Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ জুলাই, ২০২৬ ০৮:৪২ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষকের মর্যাদা, এদেশে নেই, অন্য দেশে

প্রাধান শিক্ষকের চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব



কিছু বিষয় মানুষ শুধু মানুষ হয়ে জন্মানোর কারণেই শিখে।  এটাকে বলে কমনসেন্স। এর জন্য লেখাপড়ার প্রয়োজন পড়ে না। 


শিক্ষকের চেয়ারের সম্মান আর মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার শিক্ষা যখন জাতিকে দিতে হয় তখন বুঝতে হবে আমাদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে বহু আগেই। 


যদি  উন্নত সভ্য দেশগুলোর প্রতি লক্ষ করি তাহলে দেখবো সেসব দেশে শিক্ষকের মর্যাদা অন্য সব পেশার চেয়ে উর্দ্ধে। 


আসুন কয়েকটি দেশে শিক্ষকদের অবস্থান সম্পর্কে আমরা জানি, 


১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ভিআইপি বিবেচনা করে এমন দুটি ধরণের লোক রয়েছে: বিজ্ঞানী ও শিক্ষক। 


২) ফরাসী আদালতে কেবল শিক্ষকদেরই চেয়ারে বসার অধিকার রয়েছে। 


৩) জাপানের পুলিশ সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার পরেই একজন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করতে পারে। 


৪) দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিটি শিক্ষক কেবল তার আই-কার্ড প্রদর্শন করে দক্ষিণ কোরিয়ার মন্ত্রীর সমস্ত অধিকার পান। 


৫) আমেরিকান এবং ইউরোপীয় দেশগুলিতে প্রাথমিক শিক্ষকরা সর্বাধিক বেতন পান, কারণ তারা কেবল কাঁচা মাটি পাকা করেন। 


৬) ফিনল্যান্ডে টপারদের প্রাথমিক  শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করা হয়ে থাকে। 


আমাদের দেশে সবচেয়ে অসম্মানের পেশা শিক্ষকতা। 


বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।  যখন ছোট ছিলাম প্রায়ই বলতেন, আমার প্রতিষ্ঠানে আমি প্রধান। প্রেসিডেন্টেরও অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হবে আমার কক্ষে।

যত বড় অফিসার আসুক তিনি আমার চেয়ারে  বসতে পারবেন না। আমার চেয়ার আমার জন্য নির্ধারিত। 


বাবার কথা শুনে শুনে বড় হওয়া আমি একজন শিক্ষকের সম্মান, মর্যাদা আর স্বপ্নকে ধারণ করেছি।  বাধ্য হয়ে নয়, ইচ্ছে করেই এসেছি এই পেশায়। 


উন্নত অবকাঠামো, ডিজিটাল সিস্টেম, নিত্য নতুন শিক্ষাক্রম, নানা ধরণের ভিজিট বদলে দিয়েছে শিক্ষকতা পেশাকে।

সবকিছু বদলে যায়। শুধু বদল হয় না বেতনের। একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের কোনমতে বাঁচার জন্য বেতন প্রয়োজন ২৫০০০/ টাকা অথচ লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সর্বসাকুল্যে বেতন ১৭,৫৪০/ টাকা।

গার্মেন্টস শ্রমিক তার বঞ্চনার কথা রাস্তায় নেমে চিৎকার করে বলতে পারেন। বেঁচে থাকার জন্য বুকের রক্ত ঝরিয়ে আন্দোলন করতে পারেন। শিক্ষকরা তাও পারেন না। 


একদিকে অর্থনৈতিক দীনতা অন্যদিকে অসম্মান।

যে চেয়ারটা এক সময় প্রধান শিক্ষকের ছিল এখন আর সেটায় তার অধিকার নেই।

যে কোন কর্মকর্তা  ( ব্যতিক্রম আছেন কেউ কেউ)এসেই প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসেন। ভৃত্যের মত পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন অথবা অন্য চেয়ারে বসেন প্রধান শিক্ষক।  স্যার, স্যার বলে মুখে ফেনা তোলাই যদি  শিক্ষকদের কাজ হবে তাহলে শিক্ষক কেন, পুলিশে চাকুরী নিলেই হতো? 


শিক্ষকতা যে চাকুরি নয়, পেশা এটা এ জাতি কবে বুঝবে? প্রতিটি অফিস আদালতে বসকে স্যার, স্যার বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলা হয়। এই নিয়ম যদি শিক্ষকতা পেশায়ও ন্যস্ত থাকে তাহলে শিক্ষকতার সাথে অন্য পেশার পার্থক্য কোথায় রইল?

