সহকারী অধ্যাপক
০৪ জুলাই, ২০২৬ ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ
বাইতুল্লাহ - মোঃ মুজিবুর রহমান
বাইতুল্লাহ
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
নাম নিলে যার জেগে ওঠে
ঈমানভরা প্রাণ,
শ্রদ্ধাভরা নত হৃদয়ে
বাজে প্রেমের গান।
বাইতুল্লাহ—পবিত্র ঘর,
রবের মহান দান,
যুগে যুগে যার আলো ছড়ায়
মানবতার প্রাণ।
পাথর গাঁথা প্রাচীর নয়,
নয় সে কেবল স্থাপনা,
বিশ্বজোড়া বিশ্বাসের এক
অমল দীপশিখা।
যেখানে এসে মিলেছে কত
ভাষা, বর্ণ, দেশ,
এক আল্লাহর বান্দা সবে—
একই ভালোবেসে।
মরুর বুকে রৌদ্র ঝরে,
বালু জ্বলে দাহে,
তবু সেথায় করুণাধারা
আশার কথা চাহে।
আকাশ যেন নীল কিতাবের
খোলা প্রথম পাতা,
সেখানে লেখা রহমতেরই
চিরঅমল বার্তা।
মানুষ যখন খুঁজে ফিরেছে
সত্যপথের দিশা,
তখন স্রষ্টা দেখিয়েছেন
তাওহীদেরই দিশা।
ঐতিহ্যের বাণী বলে—
মানবসৃষ্টির আগে,
ফেরেশতারা ইবাদতের
সুর তুলেছিল জাগে।
সেই স্মৃতিধন্য পবিত্র স্থল
রহমতেরই ধারা,
যুগে যুগে যার পবিত্রতা
করেছে বিশ্বভরা।
মানবহৃদয় শিখুক সেথা
বিনয়, প্রেম, নম্রতা,
এক আল্লাহর বন্দেগিতে
জাগুক সত্যচেতনা।
সময়ের সেই মহান প্রভাতে
আদেশ এল ধীর,
রবের পথে গড়ে তোলো
পবিত্র এক নীড়।
পিতা-পুত্র দাঁড়াল তখন
বিশ্বাস ভরা প্রাণে,
ইবরাহিম আর ইসমাইল
রবেরই আহ্বানে।
হাতে ছিল না রাজমুকুট,
ছিল না কোনো বল,
ছিল কেবল ঈমানভরা
বিশুদ্ধ অনল।
একটি একটি পাথর তুলে
গড়লেন পুণ্য ঘর,
শ্রমের মাঝে জ্বলল যেন
ভক্তির অমর স্বর।
ঠোঁটে তাঁদের প্রার্থনা ছিল—
"হে আমাদের রব!
এই সেবাটি কবুল করো,
তুমিই সর্বশ্রবণ।"
যে ঘর গড়েন নবীগণও
নিজের নামে নয়,
আল্লাহরই সন্তুষ্টিতে
সকল আনন্দময়।
শিখিয়ে দিল সেই ইতিহাস—
কর্ম যদি হয় খাঁটি,
খ্যাতির চেয়ে প্রিয় হয় রবের
সন্তোষেরই সাথি।
পূবের দেশে, পশ্চিম দেশে,
উত্তর কিংবা দক্ষিণ,
যেখানেই থাকুক মুসলিম,
হৃদয় থাকে একদিন—
নামাজ যখন দাঁড়ায় মানুষ
নতমুখে নির্ভীক,
বাইতুল্লাহর দিকেই তখন
ফিরে যায় সব দৃষ্টি।
কেউ সাগরপাড়, কেউ পাহাড়ে,
কেউ নগরের মাঝে,
একই কিবলা মিলন ঘটায়
বিশ্বমানব সাজে।
শুভ্র বস্ত্রের সরল রূপে
হাজার হাজার প্রাণ,
একসাথে সব উচ্চারণে
ধ্বনিত হয় গান।
ধনী-গরিব ভেদ মুছে যায়,
মুছে বংশগৌরব,
সবাই তখন এক পরিচয়—
রবের প্রিয় মানব।
