Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ জুলাই, ২০২৬ ০৪:৩৮ পূর্বাহ্ণ

সিজদায় নৈকট্য - মোঃ মুজিবুর রহমান

সিজদায় নৈকট্য

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

(সূরা আল-আলাক ১৯)

كَلَّا ؕ لَا تُطِعۡهُ وَ اسۡجُدۡ وَ اقۡتَرِبۡ ﴿ٛ۱۹﴾ (سُجود‎‎) কখনো নয়, তুমি তার আনুগত্য করবে না। আর সিজদা কর এবং নৈকট্য লাভ কর।

কখনো নয়—
মিথ্যার কাছে মাথা নত নয়,
অহংকারের সামনে আত্মসমর্পণ নয়,
ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে
সত্যের কণ্ঠ রুদ্ধ করার
অধিকার কারও নেই।

যে রব আকাশ তুলেছেন
অদৃশ্য স্তম্ভের বুকে,
যিনি নক্ষত্র সাজিয়েছেন
রাত্রির গভীর সুখে,
যিনি শিখিয়েছেন কলম ধরা,
জ্ঞান দিয়েছেন মানুষকে,
যিনি অন্ধকার ভেদ করে
আলোর পথ খুলেছেন বিশ্বলোকে—
তাঁরই সামনে
নত হবে কপাল,
নত হবে হৃদয়,
নত হবে অহংকারের প্রাচীর।

মানুষের ভয় ক্ষণিক,
রবের মহিমা অনন্ত।
মানুষের রোষ সীমাবদ্ধ,
রবের করুণা অসীম।

তাই যদি কেউ বলে—
"
সত্য বলো না,
সালাতে দাঁড়িও না,
সিজদায় যেও না,
রবের পথে চলো না"—
তবে উত্তর একটাই—

কখনো নয়!

আমি মাথা নত করব,
তবে এক আল্লাহর সামনে।
আমি কাঁদব,
তবে তাঁরই দরবারে।
আমি হাত তুলব,
তবে তাঁরই রহমতের আশায়।

সিজদা—
শুধু শরীরের নতি নয়,
এ আত্মার উত্থান।
এ অহংকারের মৃত্যু,
বিনয়ের পুনর্জন্ম।
এ দাসত্বের স্বীকৃতি,
স্বাধীনতারও ঘোষণা;
কারণ
যে আল্লাহর বান্দা,
সে আর কারও দাস নয়।

কপাল যখন
মাটির বুকে লেগে যায়,
তখন আকাশ খুলে যায়
রহমতের দুয়ার।
চোখের জল
মাটিতে ঝরে না,
আরশের দিকে
দোয়ার সুবাস হয়ে ওঠে।

সিজদায়
মুকুটের দরকার নেই,
সিংহাসনের প্রয়োজন নেই,
সম্পদের গর্ব নেই,
বংশের অহংকার নেই।

সেখানে
রাজা আর রাখাল,
ধনী আর দরিদ্র,
শিক্ষিত আর নিরক্ষর,
সবাই সমান।

একটি কপাল,
একটি হৃদয়,
একজন রব।

সিজদা শেখায়—
মাটি থেকেই এসেছি,
মাটিতেই ফিরব,
আবার সেই মাটি ভেদ করেই
একদিন উঠব
মহা বিচারের প্রান্তরে।

তখন থাকবে না
ক্ষমতার আস্ফালন,
থাকবে না বাহাদুরি,
থাকবে না বাহ্যিক পরিচয়।
থাকবে কেবল
আমল,
ইখলাস,
আর সিজদায় ভেজা কপালের সাক্ষ্য।

হে মানুষ,
যে কপাল
রবের সামনে নত হতে জানে না,
সে কপাল
অহংকারের ভারে নুয়ে পড়ে।
আর যে হৃদয়
রবকে ভুলে যায়,
সে হৃদয়
পৃথিবীর ক্ষুদ্র লোভেই বন্দী হয়ে যায়।

কিন্তু যে বান্দা
নিঃশব্দ রাতে
দাঁড়ায় কিয়ামে,
রুকু শেষে
সিজদায় ঝুঁকে পড়ে,
তার হৃদয়ে
নামে প্রশান্তি।

