Loading..

ব্লগ

রিসেট

২১ জুলাই, ২০২৬ ১২:২০ অপরাহ্ণ

নৈতিকতার সংকট ও আমাদের আগামী প্রজন্ম

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, আর এই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো বিবেক, বুদ্ধি, আত্মসংযম মনুষ্যত্ববোধ। সমাজ রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করার নামই হলো জীবন। কিন্তু আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে শিক্ষার মূল লক্ষ্যমানুষ হওয়া চেয়েসার্টিফিকেট অর্জনবাভালো ফলাফলকরাকেই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির বিচ্যুতিই আমাদের সমাজ শিক্ষা ব্যবস্থায় এক গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে, যার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বর্তমানের উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর মাধ্যমে।

সম্প্রতি দেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী অভিভাবক কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার যে ধারাবাহিক চিত্র আমরা দেখছি, তা আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের অশনি সংকেত। যে শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর, তার প্রতি অমর্যাদা প্রদর্শন কেবল একজন ব্যক্তির অবমাননা নয়, এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে উপড়ে ফেলার নামান্তর। অন্যদিকে, এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলন এবং ফলাফল কেন্দ্রিক অস্থিরতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা শিক্ষার্থীদের মেধার চেয়ে প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে বেশি ঠেলে দিচ্ছি। পরীক্ষার নম্বরই যখন সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন শিক্ষার্থী অভিভাবকউভয়ই নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে যেকোনো উপায়ে ফলাফল অর্জনের মরিয়া চেষ্টায় লিপ্ত হন। এই মরিয়া ভাবই আজকের সামাজিক অস্থিরতার মূল উৎস।

আজকের প্রজন্ম এক দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তির অবারিত সুবিধা, অন্যদিকে ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম সাফল্যের ইঁদুর দৌড়। সোশ্যাল মিডিয়ায়লাইকভিউ’-এর প্রতিযোগিতার মতো পরীক্ষায় জিপিএ- পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। তারা ভার্চুয়াল জগতের চকচকে মোড়কে নিজেদের মূল্যায়ন করতে শিখছে, ফলে বাস্তবের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই ডিজিটাল আগ্রাসনের যুগে সহমর্মিতা ধৈর্য কমে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে ব্যক্তিগত সামাজিক আচরণে।

অথচ শিক্ষার বুনিয়াদ তৈরি হয় পরিবারে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব।কিন্তু আজ সেই পারিবারিক শিক্ষা মূল্যবোধের অভাব প্রকট। যখন পরিবার থেকে সন্তানকে সাফল্যের চেয়ে সততার মূল্য শেখানো হয় না, যখন কোনো অভিভাবক তার সন্তানের ভুল সংশোধন না করে শিক্ষকের সঙ্গে অসদাচরণ করেন, তখন সেই সন্তান কেবল মেধাবী হতে পারে, কিন্তু মানুষ হতে পারে না।

আমার নটরডেম কলেজে অধ্যয়নকালীন স্মৃতি আজও আমার মানসপটে অম্লান হয়ে আছে। ফিজিক্সের অধ্যাপক সুশান্ত স্যার একবার কুইজ পরীক্ষায় ভুলবশত অনেককে ১০ নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এটি ছিল মূলত একটিনৈতিক পরীক্ষা আমি আমার বন্ধুরা সেই লোভ সংবরণ করে স্যারকে জানালে তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘বাবারা, আজকের ক্লাসের শিক্ষা হলোছোটখাটো লোভ সামলাতে হবে। যারা আজ ১০ নম্বরের লোভ সামলাতে পারলে না, তারা ভবিষ্যতে কোটি টাকার লোভে বিবেক বিসর্জন দেবে। আমি চাই না আমার ছাত্ররা অসৎ হোক।আজ সেই স্যারের আদর্শের বড় অভাব। শিক্ষকের সেই ধমক বা শাসনকে আজ আর কেউ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারছে না; উল্টো শিক্ষকের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পবিত্র সম্পর্কটি আজ দাতা-গ্রহীতার ব্যবসায়িক সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। শিক্ষক কেবল জ্ঞান দেন না, তিনি চরিত্র গঠনের কারিগর। মেধাবী হওয়ার চেয়ে অনুগত নীতিবান হওয়া অধিক জরুরি। কিন্তু শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা প্রমাণ করে যে, আমরা শিক্ষকদের মর্যাদা তাদের শাসন করার অধিকারকে সংকুচিত করে ফেলেছি। পক্ষান্তরে, শিক্ষার্থীরাও তাদের জীবনের লক্ষ্য হারিয়ে একটি অস্থির পথচলায় লিপ্ত হয়েছে।

