সহকারী অধ্যাপক
০৭ জুলাই, ২০২৬ ০৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ
“হে রব! নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি” - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
“হে রব! নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি”
(সূরা আল-আ'রাফ, ৭:২৩-এর ভাবানুসারে )
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
হে দয়াময়, হে পরম রব,
তোমারই নামে শুরু করি গান,
তোমারই আলোয় জেগে ওঠে
মানবজীবনের প্রতিটি প্রাণ।
ভুলের পথের ধুলো মেখে
মানুষ কতবার পথ হারায়,
তবু তোমার করুণাধারা
অশ্রুসিক্ত প্রাণে নেমে আসে হায়।
প্রথম মানব, প্রথম শিক্ষা,
প্রথম অনুতাপের বাণী,
চিরকাল ধরে শোনায় মানুষকে
ক্ষমার পথের অমল কাহিনি।
আদম বললেন নতশির হয়ে—
“হে আমাদের দয়াময় রব!
নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি,
ক্ষমা ছাড়া নেই কোনো সবব।
যদি না তুমি ক্ষমা করো,
যদি না করো দয়ার দান,
তবে তো আমরা হারাবো সব,
নিভে যাবে জীবনের গান।”
কী অপূর্ব সেই স্বীকারোক্তি!
নেই সেখানে অহংকার,
নেই কোনো অজুহাত খোঁজা,
নেই আত্মপ্রশংসার ভার।
দোষ ছিল নিজের, তাই নিজেই
স্বীকার করলেন মাথা নত করে,
সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ
জয়ী হয় বিনয়েরই জোরে।
অন্যদিকে ইবলিস দাঁড়ায়
অহংকারের অন্ধ মিছিলে,
ভুলকে সত্য প্রমাণ করতে
যুক্তির প্রাচীর তোলে কৌশলে।
ক্ষমা চায় না, নত হয় না,
দম্ভে রাখে বুক ভরে,
তাই সে হলো অভিশপ্ত,
অন্ধকারের অতল ঘরে।
আদম শিখালেন—
ভুল করলে ফিরতে হয়,
অশ্রুভেজা দুটি চোখে
রবের দুয়ারে দাঁড়াতে হয়।
তওবা মানে শুধু কথা নয়,
হৃদয়ভরা অনুতাপ,
নিজেকে বদলে নেওয়ার শপথ,
সত্যের পথে নতুন আলাপ।
যে মানুষ নিজের ভুল দেখে,
সে-ই তো জ্ঞানের প্রথম ধাপ,
যে মানুষ নিজেকে শুধরে নেয়,
তারই জীবনে আশার চাপ।
পাহাড় যেমন মাথা উঁচু,
তবু নীরব দাঁড়িয়ে রয়,
তেমনি জ্ঞানী বিনয়ী মানুষ
নিজেকে বড় কখনো নয়।
নদী যেমন সাগরপানে
নম্র হয়ে বয়ে যায়,
তেমনি হৃদয় নত না হলে
রহমতের দুয়ার খোলে না হায়।
কত পাপের কালো মেঘে
ঢেকে যায় জীবনের আকাশ,
তবু তোমার ক্ষমার রবি
আনে নতুন আলোর প্রকাশ।
তুমি ক্ষমার অফুরন্ত সাগর,
আমরা ক্ষুদ্র তৃষ্ণার কণা,
তোমার রহমতের এক ফোঁটাতেই
ফিরে পাই জীবনের গাঁথা।
যে অশ্রু ঝরে তওবার রাতে,
সে অশ্রু নয় কেবল জল,
সে তো হৃদয়ের ধুলা ধুয়ে
ফোটায় ঈমানের কমল।
হে রব!
অহংকার যেন কাছে না আসে,
মিথ্যা যেন মুখে না রয়,
ভুল করলে যেন স্বীকার করি,
সত্যের পথেই জীবনময়।
ক্ষমা চাওয়ার শক্তি দাও,
ক্ষমা করার মনও দাও,
ঘৃণার আগুন নিভিয়ে দিয়ে
ভালোবাসার আলো দাও।
মানুষ যেন মানুষকে দেখে
সম্মানেরই দৃষ্টিতে,
কেউ না থাকে অবহেলিত
অন্যায়ের অন্ধ সৃষ্টিতে।
আমরা সবাই ভুলের সন্তান,
নই তো কেউ ফেরেশতা,
তবু তওবায় জেগে ওঠে
পবিত্র জীবনের বারতা।
যে মাথা নত করে রবের তরে,
সে মাথা আর নত নয়,
সেই মাথাতেই সম্মানের মুকুট
আল্লাহ নিজ হাতে পরিয়ে দেন।
ক্ষমাই শক্তি, ক্ষমাই সৌন্দর্য,
ক্ষমাই হৃদয়ের জয়,
ক্ষমাই মানুষকে মানুষ করে,
ক্ষমাই অনন্তময়।
আজও পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণে
ধ্বনিত হোক সেই প্রার্থনা—
“হে আমাদের পরম রব!