সে জানে—
রিজিকের মালিক মানুষ নয়,
সম্মানের মালিক মানুষ নয়,
জীবন-মৃত্যুর মালিকও মানুষ নয়।
সব কিছুর অধিপতি
এক আল্লাহ।

তাই
অন্যায়ের হুমকি
তাকে ভীত করতে পারে না।
অত্যাচারের শিকল
তাকে বন্দী করতে পারে না।
কারণ
তার আত্মা মুক্ত,
তার হৃদয় মুক্ত,
তার সিজদা মুক্ত।

সিজদা—
ভাঙা হৃদয়ের ভাষা।
ক্লান্ত প্রাণের বিশ্রাম।
অশ্রুসিক্ত চোখের প্রার্থনা।
ক্ষমা পাওয়ার দরজা।
রহমতের সাগর।
আত্মার নির্মল নদী।

এখানেই
পাপী ফিরে পায় ক্ষমার আশা,
অসহায় ফিরে পায় আশ্রয়,
অন্ধকারে পথহারা ফিরে পায় আলো।

যখন পৃথিবী
অবিশ্বাসে কঠিন হয়ে ওঠে,
যখন চারদিকে
অন্যায়ের উল্লাস,
যখন সত্য একা দাঁড়ায়,
তখন সিজদাই বলে—

ভয় কোরো না।
রব তোমার সঙ্গে আছেন।

তাঁর কাছে
অসম্ভব বলে কিছু নেই।
তাঁর কাছে
হার মানেই শেষ নয়।
তাঁর কাছে
অশ্রু কখনও বৃথা যায় না।

হে পরম দয়াময়,
আমাদের কপালকে
সিজদায় অভ্যস্ত করে দিন।
আমাদের হৃদয়কে
অহংকারমুক্ত করে দিন।
আমাদের আত্মাকে
আপনার ভালোবাসায় পূর্ণ করে দিন।

যেন আমরা
মানুষের ভয়ে নয়,
আপনার ভয়ে চলি।
লোকদেখানো ইবাদতে নয়,
নির্মল ইখলাসে বাঁচি।
ক্ষমতার কাছে নয়,
আপনারই দরবারে মাথা নত করি।

আপনার সান্নিধ্যই
আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।
আপনার সন্তুষ্টিই
আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সফলতা।
আপনার রহমতই
আমাদের অনন্ত আশ্রয়।

তাই আজ,
আগামীকাল,
জীবনের শেষ প্রহর পর্যন্ত
আমাদের অঙ্গীকার—

কখনো নয়,
অন্যায়ের আনুগত্য নয়।

আমাদের পথ—
সত্যের পথ।
আমাদের গৌরব—
ইমানের গৌরব।
আমাদের অলংকার—
সিজদার চিহ্ন।
আমাদের গন্তব্য—
রবের নৈকট্য।

কপাল নত হোক,
অহংকার ভাঙুক,
চোখ অশ্রুতে ভিজুক,
হৃদয় জিকিরে জাগুক,
জীবন ইবাদতে প্রস্ফুটিত হোক।

আর প্রতিটি সিজদায়
আরও কাছে,
আরও কাছে,
আরও কাছে পৌঁছে যাক
আমাদের প্রাণ
পরম করুণাময় রবের
অসীম রহমত,
অশেষ সন্তুষ্টি
ও চিরন্তন নৈকট্যের দিকে।
আমীন।

সিজদা : নৈকট্যের সোপান

কখনো নয়—
অন্যায়ের কাছে নতি নয়,
অহংকারের কাছে আত্মবিক্রয় নয়,
ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে
যারা সত্যের প্রদীপ নেভাতে চায়,
তাদের পদচিহ্নে চলা নয়।

আমার কপাল
নত হবে শুধু
সেই মহান রবের দরবারে,
যিনি শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন
আকাশ, পৃথিবী, সময় আর মানুষ;
যিনি কলমের ভাষায়
জ্ঞানকে দিয়েছেন অমরতা,
অজ্ঞতার রাত্রি ভেঙে
উন্মুক্ত করেছেন আলোর দিগন্ত।

তিনি বলেছেন—
"
সিজদা কর,
আর আমার নৈকট্য লাভ কর।"

