সহকারী অধ্যাপক
০৭ জুলাই, ২০২৬ ০৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ
কথোপকথন - মোঃ মুজিবুর রহমান
কথোপকথন
(সালাত: রবের সঙ্গে বান্দার নিবিড় সংলাপ)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
নিস্তব্ধ রাতের নীল আকাশে
তারারা জ্বালে আলো,
ঘুমিয়ে পড়ে ক্লান্ত পৃথিবী—
জাগে অন্তর ভালো।
ওজুর জলে ধুয়ে যায় যেন
দিনের সব মলিনতা,
হৃদয় জেগে দাঁড়ায় নীরব—
জাগে পবিত্র বিনয়তা।
কাবার পানে মুখটি রেখে
বান্দা যখন দাঁড়ায়,
পৃথিবীর সব কোলাহল তখন
দূর আকাশে হারায়।
নেই সেখানে রাজা-প্রজা,
নেই ধনী-গরিব,
সকল মানুষ এক কাতারে—
একই রবের নিকট।
সালাত শুধু রুকু-সিজদা,
কিছু শব্দ নয়;
সালাত মানে প্রাণের গভীর
ভালোবাসার পরিচয়।
এ এক পবিত্র আলাপন,
করুণাময় রবের সাথে;
অশ্রুসিক্ত হৃদয় খুলে
দাঁড়ানো তাঁরই দ্বারে।
হৃদয়ের ভাষা ঠোঁটে আসে,
কুরআনেরই বাণী;
প্রতিটি শব্দ ভালোবাসায়
ভরে ওঠে প্রাণী।
যখন বান্দা বলে বিনয়ে—
"আপনারই করি ইবাদত,
আপনারই চাই সহায়,"
অহংকার সব ভেঙে পড়ে,
মুছে যায় হৃদয়ের দায়।
ক্ষমতার সব মিথ্যা গর্ব
মাটির সাথে মেশে;
মানুষ বুঝে—রব ছাড়া আর
কেউ তো নেই শেষে।
হে আমার রব! তোমারই দাস,
তোমারই এই প্রাণ;
তোমার দয়া ছাড়া আমার
নেই কোনো অবলম্বন।
জীবনের সুখ, জীবনের দুঃখ,
হাসি কিংবা কান্না—
সবই তোমার হাতে অর্পণ,
এই তো মুমিন চাওয়া।
আমি নই শক্তির আধার,
আমি নই বড়;
তোমার কৃপাই বাঁচিয়ে রাখে
প্রতিটি শ্বাস ঘিরে।
অন্ধকারে পথ হারালে
তুমিই হও আলো;
ঝড়ের মাঝে তুমিই তখন
নিরাপদের পাল।
তখন যেন আসমান হতে
করুণাধ্বনি ভাসে—
"এ আমার আর আমার বান্দার
মাঝের অঙ্গীকার;
সে আমারই ইবাদত করে,
আমারই করে ডাক।
সে আমারই সাহায্য চায়—
আমি তারই রব;
যা কিছু কল্যাণ, আমি দেব
আমার অসীম স্নেহে সব।"
বান্দা আবার কাঁপা কণ্ঠে
আবেদন জানায়—
"হে দয়াময়! সরল পথে
আমাদের চালাও।
সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে
চিরদিন রাখো।
যে পথে চলেছে নবী-রাসূল,
সিদ্দীক, শহীদ, সৎজন;
সেই পথেই চলার তাওফীক
দাও হে পরম করুণাময়।
অহংকারের অন্ধ গলি,
মিথ্যার সব রাস্তা,
লোভের আগুন, হিংসার কাঁটা—
সব করো নষ্ট।
অন্যায়ের দিকে যেন
না যায় কোনো পা;
অজ্ঞতার অন্ধকারে
না হারায় দিশা।
আমার অন্তর জাগিয়ে দাও
কুরআনেরই আলোয়;
আমার জীবন ফুটে উঠুক
সুন্নাহর সুবাসে।
আমার চোখে সত্যের দীপ,
হৃদয়ে দাও নূর;
পাপের টানে যেন না যাই
ভুলের অন্ধ সুর।
তখন আবার রবের সাড়া
করুণায় ভরে আসে—
"আমার বান্দা যা কিছু চাইল,
আমি তা শুনেছি;
আমার বান্দার জন্য রয়েছে
আমার রহমতের দুয়ার খোলা।
যে আমার কাছে পথ চায়,
আমি তাকে পথ দেখাই;
