সহকারী শিক্ষক
০৫ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৫৮ অপরাহ্ণ
শিক্ষা ও সংস্কৃতি একটি শিশুর ব্যাক্তিত্ব গঠনে কি ভুমিকা রাখতে পারে?
Education has a great influence on children to build the career, life and personality.
শিক্ষা ও সংস্কৃতি একটি শিশুর ব্যাক্তিত্ব গঠনে কি ভুমিকা রাখতে পারে?
প্রথমেই জেনে নেয়া যাক শিক্ষা কি? শিক্ষা কাকে বলে?
শিক্ষার সংজ্ঞা:
”শিক্ষা হচ্ছে সঠিক মুহুর্তে আনন্দ বেদনা অনুভব করতে পারার ক্ষমতা বা শক্তি”— প্লেটো
”সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করার নামই শিক্ষা”— এরিস্ততল
”শিক্ষা বলতে শিশুর ব্যাক্তিসত্তার পরিপূর্ন বিকাশ কে বোঝায় যার সাহায্যে সে নিজের সবোর্ত্তম ক্ষমতা অনুযায়ী মানুষের কল্যানে স্বকীয় অবদান রাখতে পারে’’
অর্থাৎ শিক্ষা হল এমন এক নিয়ামক যার দ্বারা একটি শিশু তার ব্যাক্তিত্ব চিনতে পারবে, বুঝতে পারবে এবং তা বিকাশ করে মানুষের কল্যানে কাজও করতে পারবে।— পার্সি নান
এবার আসা যাক সংস্কৃতির সংজ্ঞায়:
গোলাম মুরশিদ ’হাজার বছরের বাঙালী সংস্কৃতি ’ গ্রন্থে(২০০৬) পন্ডিত এডওয়ার্ড টেইলরের সংস্কৃতির ধ্রুপদী সংজ্ঞাটি তুলে ধরেছেন।” মানুষের বিশ্বাস আচার আচরন এবং জ্ঞানের একটি সমন্বিত প্যাটার্নকে বলা হয় সংস্কৃতি”।
রবীন্দনাথ শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রবন্ধে লিখেছেন ” সংস্কৃতি সমগ্র মানুষের চিত্তবৃত্তিকে গভীরতর স্তর থেকে সফল করতে থাকে”।
তাহলে দেখা গেল সংস্কৃতি একটি সুবিস্ত্রী ব্যাপক একটি ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে। এখানে মানুষের আচার আচরন, ভাষা, নিয়ম কানুন, সামাজিক মূল্যবোধ, উতসব পর্বন, শিল্প কর্ম, প্রতিদিনের কাজে লাগার হাতিয়ার, ধর্ম বিশ্বাস সব কিছু নিয়েই এই সংস্কৃতি।এর পরিধি যেমন ব্যাপক ঠিক তেমনি এর পারিমাপও সুনিয়ন্ত্রিত।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক:
শিক্ষা ও সংস্কৃতির রয়েছে নিবীড় সম্পর্ক। একটি আর একটির পরিপূরক। একটি ছ¦াড়া আর একটি অর্থহীন।রবীন্দ্রনাথ বলেছেন” কমলহীবের পাথরটাকেই বলে শিক্ষা আর ওর থেকে যে আলো ঠিকরে পড়ে তা হল সংস্কৃতি।”পাথরের যেমন ভার আছে ঠিক শিক্ষার ও ভার আছে, ্ওজন আছে। অপর দিকে সংস্কৃতির আছে দৃপ্তি।শিক্ষার আলোটাই গ্রহন করে সংস্কৃতির হাতিয়ার দ্বারা সেই আলো ছড়িয়ে দেয়। সংস্কৃতি ছাড়া শিক্ষা নিরব নিথর অচল। শিক্ষা হল সংস্কৃতি নামক গাছের ফল এবং সেই গাছ হল এমন গাছ যার আলো আছে ,ব্যাপ্তি আছে, আছে ছায়া। এ গাছের ছায়া ছ¦াড়া শিক্ষিত মানুষের আর কোন ছায়ার আশ্রয় নাই। তাই একজন মানুষের শিক্ষার প্রসার যতই বড় হউক না কেন তার নিচে কোন প্রথিকই শান্তির পরশ পেতে পারে না যদি না সেই শিক্ষার মধ্যে সংস্কৃতির ছেঁায়া থাকে। এজন্যই বলা হয় একজন সংস্কৃত হীন মানুষ সিংহের চেয়েও হিং¯্র হয়ে যেতে পারে। সংস্কৃত বান শিক্ষিত মানুষই আলোর বাতিঘর। তারাই জানে সমাজ কি করে আলোকিত করতে হয়? মানুষের চিন্তা মেধা ও মনন দ্বারাই আসে শিক্ষা আর সেই শিক্ষার কাজই হল তার হাজার বছরের সংস্কৃতিকে রক্ষা করা । একজন শিক্ষিত মানুষকে সাংস্কৃতিক কি না তা