এই একটি আহ্বানে
লুকিয়ে আছে
সমস্ত জীবনের দিশা।

সিজদা—
কেবল একটি ভঙ্গি নয়,
এ হৃদয়ের গভীরতম স্বীকারোক্তি।
এ ঘোষণা—
আমি দাস,
তুমি প্রভু।
আমি ক্ষুদ্র,
তুমি মহান।
আমি অভাবী,
তুমি অফুরন্ত দাতা।

মানুষ যত উঁচুতেই উঠুক,
তার কপালের শেষ ঠিকানা
মাটিই।
আর সেই মাটিতে
যে কপাল স্বেচ্ছায় নত হয়,
সে-ই প্রকৃত অর্থে
আকাশসম উচ্চতায় ওঠে।

কত আশ্চর্য!
যে নিচু হয়,
সেই মহিমান্বিত হয়।
যে বিনম্র হয়,
সেই সম্মানিত হয়।
যে আল্লাহর সামনে
নিজেকে শূন্য করে,
তাঁর রহমতে
সে-ই পূর্ণ হয়ে ওঠে।

হে মানুষ,
কেন এত অহংকার?
কিসের এত গর্ব?

তোমার প্রথম কান্না
তোমার ইচ্ছায় ছিল না।
প্রথম নিঃশ্বাস
তোমার শক্তিতে ছিল না।
হৃদয়ের প্রথম স্পন্দন,
চোখের প্রথম আলো,
মায়ের প্রথম হাসি,
সবই ছিল
রবের অবারিত দান।

যে সূর্য
প্রতিদিন আলো বিলায়,
সে কি নিজের আদেশে উদিত হয়?
যে চাঁদ
রাত্রির কপালে জ্যোৎস্না আঁকে,
সে কি নিজের ইচ্ছায় জ্বলে?

না—
সবাই
এক মহাশক্তির নির্দেশে
নিয়ম মেনে চলে।

তবে মানুষ কেন
বিদ্রোহ শেখে?

যখন কেউ বলে,
"
ইবাদত ছেড়ে দাও,
সত্যের পথ ছেড়ে দাও,
সিজদা করো না"—

তখন ঈমানের উত্তর
বজ্রের মতো উচ্চারিত হয়—

কখনো নয়!

আমার প্রাণ যেতে পারে,
কিন্তু সিজদা যাবে না।
আমার দেহ ক্লান্ত হতে পারে,
কিন্তু সালাত থামবে না।
আমার চোখ অশ্রু ঝরাবে,
কিন্তু সেই অশ্রু
রবের দরবারেই পড়বে।

কারণ,
সিজদার চেয়ে নিরাপদ আশ্রয়
এই পৃথিবীতে নেই।

সিজদার চেয়ে নির্মল ভাষা
মানুষ শেখেনি।
সিজদার চেয়ে গভীর কবিতা
কোনো কবি লেখেনি।

কপাল যখন
মাটিকে আলিঙ্গন করে,
আত্মা তখন
আসমানের দিকে ডানা মেলে।

বান্দা তখন
নিজেকে হারায় না,
নিজেকে খুঁজে পায়।

হৃদয়ের গোপন দীর্ঘশ্বাস,
অকথিত বেদনা,
অপ্রকাশিত অনুতাপ,
সবকিছু
রহমতের সাগরে গিয়ে মিশে যায়।

হাদিসের সুসংবাদ
আত্মাকে আশ্বস্ত করে—
বান্দা যখন সিজদায় থাকে,
তখনই সে
তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী।

অতএব,
সেই মুহূর্তে
দোয়া করো,
কান্না করো,
ক্ষমা চাও,
ভালোবাসা প্রকাশ করো।

কারণ,
যে দরজা
সিজদায় খুলে যায়,
সে দরজা
পৃথিবীর কোনো শক্তি
বন্ধ করতে পারে না।

হে অহংকারী মানুষ,
মনে রেখো—
উঁচু মাথা
একদিন মাটিতেই মিশে যাবে।
কিন্তু সিজদায় নত হওয়া কপাল
রবের সন্তুষ্টির আলোয়
চিরদিন উজ্জ্বল থাকবে।

আজ যে কপাল
ধুলোর স্পর্শে লজ্জা পায়,
কাল সেই কপালই
কবরের মাটিতে
নিঃশব্দে শুয়ে থাকবে।

