সহকারী শিক্ষক
০৫ জুলাই, ২০২৬ ০৮:২৪ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বর্তমান বিশ্ব আজ জলবায়ু পরিবর্তনের চরম অভিঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ভয়াবহ প্রতিকূলতাগুলো আজ আর তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন লড়াই।
এমন এক সংকটময় ও উত্তরণমুখী প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ বা ‘একটি শিশু, একটি গাছ’ কর্মসূচি কেবল একটি সাধারণ বৃক্ষরোপণ প্রকল্প নয়, বরং এটি একটি নতুন প্রজন্মের মানসিকতা পরিবর্তনের বৈপ্লবিক উদ্যোগ।
গত ২৯ জুন (সোমবার) শেরে বাংলা নগরের ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে’ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান, এমপি কর্তৃক উদ্বোধিত এই কর্মসূচির লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মোট পাঁচ কোটি চারা রোপণ করা। এটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত ‘টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনা’ এবং ‘জলবায়ু সহিষ্ণু আগামীর বাংলাদেশ’ গড়ার প্রতিশ্রুতির এক অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কার্যকর প্রতিফলন, যা দেশের তৃণমূল পর্যায়ে একটি সবুজ বিপ্লবের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
উদ্বোধনের সাথে সাথেই দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৯ হাজার ৬২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে—যার মধ্যে ১৮ হাজার ৯০৭টি বিদ্যালয়, ১ হাজার ৪৪৬টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ৯ হাজার ২৬৮টি মাদ্রাসা অন্তর্ভুক্ত—একযোগে এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘লার্নিং অ্যাক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ (লেইস/LAISE) প্রকল্পের বিশেষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই কর্মযজ্ঞের আওতায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ শিক্ষার্থীকে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এককালীন ‘জলবায়ু অনুদান’ প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহিত করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আকাশমণির মতো পরিবেশ-অবান্ধব বা আগ্রাসী বিদেশি জাতের গাছ রোপণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর পরিবর্তে দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে গঠিত শক্তিশালী সমন্বয় কমিটি প্রতিটি চারার সঠিক পরিচর্যা ও নিয়মিত অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টি তদারকি করছে, যা প্রকল্পের সফলতাকে দীর্ঘস্থায়ী করবে।
উল্লেখ্য, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রতিজন শিশুকে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণে সম্পৃক্ত করতে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের শিক্ষাঙ্গনে এই নতুন সবুজায়ন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর আওতায় আগামী ৫ বছরে দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় ৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রতিরোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করার লক্ষ্যেই মূলতঃ এই কর্মসূচীর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে কেবল রোপণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি টেকসই সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তর করতে হলে সৃজনশীল কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রতিটি শিশুর জন্ম নিবন্ধনের সাথে একটি চারা রোপণের অঙ্গীকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা যেতে পারে, যেখানে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভাগুলো চারা সরবরাহের দায়িত্ব নেবে। প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীয় মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েব পোর্টাল তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে অভিভাবকরা রোপণ করা গাছের ছবি এবং নিয়মিত বৃদ্ধির তথ্য আপডেট করবেন, যা ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে গাছের বেঁচে থাকার হার নিশ্চিত করবে। এছাড়া প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট দিনে স্থানীয়ভাবে ‘শিশু-বৃক্ষ মিলনমেলা’ বা বৃক্ষ উৎসবের আয়োজন করা এবং যারা তাদের সন্তানের রোপণ করা গাছ সবচেয়ে সুন্দরভাবে বড় করতে সক্ষম হবেন, তাদের বিশেষ স্বীকৃতি বা পুরস্কার প্রদান করা হলে মানুষের মধ্যে এই কাজে স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যাবে। যেসব পরিবারের নিজস্ব জমি নেই, তাদের জন্য রাস্তার ধার বা সরকারি খাস জমিতে গাছ পরিচর্যার দায়িত্ব অর্পণ করলে এই সবুজ অভিযান আরও বিস্তৃত হবে।
একজন শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের অভিজ্ঞতা থেকে আমি উপলব্ধি করি যে, পাঠ্যপুস্তকের তত্ত্বের চেয়ে এই ব্যবহারিক শিক্ষা অনেক বেশি কার্যকর ও শক্তিশালী। শিক্ষার্থীরা যখন নিজের হাতে একটি চারা রোপণ করে এবং প্রতিদিন সেটিকে পরম মমতায় বড় হতে দেখে, তখন তারা প্রকৃতির সাথে এক নিবিড় আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এই মমতা ও ভালোবাসার বোধই তাদের ভবিষ্যতে একজন পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। যখন শিক্ষার্থীরা শিখবে যে প্রতিটি গাছ একটি অক্সিজেন ব্যাংক হিসেবে কাজ করে, তখন তারা নিজেরাই প্রকৃতির অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠবে।
সরকারের এই দূরদর্শী মাইলফলক কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক লক্ষ্য পূরণের বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য এক একটি অক্সিজেন ব্যাংক তৈরির মহাযজ্ঞ। শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সমন্বিত ও ঐকান্তিক অংশগ্রহণই এই উদ্যোগকে চূড়ান্ত সফলতায় পৌঁছে দেবে। সরকারের এই উদ্যোগ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ পৃথিবী নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখবে, যা আমাদের একটি বাসযোগ্য ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
এম. আরিফুজ্জামান, সিনিয়র শিক্ষক,
মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জিয়ানগর, পিরোজপুর।
১৪
২৪ মন্তব্য