Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ আগস্ট, ২০২৬ ০৫:০০ পূর্বাহ্ণ

চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না (হাদিস: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ»-এর আলোকে) মোঃ মুজিবুর রহমান

চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না

(হাদিস: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ»-এর আলোকে)

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

ভূমিকা

মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, সহকর্মী ও সমাজের বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়েই তার জীবন গড়ে ওঠে। মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর সমাজের শান্তি অনেকাংশে নির্ভরশীল। আর এই শান্তিপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য যে কয়েকটি নিন্দনীয় অভ্যাস বিশেষভাবে দায়ী, তার মধ্যে চোগলখোরি অন্যতম।

চোগলখোরি এমন একটি সামাজিক ব্যাধি, যা বাইরে থেকে ছোট মনে হলেও এর পরিণতি অনেক সময় অত্যন্ত ভয়াবহ হয়। একজনের কথা আরেকজনের কাছে এমনভাবে পৌঁছে দেওয়া, যাতে মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ, রাগ, বিদ্বেষ বা সম্পর্কের অবনতি সৃষ্টি হয়—এটাই মূলত চোগলখোরির একটি রূপ। ইসলামে এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ।

রাসুলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করে বলেছেন—

«لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ»

অর্থ: “চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”

হাদিসটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত; কিন্তু এর শিক্ষা গভীর ও ব্যাপক। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত চরিত্রের দোষ সম্পর্কে সতর্ক করে না; বরং মানুষের মুখ, কথা, সম্পর্ক, সামাজিক শান্তি এবং আখিরাতের সফলতার ব্যাপারেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

চোগলখোরি কী?

আরবি “নামীমাহ” (نَمِيمَة) শব্দ থেকে “নাম্মাম” বা চোগলখোর শব্দের উৎপত্তি। সাধারণভাবে নামীমাহ বলতে এমন কথা একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে পৌঁছে দেওয়াকে বোঝায়, যার ফলে তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি, বিরোধ, ক্ষোভ বা শত্রুতা সৃষ্টি হয়।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি আরেকজন সম্পর্কে কোনো কথা বলল। তৃতীয় ব্যক্তি সেই কথাটি এমনভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিল, যাতে তার মনে প্রথম ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাগ বা বিদ্বেষ জন্ম নেয়। এ ধরনের আচরণ চোগলখোরির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

চোগলখোরের উদ্দেশ্য সব সময় একই রকম হয় না। কেউ হয়তো বিদ্বেষ থেকে করে, কেউ নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য করে, কেউ আবার মজা বা কৌতূহলবশত অন্যের কথা বহন করে। কিন্তু উদ্দেশ্য যাই হোক, যদি এর ফলে মানুষের মধ্যে অশান্তি ও সম্পর্কের ক্ষতি হয়, তাহলে কাজটি অত্যন্ত নিন্দনীয়।

হাদিসের সতর্কবাণীর গুরুত্ব

«لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ»—“চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না”—এই বক্তব্য একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত কঠিন সতর্কবার্তা।

এর অর্থ এই নয় যে কোনো ব্যক্তি চোগলখোরি করলে সে চিরকাল ইসলামের বাইরে চলে গেল। বরং হাদিসটি চোগলখোরির ভয়াবহতা এবং এর ওপর অবিচল থাকার পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা দেয়। কোনো মুসলিম যদি এ গুনাহে লিপ্ত হয়, তবে তাকে তওবা করে নিজেকে সংশোধন করতে হবে এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা যথাসম্ভব সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।

একজন মুমিনের লক্ষ্য শুধু দুনিয়ায় সম্মান অর্জন করা নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে আখিরাতে সফল হওয়া। তাই যে কাজ জান্নাতের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তা থেকে নিজেকে রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব।

চোগলখোরি কেন এত ভয়ংকর?