যে আমার কাছে ক্ষমা চায়,
আমি তাকে ক্ষমা করি।
যে আমার ওপর ভরসা রাখে,
আমি তার অভিভাবক;
যে আমার দিকে ফিরে আসে,
আমি তারই আশ্রয়।
তাই হে মানুষ! সালাত কেবল
কিছু নিয়ম নয়;
এ যে রবের সাথে প্রাণের
অবিরাম পরিচয়।
সিজদাতে যে কপাল নত,
সে মাথা নত নয়;
সে তো আসমানের মালিকের
নিকটতম হয়।
সালাত হলো আত্মার শ্বাস,
বিশ্বাসের দীপশিখা;
সালাত হলো দয়ার সাগর,
হিদায়াতের দিশা।
যতদিন হৃদয় ধ্বনিত হবে
'রব্বি' বলে ডাকে,
ততদিন মানুষ পথ হারাবে না
জীবনের অন্ধ ফাঁকে।
এসো তবে সালাতে দাঁড়াই,
ফিরে যাই রবের পানে;
যেখানে প্রতিটি আয়াত জুড়ে
ভালোবাসা প্রাণে প্রাণে।
সেখানে ভয় নয়—আশ্বাস আছে,
নেই কোনো হতাশা;
সেখানে বান্দা আর তার রব—
চিরন্তন কথোপকথনের ভাষা।
***কথোপকথন
সালাত: রবের সঙ্গে বান্দার নিবিড় সংলাপ
আজান ভেসে আসে দূর আকাশে,
ডাকে করুণ সুরে—
“এসো মানুষ! এসো ফিরে,
রবের নূরের নীড়ে।”
ফেলে রেখে শত ব্যস্ততা,
দুনিয়ার সব টান,
বান্দা ছুটে মসজিদ পানে,
জাগে ঈমানের গান।
কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে দাঁড়ায়
মানুষ এক কাতারে;
কেউ নয় বড়, কেউ নয় ছোট—
সবাই একই দ্বারে।
যার হাতে আজ রাজদণ্ড,
যার ঘরে নেই ভাত,
সিজদার মাটিতে সবাই সমান—
একই সালাতের প্রভাত।
যখন ধ্বনিত হয় কণ্ঠে—
“ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতা'ঈন।”
কেঁপে ওঠে অন্তর তখন,
ভেঙে যায় অহংকার;
একটি বাক্য জানিয়ে দেয়—
রবই এক অধিকার।
তোমারই করি ইবাদত আমি,
তোমারই নিকট চাই;
তোমার দ্বারেই মাথা নত,
অন্য কোথাও নয়।
ধন নয় আমার ভরসাস্থল,
ক্ষমতা নয় ঢাল;
তোমার রহমতই আশ্রয় আমার,
তুমিই জীবনের পাল।
সাগর যদি উত্তাল হয়,
আকাশ যদি ঢাকে;
তোমার নামে বুকের ভিতর
শান্তির নদী ডাকে।
আমি দুর্বল, তুমি প্রবল;
আমি ক্ষুদ্র দাস,
তোমার দয়ায় জেগে ওঠে
জীবনের প্রত্যাশ।
আমার জ্ঞান সীমিত বড়,
তোমার জ্ঞান অসীম;
আমি দেখি চোখের সীমানা,
তুমি দেখো চিরদিন।
আমি চাই যা ক্ষণিক সুখ,
তুমি দাও কল্যাণ;
আমি বুঝি না ভবিষ্যতের
অদেখা আয়োজন।
তখন যেন করুণাধারা
নেমে আসে প্রাণে—
রবের রহম নীরব ভাষায়
আশা জাগায় টানে।
“হে আমার বান্দা!
তুমি যখন আমাকেই ডাকো,
আমারই উপর ভরসা রাখো,
তখন তুমি একা নও।
তোমার চোখে যদি অশ্রু ঝরে,
আমি তা দেখি;
তোমার হৃদয়ে যদি ব্যথা জাগে,
আমি তা জানি।
তুমি আমাকে স্মরণ করো,
আমি তোমাকে স্মরণ করি;
তুমি আমার দিকে ফিরো,
আমি রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করি।
তোমার প্রয়োজন আমি জানি,
তোমার আর্তনাদ শুনি;
যা তোমার জন্য উত্তম,
সেটিই আমি নির্ধারণ করি।”
বান্দা আবার নিবেদন করে—
হে আমার পালনকর্তা!
