Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৩৮ অপরাহ্ণ

অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স করার সম্পূর্ণ নিয়ম

অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স করার সম্পূর্ণ নিয়ম

 

মনিরুল হক,

        বাংলাদেশের রাস্তায় গাড়ি নামানোর আগে যে কাগজটির কথা সবচেয়ে আগে মনে পড়ে, সেটি ড্রাইভিং লাইসেন্স। এটি নিছক একটি অনুমতিপত্র নয়; মোটরযান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩-এর ৩ নং ধারা অনুযায়ী বৈধ লাইসেন্স ছাড়া কোনো সরকারি রাস্তায় গাড়ি চালানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কয়েক বছর আগেও এই লাইসেন্স করাতে বিআরটিএ অফিসের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো, একই ফাইল নিয়ে বারবার ঘোরা আর দালালের পেছনে ছোটাটাই ছিল স্বাভাবিক চিত্র। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর নিজস্ব সেবা পোর্টাল বিএসপি (bsp.brta.gov.bd) চালুর পর সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। নিবন্ধন থেকে শুরু করে ফি জমা, পরীক্ষার ফল দেখা, এমনকি স্মার্ট কার্ডের সবশেষ অবস্থা জানা পর্যন্ত—প্রক্রিয়ার একটা বড় অংশ এখন ঘরে বসেই সারা যায়। তবে "অনলাইন" শব্দটা শুনে ভাবার কারণ নেই যে পুরো কাজটাই স্ক্রিনে বসে শেষ হয়ে যাবে। লিখিত-মৌখিক-ফিল্ড পরীক্ষা এবং বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার জন্য অন্তত একবার বিআরটিএ কার্যালয়ে সশরীরে যেতেই হয়। নিচে ধাপে ধাপে দেখানো হলো কীভাবে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা যায়।

২। যোগ্যতা ও প্রাথমিক প্রস্তুতিঃ

ক. বয়সসীমাঃ অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারীর বয়স ন্যূনতম ১৮ বছর হতে হবে। পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে এই সীমা ২০ বছর।

খ. শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ আবেদনকারীকে অন্তত অষ্টম শ্রেণি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

গ. শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাঃ আবেদনকারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে, যা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের দেওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট দিয়ে প্রমাণ করতে হয়।

ঘ. প্রয়োজনীয় কাগজপত্রঃ জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর স্ক্যান কপি, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের মেডিকেল সার্টিফিকেট, সাম্প্রতিক তোলা পাসপোর্ট সাইজ ছবি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ এবং বর্তমান ঠিকানা NID-র ঠিকানা থেকে ভিন্ন হলে গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানির যেকোনো একটি বিলের কপি লাগবে। প্রতিটি নথির স্ক্যান কপি নির্ধারিত আকারের (সাধারণত ১৫০-৬০০ কিলোবাইটের মধ্যে) বেশি না রাখাই ভালো, নইলে আপলোডের সময় সমস্যা হতে পারে।

৩। লার্নার লাইসেন্সের জন্য অনলাইন আবেদনঃ

ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো লার্নার বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্স। এই ধাপটি সম্পূর্ণ অনলাইনে সম্পন্ন করা যায়।

ক. নিবন্ধনঃ bsp.brta.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে NID নম্বর, জন্ম তারিখ এবং NID-তে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। মোবাইলে পাঠানো ওটিপি (OTP) যাচাই করলেই অ্যাকাউন্ট সক্রিয় হয়ে যায়।

খ. প্রোফাইল হালনাগাদঃ লগইন করার পরপরই প্রোফাইল সম্পূর্ণ করে নেওয়া জরুরি। ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা ও যোগাযোগের নম্বর ঠিকভাবে না দিলে পরবর্তী ধাপে আবেদনই আটকে যেতে পারে।

গ. মেডিকেল সার্টিফিকেট সংগ্রহঃ পোর্টাল থেকে নির্দিষ্ট ফরম্যাটের মেডিকেল সার্টিফিকেট ফরম ডাউনলোড ও প্রিন্ট করে যেকোনো রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের কাছ থেকে পূরণ ও স্বাক্ষর করিয়ে নিতে হয়। এই কাগজের স্ক্যান কপিই পরের ধাপে আপলোড করতে হবে।