তখন আর থাকবে না
ক্ষমতার অহংকার,
সম্পদের গর্ব,
পদমর্যাদার মোহ,
মানুষের প্রশংসা।

থাকবে শুধু
আমল।
থাকবে ইখলাস।
থাকবে
সিজদার সাক্ষ্য।

সিজদা শেখায়—
মানুষকে ভালোবাসতে,
ক্ষমা করতে,
নিজেকে সংশোধন করতে,
অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করতে।

সিজদা শেখায়—
ধৈর্য ধরতে,
আশা রাখতে,
অন্ধকারের পর আলো আসে,
কষ্টের পর স্বস্তি আসে,
পরীক্ষার পর পুরস্কার আসে।

যে মানুষ
প্রতিদিন পাঁচবার
রবের সামনে নত হয়,
তার হৃদয়
পাথর হতে পারে না।

তার চোখে
করুণা জন্মায়।
তার কথায়
সত্যের সুবাস থাকে।
তার কাজে
মানবতার আলো জ্বলে।

হে দয়াময় রব,
আমাদের এমন সিজদা দিন,
যেখানে থাকবে না
লোকদেখানো ভক্তি,
থাকবে না
অহংকারের ছায়া।

আমাদের এমন হৃদয় দিন,
যেখানে প্রতিটি স্পন্দন
আপনার স্মরণে জেগে থাকে।

আমাদের এমন চোখ দিন,
যা অন্যের দোষের আগে
নিজের ভুল দেখে।

আমাদের এমন জিহ্বা দিন,
যা মিথ্যার নয়,
সত্যের গান গায়।

আমাদের এমন জীবন দিন,
যেখানে সালাত হবে
দিনের আলো,
সিজদা হবে
রাতের প্রশান্তি,
কুরআন হবে
পথের প্রদীপ,
আর আপনার সন্তুষ্টি হবে
জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।

যেদিন পৃথিবীর সব দরজা
বন্ধ হয়ে যাবে,
যেদিন মানুষ
মানুষকে ভুলে যাবে,
যেদিন ধন-সম্পদ,
ক্ষমতা,
পরিচয়,
সবই অর্থহীন হয়ে পড়বে—

সেদিনও
একটি দরজা খোলা থাকবে—
আপনার রহমতের দরজা।

সেই দরজার চাবি
ক্ষমতা নয়,
সম্পদ নয়,
খ্যাতি নয়—

সেই চাবির নাম
সিজদা।

তাই এসো,
অহংকার নামিয়ে রাখি।
লোভ নামিয়ে রাখি।
হিংসা নামিয়ে রাখি।
পাপের বোঝা নামিয়ে রাখি।

কপাল রাখি
রবের দরবারে।

কারণ,
যে কপাল
আল্লাহর সামনে নত হয়,
সে কপাল
কখনো অপমানিত হয় না।

যে হৃদয়
আল্লাহর ভালোবাসায় ভরে ওঠে,
সে হৃদয়
কখনো নিঃস্ব থাকে না।

আর যে জীবন
সিজদায় শেষ হয়,
তার জন্য অপেক্ষা করে
চিরশান্তির জান্নাত,
রবের সন্তুষ্টি,
এবং
সর্বোচ্চ পুরস্কার—

তাঁর নৈকট্য।

আমীন।

নত কপালের মহিমা

কখনো নয়—
অন্যায়ের শাসনে নয়,
অহংকারের আসনে নয়,
মিথ্যার মুকুট-পরা
ক্ষমতার প্রাসাদে নয়—
আমার কপাল নত হবে
শুধু সেই এক মহান রবের দরবারে,
যাঁর একক আদেশে
আলো জাগে পূর্বাকাশে,
নদী ছুটে চলে সাগরের পানে,
বীজের বুকে নিঃশব্দে
সবুজ অরণ্যের জন্ম হয়।

তিনি বলেছেন—
"
তার আনুগত্য করো না;
সিজদা কর,
আর নৈকট্য লাভ কর।"

এই একটি আহ্বানেই
মানবজীবনের
সমস্ত মর্যাদা,
সমস্ত স্বাধীনতা,
সমস্ত মুক্তির ঘোষণা।

যে মাথা
অন্যায়ের সামনে নত হয় না,
সে মাথাই
সিজদায় নত হয়ে
চিরমুক্তির পথ খুঁজে পায়।