আমরা নিজেদের প্রতি করেছি অন্যায়।
আমাদের ভুল তুমি ক্ষমা করো,
করুণায় ভরিয়ে দাও প্রাণ,
তোমার রহমত ছাড়া আমরা
হারাবো জীবনের সম্মান।
আমাদের অন্তর করো পবিত্র,
আমাদের চোখে দাও লাজ,
আমাদের মুখে সত্যের বাণী,
আমাদের কর্মে ন্যায়ের সাজ।
অহংকারের আগুন নিভাও,
বিনয়ের ফুল ফুটুক প্রাণে,
তওবার সুবাস ছড়িয়ে পড়ুক
মানবতার প্রতিটি টানে।
যেদিন শেষ হবে এই পথচলা,
নিভে যাবে পৃথিবীর আলো,
সেদিনও যেন বলতে পারি—
হে রব! তুমি ছিলে ভালো।
তোমার ক্ষমায় জেগেছে আশা,
তোমার দয়ায় বেঁচেছি আমরা,
তোমার রহমতেই মুক্তি মিলুক—
এই হোক জীবনের শেষ প্রার্থনা।
হে দয়াময়!
আমাদের অন্তরকে সত্যের পথে অটল রাখো,
আমাদের জিহ্বাকে মিথ্যা থেকে রক্ষা করো,
আমাদের কর্মকে কল্যাণে পূর্ণ করো,
আর আমাদেরকে সেইসব বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো,
যারা ভুল করলে অনুতপ্ত হয়,
ক্ষমা প্রার্থনা করে,
এবং তোমার অসীম রহমতের ছায়ায়
চিরসফলতার ঠিকানায় পৌঁছে যায়।
আমীন।
***
হে রব! নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি
সকল প্রশংসা তোমারই, হে প্রভু,
সকল আলো তোমারই দান;
তোমার ইচ্ছায় সূর্য ওঠে,
তোমার ইচ্ছায় জাগে প্রাণ।
তোমার নামে খুলে যায়
জীবনের প্রতিটি দ্বার,
তোমার রহমত ছাড়া মানুষ
অসহায়, পথহারা।
তুমি আদি, তুমি অন্ত,
তুমি অনন্ত করুণাময়;
তোমার দয়ায় মরুপ্রান্তর
সবুজ বাগান হয়ে রয়।
তুমি ক্ষমার অফুরান সাগর,
আমরা ক্ষুদ্র তৃষ্ণার কণা;
তোমার কৃপাধারার একটি বিন্দু
মুছে দেয় শত যন্ত্রণা।
জান্নাত ছিল শান্তির নীড়,
ছিল না দুঃখ, ছিল না ক্ষয়;
ছিল না কোনো হিংসার ছায়া,
ছিল না মৃত্যুর পরিচয়।
সেখানে ছিলেন প্রথম মানুষ,
আদম নবী, সম্মানিত প্রাণ;
হাওয়া ছিলেন সাথি হয়ে,
ভালোবাসায় ভরা অবিরাম।
রবের দানে ছিল প্রাচুর্য,
ছিল সীমাহীন কল্যাণ;
শুধু একটি নিষেধ ছিল—
মানতে হবে প্রভুর বিধান।
কিন্তু শয়তান অহংকারে
হারিয়েছিল সত্যের জ্যোতি,
অবাধ্যতার বিষমন্ত্রে
ঢেকে গিয়েছিল তার গতি।
সে বলেছিল—'আমি শ্রেষ্ঠ,
আগুন আমার সৃষ্টির মূল;
মাটির গড়া মানুষকে কেন
করব আমি মাথা নত কূল?'
অহংকারের আগুন যখন
হৃদয়মাঝে জ্বলে ওঠে,
জ্ঞান তখন অন্ধ হয়ে
সত্যকে আর চিনতে পারে না।
সে প্রতিজ্ঞা করল তখন—
মানুষকে সে ভোলাবে,
মিথ্যার রঙে সত্য ঢেকে
বিপথগামী করেই ছাড়বে।
প্রলোভনের মধুর ভাষায়
ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো,
সন্দেহের এক ক্ষুদ্র বীজ
মানবমনে বপন করল।
নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফলের দিকে
চোখে দিল সে মায়ার রঙ,
অল্প ভুলের ক্ষণিক টানে
ঘনিয়ে এল দুঃখের ঢঙ।
মানুষ ভুল করল শেষে,
তবু ছিল না বিদ্রোহ সেখানে;
ছিল না রবের বিরুদ্ধে
অহংকারের বিষাক্ত গানে।
ভুলের পরেই জেগে উঠল
অনুতাপের দীপ্ত আলো,
অশ্রুসিক্ত দুটি হৃদয়
ফিরল প্রভুর ছায়াতলে।
নতশির হয়ে তারা বলল—
'হে আমাদের দয়াময় রব!
নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি,
তোমারই কাছে করি নিবেদন।
যদি তুমি ক্ষমা না করো,
যদি না করো দয়ার বর,
তবে আমরা নিঃস্ব হব,
হারাব চিরকল্যাণের ঘর।
আমাদের শক্তি কিছুই নয়,
তুমি ছাড়া নেই আশ্রয়;
তোমার ক্ষমাই জীবনের আলো,
তোমার রহমতেই সকল জয়।'
এই কয়টি বিনম্র বাক্য
মানবজাতির চির শিক্ষা;
পাপের পরে তওবাই হলো
মুক্তির প্রথম দীক্ষা।
যে ভুল করে, পরে কাঁদে,
সে এখনও আলোর পথিক;
যে ভুলকে সত্য বানায়,
সে অন্ধকারের সঙ্গী ঠিক।
তাই হে মানুষ,
ভুল করলে লুকিয়ো না,
অহংকারে ভেসো না আর;
আদম যেমন ফিরেছিলেন,
ফিরে এসো রবের দ্বার।
চোখের জলে ধুয়ে ফেলো
অহংকারের কালো ধূলি,
ক্ষমার আশায় মাথা নত করো—
সেখানেই জীবনের মূল।
রহমতের দরজা খোলা,
বন্ধ হয় না তওবার তরে;
যে ফিরে আসে আন্তরিক মনে,
রব তাকে নেন বক্ষে ধরে।
এই শিক্ষা যুগে যুগে
মানবহৃদয় জাগিয়ে যায়—
ক্ষমা চাওয়া লজ্জা নয়,
ক্ষমাই মানুষকে মহৎ বানায়।
***
হে রব! নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি
যখন পাপের কালো ছায়া
হৃদয়মাঝে নামে নীরব,
তখন শুধু একটি আশ্রয়—
করুণাময় পরম রব।
যে চোখ আগে গর্বে ভরা,
আজ সে চোখে অশ্রুধারা;
ভাঙা হৃদয় কাঁদে নিভৃতে,
রহমতেরই প্রত্যাশায় সারা।
অপরাধের ভার যে কত,
পাপী প্রাণই জানে শুধু;
বুকের মাঝে জ্বলে তখন
অনুতাপের নীরব আগুন।
সেই আগুনে পুড়ে পুড়ে
অহংকারের দেয়াল ভাঙে,
সত্য তখন দীপের মতো
অন্তরজুড়ে আলো জ্বালে।
আদম বললেন—“হে দয়াময়!
আমার আর কোনো বল নেই,
তোমার দয়ার সাগর ছাড়া
আমার বাঁচার পথও নেই।
আমি দোষী, আমি অপরাধী,
আমি নই নির্দোষ জন;
তোমার দয়ার একটি বিন্দু
করুক আমার হৃদয় পবন।”
হাওয়াও তখন নতশির হয়ে
একই সুরে করেন মিনতি,
“হে পরম রব!
তোমার কৃপাই জীবনের গতি।”
এই যে তওবার অশ্রুধারা,
এ শুধু নয় চোখের জল;
এ যে হৃদয়ের পবিত্র নদী,
ধুয়ে দেয় পাপের বিকলতা।
ইবলিস তখন দূরে দাঁড়ায়,
অহংকারে অন্ধ হয়ে;
নিজের দোষও স্বীকার করে না,
মিথ্যা যুক্তির আড়াল লয়ে।
একদিকে বিনয়ের অশ্রু,
অন্যদিকে গর্বের আগুন;
একদিকে জান্নাতের আশা,
অন্যদিকে ধ্বংসের ধ্বনি।
মানবজাতির শিক্ষা তাই—
ভুল করলে ফিরে এসো,
সত্যের কাছে মাথা নত করে
রবের রহমত চেয়ে বসো।
ক্ষমার দ্বার যে সর্বদা খোলা,
বন্ধ হয় না তওবার তরে;
যে ফিরে আসে আন্তরিক মনে,
রব তাকে নেন বক্ষে ধরে।
শুকনো ডালে যেমন আবার
বসন্ত এলে কুঁড়ি ফোটে,
তেমনি তওবার স্পর্শ পেলে
মৃত হৃদয়ও জীবন পেতে।
অন্ধকার যত গভীর হোক,
ভোরের আলো আসে শেষে;
রহমতের সূর্য উদিত হলে
নিভে যায় সব দুঃখ-দেশে।
হে দয়াময়!
আমাদের অন্তরে দাও
সত্যকে ভালোবাসার শক্তি,
মিথ্যা থেকে ফিরিয়ে এনে
দাও ঈমানের দীপ্ত ভক্তি।
আমরা যেন ভুলে গেলে
তৎক্ষণাৎ ফিরে আসি,
আদমের মতো অশ্রু নিয়ে
তোমার দয়ার দ্বারে ভাসি।
আমাদের মুখে থাকুক সদা
এই বিনম্র প্রার্থনার বাণী—
“হে আমাদের পরম রব!
ক্ষমাই তোমার শ্রেষ্ঠ দানই।
আমরা নিজেদের প্রতি করেছি
অগণিত অন্যায় ও ক্ষতি;
তোমার ক্ষমা, তোমার রহমত
হোক আমাদের চিরসম্পদই।”
এই প্রার্থনাই হোক জীবনের
প্রতিটি দিনের আলোকরেখা,
তওবার পথেই মানুষ খুঁজে পাক
মুক্তির চিরন্তন দেখা।
১৪
২৪ মন্তব্য