ঘ. তথ্য পূরণঃ ড্যাশবোর্ড থেকে "ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন" অপশনে ক্লিক করে পাঁচটি ধাপে তথ্য দিতে হয়—জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, লাইসেন্সের ধরন ও ক্যাটাগরি (মোটরসাইকেল, হালকা, মাঝারি বা ভারি যান), ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা-যোগাযোগ এবং সবশেষে সংযুক্তি ও কার্ড বিতরণের ঠিকানা।

ঙ. ডকুমেন্ট আপলোডঃ প্রতিটি কাগজ নির্ধারিত আকারে স্ক্যান করে আপলোড করতে হবে। এই ধাপে কোনো কাগজ অস্পষ্ট বা ভুল হলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই আগে থেকেই সব নথি প্রস্তুত রাখা ভালো।

চ. ফি জমাঃ তথ্য ও কাগজপত্র ঠিকঠাক দেওয়ার পর মোট ফি দেখানো হবে, যা বিকাশ, নগদ বা নির্ধারিত ব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইনেই পরিশোধ করা যায়।

ছ. লার্নার লাইসেন্স ডাউনলোডঃ ফি জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লার্নার লাইসেন্স ইস্যু হয়ে যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে পোর্টাল থেকে প্রিন্ট করে নেওয়া যায়। পরীক্ষার দিন এই কাগজের মূল কপি সঙ্গে রাখা আবশ্যক।

৪। প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষাঃ

ক. প্রশিক্ষণকালঃ লার্নার লাইসেন্স হাতে পাওয়ার পর সাধারণত দুই থেকে তিন মাস প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এটা শুধু নিয়মরক্ষার বিষয় নয়—রাস্তায় নামার আগে গাড়ি নিয়ন্ত্রণে সাবলীল হয়ে ওঠাটাই এই সময়ের আসল উদ্দেশ্য।

খ. পরীক্ষার দিনঃ নির্ধারিত তারিখ ও কেন্দ্রে লিখিত, মৌখিক (ভাইভা) ও ফিল্ড টেস্টে অংশ নিতে হয়। সঙ্গে মূল লার্নার লাইসেন্স, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং লেখার জন্য কলম আনতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক কেন্দ্রে পরীক্ষা ও বায়োমেট্রিক তথ্য (আঙুলের ছাপ, ছবি) একই দিনে নেওয়া হচ্ছে, ফলে বিআরটিএ কার্যালয়ে দ্বিতীয়বার যাওয়ার প্রয়োজন আগের তুলনায় কমেছে।

গ. ফলাফল যাচাইঃ পরীক্ষার এক-দুই দিনের মধ্যে পোর্টালে লগইন করে ড্যাশবোর্ডে ফলাফল দেখা যায়; পাশাপাশি মোবাইলে এসএমএসেও জানানো হয়। উত্তীর্ণ হলে পরের ধাপে যাওয়ার সুযোগ খোলে, অন্যথায় পুনরায় পরীক্ষায় বসতে হয়।

৫। স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনঃ

ক. অতিরিক্ত কাগজপত্রঃ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রমাণসহ লার্নার লাইসেন্স আবার আপলোড করতে হয়। পেশাদার লাইসেন্সপ্রার্থীদের অতিরিক্তভাবে ডোপ টেস্ট রিপোর্টও যুক্ত করতে হয়।

খ. ফি জমাঃ স্মার্ট কার্ডের ফি লার্নার লাইসেন্সের তুলনায় বেশি হওয়ায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ব্যাংকের মাধ্যমেও পরিশোধের সুযোগ রয়েছে।

গ. অস্থায়ী অনুমতিপত্রঃ আবেদন গ্রহণযোগ্য হলে ড্যাশবোর্ডে একটি অটো-জেনারেটেড অস্থায়ী অনুমতিপত্র (Temporary Authorization) পাওয়া যায়, যা প্রিন্ট করে মূল স্মার্ট কার্ড হাতে না আসা পর্যন্ত বৈধ লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

ঘ. কার্ড প্রাপ্তিঃ স্মার্ট কার্ড প্রস্তুত হয়ে গেলে আবেদনের সময় দেওয়া ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠানো হয়। এই ডাক মাশুল স্মার্ট কার্ডের ফি'র সঙ্গে বাড়তি হিসেবে যোগ করতে হয়।

৬। খরচের একটা ধারণাঃ

ড্রাইভিং লাইসেন্স করাতে মূলত দুই ধাপে সরকারি ফি দিতে হয়—প্রথমে লার্নার লাইসেন্সের জন্য, পরে পরীক্ষায় পাশ করলে স্মার্ট কার্ডের জন্য। নিচের তালিকায় বর্তমান সময়ের আনুমানিক ফি দেওয়া হলোঃ

