সহকারী অধ্যাপক
০৫ জুলাই, ২০২৬ ০৪:২৮ পূর্বাহ্ণ
চির আশ্রয় - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
চির আশ্রয়
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
বন্ধু-বান্ধব, আপনজন,
একদিন হবে দূর,
জীবনসাঁঝে মিলিয়ে যাবে
হাসির রঙিন সুর।
যে হাত ধরে পথ চলেছি,
যে মুখ ছিল পাশে,
সময়েরই স্রোত বয়ে যায়
নিয়তিরই ভাষে।
ধন-সম্পদ, যশের মালা,
ক্ষমতার অহংকার,
কালের স্রোতে হারিয়ে ফেলে
গৌরবের অধিকার।
রাজপ্রাসাদ, সোনার অট্টালিকা,
রত্নখচিত দ্বার—
সবই থাকে পৃথিবীতেই,
ফুরায় জীবনের পার।
শৈশব ছিল ফুলের মতো,
কৈশোর নদীর ঢেউ,
যৌবন এল দীপ্ত সূর্য,
রইল না সে কেউ।
বার্ধক্যের নীরব ডাকে
শরীর হয় ক্লান্ত,
তখন মানুষ খুঁজে ফেরে
শান্তির অনন্ত।
যে পিতা-মাতা প্রাণ বিলিয়ে
সন্তান করে বড়,
একদিন তারাও বিদায় নেবে,
থামবে জীবনের ঘড়ি।
ভাইয়ের কাঁধে ভাই যে থাকে,
বোনের স্নেহছায়া,
সময়েরই ডানায় ভর করে
সবই পায় বিদায়।
যে বন্ধু আজ প্রাণের চেয়েও
নিকট বলে মনে,
সেও হয়তো দূরে যাবে
নিজের প্রয়োজনে।
কেউ বা থাকবে, কেউ বা যাবে,
এটাই জীবনের রীতি,
স্থায়ী নয় দুনিয়ার কোনো
সম্পর্ক কিংবা প্রীতি।
নিঃসঙ্গ রাত, অশ্রুসজল
হৃদয় যখন কাঁদে,
নিভে আসে আশার প্রদীপ
দুঃখের কালো ছায়ায়,
তখন যিনি শুনে নেন সব
মনের গোপন কথা,
তিনি শুধু পরম করুণাময়,
অশেষ দয়ার ব্যথা।
তিনি দেখেন অশ্রুবিন্দু,
শোনেন নীরব আর্তি,
ডাক না দিলেও জানেন তিনি
হৃদয়েরই ভারটি।
অন্ধকারের গভীর রাতে
আলোকরেখা হয়ে,
তিনি আসেন রহমতেরই
অশেষ সুধা লয়ে।
যেখানে সবাই ছেড়ে যায়,
তিনি থাকেন সাথে,
নিভৃত মনে সাহস জাগান
বিশ্বাসেরই প্রাতে।
যে হৃদয়ে তাঁর স্মরণ জাগে,
সে হৃদয় অটল হয়,
ঝড়ের মুখেও ঈমান তার
হারিয়ে যেতে নয়।
তিনি দয়ায় রিজিক দেন,
ক্ষমা করেন বারংবার,
অপরাধী ফিরে এলে
খুলে দেন ক্ষমার দ্বার।
কত ভুলে ডুবে থেকেও
ডাকলে মেলে সাড়া,
অশেষ করুণায় ঢেকে দেন
পাপের কালো ধারা।
সিজদার মাঝে মিশে থাকে
শান্তির নির্মল ঢেউ,
অশ্রুভেজা দোয়ার ভাষা
ফিরিয়ে দেন না তিনি কেউ।
হৃদয় যখন ভেঙে চুরমার,
ভরসাহীন প্রাণ,
তাঁরই নামে শক্তি ফিরে,
জাগে নতুন গান।
তিনি আছেন আসমানে,
তিনি আছেন অন্তরে,
তিনি জানেন সবই আগে,
অতীত-ভবিষ্যতের তরে।
তিনি ছাড়া আশ্রয় কোথায়?