চোগলখোরির ভয়াবহতা হলো—এটি শুধু একজন মানুষের ক্ষতি করে না; বরং একসঙ্গে অনেক মানুষের সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে।

একটি ছোট কথা কখনো একটি পরিবারের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে। একটি ভুলভাবে বহন করা বক্তব্য দুই বন্ধুর সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। আত্মীয়দের মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে পারে। এমনকি দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব বা পারিবারিক সম্পর্কও ভেঙে যেতে পারে।

চোগলখোরির মাধ্যমে সাধারণত তিনটি জিনিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়—

প্রথমত—বিশ্বাস।
মানুষ যখন বুঝতে পারে তার ব্যক্তিগত কথা অন্যের কাছে পৌঁছে গেছে, তখন সে আর সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না।

দ্বিতীয়ত—সম্পর্ক।
ভুল বোঝাবুঝি ও সন্দেহের কারণে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়।

তৃতীয়ত—সামাজিক শান্তি।
একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগিয়ে দেওয়ার ফলে পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হয়।

চোগলখোরির সঙ্গে গীবতের সম্পর্ক

চোগলখোরি ও গীবত এক জিনিস নয়, তবে অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে থাকে।

গীবত হলো কোনো মুসলিম ভাই বা বোনের এমন দোষ তার অনুপস্থিতিতে আলোচনা করা, যা সে জানলে অপছন্দ করবে। আর চোগলখোরি হলো মানুষের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বা এমন পরিণতি ঘটিয়ে একের কথা অন্যের কাছে বহন করা।

একজন ব্যক্তি কারও গীবত করল এবং সেই কথা এমনভাবে অন্যের কাছে পৌঁছে দিল যে দুজনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলো—তাহলে সেখানে গীবত ও চোগলখোরি উভয় গুনাহই থাকতে পারে।

তাই একজন মুমিনকে শুধু নিজের জিহ্বাকে গীবত থেকে নয়, মানুষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে এমন কথাবার্তা থেকেও সংযত রাখতে হবে।

পবিত্র কুরআনের শিক্ষা

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সূরা আল-হুজুরাতে মানুষের সামাজিক আচরণ সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। সেখানে বিদ্রূপ, অপমান, কু-ধারণা, গোপন অনুসন্ধান ও গীবত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে...”
—
সূরা আল-হুজুরাত: ১১

আর পরবর্তী আয়াতে কু-ধারণা, গোপন অনুসন্ধান ও গীবত থেকে নিষেধ করা হয়েছে।

এসব নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, ইসলাম মানুষের সম্মান, মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।

একটি কথার শক্তি

মানুষের জিহ্বা ছোট; কিন্তু তার প্রভাব অনেক বড়।

একটি ভালো কথা একজনের মন আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারে। আবার একটি কটু কথা মানুষের হৃদয়ে গভীর কষ্ট সৃষ্টি করতে পারে। একটি সত্য ও সুন্দর পরামর্শ একটি পরিবারকে রক্ষা করতে পারে। আবার একটি মিথ্যা বা উসকানিমূলক কথা একটি সম্পর্ক ধ্বংস করে দিতে পারে।

তাই কথা বলার আগে চিন্তা করা জরুরি—

আমি যা বলছি, তা কি সত্য?
এটি কি প্রয়োজনীয়?
এটি বললে কারও ক্ষতি হবে কি?
আমি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বলছি?

এই কয়েকটি প্রশ্ন একজন মানুষকে অনেক গুনাহ থেকে রক্ষা করতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোগলখোরি

বর্তমান যুগে চোগলখোরির ক্ষেত্র শুধু মুখোমুখি কথাবার্তায় সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজ, গ্রুপ, মন্তব্য, অডিও, ভিডিও ও বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে মানুষের কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

