমান।

বৃষ্টি নামে শুকনো মাঠে,
জাগে সোনালি ধান;
ফুলের বুকে রঙের উৎসব,
ফলে ভরে বাগান।

মৌমাছিটি মধু আনে,
পিঁপড়ে খোঁজে দানা;
ক্ষুদ্র প্রাণও জানে যেন
প্রভুর দানের মান।

সৃষ্টি জুড়ে আনুগত্যের
অমল দীপশিখা জ্বলে;
কেবল মানুষ পথ ভুলে যায়
নিজ অহংকারতলে।

যে হাতে পেয়েছে অফুরান
অনুগ্রহের ধারা,
সেই হাত কেন কৃতজ্ঞতায়
উঠে না বারেবারা?

যে হৃদয় পেয়েছে ভালোবাসা
অকারণ করুণায়,
সেই হৃদয় কেন ভুলে থাকে
দয়াময়ের পরিচয়?

হে মানুষ,
তুমি কি ভেবেছ একটিবার—
এই প্রাণ কার দান?
এই পৃথিবীর প্রতিটি সুখ
কার অপরিসীম সম্মান?

নদীর জলে তোমার তৃষ্ণা,
ধানে তোমার ভাত,
আকাশভরা নির্মল বাতাস,
জীবনের প্রভাত।

সবই যখন দানের মালা,
সবই অনুগ্রহ,
তবে কেন এই বুকের মাঝে
অকৃতজ্ঞতার মোহ?

কেন মানুষ ভুলে যায়
অদেখা সেই রবকে?
কেন ক্ষণিক ধনের নেশায়
হারায় আপন সবকে?

আজও সূর্য সাক্ষী হয়ে
দিগন্ত জুড়ে রয়;
আজও বাতাস বলে নীরব—
"
প্রভুই এক আশ্রয়।"

আজও প্রতিটি জাগ্রত প্রভাত
ডাকে মৃদু স্বরে,
"
ফিরে এসো, হে পথিক,
তোমার প্রতিপালকের দ্বারে।"

যে দান পেয়েছ অগণিত,
গুনে শেষ হবে না কভু;
কৃতজ্ঞতার একটি অশ্রু
তারই শ্রেষ্ঠ প্রভু।

এই সত্য যদি হৃদয় জাগায়,
জীবন হবে ধন্য;
রবের স্মরণে আলোকিত হবে
মানবজন্ম অনন্য।

***

মানুষ,
কত সহজে ভুলে যাও তুমি
যে হাত তোমায় দিল আলো;
একদিন যার করুণাধারায়
হেসেছিল জীবনের ভোরকাল।

যে দয়ার জলে ধুয়ে গিয়েছিল
অস্তিত্বের প্রথম ক্ষণ,
সেই দয়াকেই বিস্মৃত হয়ে
গড়ো অহংকারের ভবন।

বলতে শেখো—
"
আমি করেছি",
"
আমার শক্তি",
"
আমার জয়";
শুধু বলতে ভুলো—
"
এই সামর্থ্যও
রবেরই অশেষ পরিচয়।"

ধানের শিষে সোনার হাসি,
তুমি বলো—আমার ঘাম;
ভুলো যে সেই বৃষ্টিধারা,
আকাশ ভরা করুণাধাম।

বৃক্ষ যখন ফলে নুয়ে পড়ে,
তুমি দেখো কেবল ফল;
যে অদৃশ্য হাত
মূলে মূলে
জাগায় জীবন,
ভুলো তারই বল।

শিশিরবিন্দু
ঘাসের ডগায়
লিখে রাখে ভোরের গান;
তুমি শুধু পথেই চলো,
দেখো না সেই দানের মান।

পাখির কণ্ঠে
জাগে যে সুর,
কোন বিদ্যালয়ে শেখা?
প্রজাপতির রঙিন পাখায়
কার তুলির লেখা?

মেঘের বুকে
কার নির্দেশে
বৃষ্টি নামে ধরা জুড়ে?
কার ইশারায়
বজ্র গর্জে,
বিদ্যুৎ হাসে দূর-দূরে?

