সিনিয়র শিক্ষক
০৮ জুলাই, ২০২৬ ০৮:৩৮ অপরাহ্ণ
শিক্ষার প্রধান সংকট: শিক্ষকের স্বাভাবিক জীবন চলার কষ্ট
স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও ভাবনাহীনভাবে চলছে রাষ্ট্র, সরকার ও আমলাতন্ত্র। তাদের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা—শিক্ষকরা সাধারণ মানুষ নয়; তাদের সবকিছু যেন সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। বৃষ্টির পানির মতো তাদের খাওয়া-দাওয়া, চাওয়া-পাওয়া, অনায়াসে পাওয়া যায়। আমাদের দেশের মতো এমন নিকৃষ্ট ভাবনা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে দৃশ্যমান নয়। সব সরকারই অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিশুদের বিনামূল্যের বই, উপবৃত্তি, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, পোশাক, নানা প্রকল্প অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষার উন্নতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামোগত সুবিধাসহ বিশাল ভবন, অন্যান্য উন্নয়নও চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে একমাত্র অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছাড়া সব সরকারের আমলে শিশু শিক্ষা কম-বেশি উন্নতি হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিশু শিক্ষাকে বিপর্যস্ত করে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। আর কিছুদিন তারা ক্ষমতায় থাকলে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা সমৃদ্ধ না করে সুনাম বিনষ্ট করে এনজিওর হাতে তুলে দিতেন।
আদিকালে বিশেষ করে শিশু শিক্ষা বৈঠকখানায়, কাছারি ঘরে, টিনের তৈরি ভাঙা বেড়ায়, মুলি বাঁশের চালে, কোনো কোনো স্থানে গোলপাতার ছাউনির ঘরে হতো। ভাঙা ঘরে একটুখানি বৃষ্টির আভাস পেলেই স্কুল ছুটি দিতে হতো। শিশু শিক্ষার এ রুগণ অবস্থার আমূল পরিবর্তন শুরু হয়েছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট মরহুম এরশাদ সরকারের আমল থেকে। এ ধারা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলে আসছে জ্যামিতিক গতিতে। অথচ শিক্ষার প্রাণ শিক্ষক; তাদের বেতন, ভাতা, জীবনযাপন মান পরিবর্তন তথা বেঁচে থাকার বিষয়ে কার্যক্রম চলছে অতি ধীরগতিতে। সারা বিশ্বে শিক্ষকদের পাশাপাশি আদালতের প্রতি সম্মান বা তাদের আদেশ-নির্দেশ মান্য করা সবার কাছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধ্যতামূলকভাবে করণীয়। বিশেষ করে আদালতের রায় সম্মানজনকভাবে মান্য না করে বা সময়ক্ষেপণ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমাদের দেশের আদালতের শীর্ষ হলো সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এ আদালতের রায় সবাই মানতে বাধ্য।
আমাদের প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা ৯ মার্চ ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা প্রাপ্তির পর থেকে মর্যাদা ও সব সরকারি কর্মচারীর মতো দশম গ্রেড পাওয়ার জন্য আবেদন-নিবেদন করে, না পেয়ে অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় নিতে হলো। রায় পাওয়ার পর গিঁটু লাগিয়ে সময়ক্ষেপণ কেন? প্রাথমিক শিক্ষকদের খানিকটা অপরাধের জন্য শাস্তির বিরোধিতা করছি না। তবে সর্বশেষ আদালতের রায়ের সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি গিঁটু লাগিয়ে দেওয়ার অপরাধের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের উপদেষ্টাসহ বর্তমান জড়িত সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা কাম্য। আদালতের রায় বাস্তবায়নের ষড়যন্ত্র ও গড়িমসি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অনতিবিলম্বে রায় বাস্তবায়ন করে সময়ক্ষেপণের দায়ে জড়িতদের শাস্তি দাবি করছি। প্রশাসনের গতি আনার জন্য এ জবাবদিহি অতীব জরুরি।
সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডসহ ৩ দফা সমস্যা অনেকটা মীমাংসিত। বিষয়টি নিয়েও ইতিবাচক পদক্ষেপ অনেকটা ধীরগতি। প্রশাসন, সরকার যেন অনেকটা ঘুমের ঘোরে থেকে সময়ক্ষেপণ করে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে এ মীমাংসিত বিষয়টি সমাধান করে প্রাথমিক শিক্ষার এ সমস্যা নিরসনে শিক্ষক সমাজের মুখে হাসি ফুটাতে। দৃশ্যমান এই, বড় বড় কাজ দেখিয়ে শিক্ষকদের অশান্তিতে ও অস্বস্তিকর অবস্থায় রেখে শিক্ষার মান উন্নয়নের কল্পনা শুধু স্বপ্ন। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ, সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ, সব পাঠদান বহির্ভূত কাজের চাপ বন্ধসহ শিক্ষকদের অন্যান্য সরকারি কর্মচারীর সমান বেতন স্কেল দিয়ে তাদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা সমৃদ্ধ করুন। শিক্ষকদের অবহেলায় রেখে যত কিছুই করেন না কেন, বাবুই পাখি কবিতার মতো—বাবুর মতো ষোল আনাই মিছে হতে বাধ্য। মনে রাখতে হবে, শিক্ষার সমৃদ্ধির সঙ্গে সবার আগে আনতে হবে শিক্ষকের সমৃদ্ধি। এটা বাস্তব সত্য।
লেখক: শিক্ষাবিদ সিদ্দিকুর রহমান
সংগ্রহে: মোঃ হাবিবুল্লাহ্
১৪
২৪ মন্তব্য