কেউ কারও ব্যক্তিগত কথা স্ক্রিনশট নিয়ে অন্যের কাছে পাঠিয়ে দিল, কারও ব্যক্তিগত বক্তব্য বিকৃত করে ছড়িয়ে দিল, কিংবা একজনের কথা অন্যজনের কাছে এমনভাবে পৌঁছে দিল যাতে বিরোধ সৃষ্টি হয়—এসব আচরণও চোগলখোরির আধুনিক রূপ হতে পারে।

অনলাইনে কোনো কথা ছড়িয়ে দেওয়ার আগে তাই আরও বেশি সতর্ক হওয়া দরকার। কারণ মুখে বলা কথা হয়তো কয়েকজন শুনবে; কিন্তু অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া কথা মুহূর্তের মধ্যে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

যাচাই না করে কথা ছড়ানো

ইসলাম কোনো খবর যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়াকে সমর্থন করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন—

“হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে দেখো...”
—
সূরা আল-হুজুরাত: ৬

এই আয়াত আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি শেখায়—শোনা মাত্রই বিশ্বাস করা যাবে না এবং যাচাই না করে ছড়ানো যাবে না।

আজকের পৃথিবীতে গুজব ছড়ানোর অন্যতম কারণ হলো যাচাই না করে তথ্য প্রচার করা। একটি ভুল তথ্য থেকে বহু ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই মুমিনের জিহ্বা যেমন সংযত হবে, তেমনি তার আঙুলও সংযত হবে—যাতে যাচাইহীন কোনো কথা সে প্রচার না করে।

চোগলখোরির পেছনে যে কারণগুলো কাজ করে

চোগলখোরির পেছনে বিভিন্ন মানসিক ও সামাজিক কারণ থাকতে পারে। যেমন—

১. হিংসা

কেউ অন্যের সাফল্য সহ্য করতে না পেরে তার বিরুদ্ধে কথা ছড়াতে পারে।

২. বিদ্বেষ

কারও প্রতি ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকলে তার সম্পর্ক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে কথা বহন করা হতে পারে।

৩. নিজের গুরুত্ব দেখানোর প্রবণতা

কেউ কেউ মনে করে, অন্যের গোপন কথা জানার কারণে সে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই সে তা প্রকাশ করে।

৪. বিনোদনের ভুল ধারণা

কিছু মানুষ অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করাকে মজার বিষয় মনে করে। অথচ এতে মানুষের সম্মান নষ্ট হতে পারে।

৫. স্বার্থসিদ্ধি

কেউ কখনো নিজের সুবিধা অর্জনের জন্য একজনের কথা আরেকজনের কাছে লাগিয়ে দেয়।

৬. কৌতূহল

অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় জানার অযথা আগ্রহও মানুষকে চোগলখোরির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

চোগলখোরির ক্ষতিকর পরিণতি

চোগলখোরির ফলে—

  • মানুষের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়;

  • বন্ধুত্ব নষ্ট হয়;

  • স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে;

  • আত্মীয়তার সম্পর্ক দুর্বল হয়;

  • কর্মক্ষেত্রে বিরোধ সৃষ্টি হয়;

  • প্রতিষ্ঠানে দলাদলি বাড়ে;

  • সমাজে অশান্তি ছড়ায়;

  • মানুষের পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হয়;

  • ব্যক্তির সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়;

  • এবং সর্বোপরি, আল্লাহর অসন্তুষ্টি অর্জিত হতে পারে।

একজন চোগলখোর হয়তো মনে করতে পারে, সে শুধু একটি কথা বলেছে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না, তার সেই একটি কথার পেছনে কত মানুষের কষ্ট, কান্না, সম্পর্কচ্ছেদ ও অশান্তি তৈরি হতে পারে।

চোগলখোরের কথা শুনলে কী করব?