পথ অনেক, সত্য এক;
মিথ্যার মেলা চারদিকে আজ,
সত্য যেন না হারায়।
দেখাও আমায় সে-ই পথ,
যেখানে তোমার নূর;
যেখানে ন্যায়ের জয়ধ্বনি,
যেখানে হৃদয় ভরপুর।
হিংসা যেন গ্রাস না করে,
লোভ যেন না টানে;
ক্ষমা, দয়া, সত্যের আলো
ফুটুক প্রাণের গানে।
রাগের আগুন নিভে যাক,
মমতা ফুটুক মনে;
অহংকারের প্রাচীর ভেঙে
নম্রতা আসুক জীবনে।
মিথ্যা ভাষা শুকিয়ে যাক,
সত্য হোক উচ্চার;
অন্যায়ের সব শৃঙ্খল ছিঁড়ে
জাগুক ন্যায়ের দ্বার।
আমার সন্তান, পরিবার,
সমাজ আর দেশ—
সত্যের পথে চলুক সবাই,
হোক কল্যাণের রেশ।
আমার কর্ম হোক ইবাদত,
আমার জ্ঞান হোক নূর;
প্রতিটি নিঃশ্বাস সাক্ষী দিক—
তুমিই আমার সুর।
যখনই বলি—
“ইহদিনাস্ সিরাতাল মুস্তাকীম।”
হৃদয় জুড়ে ভেসে আসে
হিদায়াতের গান;
রবের রহম জড়িয়ে ধরে
বিশ্বাসী প্রতিপ্রাণ।
সরল পথ কেবল রাস্তা নয়,
এ জীবনচলার ধারা;
সত্য, আমানত, ন্যায় ও দয়া—
এ পথেরই তারা।
নবীদের সে আলোকপথ,
সিদ্দীকদের শপথ;
শহীদদের ত্যাগের রক্তে
রাঙা সত্যরথ।
সৎকর্ম যার প্রতিদিনের
নীরব পরিচয়,
রবের সন্তোষ যার লক্ষ্য—
সেই তো সফল হয়।
সালাত শেষে যে মানুষটি
হাসিমুখে ফিরে,
যদি তার চরিত্র বদলায়—
সালাত তখনই ঘিরে
হৃদয়ের সব অন্ধকারে
জ্বালায় নূরের দীপ;
জীবনভর শেখায় মানুষ—
রবই শ্রেষ্ঠ সঙ্গী চিরদীপ।
তাই প্রতিটি রাকাতে যেন
প্রাণ খুলে বলি—
“হে আমার রব! তোমারই পথে
আমায় রেখো চলি।”
সালাত হোক জীবনের শপথ,
সালাত হোক প্রাণ;
সালাত হোক বান্দা আর রবের
চিরন্তন সম্মান।
যতদিন ধ্বনিত হবে কণ্ঠে
ফাতিহার পবিত্র বাণী,
ততদিন জেগে থাকবে অন্তরে
ঈমানের অম্লান পানি।
ইবাদতের এ মহাসংলাপ
চলুক জীবনভর;
সালাতেই খুঁজে পাক মানুষ
তার দয়াময় রবের ঘর।
***
কথোপকথন
সালাত: রবের সঙ্গে বান্দার নিবিড় সংলাপ
যখন ধ্বনিত হয় কণ্ঠে প্রার্থনা—
"সিরাতাল্লাযীনা আন'আমতা আলাইহিম..."
তখন কাঁপে নীরব হৃদয়,
চোখে নামে জল;
মানুষ তখন খুঁজে ফেরে
সত্যের অনন্ত পথচল।
হে আমার রব!
