সহকারী অধ্যাপক
০৩ জুলাই, ২০২৬ ০৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ
রবের সন্তুষ্টি - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
রবের সন্তুষ্টি
(সূরাঃ আল-বায়্যিনাহ আয়াতঃ ৭,৮আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
পৃথিবীর মেলা ভাঙবে একদিন,
নিভে যাবে রঙিন আলো;
মুছে যাবে রাজমুকুট, অহংকার,
শেষ হবে সুখের পালা।
থেমে যাবে ব্যস্ত শহরের গান,
নিস্তব্ধ হবে পথ,
যে হাতে গড়েছিল অট্টালিকা,
সেই হাতও হবে রথহীন রথ।
কিন্তু মুছে যাবে না কখনো
ঈমানের নির্মল দীপ;
যে হৃদয়ে জ্বলে রবের প্রেম,
সে হৃদয় থাকে অনুপম স্নিগ্ধ নীড়।
যারা বিশ্বাস করেছে এক আল্লাহকে,
শুধু মুখের ভাষায় নয়;
জীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে
তাঁর বিধানকে করেছে জয়।
যারা নামাজে নত করেছে শির,
সিজদায় ভিজেছে প্রাণ;
যারা সত্যকে বুকে আগলে রেখে
ত্যাগ করেছে মিথ্যার মান।
যারা অন্যায় দেখে নীরব থাকেনি,
ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছে;
ক্ষমতার মোহে বিবেক বিকায়নি,
মানুষকে ভালোবেসেছে।
যারা ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন দিয়েছে,
এতিমের চোখ মুছে;
অসহায় মানুষের ব্যথার পাশে
নিজের সুখটুকু পুড়িয়ে পুছে।
যারা জানত—
লোকচক্ষুর আড়াল বলে কিছু নেই,
প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস
রবের অগোচর হয় না কভুই।
তাঁদেরই বলে মহান রব—
"তোমরাই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি,
ঈমান আর সৎকর্মে যাদের জীবন
পেয়েছে অনন্ত দৃষ্টি।"
তাঁদের জন্য অপেক্ষায় থাকে
চিরসবুজ জান্নাতের দেশ,
যেখানে ক্লান্তির কোনো নাম নেই,
নেই কোনো মৃত্যির রেশ।
যেখানে নদী বহে শান্ত সুরে,
স্বচ্ছ, নির্মল, নীল;
যেখানে বাতাস আনে প্রশান্তির গান,
অশেষ সুখের ঢিল।
সেখানে ফুল ঝরে না কখনো,
ফুরায় না সুবাসধারা;
সেখানে বসন্ত থাকে চিরদিন,
ম্লান হয় না সবুজপাড়া।
সেখানে নেই কোনো হিংসা,
নেই বিদ্বেষ, নেই ক্ষোভ;
নেই বিচ্ছেদের কান্না,
নেই দুঃখের কোনো রোষ।
সেখানে নেই রোগের কষ্ট,
নেই বার্ধক্যের ক্ষয়;
নেই মৃত্যুর কালো ছায়া,
নেই বিচ্ছেদের ভয়।
সেখানে প্রতিটি সকাল
আনে নতুন আনন্দ;
প্রতিটি সন্ধ্যা ছড়িয়ে দেয়
রহমতের অপরূপ ছন্দ।
কিন্তু জান্নাতের সব নিয়ামতেরও ঊর্ধ্বে
আছে এক মহামূল্য দান—
আল্লাহ বলবেন,
"আজ আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট,
চিরদিন থাকবে এই সম্মান।"
সেদিন জান্নাতের অধিবাসীরা
নত হবে কৃতজ্ঞ প্রাণে,
বলবে—
"হে আমাদের প্রতিপালক!
আপনার দয়ার তুলনা কোথায় আর জানে?"
আপনি ডেকেছেন,
আমরা এসেছি;
আপনি ক্ষমা করেছেন,
আমরা বেঁচেছি।
আপনি আড়াল করেছেন
আমাদের অগণিত দোষ;
আপনি না চাইলে
ডুবে যেতাম পাপের রোষ।
আপনি পথ দেখিয়েছেন,
তাই তো আজ এ সুখ;
আপনি না ধরলে হাত,
হারিয়ে যেত জীবনমুখ।
তখন মহান রব ঘোষণা দেবেন—
"আজ থেকে আর কখনো
তোমাদের প্রতি
আমার অসন্তুষ্টি আসবে না।"
সে একটি বাক্য—
সমস্ত জান্নাতের সুখকেও
অতিক্রম করে যাবে;
কারণ সৃষ্টির সর্বোচ্চ প্রাপ্তি
রবের সন্তুষ্টিতেই থেমে রবে।
যে হৃদয় দুনিয়ায়
রবকে ভয় করেছে,
গোপনেও পাপকে ভয় পেয়ে
নিজেকে ফিরিয়ে এনেছে;
যে নির্জন রাতে
অশ্রু ঝরিয়ে বলেছে—
"হে আল্লাহ!
