Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ জুলাই, ২০২৬ ০৪:২৮ পূর্বাহ্ণ

হকের কান্না -মোঃ মুজিবুর রহমান

                                                                                                  হকের কান্না

(মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও আখিরাতের জবাবদিহিতা)

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানুষ যদি মানুষ হয়ে মানুষেরই হয়,
তবেই তো পৃথিবীজুড়ে শান্তির ফুল রয়।
হাসির মাঝে ফুটে ওঠে বিশ্বাসেরই গান,
ভালোবাসায় রঙিন হয় প্রতিটি প্রাণ।

কিন্তু যখন লোভের আগুন হৃদয়জুড়ে জ্বলে,
অন্যায়েরই কালো ছায়া চারদিকে যায় ছলে।
সরল, নীরিহ মানুষের ঘামে গড়া ধন,
ছিনিয়ে নিয়ে ভাবে কেউ—জয় করেছি জীবন!

কোথায় তার সে জয়গাথা?
কোথায় সুখের রঙ?
অন্যায়েরই ভিতের উপর
ভেঙে পড়ে সব ঢঙ।

অশ্রুর দামে গড়া প্রাসাদ
দাঁড়ায় না বেশিদিন,
জুলুমেরই রাজদণ্ড ভেঙে
আসে ন্যায়ের দিন।

যে হাতে ছিল আমানত,
সে হাতে যদি ছল,
সেই হাত একদিন হবে
লজ্জায় অবশ, টলমল।

অন্যায়ের ধন আগুনসম,
বাহিরে লাগে সোনা,
ভেতর ভেতর পুড়িয়ে ফেলে
স্বপ্ন, সুখের বোনা।

সরল মুখের নীরব কান্না
আকাশ ছুঁয়ে যায়,
মজলুমের সেই দীর্ঘশ্বাস
আরশ পর্যন্ত ধায়।

দেখে মনে হয়—জালিম বুঝি
খুবই সুখে আছে,
কিন্তু তারই অন্তরজুড়ে
অশান্তি নীরবে নাচে।

আল্লাহ দেন অবকাশ শুধু,
ভুলে যেন না যাই,
ছাড় দেওয়া আর ছেড়ে দেওয়া
এক কথা মোটেই নয়।

সময় যখন পূর্ণ হবে,
আসবে বিচারের দিন,
কারও ক্ষমতা থাকবে না আর,
থামবে না হিসাবের ঋণ।

সেদিন ধন আর মান-মর্যাদা
কোনোটাই হবে না সাথি,
সত্য, ন্যায় আর সৎকর্মগুলো
হবে একমাত্র সাথি।

যে ভেবেছিল—"আমি বড়",
ক্ষমতা আমার ঢাল,
সেদিন তারই অহংকারের
ভেঙে যাবে জাল।

যে কাঁদিয়েছে শত হৃদয়,
হেসেছে অন্য ব্যথায়,
সে কি পারে সফল হতে
রবের মহা আদালতে?

যে নিয়েছে বিধবার অশ্রু,
এতিম শিশুর হক,
সে কি পারে মুক্তি পেতে
অন্যায়েরই রক্‌তচক?

যে বন্ধুরই বিশ্বাস ভেঙে
করেছে স্বার্থসাধন,
সে কি পাবে জান্নাতেরই
চিরসবুজ উদ্যান?

না, সফলতা ধনে নয়,
সফলতা নয় জোরে,
সফলতা সেই হৃদয়েতে
যে থাকে সত্যের ঘোরে।

ক্ষমা চায় যে ভুলের পরে,
ফিরে আসে ন্যায়ের পথে,
আল্লাহ তার তওবা কবুল
করতে ভালোবাসেন তাতে।

কিন্তু আগে ফিরিয়ে দিতে
হবে মানুষের হক,
অন্যায়েরই বোঝা কাঁধে
মেলে না মুক্তিলোক।

মায়ের অশ্রু, বাবার দীর্ঘশ্বাস,
এতিমের নিঃশব্দ ক্রন্দন,
অসহায়ের বুকের হাহাকার—
সবই রাখেন পরম করুণাময় গণন।