আমি চাই না অন্ধ গর্ব,
চাই না মিথ্যা জয়;
তোমার সন্তুষ্টির চেয়ে বড়
কোনো সম্পদ নয়।
আমি চাই সে পথ,
যেখানে নবীদের পদচিহ্ন;
যেখানে সত্যের দীপ জ্বলে,
নেই প্রতারণার গন্ধ।
যেখানে ইবরাহীমের তাওহীদ,
নূহের অবিচল ধৈর্য;
মূসার দৃঢ় প্রত্যয়,
ঈসার পবিত্র ঐশ্বর্য।
যেখানে মুহাম্মদ (সা.)-এর
দয়া ছড়িয়ে পড়ে;
শত্রুকেও ক্ষমা করে মানুষ,
করুণার সাগর ঘিরে।
আমি চাই আবু বকরের সত্য,
উমরের ন্যায়বিচার;
উসমানের লজ্জাশীলতা,
আলীর জ্ঞানের অবারিত দ্বার।
আমি চাই খাদিজার ত্যাগ,
ফাতিমার পবিত্র প্রাণ;
আয়েশার জ্ঞানের আলো
ছড়িয়ে পড়ুক অবিরাম।
হে পালনকর্তা!
যাদের তুমি সম্মান দিয়েছ,
আমাকেও দাও স্থান;
সৎ মানুষের পদাঙ্ক ধরে
চলুক আমার প্রাণ।
অভিমান নয়,
অহংকার নয়,
লোভ নয় হৃদয়ের বাস;
সত্য, আমানত, ধৈর্য, দয়া—
হোক আমার পরিচয় বিশেষ।
যেন আমার মুখে কুরআন থাকে,
কর্মে থাকে তার রূপ;
মানুষ দেখে চিনে নেয়—
ঈমানের সুমধুর রূপ।
হে আমার রব!
আমি যেন পথ না হারাই
ক্ষমতার মোহে পড়ে;
ধনের নেশায় না ভুলে যাই
তোমার স্মরণ ঘিরে।
যেন প্রতিটি সালাত শেষে
আরও উত্তম হই;
প্রতিটি সিজদা শেষে
পাপ থেকে দূরে রই।
প্রতিটি রাকাত শেখাক আমায়
নম্রতার ইতিহাস;
প্রতিটি দোয়া জাগিয়ে তুলুক
তাওয়াক্কুলের সুবাস।
তখন যেন করুণার সুর
হৃদয়ে ভেসে আসে—
“হে আমার বান্দা!
যে সত্যকে ভালোবাসে,
আমি তার পথ সহজ করি।
যে আমার সন্তুষ্টি চায়,
আমি তার অন্তরে প্রশান্তি দিই।
যে মানুষের উপকার করে,
আমি তার মর্যাদা বৃদ্ধি করি।
যে বিনয়ী হয়,
আমি তাকে সম্মানিত করি।
তুমি শুধু আমার পথ আঁকড়ে ধরো;
আমি তোমার পথ আলোকিত করব।
তুমি ন্যায়ের পাশে দাঁড়াও;
আমি তোমাকে একা ছেড়ে দেব না।
তুমি সত্য বলো,
যদিও তা কঠিন হয়;
কারণ সত্যই শেষ পর্যন্ত
মানুষকে মুক্তি দেয়।”
সালাত তখন আর
কেবল কিছু উচ্চারিত শব্দ নয়;
এ যেন আকাশ আর পৃথিবীর মাঝে
ভালোবাসার এক সেতুবন্ধন।
যেখানে বান্দা কাঁদে,
রব রহমত বর্ষণ করেন;
যেখানে মানুষ দোয়া করে,
সেখানে আশা প্রস্ফুটিত হয়।
যেখানে হৃদয় নত হয়,
সেখানে অহংকার মরে;
যেখানে কপাল সিজদায় নামে,
সেখানে আত্মা মুক্তি পায়।
হে আল্লাহ!
আমাদের জীবন করো
ফাতিহার জীবন্ত ব্যাখ্যা;
আমাদের চরিত্রে ফুটিয়ে দাও
ইসলামের মহিমা।
যাতে মানুষ দেখে বলে—
এই মানুষ সালাতে দাঁড়ায়,
তাই তার ভাষায় সত্য,
তার ব্যবহারে দয়া,
তার হৃদয়ে আলো,
তার জীবনে হিদায়াত।
এই হোক আমাদের প্রার্থনা,
এই হোক জীবনের গান—
সালাতে গড়ে উঠুক
রবমুখী প্রতিটি প্রাণ।
৪
৪ মন্তব্য