কারই বা সে শক্তি?
তাঁরই দয়ায় টিকে থাকে
মানবজীবন-ভক্তি।
কবর হবে শেষ ঠিকানা,
বন্ধ হবে চোখ,
সেদিন হবে না তো সাথে
ক্ষমতারই লোক।
সাথে যাবে না ধনরতন,
যশের কোনো মান,
সঙ্গে যাবে ঈমান, আমল,
সত্যেরই সম্মান।
তাই হে মন,
অহংকারের প্রাসাদ ছেড়ে
বিনয় দিয়ে বাঁচ,
সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে
নিজেকে সদা রাখ।
অন্যায় যদি ডাকে তোমায়,
ফিরে এসো তবু,
ক্ষমার দ্বার খোলা রয়েছে
করুণাময়ের রবে।
স্মরণ রেখো—
বন্ধু-বান্ধব থাকবে না আর
কোনো একদিন নিকটে,
জীবনের সব রঙ মিলাবে
সময়েরই লিখতে।
কিন্তু যিনি চিরকালই
রহমতের অফুরান,
তিনি আছেন, থাকবেন সদা,
অনন্ত মহিমান্বিত মহান।
তাঁরই কাছে রাখো ভরসা,
তাঁরই কাছে মন,
তাঁরই নামে জাগুক সদা
জীবনের স্পন্দন।
তাঁরই পথে চলতে চলতে
হোক সকলের যাত্রা,
তাঁর সন্তুষ্টিই হোক আমাদের
জীবনের শ্রেষ্ঠ মাত্রা।
হে পরম দয়াময়,
তোমার দয়ায় রাখো ঢেকে,
ভুলের বোঝা ক্ষমায় মুছে
নাও আপন বুকে।
তোমার স্মরণ, তোমার প্রেম,
তোমারই আনুগত্য—
এই হোক প্রাণের চিরসম্পদ,
এই হোক জীবনের সত্য।
যতদিন প্রাণ, ততদিন মুখে
জাগুক তোমার নাম,
শেষ নিঃশ্বাসে ফুটুক শুধু
তোমারই সালাম।
দুনিয়াজুড়ে যতই ভাঙুক
সম্পর্কের বন্ধন,
পরম অভিভাবক, তুমি-ই আমার
চির আশ্রয়, চির নির্ভর, চির স্মরণ।
চির আশ্রয়
বন্ধু যাবে, সাথি যাবে,
যাবে আপনজন,
কালের স্রোতে মিলিয়ে যাবে
হাসি-কান্নার ক্ষণ।
যে হাতখানি ধরেছিল আজ
স্বপ্নভরা ভোরে,
সে-ও একদিন হারিয়ে যাবে
সময়েরই ঘোরে।
ফুল ঝরে যায়, পাতা ঝরে,
ঝরে শিশিরবিন্দু,
জীবন যেন ভাসমান এক
ক্ষণস্থায়ী সিন্ধু।
মেঘের মতো সুখের মেলা,
বাতাসসম মান,
চোখের পলক ফেলতেই যেন
ফুরায় তার গান।
আজ যে ঘরে আলোর মেলা,
আগামীকাল শূন্য,
আজ যে মুখে উচ্ছ্বাস ভাসে,
কাল সে নীরব গুণ্য।
আজ যে বন্ধু প্রাণের আপন,
হাসি ভাগ করে,
কাল সে হয় দূর দিগন্তে
অচেনা পথ ধরে।
আজ যে পিতা ছায়া হয়ে
রাখেন বুকের কাছে,
কাল তিনি আর থাকবেন না
জীবনেরই মাঝে।
মায়ের স্নেহ, বোনের মায়া,
ভ্রাতার দৃঢ় হাত,
সবই একদিন স্মৃতির খাতায়
রেখে যাবে পাত।
ধন-সম্পদের সোনার পাহাড়,
ক্ষমতার আসন,
কালের কাছে ক্ষণিক তারা,
মুছে যায় সে রঙ।
মুকুট, মান আর রাজদণ্ড,
গৌরবেরই ঢেউ,
মৃত্যু এসে বলে শেষে—
"এসব তোমার নয়।"
যখন রাত্রি গভীর হবে,
থামবে সকল গান,
চোখের জলে কাঁপবে নীরব
অসহায় প্রাণ।
ডাকবে কাকে? কারই বা তখন
থাকবে উত্তর দিতে?