লোভের আগুন নিভিয়ে ফেলো,
জাগাও বিবেক-আলো,
মানুষ হয়ে মানুষেরই
পাশে থেকো ভালো।

অর্থ যদি হয় আমানত,
রক্ষা করো তাই,
অন্যের প্রাপ্য ফিরিয়ে দিয়ে
সত্যপথে চল ভাই।

একটি হাসি ফিরিয়ে দেওয়া
অসংখ্য ধনের চেয়ে বড়,
একটি ন্যায়ের সিদ্ধান্ত
অন্ধকারে সূর্যোদয় করে।

যে শিক্ষক সত্য শেখান,
যে কৃষক ঘামে ভেজে,
যে শ্রমিক সৎ উপার্জনে
দিন কাটান নীরব সেজে—

তারাই পৃথিবীর গর্ব,
তারাই আলোর দল,
তাদের ঘামে টিকে থাকে
সভ্যতারই ফল।

প্রতারণার ক্ষণিক জয়
স্থায়ী জয় নয়,
সত্যের শিকড় গভীর বলে
ঝড়েও ভাঙে না ভয়।

মানুষ যদি কাঁদে তোমায়
অন্যায়েরই দোষে,
সেই কান্নাধারা ফিরবেই একদিন
বিচারেরই রোষে।

তাই এসো সবাই শপথ করি—
হক কখনো নেব না কভু,
অন্যায়ের ধন স্পর্শ না করে
সত্যের পথে রব।

সরল মানুষ ঠকাব না আর,
ভাঙব না বিশ্বাস,
মানুষ হয়ে মানুষ গড়াই
হোক জীবনের আশ।

যার যা প্রাপ্য ফিরিয়ে দেব,
রাখব আমানতের মান,
ন্যায়ের পথে গড়ব আমরা
মানবতার গান।

হে পরম দয়াময় আল্লাহ!
রাখো সত্যের পাশে,
লোভ, প্রতারণা, জুলুম থেকে
বাঁচাও সর্বনাশে।

যাদের হৃদয় কষ্টে ভরা,
দাও তাদের ধৈর্যের বল,
জালিমকে দাও হিদায়াত,
না হলে ন্যায়ের ফল।

আমাদের করো আমানতের
বিশ্বস্ত এক প্রহরী,
মানুষের হক রক্ষার পথে
রাখো সদা অবিচল ধরি।

যেন কোনো অশ্রু আমাদের
কারণে না ঝরে,
যেন কোনো হৃদয় না ভাঙে
আমাদের আচরণে।

ইহকাল হোক ন্যায়ের আলো,
পরকাল হোক সুখ,
মানুষের হক রক্ষা করেই
ফুটুক জীবনের মুখ।

কারণ সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী,
মিথ্যা থাকে না চিরকাল;
মানুষের হক রক্ষা যার,
সফল তারই দুই কাল।

***

হকের আর্তনাদ

(মানুষের অধিকার, আমানত, ন্যায়বিচার ও আখিরাত)

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ধন-সম্পদে নয়,
ক্ষমতার অহংকারে নয়,
বরং সত্যে, ন্যায়ে,
আমানত রক্ষায়,
এবং মানুষের হক আদায়ে।

যে হৃদয়ে দয়া আছে,
সেই হৃদয়ই আলোর নিবাস;
যে হাতে আমানত নিরাপদ,
সেই হাতই সম্মানের প্রতীক।

কিন্তু যখন লোভ
বিবেকের প্রদীপ নিভিয়ে দেয়,
যখন স্বার্থ
মানবতার মুখে তালা লাগায়,
তখন মানুষই
মানুষের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়।

***

সফলতা কি অট্টালিকার উচ্চ মিনারে?
নাকি স্বর্ণভাণ্ডারের ঝলমলে দ্বারে?
সফলতা কি করতালির গর্জনে মেশে,
নাকি ক্ষমতার অহংকারে হেসে?