শুধু চোগলখোরি করা থেকে বিরত থাকলেই হবে না; অন্যের চোগলখোরিও গ্রহণ করা যাবে না।

কেউ এসে বলল, “অমুক ব্যক্তি তোমার সম্পর্কে এই কথা বলেছে”—তখন সঙ্গে সঙ্গে রেগে যাওয়া উচিত নয়।

প্রথমে ভাবতে হবে—

কথাটি সত্য কি না।
কথাটি সঠিকভাবে বলা হয়েছে কি না।
কথাটি বলার পেছনে কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না।

সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে শান্তভাবে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে। কিন্তু এমনভাবে নয়, যাতে নতুন করে ঝগড়া সৃষ্টি হয়।

একজন বিচক্ষণ মানুষ আগুনে তেল ঢালে না; বরং আগুন নেভানোর চেষ্টা করে।

চোগলখোরির পরিবর্তে সংশোধনের সংস্কৃতি

ইসলাম মানুষের ভুল খুঁজে বেড়ানোর সংস্কৃতি শেখায় না। বরং ইসলাম সংশোধন, কল্যাণ ও নসিহতের শিক্ষা দেয়।

কেউ ভুল করলে তার ভুলকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে না দিয়ে, সুযোগ ও পরিবেশ বুঝে সুন্দরভাবে তাকে বোঝানো উত্তম।

একজন সত্যিকারের কল্যাণকামী ব্যক্তি মানুষের দুর্বলতা নিয়ে আনন্দিত হয় না; বরং তাকে সংশোধনের পথ দেখায়।

মানুষের দোষ ছড়ানো সহজ; দোষ সংশোধনে সাহায্য করা কঠিন।
কিন্তু মুমিনের পথ হলো কঠিন হলেও কল্যাণের পথ বেছে নেওয়া।

পরিবারে চোগলখোরির ক্ষতি

পরিবার হলো ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সহযোগিতার স্থান। কিন্তু পরিবারের একজন সদস্য যদি অন্যের কথা এদিক-ওদিক বহন করতে থাকে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই পারিবারিক পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে।

একজনের কথা আরেকজনের কাছে বিকৃতভাবে পৌঁছানো, শাশুড়ির কথা পুত্রবধূর কাছে, পুত্রবধূর কথা শাশুড়ির কাছে, ভাইয়ের কথা ভাইয়ের কাছে বা আত্মীয়ের কথা অন্য আত্মীয়ের কাছে লাগিয়ে দেওয়া—এসব আচরণ পারিবারিক শান্তি নষ্ট করতে পারে।

তাই পরিবারের সদস্যদের উচিত—

কথা কম বলা, বেশি বোঝা;
অভিযোগ কম করা, সমাধান বেশি খোঁজা;
দোষ ছড়ানো নয়, সংশোধনে সাহায্য করা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চোগলখোরি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞান ও চরিত্র গঠনের স্থান। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সহপাঠী ও কর্মচারীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও আস্থা থাকা জরুরি।

একজন শিক্ষার্থী যদি এক বন্ধুর কথা অন্য বন্ধুর কাছে লাগিয়ে দেয়, অথবা কারও বক্তব্য বিকৃত করে শিক্ষকের কাছে উপস্থাপন করে, তাহলে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ নষ্ট হতে পারে।

আবার শিক্ষকরাও যদি শিক্ষার্থী বা সহকর্মীদের ব্যক্তিগত বিষয় অপ্রয়োজনীয়ভাবে আলোচনা করেন, তাতেও আস্থা নষ্ট হতে পারে।

তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি সত্যবাদিতা, আমানতদারি, গোপনীয়তা রক্ষা, সৌজন্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা শেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কর্মক্ষেত্রে চোগলখোরি

কর্মক্ষেত্রেও চোগলখোরি একটি বড় সমস্যা। কেউ যদি সহকর্মীর সামান্য ভুলকে বাড়িয়ে অন্যের কাছে উপস্থাপন করে, তাহলে কর্মপরিবেশে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে।

কাজের জায়গায় ভুল হলে তা সংশোধনের উদ্দেশ্যে যথাযথ ব্যক্তিকে জানানো এক বিষয়; আর কাউকে হেয় করা বা সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য তার কথা বহন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