আমি দুর্বল,
আমাকে ক্ষমা করুন।"
যে ভুল করেছে,
কিন্তু ভুলেই থাকেনি;
তওবার অশ্রুতে
অন্তর ধুয়ে নিয়েছে।
যে মানুষের প্রশংসার চেয়ে
রবের সন্তুষ্টিকে বড় জেনেছে;
যে ক্ষণিক লাভের চেয়ে
আখিরাতকে বেছে নিয়েছে।
যে প্রলোভনের আগুনে
ঈমান বিকায়নি;
যে ক্ষমতার মোহে
বিবেক হারায়নি।
যে একাকী থাকলেও
রবকে ভুলে যায়নি;
অন্ধকার ঘরেও
তাঁর ভয় হারায়নি।
সেই মানুষই সফল,
সেই মানুষই ধন্য,
সেই মানুষই পৃথিবীর
সত্যিকার শ্রেষ্ঠ মানব।
কারণ শ্রেষ্ঠত্ব রূপে নয়,
ধনে নয়,
বংশে নয়,
ক্ষমতার অহংকারে নয়।
শ্রেষ্ঠত্ব থাকে
পরিশুদ্ধ ঈমানে,
সৎকর্মে,
তাকওয়ার দীপ্ত আলোয়,
রবের আনুগত্যে।
এসো তবে,
আমরা এমন জীবন গড়ি
যেখানে সত্য হবে পরিচয়,
ন্যায় হবে পথ,
করুণা হবে ভাষা,
আর তাকওয়া হবে হৃদয়ের অলংকার।
এসো,
সৎকর্মকে করি জীবনের শ্বাস,
ঈমানকে করি প্রাণের আলো,
আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই করি
সমস্ত চাওয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য।
যেন শেষ নিশ্বাসে
ফেরেশতারা হাসিমুখে বলে—
"ভয় কোরো না,
দুঃখ কোরো না,
তোমাদের জন্য প্রস্তুত
চিরস্থায়ী শান্তির নিবাস।"
আর অনন্ত জীবনের প্রভাতে
আমরা শুনতে পাই
সকল পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ আহ্বান—
"আজ আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট।"
সেদিন আর কোনো ভয় থাকবে না,
থাকবে না কোনো বেদনা,
থাকবে শুধু রবের নৈকট্য,
অসীম রহমত,
চিরস্থায়ী শান্তি,
আর অনন্ত আনন্দের মহাকাব্য।
এই মহাপুরস্কার তাদেরই জন্য—
যারা দুনিয়ায় নিজেদের রবকে ভয় করেছে,
তাঁকে ভালোবেসেছে,
তাঁর আনুগত্যে জীবন সাজিয়েছে,
আর তাঁর সন্তুষ্টিকেই
জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন বলে জেনেছে।
***
রবের সন্তুষ্টি
প্রভাত নামে নীরব আলোয়,
জাগে নতুন দিন;
সূর্য ওঠে প্রভুর হুকুমে,
ছড়ায় সোনার ঋণ।
চাঁদ আসে তার নির্ধারিত ক্ষণে,
তারারা রাখে পাহারা;
আকাশজোড়া নক্ষত্রমালা
গায় তাসবীহ সারা।
নদী বয়ে যায় সাগর-পানে,
ফিরে না নিজের পথে;
বনানীর সবুজ পাতারাও
নতমুখে রবকে রটে।
পাহাড় দাঁড়ায় অবিচল হয়ে,
ঝড়ের মুখে স্থির;
সাগরের ঢেউ সীমা মানে,
ভোলে না তার নীতির।
পাখির কণ্ঠে ভোরের সুর,
মৌমাছির কর্মগান;
সকল সৃষ্টি পালন করে
প্রভুর অমোঘ বিধান।
এই বিশাল বিশ্বমাঝে
মানুষ পেল মান—
জ্ঞান, বিবেক, ঈমান নিয়ে
হল সম্মানিত প্রাণ।
তবু সে কি শ্রেষ্ঠ হবে
শুধু জন্মের বলে?
নাকি শ্রেষ্ঠ সে-ই হবে,
যে সত্যপথে চলে?
না, শ্রেষ্ঠত্ব রূপে নয়,
ধনে নয়, বংশে নয়;
ক্ষমতার উচ্চ আসনেও
সত্যিকার গৌরব নয়।
যার অন্তরে ঈমান জাগে,
যার কর্ম শুভ হয়,
যে রবের ভয়ে পাপ ত্যাগ করে,
সত্যিকার শ্রেষ্ঠ সেই।
ঈমান শুধু উচ্চারিত
কয়েকটি শব্দ নয়;
ঈমান হলো জীবনজুড়ে
সত্যের দৃঢ় পরিচয়।
সৎকর্ম শুধু দানের হাত
বা কিছু ভালো কাজ?