না—
সফলতা নয় অন্যের চোখের ভয়,
সফলতা নয় অন্যের অশ্রুর উপর
নিজের হাসি গড়ে তোলা।

যে সুখ
মজলুমের দীর্ঘশ্বাসে জন্ম নেয়,
সে সুখ মরুভূমির মরীচিকা;
যে ধন
এতিমের অধিকার গ্রাস করে আসে,
সে ধন আগুনের শিখা।

সরল মানুষের বিশ্বাস
পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান আমানত।
যে সেই বিশ্বাস ভাঙে,
সে শুধু মানুষকে ঠকায় না—
নিজের বিবেককেও নির্বাসিত করে।

যে হাত
অসহায়ের প্রাপ্য কেড়ে নেয়,
সে হাত একদিন
নিজেরই বিচারলিপি পড়বে।

যে মুখ
মিথ্যার হাসি পরে,
তার অন্তরে
অশান্তির ঝড় বয়ে যায়।

লোভের নদী
কখনো তৃষ্ণা মেটায় না;
যতই পান করো,
ততই বাড়ে তার দহন।

অন্যের হকের উপর
যে প্রাসাদ দাঁড়ায়,
তার প্রতিটি ইট
নীরব কান্নার সাক্ষী হয়ে থাকে

দেখে মনে হয়—
জালিমের রথ দ্রুত ছুটে চলে,
তার পথে ফুল,
তার আঙিনায় উৎসব।

কিন্তু রাত গভীর হলে
নিঃশব্দ দেয়ালও
অনেক অশ্রুর ইতিহাস শোনে।

অন্যায়ের বিজয়
বসন্তের নয়,
শুকনো পাতার মতো—
এক ঝড়েই ঝরে যায়।

আল্লাহ অবকাশ দেন,
কিন্তু অবহেলা করেন না।
তিনি সময় দেন,
কিন্তু হিসাব ভুলে যান না।

যখন বিচার উপস্থিত হয়,
ক্ষমতার আসন কেঁপে ওঠে,
অহংকারের মিনার
ধুলায় মিশে যায়।

সেদিন
স্বর্ণ কথা বলবে না,
প্রভাব এগিয়ে আসবে না,
আত্মীয়তার পরিচয়ও
কারও মুক্তির দলিল হবে না।

শুধু থাকবে কর্ম,
থাকবে মানুষের অধিকার,
আর থাকবে
পরম ন্যায়বিচারের আদালত।

হে মানুষ,
অন্যের অশ্রু দিয়ে
নিজের ভবিষ্যৎ লিখো না।

অন্যের রক্তে
নিজের ভাগ্য রাঙিও না।

যে শিশু
ক্ষুধার কান্না চেপে ঘুমায়,
যে বৃদ্ধ
প্রাপ্য না পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
যে শ্রমিক
দিনশেষে মজুরি খুঁজে ফিরে,
তাদের প্রতিটি আহাজারি
আকাশ ছুঁয়ে যায়।

তুমি যদি পারো,
কারও চোখের জল মুছে দাও।
পারো যদি,
কারও আমানত ফিরিয়ে দাও।

কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ
ধন নয়—
মানুষের বিশ্বাস।

সবচেয়ে বড় বিজয়
ক্ষমতা নয়—
ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো।

সবচেয়ে বড় সম্মান
অহংকার নয়—
অন্যের হক রক্ষা করা।

হে পরম দয়াময়!

আমাদের হৃদয়কে
লোভের অন্ধকার থেকে রক্ষা করুন।

অন্যের হক নষ্ট করা থেকে
আমাদের বাঁচিয়ে রাখুন।

আমাদের এমন বিবেক দিন,
যাতে ক্ষমতা পেলে ন্যায় ভুলে না যাই,
সম্পদ পেলে কৃতজ্ঞতা হারিয়ে না ফেলি,
সুযোগ পেলে আমানত ভঙ্গ না করি।

যাদের অধিকার নষ্ট হয়েছে,
তাদের ধৈর্য, মর্যাদা ও উত্তম প্রতিদান দান করুন।

যারা অন্যায় করেছে,
তাদের সত্যিকার তাওবার তাওফিক দিন;
আর যদি তারা অন্যায়েই অটল থাকে,
তবে আপনার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুন।

আমাদের এমন জীবন দিন,
যাতে আমাদের কারণে
কোনো নিরীহ মানুষের চোখে
এক ফোঁটা অশ্রুও না ঝরে।

আমাদের ইহকালকে করুন ন্যায়ের আলোয় উজ্জ্বল,
আর পরকালকে করুন আপনার রহমতে পরিপূর্ণ।

আমিন।

মন্তব্য করুন