বলা যাবে না কিন্তু একজন সাংস্কৃতিক মানুষ অবশ্যই শিক্ষত। সংস্কৃতি হল পরিশুদ্ধি এ জন্যই বলা হয় যে সমাজ যত বেশি সংস্কৃতিক সে সমাজ তত বেশি শিক্ষিত। সংস্কৃতির উন্নয়নে যেমন আছে শিক্ষা ঠিক তেমনি শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেষ্য নির্নয়নেও রয়েছে সংস্কৃতির অপার ভুমিকা। সংস্কৃতি ছাড়া কোন শিক্ষাই পূর্ন শিক্ষা হয়ে উঠে না। তাই একজন শিক্ষার্থীকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় নৈতিক, আদর্শিক ও সংস্কৃতি শিক্ষা নেয়া অতীব জরুরী। সংস্কৃতির ধারক বাহক বলা হয় শিক্ষাকে। দেশীয় সংস্কৃতিকে ধারন, নির্ধারন, উন্নয়ন, তার বিকাশ, প্রকাশ ও প্রসারই শিক্ষার কাজ। দেশীয় শিক্ষাব্যাবস্থায় তাই সংস্কৃতির প্রভাব অনস্বীকার্য। সংস্কৃতি উন্নত মনের না হলে শিক্ষাও উন্নত মানের হবে না। বরং তা দিনে দিনে পঙ্গু আকার ধারন করবে।
শিশুর ব্যাক্তিত্ব গঠনে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভুমিকা:
শিক্ষার ও সংস্কৃতির মুল উদ্দেষ্য হল মানুষের মৌলিক মানবীয় গুনাবলী অর্জন করে মানুষ্যত্ব অর্জন করা । মেধা ও মনন দিয়ে আমরা যে শিক্ষা অর্জন করি সেই শিক্ষাই আমাদের হাজার বছরের ধ্যান ধারনা আচরনকে পরিবর্তন করতে শিখায়। শিখায় নতুনত্বকে গ্রহন করতে। যথার্থ সংস্কৃতি মানুষের সৌজন্যকে বড় মূল্য দিয়ে থাকে। এটি হল মানুষের সঙ্গে কাজ উদ্দার করার বিনিত কৌশল। সংস্কৃতিবান মানুষ নিজের ক্ষতি করতে পারে কিনÍু নিজেকে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে না।সে আড়ম্বপ র্পর্ন জীবনকে প্রচার করতে কুন্ঠবোধ করে না। সে সবার আগে নিজেকে প্রাপ্য গহন করাকে লজ্জা বোধ করে। সে আপরের হকের ব্যাপারে সর্বদাই সতর্ক। ভালো জিনিস তাকে আনন্দ দেয় আর খারাপ কিছু তাকে করে ব্যাথিত। সে শেষ্ঠকে শেষ্ঠ মনে করে তাকে সম্মান করে এবং পাপীকে নয় বরং পাপকেই ঘৃণা করে। সে বেদাভেদ দুর করেতে পারে। সে বিচার করতে পারে, সে হাসতে পারে, হাসাতেও পারে, ক্ষমা করতে পারে।সে অন্যের সফলতায় ঈর্ষান্বিত হওয়াকে লজ্জা মনে করে। সে বিতর্ক থেকে প্রয়োজনীয় কথা গুগো নিজের জন্য বেছে নিতে পারে। শিক্ষিত মানুষকে সুশিক্ষিত হতে হলে তাকে সংস্কৃতি বান হতে হবে। হতে হবে তাকে সংস্কৃতির ধারক বাহক। মানুষকে মানুষ হতে হলে তাকে গ্রহন করেতে হবে সংস্কৃতি। পান করতে হবে তার সুধা।যদি শিক্ষার সাথে সংস্কৃতির কোন মেলবন্ধন না থাকে তবে শুধু কমল হীরের পাথরটাকেই পাওয়া যাবে কিন্তু তার থেকে কোন দীপ্তি আর পাওয়া যাবে না । শিশু যদি হিংসা, বিদ্বেস, কানাকানি, ফিসফিসানি, চোগলখুরী, গীবত, অপসংস্কৃতি, হেয়প্রবনতা, পূর্বমূল্যায়ন নামক মানবিক দূুর্বলতা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় তবে তাকে আসতে হবে সংস্কৃতি নামক ছাতার নিচে।