এ কেমন বিস্ময়!
যেখানে পৃথিবীর চোখে
নত হওয়া পরাজয়,
সেখানে আসমানের বিচারে
নত হওয়াই বিজয়।

মানুষ যত উচ্চে ওঠে,
যত গর্বে বুক ফুলায়,
যত ক্ষমতার মসনদে বসে,
শেষ পর্যন্ত
এক মুঠো মাটিই
তার ঠিকানা।

কিন্তু যে মানুষ
জীবিত অবস্থায়
স্বেচ্ছায় কপাল রাখে
রবের দরবারে,
মৃত্যুর পরও
তার সম্মান মুছে যায় না;
বরং তার নাম
লিখে যায় ফেরেশতারা
ইবাদতের আলোয়।

সিজদা—
এ কেবল শরীরের ঝুঁকে পড়া নয়;
এ হৃদয়ের জেগে ওঠা।
এ অহংকারের বিদায়,
বিনয়ের আগমন।
এ আত্মার কান্না,
আশার দীপ,
ক্ষমার দুয়ার।

যখন কপাল
মাটিকে চুম্বন করে,
তখন অহংকার
ধুলোর সঙ্গে মিশে যায়।
যখন চোখে অশ্রু নামে,
তখন পাপের কালিমা
করুণার স্রোতে ধুয়ে যায়।

রাসূলের সুসংবাদ
আত্মাকে সাহস দেয়—
বান্দা যখন সিজদায় থাকে,
তখন সে
তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী।

তাই সিজদা
কেবল একটি আমল নয়;
এ দোয়ার শ্রেষ্ঠ সময়,
ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত,
ভালোবাসা নিবেদনের
সবচেয়ে নির্মল ভাষা।

হে মানুষ,
তুমি যদি ক্লান্ত হও—
সিজদায় এসো।
যদি ভেঙে পড়ো—
সিজদায় এসো।
যদি পৃথিবী তোমাকে প্রত্যাখ্যান করে—
সিজদায় এসো।

কারণ,
মানুষের দরজা বন্ধ হতে পারে,
রবের দরজা কখনো বন্ধ হয় না।

যখন অত্যাচারী বলে—
"
সত্যের পথে যেও না,"
তখন ঈমান উত্তর দেয়—
"
কখনো নয়।"

যখন প্রবঞ্চনা ডাকে,
লোভ হাতছানি দেয়,
শয়তান আশা ভাঙতে চায়,
তখন একজন মুমিন
সিজদায় আশ্রয় নেয়।

সেখানে
তার ভয় গলে যায়,
অস্থিরতা থেমে যায়,
হৃদয়ে নেমে আসে
অদৃশ্য প্রশান্তি।

সিজদা শেখায়—
ক্ষমতাকে নয়,
সত্যকে ভালোবাসতে।
মানুষকে নয়,
রবকে ভয় করতে।
পৃথিবীকে নয়,
আখিরাতকে সামনে রাখতে।

যে কপাল
দিনে-রাতে
রবের সামনে নত হয়,
সে কপাল
অন্যায়ের সামনে
কখনো নত হয় না।

যে হৃদয়
জিকিরে সজীব,
তার ভেতর
হিংসা স্থায়ী হয় না।
যে আত্মা
সালাতে প্রস্ফুটিত,
তার জীবনে
আশা কখনো নিভে যায় না।

হে পরম করুণাময়,
আমাদের এমন সিজদা দান করুন,
যেখানে থাকবে
শুধু ইখলাসের সুবাস।

আমাদের এমন হৃদয় দিন,
যা আপনাকে স্মরণ করে
শান্তি খুঁজে পায়।

আমাদের এমন জীবন দিন,
যেখানে সত্য
কথায় ফুটে ওঠে,
ন্যায়
কর্মে প্রতিফলিত হয়,
আর প্রতিটি সিজদা
আমাদের আরও কাছে নিয়ে যায়
আপনার অসীম রহমতের।

যেদিন শেষবারের মতো
এই পৃথিবীর মাটি
আমাদের কপাল স্পর্শ করবে,
সেদিন যেন
আমাদের জীবনের
শেষ সিজদাটিও হয়
আপনার সন্তুষ্টির আলোয় উদ্ভাসিত।

