সহকারী অধ্যাপক
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:১০ অপরাহ্ণ
বিদীর্ণ আকাশের আহ্বান - মোঃ মুজিবুর রহমান
বিদীর্ণ আকাশের আহ্বান
(সূরাঃ আল-ইনফিতারে ভাবধারায় আয়াতঃ ১-৮)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
যেদিন হঠাৎ বিদীর্ণ হবে আকাশের নীল দুয়ার,
নিভে যাবে দিনের অহং, স্তব্ধ হবে সংসার।
তারারা ছুটে পড়বে তখন অসীম শূন্যপথে,
সময়ের সব গর্ব হারাবে অনন্ত নীরব রথে।
সমুদ্র তখন ভেঙে দেবে আপন সীমার বাঁধ,
উথলে উঠবে গর্জন তুলে, কাঁপবে বিশ্বসাধ।
অতল জলের গোপন কথা ভেসে উঠবে তীর,
লুকিয়ে রাখা শত ইতিহাস হবে সবার ধীর।
মাটির নিচে নিদ্রিত যারা যুগের পর যুগ রয়,
কবর হতে জেগে উঠবে মহান প্রভুর ভয়।
ধুলোর বুকে মিশে যাওয়া নীরব জীবনের দল,
ডাক শুনে সব দাঁড়াবে এসে বিচার-প্রাঙ্গণতল।
সেদিন কেউ আর লুকোতে পারবে না কোনো পাপ,
মিথ্যার গড়া প্রাসাদ ভেঙে হবে ধূলিসাৎ।
হৃদয়ের গভীর গোপন কথা খুলে যাবে সব,
নিজের আমল নিজের মুখে দেবে সত্য উত্তর রব।
যা পাঠিয়েছ জীবনের পথে কর্মের অর্ঘ্য করে,
যা রেখে গেছ মানুষের মাঝে চলে যাওয়ার পরে,
সবই তখন স্পষ্ট হয়ে দাঁড়াবে সামনে এসে,
একটি কাজও হারাবে না হিসাবের পরিবেশে।
হে মানুষ!
কোন মোহ তোমায় আচ্ছন্ন করে রাখে?
কার ভরসায় ভুলে যাও চিরন্তন সত্যকে?
কী এমন শক্তি পেয়েছ তুমি ক্ষণিক পৃথিবীতে,
যে ভুলে যাও দয়াময়কে অহংকারের নেশাতে?
যিনি তোমায় সৃষ্টি করলেন শূন্য থেকে ডেকে,
মায়ের গর্ভে লালন করলেন অপার মমতা মেখে।
এক ফোঁটা তুচ্ছ তরল হতে দিলে জীবনের দান,
অন্ধকারে লিখে দিলেন ভবিষ্যতের গান।
তিনি গড়লেন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিখুঁত পরিমাপে,
সামঞ্জস্যের অপূর্ব ছোঁয়া দিলেন আপন হাতে।
চোখে দিলেন দেখার শক্তি, কানে শ্রবণধ্বনি,
জিহ্বায় ভাষা, মনে বিবেক—অমূল্য যত ধনই।
দুইটি হাত কর্মের তরে,
দুইটি পা চলার;
হৃদয় দিলেন ভালোবাসার,
বুদ্ধি সত্য বলার।