তাই ন্যায়সঙ্গত অভিযোগ ও চোগলখোরির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।

সব কথা গোপন রাখা কি সব সময় জরুরি?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। সব ধরনের তথ্য অন্যের কাছে না বলাই চোগলখোরি থেকে বাঁচার একমাত্র নিয়ম নয়। যদি কারও ওপর জুলুম হয়, কারও অধিকার নষ্ট হয়, কারও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকে বা কোনো গুরুতর অন্যায় প্রতিরোধের জন্য যথাযথ ব্যক্তিকে সত্য তথ্য জানানো প্রয়োজন হয়, তাহলে তা চোগলখোরির পর্যায়ে পড়ে না—বরং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হতে পারে।

তবে এ ক্ষেত্রেও উদ্দেশ্য হতে হবে অন্যায় প্রতিরোধ ও কল্যাণ, অপমান, প্রতিশোধ বা বিরোধ সৃষ্টি নয়।

অর্থাৎ, ইসলামের শিক্ষা হলো—কথার উদ্দেশ্য, প্রয়োজন ও পরিণতি বিবেচনা করে কথা বলা।

কীভাবে চোগলখোরি থেকে বাঁচব?

চোগলখোরি থেকে বাঁচতে কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।

প্রথমত: কথা বলার আগে চিন্তা করা

যা বলতে যাচ্ছি, তা সত্য হলেও তা বলা প্রয়োজন কি না—এটি ভাবতে হবে।

দ্বিতীয়ত: গোপন কথা রক্ষা করা

কেউ বিশ্বাস করে ব্যক্তিগত কথা বললে তা অকারণে অন্যের কাছে প্রকাশ করা যাবে না।

তৃতীয়ত: গীবত ও পরনিন্দা থেকে দূরে থাকা

অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা বন্ধ করতে হবে।

চতুর্থত: যাচাই না করে কোনো কথা বিশ্বাস না করা

শোনা কথা সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করা যাবে না।

পঞ্চমত: চোগলখোরের কথা উৎসাহ না দেওয়া

কেউ এসে অন্যের কথা লাগাতে শুরু করলে তাকে উৎসাহিত না করে সুন্দরভাবে থামিয়ে দিতে হবে।

ষষ্ঠত: নিজের জিহ্বার হিসাব নেওয়া

প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—আজ আমার কথায় কারও কষ্ট হয়েছে কি না, কারও সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে কি না।

সপ্তমত: আল্লাহকে বেশি স্মরণ করা

আল্লাহর স্মরণ মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং জিহ্বাকে সংযত রাখতে সাহায্য করে।

তওবার দরজা খোলা

কেউ যদি চোগলখোরিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তার জন্য হতাশ হওয়ার কারণ নেই। আল্লাহর রহমতের দরজা খোলা। আন্তরিক তওবা করে মানুষ নিজের চরিত্র পরিবর্তন করতে পারে।

তওবার অর্থ শুধু মুখে “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা নয়; বরং গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া এবং পুনরায় সেই গুনাহে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প করা।

চোগলখোরির মাধ্যমে যদি কারও ক্ষতি হয়ে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি বুঝে ক্ষতি সংশোধনের চেষ্টা করাও জরুরি। তবে এমনভাবে কিছু করা উচিত নয়, যাতে নতুন করে আরও ক্ষতি বা বিরোধ সৃষ্টি হয়।

জিহ্বার হেফাজত

মুমিনের অন্যতম পরিচয় হলো সে তার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

জিহ্বা দিয়ে আমরা কুরআন তিলাওয়াত করতে পারি, জিকির করতে পারি, সালাম দিতে পারি, ভালো কথা বলতে পারি, কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারি। আবার এই জিহ্বা দিয়েই মিথ্যা, গীবত, অপবাদ, কটুকথা ও চোগলখোরি করা সম্ভব।