কারণ,
এই পৃথিবীর সর্বোচ্চ সম্মান
রাজমুকুটে নয়,
ক্ষমতার সিংহাসনে নয়,
মানুষের করতালিতে নয়—

সর্বোচ্চ সম্মান লুকিয়ে আছে
একটি সিজদায়,
একটি অশ্রুবিন্দুতে,
আর সেই নত কপালের মধ্যে,
যে কপাল
তার রবের নৈকট্য লাভ করেছে।

আমীন।

সিজদা : নৈকট্যের চূড়ান্ত পথ

কখনো নয়—
অসত্যের আহ্বানে নয়,
অহংকারের নির্দেশে নয়,
ক্ষমতার গর্জনে নয়,
মানুষের ভয়ে নয়—
আমার পদচারণা হবে
সেই পথেই,
যে পথে জেগে থাকে
রবের সন্তুষ্টির আলো।

যদি কোনো দিন
অন্যায় বলে—
“
নত হও,”
আমি বলব—
আমার কপালের ঠিকানা
তোমার দুয়ারে নয়।

আমার কপাল
মাটির সঙ্গে মিলবে,
কিন্তু অপমানের সঙ্গে নয়;
ধুলোর বুকে ঝুঁকবে,
কিন্তু মিথ্যার সামনে নয়;
নত হবে,
তবে কেবল
সেই মহান সত্তার উদ্দেশে,
যিনি নত হওয়াকেই
মর্যাদার শিখরে উন্নীত করেছেন।

তিনি সৃষ্টি করেছেন
ভোরের প্রথম আলো,
সন্ধ্যার শেষ রঙ,
বৃষ্টির বিন্দু,
সমুদ্রের ঢেউ,
পাখির ডানা,
শিশুর হাসি,
মায়ের মমতা,
আর মানুষের হৃদয়।

তিনি জানেন
অশ্রুর ভাষা,
নিঃশ্বাসের আর্তি,
নিঃসঙ্গ রাতের দীর্ঘ প্রার্থনা,
অবহেলিত মানুষের নীরব কান্না।

তাঁরই আহ্বান—
এসো,
সিজদায় নত হও,
আমার নৈকট্যে চলে এসো।

কত বিস্ময়কর
এই আহ্বানের গভীরতা!

পৃথিবী বলে—
উঁচু হয়ে দাঁড়াও।
রব বলেন—
নত হও,
তবেই হবে সর্বোচ্চ।

মানুষ বলে—
ক্ষমতাই সম্মান।
রব বলেন—
ইখলাসই সম্মান।

পৃথিবী শেখায়
নিজেকে বড় ভাবতে;
সিজদা শেখায়
নিজেকে চিনতে।

যে নিজের সীমাবদ্ধতা জানে,
সে-ই
অসীমের সন্ধান পায়।

যে নিজের অভাব বোঝে,
সে-ই
অফুরন্ত দানের দরজায় পৌঁছে।

যে চোখ
সিজদায় অশ্রু ঝরায়,
সে চোখ
আলোকে নতুন করে দেখে।

যে হৃদয়
রবের স্মরণে নরম হয়,
সে হৃদয়
মানুষের কষ্টও অনুভব করে।

সিজদা
শুধু ইবাদতের অংশ নয়;
এ এক বিপ্লব,
যেখানে অহংকার পরাজিত হয়,
বিনয় বিজয়ী হয়।

এ এক নীরব ঘোষণা—
আমি দাস,
আমার রবই মহান।

কত রাজা
ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে।
কত সাম্রাজ্য
ধুলোর সঙ্গে মিশে গেছে।
কত শক্তিমান
নিজ শক্তির ভারেই ভেঙে পড়েছে।

কিন্তু
একজন অচেনা বান্দা,
অন্ধকার রাতে,
নিঃশব্দ ঘরে,
যে কপাল রাখে
রবের সামনে—
তার নাম
আসমানের ফেরেশতারা জানেন।

এ সম্মান
পৃথিবীর কোনো পুরস্কার দিতে পারে না।

যখন কপাল
মাটিকে স্পর্শ করে,
তখন হৃদয়
আকাশের দিকে উড়ে যায়।

যখন ঠোঁট ফিসফিস করে,
“
হে আমার রব...”
তখন দুনিয়ার কোলাহল
দূরে সরে যায়।

যখন অশ্রু
সিজদার মাটিতে ঝরে,
তখন পাপের ভার
হালকা হতে থাকে।

যখন বান্দা
নিজেকে শূন্য করে,
তখন রব
তাঁর রহমতে
তাকে পূর্ণ করে দেন।

হে মানুষ,
কিসের অহংকার?

