সহকারী শিক্ষক
১০ জুলাই, ২০২৬ ১১:১০ অপরাহ্ণ
Assesment for learning (AFL) | এসেস্মেন্ট ফর লার্নিং
প্রথম শ্রেণিতে রিডিং ও রাইটিং দক্ষতা উন্নয়নে আমার শ্রেণিকক্ষের কিছু অভিজ্ঞতা
ক্লাস্রুমে প্রতিদিন নিজেও নতুন করে শিখি। প্রতিদিন এক বা একাধিক নতুন অভিজ্ঞতা হয়। শিশুর আচারণের উপর ভিত্তি করে নতুন শিখন কৌশল অবলম্বন করতে হয়। এবসব নিয়েই আজকের আলোচনা। (ছবিটি এ আই দিয়ে বানানো)।
প্রথম শ্রেণির একটি শিশু যখন প্রথম বই হাতে নেয়, তখন সে শুধু অক্ষর শেখে না; সে ধীরে ধীরে একটি নতুন পৃথিবীর দরজা খুলতে শেখে। সেই দরজার চাবি দুটি—পড়া এবং লেখা। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে তাই রিডিং ও রাইটিং শেখানো কেবল একটি পাঠদান নয়; এটি শিশুর আত্মবিশ্বাস, কল্পনাশক্তি এবং ভাষা-প্রকাশের ভিত্তি নির্মাণের একটি দীর্ঘ, আনন্দময় যাত্রা।
শ্রেণিকক্ষে আমি কখনোই পড়াকে মুখস্থ করার কাজ হিসেবে উপস্থাপন করি না। বরং প্রতিটি পাঠের শুরুতেই শিশুদের সঙ্গে গল্প করি, ছবি দেখি, ছড়া বলি কিংবা কোনো পরিচিত ঘটনা নিয়ে কথা বলি। এতে তারা সহজেই পাঠের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পায়। এরপর বই খুললে পাঠটি আর তাদের কাছে অপরিচিত থাকে না; বরং মনে হয়, এ তো তাদেরই গল্প।
আমি লক্ষ্য করেছি, শিশুরা অনুকরণ করতে ভালোবাসে। তাই শুরুতে আমি নিজেই স্পষ্ট ও শুদ্ধ উচ্চারণে পাঠ পড়ে শোনাই। তারা মনোযোগ দিয়ে শোনে, তারপর আমার সঙ্গে সমস্বরে পড়ে। কিছুদিন পর জোড়ায় জোড়ায় পড়ার সুযোগ দিলে তারা একে অপরকে সাহায্য করে। যে শিশুটি একটু ভালো পড়তে পারে, সে অজান্তেই তার বন্ধুর শেখার সহযাত্রী হয়ে ওঠে। এই সহযোগিতামূলক পরিবেশ শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
রিডিং দক্ষতা গড়ে তুলতে আমি শ্রেণিকক্ষে একটি ছোট পাঠকোণ তৈরি করেছি। সেখানে গল্পের বই, ছবি সম্বলিত বই, শব্দ কার্ড ও বর্ণ কার্ড রাখা থাকে। অবসর সময়ে অনেক শিশুই নিজে থেকে বই হাতে নেয়। শুরুতে তারা শুধু ছবিগুলো দেখে, পরে ছবির নিচের শব্দ পড়ার চেষ্টা করে। এই স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহই ধীরে ধীরে তাদের পাঠাভ্যাসে রূপ নেয়।
লেখা শেখানোর ক্ষেত্রেও আমি তাড়াহুড়ো করি না। প্রথমে শিশুরা আঙুল দিয়ে বাতাসে অক্ষর আঁকে, এরপর খাতায় লিখে। ছবি দেখে একটি শব্দ, তারপর একটি ছোট বাক্য—এভাবেই ধাপে ধাপে তাদের এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। ভুল করলে আমি লাল দাগ দিয়ে নিরুৎসাহিত করি না; বরং বলি, “চেষ্টা খুব ভালো হয়েছে, এবার আরেকবার দেখি।” এই ছোট্ট উৎসাহ তাদের আবার লিখতে বসার সাহস জোগায়।
আমার অভিজ্ঞতায়, খেলার মাধ্যমে শেখা সবচেয়ে ফলপ্রসূ। কখনো শব্দ সাজানোর খেলা, কখনো ছবি ও শব্দ মিলানো, কখনো আবার গল্পের শেষ অংশ শিশুদের দিয়ে বলানো—এসব কার্যক্রমে তারা আনন্দের সঙ্গে অংশ নেয়। তারা বুঝতেই পারে না, কখন খেলার মধ্যেই পড়া ও লেখা শিখে ফেলছে।
মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও আমি কেবল খাতার নম্বরকে গুরুত্ব দিই না। প্রতিদিন কে নতুন একটি শব্দ পড়তে পারল, কে আজ নিজের নাম সুন্দরভাবে লিখল, কে বন্ধুকে পড়তে সাহায্য করল—এসব ছোট ছোট অর্জনও আমি লক্ষ্য করি এবং প্রশংসা করি। কারণ একটি শিশুর শেখার পথ অন্য শিশুর মতো হয় না; প্রত্যেকেই নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যায়।
বিদ্যালয়ের পাশাপাশি অভিভাবকদের সম্পৃক্ততাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমি অভিভাবকদের অনুরোধ করি, প্রতিদিন অন্তত দশ মিনিট সন্তানের সঙ্গে বই দেখুন, গল্প শুনুন কিংবা দুটি বাক্য লিখতে উৎসাহ দিন। এই অল্প সময়ের অনুশীলনই বিদ্যালয়ের শিক্ষাকে অনেক বেশি কার্যকর করে তোলে।
আমি বিশ্বাস করি, প্রথম শ্রেণির শিশুদের রিডিং ও রাইটিং দক্ষতা উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো ভালোবাসা, ধৈর্য এবং আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ। শিশু যদি শেখাকে আনন্দ হিসেবে গ্রহণ করে, তবে সে শুধু পাঠ্যবইয়ের অক্ষরই নয়, জীবনকেও পড়তে ও বুঝতে শিখবে। আর সেই শেখার পথেই একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সার্থকতা নিহিত।
১৪
২৪ মন্তব্য