Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ জুলাই, ২০২৬ ০৬:১১ পূর্বাহ্ণ

উত্তর মেরুর লাখ লাখ বছর আগে দক্ষিণ মেরু কেন জমে গিয়েছিল

লক্ষ লক্ষ বছর আগে উত্তর মেরুর অনেক আগেই দক্ষিণ মেরু (অ্যান্টার্কটিকা) বরফে জমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল ভূ-খণ্ডের অবস্থান পরিবর্তন, সমুদ্রের স্রোত এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের হ্রাস।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে (ইওসিন যুগের শেষে) দক্ষিণ মেরু পুরোপুরি বরফে ঢাকতে শুরু করে। অন্যদিকে, উত্তর মেরু পুরোদমে জমতে শুরু করে তার অনেক পরে, মাত্র প্রায় ২৭ লক্ষ বছর আগে।

উত্তর মেরুর এত আগে দক্ষিণ মেরু জমে যাওয়ার প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. টেকটোনিক প্লেটের পরিবর্তন ও কুমেরু বৃত্তাকার স্রোত (ACC)

আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি বছর আগে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশটি দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের সাথে যুক্ত ছিল। তখন বিষুবরেখা বা গরম অঞ্চল থেকে উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোত অনায়াসে অ্যান্টার্কটিকার উপকূল পর্যন্ত পৌঁছাত এবং এই অঞ্চলটিকে বেশ উষ্ণ রাখত (সে সময় অ্যান্টার্কটিকায় সবুজ বনভূমিও ছিল!)।

কিন্তু টেকটোনিক প্লেটের বা ভূ-খণ্ডের সঞ্চালনের কারণে অ্যান্টার্কটিকা যখন অন্যান্য মহাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একদম দক্ষিণ মেরুতে চলে যায়, তখন দক্ষিণ আমেরিকা ও অ্যান্টার্কটিকার মাঝে 'ড্রেক প্যাসেজ' (Drake Passage) নামের একটি উন্মুক্ত সামুদ্রিক পথ তৈরি হয়। এর ফলে অ্যান্টার্কটিকার চারপাশে ঘড়ির কাঁটার দিকে একটি বিশাল এবং তীব্র শীতল সামুদ্রিক স্রোতের সৃষ্টি হয়, যাকে বলা হয় Antarctic Circumpolar Current (ACC)।

এই শক্তিশালী শীতল স্রোতটি একটি প্রাচীরের মতো কাজ করে। এটি উত্তর দিকের কোনো উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোতকে অ্যান্টার্কটিকার কাছে ঘেঁষতে দেয় না। ফলে অ্যান্টার্কটিকা বাকি পৃথিবী থেকে তাপীয়ভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং দ্রুত জমতে শুরু করে।

২. বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ($CO_2$) ঘাটতি

সে সময় বিশ্বব্যাপী বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে গিয়েছিল। $CO_2$ কমে যাওয়ার কারণে গ্রিনহাউস প্রভাব হ্রাস পায় এবং পুরো পৃথিবীর তাপমাত্রা কমে যায়। এই বৈশ্বিক শীতলীকরণের প্রথম এবং সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ে ইতিমধ্যেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দক্ষিণ মেরুর ওপর।

৩. স্থলভাগ বনাম জলভাগের অবস্থান (ভৌগোলিক পার্থক্য)

উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর ভৌগোলিক গঠনে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে, যা তাদের জমে যাওয়ার সময়ে তারতম্য ঘটিয়েছে:

  • দক্ষিণ মেরু (অ্যান্টার্কটিকা): এটি একটি বিশাল স্থলভাগ বা মহাদেশ, যা চারদিকে মহাসাগর দিয়ে ঘেরা। স্থলভাগ পানির চেয়ে অনেক দ্রুত তাপ হারিয়ে ঠান্ডা হয়ে যায়। একবার বরফ জমতে শুরু করার পর তা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে (অ্যালবেডো প্রভাব) নিজেকে আরও দ্রুত ঠান্ডা করে ফেলে।

  • উত্তর মেরু (আর্কটিক): এটি কোনো মহাদেশ নয়, এটি মূলত স্থলভাগ দিয়ে ঘেরা একটি মহাসাগর (Arctic Ocean)। পানি খুব ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয় এবং চারপাশের মহাদেশগুলো থেকে উষ্ণ পানির স্রোত ও বাতাস উত্তর মেরুর দিকে প্রবাহিত হতে পারত। এই কারণে উত্তর মেরু অত সহজে জমেনি।

সংক্ষেপে: দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অ্যান্টার্কটিকা আলাদা হয়ে যাওয়ার পর তার চারপাশে যে তীব্র শীতল সামুদ্রিক স্রোতের প্রাচীর তৈরি হয়েছিল, তা-ই মূলত উত্তর মেরুর লক্ষ লক্ষ বছর আগেই দক্ষিণ মেরুকে একটি চিরস্থায়ী বরফের রাজ্যে পরিণত করেছিল।

মন্তব্য করুন

ব্লগ