যে নিঃশ্বাসে বাঁচছ,
তা কি তোমার সৃষ্টি?

যে হৃদয় ধুকধুক করছে,
সে কি তোমার আদেশ মানে?

যে সূর্য
প্রতিদিন তোমার জানালায় আলো পাঠায়,
সে কি তোমার নির্দেশে উদিত হয়?

যে বৃষ্টি
শস্যের হাসি হয়ে নামে,
সে কি তোমার ইচ্ছায় ঝরে?

না—
সবই
এক মহান পরিচালকের
অসীম হিকমতের নিদর্শন।

তবু মানুষ
নিজেকেই বড় ভাবে!

সিজদা এসে বলে—
ফিরে এসো।
নিজেকে চিনো।
তোমার রবকে চিনো।

যখন পৃথিবী
দুঃখে ভারী হয়,
সিজদা
হৃদয়কে হালকা করে।

যখন মানুষ
বিশ্বাসঘাতকতা করে,
সিজদা
বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে।

যখন আশা নিভে যায়,
সিজদা
নতুন ভোরের আলো দেখায়।

যখন সব দরজা বন্ধ,
একটি দরজা খোলা থাকে—
রহমতের দরজা।

সেই দরজার সামনে
কোনো প্রহরী নেই,
কোনো সুপারিশের প্রয়োজন নেই,
কোনো পরিচয়পত্র লাগে না।

প্রয়োজন শুধু
একটি বিনম্র হৃদয়,
একটি নত কপাল,
একটি সত্যিকার আহ্বান।

হে প্রভু,
আমাদের এমন সিজদা দিন,
যেখানে থাকবে
অহংকারের কোনো ছায়া নয়,
লোকদেখানো ভক্তির কোনো রং নয়,
থাকবে শুধু
আপনাকে পাওয়ার আকুলতা।

আমাদের এমন সালাত দিন,
যেখানে মন হারিয়ে যাবে
আপনার স্মরণে।

আমাদের এমন জীবন দিন,
যেখানে সত্য হবে সাহস,
ন্যায় হবে পথ,
করুণা হবে পরিচয়,
আর ইবাদত হবে
প্রতিটি দিনের প্রাণস্পন্দন।

আমাদের এমন হৃদয় দিন,
যে হৃদয়
ক্ষমা করতে জানে,
ভালোবাসতে জানে,
অন্যায়ের সামনে দাঁড়াতে জানে,
কিন্তু আপনার সামনে
অশ্রুসজল হয়ে নত হতে জানে।

যেদিন
এই পৃথিবীর আকাশ
আমাদের শেষবার দেখবে,
যেদিন
শেষবারের মতো
এই মাটি
আমাদের কপাল ছুঁয়ে দেবে,

সেদিন যেন
আমাদের জীবনের
সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় হয়—

আমরা ছিলাম
নত কপালের মানুষ।

আমরা ছিলাম
সত্যের পথিক।

আমরা ছিলাম
সিজদার যাত্রী।

আর আমাদের
সবচেয়ে বড় অর্জন—
ধন নয়,
খ্যাতি নয়,
ক্ষমতা নয়,
মানুষের প্রশংসা নয়—

আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি
ছিল
আমাদের রবের নৈকট্য।

সেই নৈকট্য,
যেখানে সব ভয় থেমে যায়,
সব অশ্রু শান্তি হয়ে ঝরে,
সব ক্লান্তি প্রশান্তিতে রূপ নেয়,
আর আত্মা বলে ওঠে—

হে আমার রব,
আপনার সান্নিধ্যই
আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সফলতা,
আমার সকল প্রার্থনার পরিণতি,
আমার সকল সিজদার চূড়ান্ত পুরস্কার।

আমীন।

মন্তব্য করুন