ভাষা আলাদা, দেশ আলাদা,
আলাদা সংস্কৃতি,
ঈমান এসে বেঁধে দেয় সব
ভ্রাতৃত্বেরই গীতি।
প্রদক্ষিণে ঘুরে চলে
অগণিত বিশ্বাস,
প্রতি পদে উচ্চারিত হয়
স্মরণের সুবাস।
ঘূর্ণনের সেই মহাশিক্ষা—
জীবনেরই মানে,
সবকিছুরই কেন্দ্র যেন
রবের সন্তোষখানে।
কালো গিলাফ ঢেকে রাখে
মহিমান্বিত রূপ,
সোনালি অক্ষরে ফুটে ওঠে
কুরআনেরই রূপ।
বাহিরেতে সরল শোভা,
ভেতরেতে মহিমা,
মানবজীবনও তেমনি হোক
সৎকর্মে সুসীমা।
বাইতুল্লাহ বলে নীরব ভাষায়—
"ভাগ হয়ো না আর,
স্রষ্টা তোমার এক ও অদ্বিতীয়,
একই তাঁর দ্বার।"
অহংকারের সব প্রাচীর
ভেঙে ফেলো আজ,
সত্য, ন্যায় আর করুণাতে
গড়ো মানবসমাজ।
শুধু পাথর দেখলেই হবে?
হৃদয় যদি শূন্য!
সত্য, ন্যায় আর দয়ার আলো
হোক জীবনের ধন্য।
মনকে করো নির্মল আগে,
কর্ম করো পবিত্র,
তবেই হবে জীবনের পথ
আলোকময় চিত্র।
হে পরম দয়াময় আল্লাহ!
দাও এমনই মন,
সত্যের পথে অটল থাকে
জীবনের প্রতিক্ষণ।
হিংসা যেন দূরে সরে যায়,
মুছে যাক সব দ্বেষ,
শান্তি, প্রেম আর ন্যায়ের বাণী
ছড়িয়ে পড়ুক দেশ।
বাইতুল্লাহর পবিত্র স্মৃতি
জাগুক অন্তরে,
সততা আর সেবার আলো
ফুটুক ঘরে ঘরে।
যতদিন এই সূর্য উঠবে,
চাঁদ ভাসাবে রাত,
ততদিন এই পুণ্য ঘরই
জাগাবে মানবজাত।
বিশ্বের যত সৎ হৃদয়
একই সুরে বলে—
"রবের পথে চলাই শ্রেষ্ঠ,
সত্যই জীবনের ফলে।"
বাইতুল্লাহ—তুমি নও শুধু
প্রস্তরের স্থাপনা;
তুমি মানবঐক্যের দীপ,
বিশ্বাসের প্রার্থনা।
তুমি যুগে যুগে শিখিয়ে যাও
বিনয়, প্রেম, ত্যাগ,
তোমার দিকে মুখ ফিরিয়ে
জাগে ঈমানের রাগ।
রবের ঘর, শান্তির ঘর,
করুণার আলয়,
তোমার স্মৃতির দীপ্তি যেন
মানবহৃদয়ে রয়।
***
যুগের পরে যুগ গড়ায়,
সভ্যতারও ক্ষয়,
তবু তোমার পবিত্র আলো
চিরদিন অক্ষয়।
সিংহাসন সব ধুলায় মিশে,
মুছে রাজমুকুট,
তোমার ডাকে জেগে থাকে
ঈমানভরা স্ফুট।
নক্ষত্র যেমন রাতের বুকে
দিশা দিয়ে যায়,
তেমনি তুমি সত্যপথের
অমর আলোকছায়।
মানুষ যত দূরে সরে
লোভের অন্ধ টানে,
ততই যেন ডেকে ওঠো
করুণাময় গানে।
মরুর বুকে ঝড়ের নাচন,
বালুর ঢেউ উড়ে,
তবু সেথায় শান্তির বাণী
অমৃত হয়ে ঝরে।
দিগন্তজোড়া নির্জনতায়
শোনা যায় যে সুর,
সে যে যেন রবের ডাকা—
"এসো আমার নূর।"
অহংকারের উচ্চ প্রাসাদ
ভেঙে যায় একদিন,
বিনয় থাকে চিরসবুজ
বিশ্বাসের অধকালো গিলাফ নীরব যেন,
তবু কত যে বাণী!