সৎকর্ম মানে প্রতিক্ষণে
সত্যের প্রতি লাজ।
অন্যায় দেখে চুপ না থাকা,
ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো;
অসহায়ের চোখের জলে
নিজের হৃদয় ভেজানো।
পিতা-মাতার সেবা করা,
প্রতিবেশীর হক;
অঙ্গীকারে অটল থাকা,
ন্যায়ের প্রতি শপথ।
হৃদয় যখন ক্ষমা শেখে,
বিদ্বেষ করে ক্ষয়,
তখনই মানুষ সৃষ্টিজগতে
শ্রেষ্ঠ মর্যাদা লয়।
রাতের শেষে তাহাজ্জুদে
অশ্রু যখন ঝরে,
নীরব ঘরে একাকী মন
রবকে শুধু স্মরে—
"হে আমার প্রভু,
তুমি ছাড়া নেই তো আর কেউ;
তোমার দয়া না পেলে আমি
হারিয়ে যাই ঢেউ।"
এই মিনতি, এই বিনয়,
এই অনুতপ্ত প্রাণ—
মানুষকে তোলে আলোর পথে,
বদলে দেয় পরিচয়খান।
যে নিজেকে বড় না ভেবে
রবকে রাখে বড়,
তার হৃদয়ের বিনয়-ফুলে
ফোটে জান্নাত-ঘর।
তাকওয়া মানে ভয়ের সঙ্গে
অসীম ভালোবাসা;
প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের তরে
জীবনভর প্রত্যাশা।
গোপন ঘরে, নির্জন রাতে,
যখন কেউই নেই,
তখনও যে পাপকে ছাড়ে,
তাকওয়ার আলো সেই।
লোকের চোখে সাধু সেজে
অন্তরে পাপ লুকায়?
না, রব জানেন অন্তরের সব,
কিছুই আড়াল নয়।
তাই যে মানুষ নিজেকে আগে
নিজেই করে বিচার,
তার জীবনেই সত্যিকার
শুরু হয় সংস্কার।
ভুল হলে সে ফিরে আসে,
তওবায় ভেজায় মন;
প্রভুর রহমত অসীম জেনে
পায় নতুন জীবন।
এমন মানুষই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি,
এমন জীবন ধন্য;
আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন,
তাদের কীর্তি অনন্য।
তাদের জন্য প্রস্তুত আছে
অনন্ত শান্তিধাম;
যেখানে নেই মৃত্যুর ছায়া,
নেই কোনো অবসান।
নদী বয়ে যায় নির্মল স্রোতে,
সবুজ ছায়ার তলে;
সেখানে সুখের প্রতিটি ক্ষণ
চিরদিন হাসে দোলে।
ফুলের গন্ধ ফুরায় না আর,
মলিন হয় না রং;
চিরবসন্তের সেই উদ্যান
অমল আনন্দ-ঢং।
তবু জান্নাতের সব নিয়ামত
ছাড়িয়ে আছে আর—
রবের মুখে উচ্চারিত হবে
এক অনন্ত উপহার—
"আমি আজ তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট;
আর কখনো হবে না অসন্তুষ্ট।"
সে বাণী শুনে জান্নাতবাসী
নত হবে আনন্দে;
চোখে তাদের কৃতজ্ঞতার
অশ্রু ঝরবে ছন্দে।
বলবে তারা—
"হে দয়াময়,
সবই তোমার দান;
তোমার দয়া ছাড়া আমাদের
নেই তো কোনো মান।
তুমি ক্ষমা করেছ বলে
আজ এ সুখের দেশ;
তুমি ধরেছিলে হাত বলেই
শেষ হয়েছে ক্লেশ।"
এই তো মানুষের সর্বোচ্চ লাভ,
সকল সুখের শীর্ষ—
রবের সন্তুষ্টি, রবের নৈকট্য,
চিরশান্তির দিগন্ত বিস্তৃত।
এসো তবে আজই গড়ি
ঈমানভরা প্রাণ;
সৎকর্ম হোক প্রতিটি শ্বাস,
তাকওয়া হোক জ্ঞান।
যেন জীবনের অন্তিম ক্ষণে
হৃদয় থাকে স্থির,
রবের ডাকে সাড়া দিয়ে
হাসিমুখে ফিরি।
কারণ সত্যের পথের শেষে
যে পুরস্কার রয়—
আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে
মহান আর কিছু নয়।
১
১ মন্তব্য