চরিত্র গঠন এবং শিষ্টাচারের বিষয়টি আমাদের জীবনবোধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, সু আচার-আচরণ অঙ্ক শাস্ত্রের শূন্যের মতো। আপাতদৃষ্টিতে এর গুরুত্ব ততোটা বোঝা যায় না, কিন্তু সবকিছুর সাথে এর সংমিশ্রণ বিরাট মূল্য পরিবর্ধন করে। একজন মেধাবী মানুষ যদি বিনয়ী নীতিবান না হন, তবে তার মেধার পূর্ণ সার্থকতা পাওয়া যায় না; পক্ষান্তরে নৈতিকতায় সমৃদ্ধ মানুষ তার চারপাশের প্রতিটি গুণকে এক একটি শূন্যের সামনে এককের মতো বসিয়ে সাফল্যের বহুগুণ মান বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হন।

আগামী প্রজন্মকে এই নৈতিক অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যক্তিগত, পারিবারিক রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। প্রথমেই পরিবারকে শিক্ষার মূল কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে, কারণ পারিবারিক মূল্যবোধই শিশুর নৈতিকতার প্রথম সোপান। সন্তানকে কেবল জিপিএ- পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ঠেলে না দিয়ে সৎ নীতিবান হওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে হবে। অভিভাবকের আচরণই সন্তানের প্রথম পাঠ; তাই বাবা-মায়ের সততা সত্যনিষ্ঠা সন্তানকে সঠিক পথ দেখাবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পবিত্র সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে শিক্ষকদের ভয় নয়, বরং গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করতে হবে। শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা, কারণ শিক্ষক ছাড়া প্রকৃত মানুষ গড়া অসম্ভব। তৃতীয়ত, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি মানবিক, সামাজিক নৈতিক শিক্ষার বাস্তবধর্মী প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা এবং ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিতে হবে। চতুর্থত, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন নীতি প্রণয়ন সংস্কার প্রয়োজন যেখানে মেধাবীদের চেয়েও মানবিক গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা হবে। সমাজ থেকে দুর্নীতির চর্চা কমিয়ে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে নিজেদের দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

পরিশেষে, সুশিক্ষিত মানবিক প্রজন্ম গড়তে হলে পরিবার, শিক্ষাঙ্গন এবং রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নটরডেমের সেই ১০ নম্বরের লোভবর্জন বা স্যারের সেই কঠোর শাসন আজও আমাদের পথ দেখাতে পারে। আমরা কি পারব না আজকের অস্থির প্রজন্মকে সত্য সুন্দরের পথে ফিরিয়ে আনতে? অন্ধকার দুর্দশাগ্রস্ত জাতিকে আলোর ঠিকানায় পৌঁছে দিতে হলে, মেধার অহংকারের চেয়ে মানবিকতার জয়গান গাইতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রিধারী তৈরি নয়, প্রকৃতমানুষগড়ে তোলা। সমাজ রাষ্ট্রের এই সন্ধিক্ষণে এসে আমাদের প্রত্যয়ের নাম হোক—‘নৈতিকতায় মেধার উৎকর্ষ

মন্তব্য করুন