তাই জিহ্বা আল্লাহর একটি বড় নিয়ামত; এর অপব্যবহার করা উচিত নয়।

যে জিহ্বা আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত থাকে, সে জিহ্বা মানুষের দোষ বহনে ব্যস্ত হওয়া উচিত নয়।

চোগলখোরির বিপরীত হলো শান্তি প্রতিষ্ঠা

একজন মুমিনের কাজ মানুষের মধ্যে আগুন জ্বালানো নয়; বরং আগুন নেভানো।

দুইজন মানুষের মধ্যে বিরোধ হলে একজন মুমিন চেষ্টা করবে তাদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি করতে। কারও ভুল শুনলে তা ছড়িয়ে না দিয়ে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করবে। কেউ কারও বিরুদ্ধে কথা বললে সে অন্ধভাবে তা গ্রহণ করবে না।

অর্থাৎ—

চোগলখোর মানুষ ভাঙে,
মুসলিম মানুষ গড়ে।

চোগলখোর দূরত্ব বাড়ায়,
মুমিন হৃদয়ের দূরত্ব কমায়।

চোগলখোর আগুন ছড়ায়,
সৎ মানুষ শান্তির জল ঢালে।

আমাদের করণীয়

আজ আমাদের সমাজে নানা ধরনের বিভেদ, সন্দেহ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা যায়। এর পেছনে অনেক কারণ থাকলেও অনর্থক কথাবার্তা, গুজব, পরনিন্দা ও চোগলখোরি এসব সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের ঘর থেকেই পরিবর্তন শুরু করা।

আমরা প্রতিজ্ঞা করতে পারি—

আমি অকারণে কারও কথা অন্যের কাছে বহন করব না।

আমি যাচাই না করে কোনো খবর প্রচার করব না।

আমি কারও ব্যক্তিগত দুর্বলতা নিয়ে আনন্দ করব না।

আমি গীবত ও অপবাদ থেকে নিজেকে রক্ষা করব।

আমি চোগলখোরের কথা শুনে তাকে উৎসাহ দেব না।

আমি মানুষের মধ্যে বিরোধ নয়, শান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করব।

আমি ভুল করলে ক্ষমা চাইব এবং অন্যের ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ দেব।

উপসংহার

চোগলখোরি দেখতে হয়তো একটি ছোট অভ্যাসের মতো মনে হয়, কিন্তু এর ক্ষতি ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই গভীর হতে পারে। এটি মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করে, সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সতর্কবাণী—

«لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ»

আমাদের জন্য একটি গভীর আত্মশুদ্ধির শিক্ষা। একজন মুমিনের উচিত এই হাদিসকে শুধু পড়ে যাওয়া নয়, বরং নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।

আমরা যেন অন্যের কথা বহনকারী না হয়ে কল্যাণের কথা বহনকারী হই; মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে ভালোবাসা সৃষ্টি করি; গোপন কথা প্রকাশ না করে আমানত রক্ষা করি; গুজব ছড়ানো নয়, সত্য যাচাই করি; পরনিন্দা নয়, উত্তম নসিহত করি।

আমাদের জিহ্বা যেন কারও হৃদয় ভাঙার কারণ না হয়; বরং কারও কষ্ট লাঘবের মাধ্যম হয়। আমাদের কথা যেন শত্রুতা বাড়ানোর কারণ না হয়; বরং ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও শান্তির সেতু হয়ে ওঠে।

হে আল্লাহ! আমাদের জিহ্বাকে মিথ্যা, গীবত, অপবাদ, চোগলখোরি ও অশ্লীল কথা থেকে হেফাজত করুন। আমাদের অন্তরকে হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার থেকে পবিত্র করুন। আমাদেরকে সত্য কথা বলার, আমানত রক্ষা করার এবং মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার তাওফিক দান করুন। আমাদের এমন বান্দা করুন, যাদের কথা ও কাজে মানুষ নিরাপদ থাকে।

আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