দেখলেই মন সিজদা হয়ে
হারায় আপনখানি।
সোনার অক্ষর দীপ্ত হয়ে
বলে অনুক্ষণ,
আল্লাহ ছাড়া নেই উপাস্য,
এই হোক জীবন।
চোখের জলে ধুয়ে যাক সব
অহমিকার দাগ,
ভালোবাসায় ভরে উঠুক
প্রাণের অনুরাগ।
পূবের আলো, পশ্চিম হাওয়া,
উত্তরের পর্বত,
দক্ষিণ সাগর—সবই যেন
এক মহাসংগত।
একই কিবলা, একই সিজদা,
একই রবের নাম,
একই ডাকে জেগে ওঠে
অসংখ্য অবিরাম।
রঙের ভেদ আর ভাষার ভেদ
গলে যায় নিমেষে,
মানুষ তখন মানুষ হয়ে
ভালোবাসা মেশে।
শুভ্র ইহরামের সরল রূপ,
নেই গৌরবচিহ্ন,
ধনী-দরিদ্র এক কাতারে
হৃদয় হয় নিঃশঙ্ক।
রাজা সেথায় সাধারণজন,
সাধারণও মহান,
রবের ঘরে সবার পরিচয়—
বিশ্বাসী ইনসান।
লাব্বাইক ধ্বনি আকাশভরা,
কম্পে ধরণী,
সেই ধ্বনিতে জেগে ওঠে
অমর চিরধ্বনি।
পাথর দিয়ে ঘর গড়া যায়,
মন কি গড়া যায়?
সত্য ছাড়া হৃদয় কোনো
পবিত্রতা পায়?
তাই যে আগে অন্তর গড়ো
সততারই শিলে,
দয়ার নদী বইতে দাও
জীবনেরই নীড়ে।
ক্ষমার ফুলে ভরুক জীবন,
ফলুক প্রেমের বন,
সেই হৃদয়েই জাগবে এসে
রহমতের স্পন্দন।
বাইতুল্লাহ শেখায় শুধু
ইবাদতের রীতি?
না, সে শেখায় মানবতার
মহান সমপ্রীতি।
ক্ষুধার্ত মুখ দেখলে আগে
বাড়াও সেবার হাত,
অন্যায়েরই অন্ধকারে
জ্বালো ন্যায়ের বাতি।
সত্যভাষণ, সৎ উপার্জন,
অপরের সম্মান—
এসব নিয়েই গড়ে ওঠে
বিশ্বাসী ইনসান।
যতদিন এই নীল আকাশে
রবির আলো রয়,
ততদিন এই পবিত্র ঘর
বিশ্বমানবের জয়।
যতদিন এই নদী বইবে,
বইবে প্রাণের গান,
ততদিনই জাগ্রত থাকবে
তোমার মহিমান।
হে বাইতুল্লাহ! তোমার স্মৃতি
আলোকময় পথ,
তোমার ডাকে জেগে উঠুক
মানবতার রথ।
প্রেমের ঘর, শান্তির ঘর,
ঐক্যের মহাদীপ,
বিশ্বের বুকে জ্বালিয়ে রেখো
তাওহীদের প্রদীপ।
সত্য, ন্যায় আর করুণাতে
উজ্জ্বল হোক প্রাণ,
রবের ঘরে মিলুক এসে
সমস্ত বিশ্বজ্ঞান।
তোমার পানে ফিরুক সবাই
নম্র বিনয়ভরে,
রহমতেরই ছায়া নেমে
আসুক ঘরে ঘরে।
১৪
২৪ মন্তব্য