মা, বাবা আর শিক্ষকের সাথে অন্য সম্পর্ক গুলিয়ে ফেললে যে চলবে না সেটা বুঝতে হবে সমাজকে। 

একজন ঝাড়ুদারের সমতূল্য বেতনে এ জাতিকে অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষকবৃন্দ বহুকাল। কেন? সেটা কি ভাবার সময় হয়নি? 

দেশ এত উন্নত হলো।  অবকাঠামোগত ঝলকে চোখ ঝলসে যায়। তাহলে শিক্ষক কেন দাঁড়িয়ে থাকেন শত বছরের পুরনো জীবনমান নিয়ে? 

অতীতে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা  না থাকলেও শিক্ষকের স্বপ্ন ছিল, সম্মান ছিল, সমাজের সবার চেয়ে আলাদা স্থান ছিল, সেই সাথে ছিল তার নিজস্ব একটা চেয়ার।

স্মার্ট দেশে, স্মার্ট নাগরিক গড়ার দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষক এখন সম্মান হারিয়ে, চেয়ার হারিয়ে, মেরুদন্ড হারিয়ে করজোড়ে অবনত। 

কর্মকর্তাদের এই সৌজন্যবোধটা  শিখানো জরুরি যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের চেয়ারটা সেই প্রতিষ্ঠান প্রধানের জন্যই নির্ধারিত।  


স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে অতিথির চেয়ারে বসাই ভদ্রতা এবং সৌজন্য। প্রধান শিক্ষকের জন্য নির্ধারিত চেয়ারে বসা অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং নীতি বহির্ভূত। 


উন্নত দেশের শিক্ষাক্রম আমদানির সাথে সাথে উন্নত দেশের শিক্ষকের  সম্মান, বেতন, সামাজিক মর্যাদা এসব জানাও কর্তব্য।

স্মাট নাগরিক গড়ার জন্য, যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম কার্যকর করার জন্য বিভিন্ন দেশের শিক্ষা পদ্ধতির সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে নতুন শিক্ষাক্রম। এই শিক্ষাক্রম কার্যকর করবেন শিক্ষকবৃন্দ। সুতরাং উন্নত দেশের শিক্ষাক্রমের যথাযথ প্রয়োগের জন্য উন্নত দেশের শিক্ষকের জীবনমান এবং মর্যাদাও অনুসরণ করা আবশ্যক। 


হালাল রুজির উপদেশ বর্ষণ শিক্ষকের দায়িত্ব।   অথচ শিক্ষককে অনবরত হালাল রুজির উপদেশ বর্ষণ করে, তাকে ঝাড়ুদারের সমতূল্য বেতন প্রদান এক ধরণের শোষণ।শিক্ষককে অনুরোধ করা যায়, আদেশ নয়। 


শিক্ষক শব্দকে ধারণ করা এবং এই শব্দের সম্মান রক্ষার দায়িত্ব সমাজের প্রতিটি মানুষের। এমন কি শিক্ষকের নিজেরও। 


সম্প্রতি ইউএনও কর্তৃক একটি বিদ্যালয় পরিদর্শনের ভিডিও ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।  সেখানে কেন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সাবলীলভাবে পড়তে পারছে না এ বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সামনেই  শিক্ষককে ধমকাচ্ছেন ইউএনও।

এরপর দেখা যায় প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে ইউএনও মহোদয় শিক্ষকদের সাথে কথা বলছেন। 


সৌজন্য আর সম্মান একটা কমনসেন্স। সেটা নিজ থেকেই শিখতে হয়। 

দুর্ভাগ্য মা,বাবা এবং শিক্ষককে সম্মান করা আমাদের ঐতিহ্য ছিল। আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিল। এখন বৃদ্ধাশ্রম তৈরি হয়েছে। সেইসাথে শিক্ষকদের অসম্মানের মহোৎসব চলছে। 


নানা বিষয়ে কেন শিক্ষকদের পদে পদে পাহারা দিতে হয় সেটা গবেষণার বিষয়, পরিকল্পনার বিষয়। 

কিন্তু শিক্ষকের চেয়ারে বসা চরম বেয়াদবি আর অসম্মানের বহিঃপ্রকাশ এটা বুঝানোও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

প্রধান শিক্ষক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান। তার চেয়ারে বসার অধিকার দেশের প্রধানমন্ত্রীরও নেই।

এ জাতি সনদ নির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত। সৌজন্যবোধ এ জাতির চরিত্রে নেই।


প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করা হোক। 


কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেয়া হোক, প্রধান শিক্ষকদের চেয়ারের মর্যাদা রক্ষায় সে চেয়ারে তারা বসতে পারবেন না। 


একটি আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন জাতি  তৈরির লক্ষ্যেই শিক্ষকের চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।


সংগ্রহ 

মন্তব্য করুন

ব্লগ