প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুধু মাত্র তার দক্ষতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে কিন্তু সেই শিক্ষাতে যদি সংস্কৃতির কোন ছোয়া না থাকে তবে সেই দীক্ষা বা দক্ষতা মানুষের কল্যানে ব্যাবহার না হয়ে বরং মানুষের ক্ষতির কারন হয়ে দাড়াবে। একটি শিশু ঠিক যেমন পাঠ্য পুস্তক পড়া উচিত ঠিক তেমনি তার জানা উচিত সামাজিক মূল্যবোধ। মেনে চলা উচিত পারিবারিক অনুশাসন। সম্মান করা উচিত দেশের ঐতিয্য ও রীতি নীতিকে। শিক্ষার উদ্দেষ্য আর সুফল এর মাপ কাটিই হল তার শিক্ষা । আর শিক্ষার পরিমাপকই হল সংস্কৃতি। বস্তুত মানুষের ব্যাক্তিত্বকে রুপায়ন করে সংস্কৃতি। মানুষের ব্যাক্তিত্বে উতস মুলত দুই ধরনের তা হল একটি জন্মগত আর একটি হল সংস্কৃতিগত । সমাজ সাংস্কতির উপর মানুষের ব্যক্তিত্ব অনেকটাই নির্ভরশীল । শিক্ষা ব্যাক্তিত্ব ঘটায় ও তা বিকাশ করে।এবং ধারাবাহিক ভাবে আর আচরনের পরিবর্তন ঘটায়। এবং দৃষ্টিভঙ্গীর স্থায়ী পরিবর্তন আনে, পূনগঠন করে। শিক্ষাই মানুষের আচরনে আমুল পরিবর্তন সাধিত করে ও তা সংস্কৃতির উপর প্রভাব ফেলে। পরবতীর্তে সে সেই প্রভাবকেই তার ইতিবাচক কাজে লাগায় । সর্বোপরি বলা যায় যে মানুষের আচরনমালার সমষ্টিই হল সংস্কৃতি।
একদিকে যেমন আমরা ফলাফল নিয়ে খুব উতসাহিত হচ্ছি ঠিক অপরদিকে পরিক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়েও আমরা হতাশ হচ্ছি। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যাবস্থা নিয়েও দু:চিন্তা কম নয় । এমন নব নব পরিক্ষা কঠামোতে পরিক্ষা দিয়ে ঠিক যেমন সোনা ঝরবে । অপরদিকে প্রশ্ন পত্র ফাঁস করে আমলা হলেও তা আমাদের হতাশার । কাগজে কলমে শিক্ষিত হলেও তখন শিক্ষার প্রয়োগ যৌগতা. গ্রহন যৌগতা, সেই আমলার রুচি ও মূল্যবোধ হয়ে উঠবে প্রশ্নবিদ্ধ। এই প্রজন্ম নিয়ে যতটানা চিন্তার তার থেকে অধিকতর চিন্তার বিষয় হল তাদের বোধের । বোধ সম্পন্ন মানুষ অসৎ উপায় অবলম্বন করতে পারে না। সুশিক্ষিত অভিভাবক পারে না তার সন্তানের হাতে তুলে দিতে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের এ কে ফরটি সেভন। তাহলে দেখতে হবে যে আমাদের শিক্ষার গোড়ায় ই রয়েছে সংস্কৃতির অভাব। আসলে আমরা সাব্ই মনে করে থাকি য়ে সংস্কৃতি হল গাছের উপশাখা। বরং সংস্কৃতি হল গাছের মুূল আর তার উপশাখা হল আমাদের এই শিক্ষা। শিক্ষায় সংস্কৃতির অভাবের কারনেই আজ সমাজে অন্যায়, রাহজানী, ঘুষ, হটকারিতা, বিষবাস্প হয়ে আমাদের সংক্রমিত করছে। আমারা বিজ্ঞান ভিত্তিক এই যুগে প্রতিদিনই শিক্ষিত হচ্ছি, আধুনিক হচ্ছি, ডিজিটাল হচ্ছি, যন্ত্রে তন্ত্রে যুগপদ হচ্ছি কিন্তু মন্ত্রে রয়ে গেছি আদিম। আমাদের মানবিক গুনাবলি বিকাশিত হচ্ছে না। আমাদের মানিসিক উতকর্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। একদিন হয়তো আমরা প্রাকৃতিক কোন দুযোর্গে নয় বরং সংস্কৃতির দুযোর্গে পড়েই মারা যাব।তাই এর পতিশোধক শিক্ষা জীবনের শুরুতেই দেয়া উচিত । শিক্ষক শুধু ক্লাসে পড়াবেন না বরং শিক্ষার্থীর মন মনন বিকাশে উদ্দোমী ও হবেন ।একজন সুশিক্ষিত সংস্কৃতি বোধ সম্পন্ন মানুষের ব্যাক্তিত্ব হবে অনুকরনীয় । সে অন্যকে অনুসরণ করবে কিন্তু কাউকেই অনুকরণ করবে না । তার ব্যাক্তিত্বে থকবে মাধুর্য, অপরকে আকৃষ্ট কারার উপাদান, অন্যের জন্য পাথেয়, সে হবে সকলের জন্য আদর্শিক ও উপমীয়। একজন শিক্ষিত মানুষ নয় বরং একজন সু সংস্কৃতিপূর্ন মানুষই পারে এই সমাজের কাঙ্খিত লক্ষ ভেদ করে সোনালি সূর্যটা এনে দিতে আমাদের হতে হাতে ।
১
২ মন্তব্য