তবু মানুষ,
সবকিছু পেয়ে
হৃদয় রাখে শূন্য করে;
দাতার বদলে
দানের মোহে
হারায় আপন অন্তরে।

ধন জমাতে
ব্যস্ত থাকে,
দিনের পরে রাত;
হিসাব বাড়ে,
ঘুম কমে যায়,
শুকিয়ে আসে প্রভাত।

একটি মুদ্রা
আরও চাই,
আরও চাই সম্মান;
আরও চাই
উঁচু আসন,
আরও দীর্ঘ পরিচয়পত্রখান।

লোভের আগুন
অদ্ভুত আগুন—
জ্বলে তবু নেভে না;
পেয়েও মানুষ
অপূরণীয়,
তৃপ্তির নদী বয়ে না।

অট্টালিকার
উঁচু জানালা
আকাশ ছুঁতে চায়;
তবু অন্তর
নিঃস্ব থেকে
নিঃশব্দে কেঁদে যায়।

স্বর্ণের থালা
ভরে ওঠে,
শূন্য থাকে মন;
হাজার মানুষের
অভিবাদনেও
মেলে না প্রশান্তি-ধ্বনন।

বিবেক তখন
নীরব বসে
দেয় না কোনো তালি;
অন্তর বলে—
"
এই তো সেই পথ,
যেখানে আলো খালি।"

মানুষ শোনে না
সেই ডাক,
হাসির শব্দ বাড়ায়;
নিজের কাছে
নিজেই হেরে
জয়ের মালা গাঁথায়।

রাত্রি নামে,
চারদিক ঘুমায়,
জেগে থাকে কে?
নিঃশব্দ অন্তর
প্রশ্ন তোলে
নিজেরই মানুষটিকে।

"আজ যে কথাটি
মুখে বললে,
হৃদয় কি তা মানে?
যে হাসিটি দিলে,
তার আড়ালে
কত অশ্রু গোপনে?"

"যে অন্যায়কে
ছোট বলে
হেসে উড়িয়ে দিলে,
তার প্রতিধ্বনি
ফিরে এসে
তোমাকেই কি না মিলে?"

বিবেক কোনো
শত্রু নয়,
সে তো অন্তর-বন্ধু;
সত্যের পথে
হারিয়ে গেলে
ডাকে নিরবচ্ছিন্ন।

তাকে চুপ করানো যায়,
মুছে ফেলা যায় না;
মুখ ফিরিয়ে
পথ চলা যায়,
সাক্ষ্য তার থামে না।

তুমি নিজেই
নিজের বিরুদ্ধে
সাক্ষী হয়ে থাকো;
অন্তর জানে
কোথায় তুমি
সত্যটাকে ঢাকো।

হাজার মানুষ
প্রশংসা করুক,
অন্তর যদি কাঁদে,
সেই কান্নাধ্বনি
আকাশ ছুঁয়ে
রবের কাছেই বাঁধে।

তাই হে মানুষ,
একটু থেমে
নিজেকেই প্রশ্ন করো—
ধনের নেশায়
কী হারালে,
সেটিও একবার ধরো।

যা পেয়েছ
সবই আমানত,
চিরদিন নয় সঙ্গী;
আজ যে প্রাসাদ
তোমার গর্ব,
কাল তা হবে ভাঙি।

যে মুঠো ভরে
স্বর্ণ ধরেছ,
ফেলে যাবে সব;
সঙ্গে যাবে
একটি মাত্র—
তোমার কর্মরব।

অতএব এসো,
হৃদয়খানি
কৃতজ্ঞতায় ভরি;
অহংকারের
ধুলোমাখা পথ
আজই ছেড়ে ধরি।

যে দানের শেষ নেই,
সেই দাতাকেই
জীবনের কেন্দ্র করি;
অন্তর জুড়ে
সত্যের প্রদীপ
নিভতে যেন না ধরি।

মন্তব্য করুন