শ্বাসের পরে শ্বাসটি দিলেন বিনা মূল্যের দান,
প্রতিটি ক্ষণ তাঁরই কৃপায় জাগে জীবনের গান।
রক্তধারার প্রতিটি স্রোত বহে তাঁরই হুকুমে,
জীবন যেন অনন্ত শিক্ষা স্রষ্টার মহিমাতে।
কত বিস্ময় চারপাশ জুড়ে—
পাহাড়, নদী, বন,
সূর্য ওঠে নিয়ম মেনে,
ঘুরে দিনের ক্ষণ।
চাঁদের আলো নীরব রাতে
ঢালে স্নিগ্ধ রূপ,
ফুলের বুকে রঙের হাসি,
ধানের ক্ষেতে ধূপ।
শিশিরকণা ভোরের বেলায়
জাগায় নতুন প্রাণ,
পাখির কণ্ঠে ওঠে ভেসে
সৃষ্টির জয়গান।
সবই যেন একেকটি বাণী—
ভাবতে শেখো আজ,
স্রষ্টার পথে ফিরিয়ে নেবে
জীবনেরই সাজ।
মানুষ তুমি ক্ষুদ্র হলেও
মর্যাদাতে মহান,
যদি রাখো সত্যের পথে
অটল বিশ্বাসখান।
সম্পদ, ক্ষমতা, রূপের গর্ব—
সবই ক্ষণস্থায়ী,
সৎকর্ম শুধু রয়ে যাবে
চিরদিনের সাথী।
কেউ নয় বড় বংশের জোরে,
কেউ নয় ধনের দাপে,
মানুষ বড় হয় কেবলই
সত্য, ন্যায় আর ত্যাগে।
করুণা, দয়া, ন্যায়বিচার,
ক্ষমার কোমল বাণী—
এসব গুণেই প্রস্ফুটিত হয়
মানবতার টানি।
এ জীবন এক অস্থায়ী পথ,
চিরবাস নয় এখানে;
আজ যে হাসে, কাল সে-ও যাবে
অচেনা এক গন্তব্যে।
তাই তো সময় ফুরাবার আগে
সংশোধনের ডাক,
অন্ধকারের পথ ছেড়ে দাও,
সত্যের পথে হাঁট।
অন্যায়ের সব প্রাচীর ভেঙে
ন্যায়ের প্রদীপ জ্বালো,
অহংকারের শৃঙ্খল ছিঁড়ে
বিনয়ের মালা ভালো।
দুঃখীর মুখে হাসি ফুটাও,
ক্ষুধার্তকে দাও অন্ন,
এমন জীবন রেখে যেও
হোক মানবতার ধন্য।
জ্ঞান অর্জনে হও উদ্যমী,
চরিত্র রাখো শুদ্ধ,
কথায় কাজে মিল থাকুক,
হৃদয় হোক নির্মল-বুদ্ধ।
পিতা-মাতা, শিক্ষক, প্রতিবেশী—
সবার প্রতি মান,
মানুষ হয়ে মানুষের তরে
ছড়িয়ে দাও সম্মান।
সেদিন যখন বিদীর্ণ হবে
অসীম নীল আকাশ,
শেষ হয়ে যাবে পৃথিবীর
সকল গর্ব-উল্লাস।
তখন শুধু কর্মই হবে
মানুষের পরিচয়,
সত্যের কাছে মিথ্যা যত
হারিয়ে যাবে নিশ্চয়।
এসো তবে আজই করি
আত্মশুদ্ধির শপথ,
সত্য, ন্যায় আর কল্যাণময়
হোক আমাদের রথ।
মহান রবের দয়া ভরে
জীবন হোক উজ্জ্বল,
ইমান, আমল, উত্তম চরিত্রে
ফুটুক মানবফল।
হে দয়াময় প্রতিপালক!