সবাই তখন ব্যস্ত হবে
নিজের পথটি নিতে।
সেই নিঃসঙ্গ অন্ধকারে,
সেই নীরব ক্ষণে,
রহমতেরই দরজা খুলে
তিনি থাকেন সনে।
যাঁর করুণা সীমাহীন,
দয়া অফুরান,
তিনি-ই দেন আশার আলো,
তিনি প্রাণের প্রাণ।
তিনি জানেন হৃদয়জুড়ে
লুকিয়ে থাকা ব্যথা,
অশ্রুর আগে বুঝে নেন তিনি
মনের সব কথা।
ঠোঁট না নড়ে, শব্দ না ফোটে,
চোখে নামে জল,
তবু তিনি শুনে নেন সব,
খুলে দেন সম্বল।
কতবার যে পথ হারিয়ে
ফিরেছি পাপপথে,
তবু তিনি ডাক দিয়েছেন
অসীম মমতাতে।
ক্ষমার সাগর উজাড় করে
ডেকেছেন বারবার—
"ফিরে এসো, আমার বান্দা,
খোলা রহমতের দ্বার।"
তাঁরই নামে ভোরের আলো,
তাঁরই নামে দিন,
তাঁরই নামে জেগে ওঠে
ফুলের রঙিন ঋণ।
তাঁরই নামে নদীর স্রোতে
জাগে কলকল,
তাঁরই নামে পাখির কণ্ঠে
মধুর কাকলি-ছল।
তিনি দিলেন নীল আকাশ,
সূর্য, চাঁদের হাসি,
তিনি দিলেন বৃষ্টি, বাতাস,
সবুজ ঘাসের বাঁশি।
তিনি দিলেন মায়ের বুকে
অতল স্নেহধারা,
তিনি দিলেন মানুষের প্রাণে
ভালোবাসার তারা।
যত সুখের উৎস আছে,
যত দয়ার রং,
সবই তাঁর অনুগ্রহের
অশেষ সুধাতরঙ্গ।
তাঁরই দানে পৃথিবীজুড়ে
শস্যে ভরে ক্ষেতে,
তাঁরই দানে প্রাণের পাখি
গায় অনন্ত গীতে।
তাই হে মানুষ, ভুলে যেয়ো না
জীবনের এ বাণী—
দুনিয়ার সব সম্পর্ক ক্ষণিক,
চিরস্থায়ী নন তারা কেউই।
চিরস্থায়ী একমাত্র তিনি,
করুণার আধার,
তাঁরই দিকে ফিরিয়ে দাও
জীবনের অধিকার।
যখন কবর ডাকবে তোমায়,
নিভে যাবে প্রাণ,
সঙ্গে যাবে না ধনরতন,
যশের সম্মান।
সঙ্গে যাবে ঈমানখানি,
সৎকর্মেরই ফুল,
তাই আজই হৃদয়টাকে
করো না আর ভুল।
বন্ধু যাবে, সাথি যাবে,
ফুরাবে সংসার,
পরম দয়ালু আল্লাহই শুধু
চির আশ্রয়দাতা আর।
তাঁরই স্মরণ হৃদয়ে রাখো,
তাঁরই উপর ভর,
তাঁরই পথে চললে মানুষ
হারায় না আর পথের পর।
তাঁরই রহমত নক্ষত্রসম
জ্বলে অন্তরাকাশে,
তাঁরই প্রেমে জীবন ভরে
শান্তির সুবাতাসে।
সবাই যদি ছেড়ে যায়ও
দুঃসময়ের দিন,
পরম অভিভাবক আল্লাহ আছেন—
এই বিশ্বাসেই জয় নিশ্চিত, চিরদিন।
১৪
২৪ মন্তব্য