আমাদের অন্তর জাগাও,
অহংকারের ঘোর অন্ধকার
চিরদিনের তরে মুছাও।
সৎপথে রাখো অবিচল,
সত্যে রাখো স্থির,
যেন তোমার সন্তুষ্টি নিয়ে
ফিরতে পারি শেষ নীড়।
***
বিদীর্ণ আকাশের আহ্বান
যেদিন বিদীর্ণ হবে আকাশের অটল নীল প্রাচীর,
নক্ষত্রমালা ছিন্নমুকুটে হারাবে আপন নীর।
অসীম শূন্য কেঁপে উঠবে প্রভুর মহা ডাকে,
সমস্ত সৃষ্টি স্তব্ধ হবে এক অনন্ত ফাঁকে।
সমুদ্র তখন সীমা ভেঙে মিলবে সমুদ্র-পানে,
অতল জলের গোপন ভাষা ধ্বনিত হবে গানে।
ঢেউয়ের বুকে লুকিয়ে থাকা যুগের ইতিহাস,
সত্যের আলোয় প্রকাশ পাবে মুছে যাবে সর্বনাশ।
কবরভূমির নিস্তব্ধতা ভাঙবে এক নিমেষে,
অগণিত প্রাণ জেগে উঠবে প্রভুর ডাকে শেষে।
রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, জ্ঞানী কিংবা মূঢ়,
একই কাতারে দাঁড়াবে সব, হবে না কোনো ভেদসূত্র।
সেদিন মানুষ জানতে পারবে আপন কর্মফল,
যা পাঠিয়েছে জীবনের পথে, যা রেখেছে অমল।
কোনো কথা আর গোপন হবে না বিচারদ্বারে গিয়ে,
সত্য তখন আপন আলোয় উঠবে জ্বলে দিয়ে।
হে মানুষ!
কিসের মোহে ভুলে গেলে করুণাময় রব?
কিসের গর্বে আচ্ছন্ন হলে হারালে সত্য-সব?
যিনি তোমায় সৃষ্টি করলেন অনুপম পরিমাপে,
সৌন্দর্যের সাম্য লিখলেন আপন দয়ার ছাপে।
তিনি দিলেন দুটি নয়ন সত্যকে দেখিবার,
দুটি কর্ণ জ্ঞানের ধ্বনি নীরবে শুনিবার।
বাক্য দিলেন সত্য বলার, বিবেক দিলেন মনে,
ন্যায়ের পথে চলার শক্তি রাখলেন গোপনে।
তিনি গড়লেন হৃদয়খানি মমতারই ঘরে,
ভালোবাসার সুধা ঢেলে মানুষের অন্তরে।
তিনি দিলেন চিন্তার আলো, বিবেচনার দীপ,
তবু কেন মানুষ আজও ভ্রমে করে নীপ?
দেখো তবে প্রভুর কুদরত দিগন্ত হতে দিগন্তে,
সূর্য ওঠে বিধান মেনে অনাদি অনন্তে।
চাঁদ ভাসে নীরব রাতে স্নিগ্ধ আলোর ঢেউ,
তারারাও রাখে নিয়ম, ব্যতিক্রম নয় কেউ।
পাহাড় অটল সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্থির,
নদী বয়ে যায় অনবরত আপন গানের নীর।
ফুলের বুকে রঙের হাসি, ফলে মধুর রস,
প্রতিটি সৃষ্টি ঘোষণা করে—একই মহান বস।
মানুষ তুমি সবার সেরা জ্ঞানের অলংকার,
সত্যের পথে চললে তবে পূর্ণ হবে আর।
অহংকারের প্রাসাদ যত মুহূর্তে যায় ভেঙে,
বিনয় থাকে চির অম্লান যুগের পরে রেঙে।
ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা, ক্ষমতারই দম্ভ,
মৃত্যুর দ্বারে মিলিয়ে যায় ক্ষণিক মরীচিকা-স্বপ্ন।
থেকে যায় কেবল সৎকর্ম, থেকে যায় উপকার,
থেকে যায় মানুষের মুখে স্নেহের উচ্চারণ।
তাই এসো আজ শপথ করি সত্য হবে সাথি,
ন্যায়ের পথে রাখব জীবন, করব না আর ক্ষতি।
অন্যায়ের সব শৃঙ্খল ছিঁড়ে জ্বালব ন্যায়ের দীপ,
মানবতার অমর বাণী রাখব হৃদয়-সীপ।
পিতা-মাতার সেবা হবে জীবনের অলংকার,
শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা হবে জ্ঞানের প্রথম দ্বার।
প্রতিবেশীর সুখে হাসব, দুঃখে হব সাথি,
এই শিক্ষাতেই গড়ে ওঠে সভ্যতারই মাটি।
এ পৃথিবী ক্ষণিকের পথ, চিরনিবাস নয়,
আজ যে শক্তির গর্বে মাতে, কালই হবে ক্ষয়।
তাই তো আগে জাগাও প্রাণে আত্মশুদ্ধির বাণী,
ইমান, আমল, সৎচরিত্র—জীবনেরই টানি।
যেদিন আবার বিদীর্ণ হবে সীমাহীন আকাশ,
নক্ষত্রমালা ঝরে পড়বে হারিয়ে সকল উল্লাস,
সেদিন শুধু সত্যের আলো পথ দেখাবে প্রাণে,
রবের দয়ার আশ্রয় খুঁজে দাঁড়াবে সব জানে।
হে পরম দয়াময়!
আমাদের অন্তর করো সত্যের আলোয় ভরা,
অহংকারের কালো মেঘ হোক চিরতরে সরা।
জীবনভর দাও তাওফীক ন্যায়ের পথে চলি,
তোমার সন্তুষ্টি নিয়েই যেন শেষ ঠিকানায় ফিরি।
আমাদের কর্ম হোক কল্যাণের, বাক্য হোক নির্মল,
চরিত্র হোক সুবাসিত, হৃদয় হোক উজ্জ্বল।
তোমারই দয়া, তোমারই নূর, তোমারই আশ্রয়,
এই প্রার্থনায় শেষ হোক জীবনের সকল জয়।
***
বিদীর্ণ আকাশের আহ্বান
বিদীর্ণ হবে আকাশ যবে, থেমে যাবে কাল,
নক্ষত্র হবে ঝরাপাতা, নিভে যাবে জ্বাল।
সূর্য-চন্দ্র স্তব্ধ হয়ে হারাবে আপন রূপ,
প্রভুর মহিমা ভাসবে শুধু মহাবিচার-ধূপ।
পর্বত হবে উড়ন্ত তুলা, ভাঙবে শিলার বাঁধ,
পৃথিবী জুড়ে ধ্বনিত হবে ন্যায়বিচারের সাধ।
সমুদ্র তার উচ্ছ্বাস নিয়ে মিলবে সাগর-বুকে,
সকল সীমা বিলীন হবে রবের এক ইশারাতে।
কবর হতে উঠবে মানুষ, নিঃশব্দ বিস্ময়ে,
কে ছিল রাজা, কে ভিখারি—একই সারি হয়ে।
কোনো মুকুট থাকবে না আর, থাকবে না পরিচয়,
আমল ছাড়া সেদিন কারও থাকবে না আশ্রয়।
যা করেছি নিভৃতে বসে, যা করেছি প্রকাশ,
সবই হবে চোখের সামনে সত্যের ইতিহাস।
মুখে নয়, কর্মই সেদিন সাক্ষ্য দেবে এসে,
একটি ক্ষুদ্র সৎকর্মও হারাবে না শেষে।
হে মানুষ!
কিসের মোহে ডুবলে তুমি ক্ষণিক সুখের টানে?
কিসের নেশায় ভুলে গেলে চিরকল্যাণ-পানে?
যিনি দিলেন জীবন তোমায় অপরূপ পরশে,
তাঁকেই কেন ভুলে থাকো অহংকারের রোষে?
তিনি তোমার দেহে এঁকেছেন ভারসাম্যের ছাপ,
হাড়ে-মাংসে, রক্তধারায় নেই তো কোনো চাপ।
চোখে দিয়েছেন আলোর জানালা, কানে শ্রবণদ্বার,
হৃদয় জুড়ে লিখে দিয়েছেন সত্যের অক্ষরধার।
তিনি গড়েছেন চিন্তার শক্তি, স্মৃতির দীপশিখা,
ভাষার মালা, জ্ঞানের নদী, প্রজ্ঞার মহাদীক্ষা।
অগণিত যে নিয়ামত তাঁর প্রতিটি ক্ষণজুড়ে,
তবু কেন অকৃতজ্ঞতা মানুষ বুকে ঘুরে?
দেখো ভোরের শিশিরকণা কাঁপে ঘাসের ডগায়,
দেখো পাখির সুরের ভেলায় নতুন সকাল জাগায়।
দেখো বৃষ্টির বিন্দুগুলো মেঘের বুক ছিঁড়ে,
মরুপ্রাণে সবুজ আশা ফোটায় ধীরে ধীরে।
দেখো নদীর নিরবধি পথ সাগরেরই পানে,
দেখো ফুলের সুবাস ছড়ায় নীরব অভিমানে।
দেখো শস্য সোনার হাসি কৃষকেরই ঘরে,
স্রষ্টার দান ঝরে নেমে প্রতিটি অন্তরে।
মানুষ যদি বুঝত শুধু এই মহাদানখানি,
হিংসা, লোভ আর অহংকার হারাত অমনি।
দয়া, ন্যায় আর সত্যবচন হতো জীবনের গান,
ভালোবাসায় ভরে উঠত বিশ্বমানবপ্রাণ।
ধন যাবে না, মান যাবে না, যাবে না সংসার,
থেকে যাবে কর্ম শুধু বিচার-অঙ্গন পার।
সৎকর্ম হবে শীতল ছায়া প্রখর দিনের তাপে,
অসৎকর্মই অন্ধকার হয়ে দাঁড়াবে অভিশাপে।
এসো তবে গড়ি এমন মন, নির্মল নদীর মতো,
যেখানে ঘৃণা জমবে না আর, প্রেমই হবে যত।
ক্ষমা দিয়ে জিতব হৃদয়, সত্য দিয়ে প্রাণ,
মানবসেবায় খুঁজে নেব রবেরই সম্মান।
শিক্ষা হোক আলোর প্রদীপ, জ্ঞান হোক পথচিহ্ন,
চরিত্র হোক ফুলের সুবাস, বিনয় হোক বিহঙ্গ।
শিশুর মুখে ফুটুক হাসি, বৃদ্ধ পাক সম্মান,
ন্যায়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকুক প্রতিটি মানবপ্রাণ।
যে দিনটি আজ দূরে মনে, কাছে সে প্রতিক্ষণ,
জীবনেরই প্রতিটি শ্বাস লিখছে নতুন গণন।
তাই আজই ফিরি রবের ডাকে, জাগি সত্য-আলোয়,
সৎপথ যেন শেষ অবধি হৃদয়খানি চালায়।
হে পরম করুণাময়!
আমাদের অন্তর করো কুরআনের নূরে ভরা,
অহংকারের অন্ধকার হোক চিরতরে সরা।
ইমান দাও, সৎকর্ম দাও, সত্যের দৃঢ় বল,
তোমার সন্তুষ্টিই হোক জীবনের সম্বল।
যেদিন বিদীর্ণ হবে আকাশ, নিভে যাবে নক্ষত্রলোক,
সেদিন যেন ডেকে নিও—"এসো, হে আমার শোকহীন লোক।"
দয়ার ছায়ায় স্থান দিও, ক্ষমার সুধা ঢালো,
তোমারই নৈকট্যে হোক আমাদের চিরকালের ভালো।
***
বিদীর্ণ আকাশের আহ্বান
যেদিন কাঁপবে সময়ের চাকা, স্তব্ধ হবে ক্ষণ,
মুছে যাবে ক্ষমতার আসন, নিভে যাবে মন।
সেদিন কেবল সত্যের সূর্য উঠবে দীপ্তিময়,
মিথ্যার সব ছায়া হারাবে, থাকবে না আর ভয়।
হে মানব!
কিসের মোহে ভাসছ আজও ক্ষণিক সুখের নেশায়?
কিসের গর্বে ভুলো তুমি অনন্ত প্রত্যাশায়?
যে মহান রব নিঃস্ব হতে করলে তোমায় ধনী,
তাঁরই দান ভুলে গিয়ে কেন হও অকৃতজ্ঞ গণি?
তিনি তোমার অস্থিতে দিলেন দৃঢ়তারই বল,
শিরায় শিরায় বইয়ে দিলেন জীবনের অনল।
হৃদয়জুড়ে স্থাপন করলেন অনুভবের দীপ,
বিবেক নামে জাগিয়ে দিলেন সত্যপথের সীপ।
চোখের পাপড়ি প্রহরী হয়ে রক্ষা করে নয়ন,
শ্রবণপথে জ্ঞানের ধারা জাগায় নতুন জীবন।
জিহ্বায় দিলেন ভাষার সুধা, সত্য বলার তরে,
চিন্তার মাঝে প্রজ্ঞার আলো ফুটল অন্তরে।
একটি শ্বাসও নিজের নয়—সবই তাঁরই দান,
তবু কেন মানুষ ভুলে যায় কৃতজ্ঞতার গান?
একটি ফোঁটা রক্তও তো চলেনা তাঁর বিনা,
তবু কেন হৃদয় জুড়ে অহংকারের ঋণা?
দেখো আকাশ সীমাহীন, তবু নিয়মে বাঁধা,
দেখো নদী সাগরপানে ছুটে চলে সাধা।
দেখো গাছের প্রতিটি পাতা বাতাস পেলে দোলে,
স্রষ্টার বিধান মেনে তারা জীবনরাগে চলে।
বীজের বুকে লুকিয়ে থাকে অরণ্যেরই গান,
বিন্দু জলে ফুটে ওঠে মহাসমুদ্র-প্রাণ।
ক্ষুদ্র পিঁপড়ের পথচলাতেও আছে জ্ঞানের ছাপ,
সৃষ্টি যেন কুরআনেরই খোলা এক অধ্যায়।
যে শিশুটি প্রথম হেসে ডাকে মায়ের মুখ,
সে-ও তো এক মহা নিদর্শন—অশেষ করুণাসুখ।
যে বৃদ্ধটি লাঠি হাতে ধীরে চলে পথ,
তার জীবনও সাক্ষ্য দেয় সময়েরই রথ।
হে মানুষ!
নিজেকে একবার দেখো নীরব অন্তরে,
কত অনুগ্রহ জমে আছে প্রতিটি নিশ্বাস ভরে।
কোন অধিকারে ভুলে যাও সেই দয়াময় নাম?
যাঁর কৃপায় প্রতিটি প্রভাত, প্রতিটি অবসান।
যা কিছু করো, লিখে রাখে অদৃশ্য সাক্ষীগণ,
কথা, কাজ আর মনের গোপন প্রতিটি স্পন্দন।
কোনো অশ্রু হারায় না তো, হারায় না আহ্বান,
রবের কাছে সংরক্ষিত প্রতিটি প্রাণের টান।
সৎকর্ম যেন বীজের মতো অঙ্কুর হয়ে ফোটে,
মানবতার ফলের ভারে নত হয় জীবনের রথে।
একটি হাসি, একটি সেবা, একটি মধুর বাণী,
হতে পারে আখিরাতে মুক্তিরই পাথেয়খানি।
অন্যদিকে অন্যায় যত, অহংকারের দাগ,
একদিন সব খুলে যাবে বিচারদিনের ভাগ।
তাই তো আজই ফিরে এসো সত্যের আলোকপথে,
ক্ষমা চেয়ে দাঁড়াও নত মহান রবের রথে।
ইমান হোক অন্তরজুড়ে, আমল হোক শুদ্ধ,
সত্যবচন হোক জীবনের অমূল্য মহাবুদ্ধ।
বিনয় হোক অলংকার, দয়া হোক পরিচয়,
এমন জীবন গড়তে পারলেই সফল মানবজয়।
হে দয়াময় প্রতিপালক!
বিদীর্ণ আকাশের আগে বিদীর্ণ করো মন,
অহংকারের শিলা ভেঙে জাগাও অনুতাপ-ধ্বনন।
যেন বিচারদিনে ডেকে বলো—"এসো আমার কাছে",
তোমার দয়ার ছায়াতলে চিরশান্তি যে আছে।
১৪
২৪ মন্তব্য