সেবার ধরন

মেয়াদ

আনুমানিক ফি

লার্নার লাইসেন্স (একটি ক্যাটাগরি, যেমন শুধু মোটরসাইকেল)

৬ মাস

৫১৮ টাকা

লার্নার লাইসেন্স (দুটি ক্যাটাগরি, যেমন মোটরসাইকেল ও হালকা যান)

৬ মাস

৭৪৮ টাকা

স্মার্ট কার্ড — অপেশাদার লাইসেন্স

১০ বছর

প্রায় ৪,৪৯৭ টাকা

স্মার্ট কার্ড — পেশাদার লাইসেন্স

৫ বছর

২,৭৭২ টাকা

ডাকযোগে কার্ড বিতরণ চার্জ (স্মার্ট কার্ডের ফি'র সঙ্গে অতিরিক্ত)

—

৬০ টাকা

দ্রষ্টব্যঃ বিআরটিএ সময়ে সময়ে ফি পুনর্নির্ধারণ করে, এবং যানবাহনের ক্যাটাগরি (হালকা, মাঝারি, ভারি) অনুযায়ী অঙ্কেও কিছুটা তারতম্য হয়। তাই আবেদনের আগে bsp.brta.gov.bd পোর্টালের ফি ক্যালকুলেটর থেকে সঠিক ও হালনাগাদ অঙ্কটি একবার যাচাই করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

৭। লাইসেন্সের অবস্থা বা বৈধতা যাচাইঃ

লাইসেন্স ইস্যু হয়েছে কি না বা কোনো লাইসেন্স আসল কি না, তা দুইভাবে যাচাই করা যায়। প্রথমত, মোবাইলের মেসেজ অপশনে বড় হাতের অক্ষরে DL লিখে স্পেস দিয়ে লাইসেন্স নম্বর লিখে নির্ধারিত শর্টকোডে এসএমএস পাঠানো যায়। দ্বিতীয়ত, বিএসপি পোর্টালে লগইন করে ড্যাশবোর্ড থেকেও আবেদনের সবশেষ অবস্থা দেখা যায়।

৮। কিছু বাস্তব পরামর্শঃ

ক. দালাল এড়িয়ে চলুনঃ পুরো প্রক্রিয়া এখন এতটাই সহজ করে দেওয়া হয়েছে যে চাইলে নিজে নিজেই পুরোটা সম্পন্ন করা সম্ভব। দালালের মাধ্যমে করাতে গেলে বাড়তি খরচের পাশাপাশি ভুল বা জাল কাগজপত্রের ঝুঁকিও থেকে যায়।

খ. সব তথ্য নির্ভুলভাবে দিনঃ কোনো তথ্য ভুয়া বা ভুল প্রমাণিত হলে লার্নার ও স্মার্ট কার্ড—দুই আবেদনই বাতিল হয়ে যেতে পারে।

গ. প্রশিক্ষণকে হালকাভাবে নেবেন নাঃ লাইসেন্স আইনি বৈধতা দেয়, কিন্তু দক্ষতা এনে দেয় না। দক্ষতা তৈরি হয় বাস্তব অনুশীলনে, আর সেই দক্ষতার উপরই নির্ভর করে নিজের ও রাস্তার অন্যদের নিরাপত্তা।

ঘ. সময় হাতে রাখুনঃ আবেদন থেকে পরীক্ষা, পরীক্ষা থেকে স্মার্ট কার্ড হাতে পাওয়া—পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত কয়েক মাস সময় লাগে, কেন্দ্রভেদে কখনো কখনো এর বেশিও লাগতে পারে। তাই শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা না করে হাতে সময় নিয়ে আবেদন করাই ভালো।

 

            ডিজিটাল সেবা পোর্টাল চালুর পর বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স করার প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক সহজ ও স্বচ্ছ হয়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এটি এখনো পুরোপুরি ঝামেলামুক্ত নয়—ধৈর্য ধরে প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করা এবং অন্তত একবার সশরীরে বিআরটিএ কার্যালয়ে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া, দুটোই এখনো প্রয়োজন। সরকারি ডিজিটাল সেবাগুলো নিয়মিত হালনাগাদ হয় বলে আবেদনের আগে সবশেষ নিয়ম ও ফি একবার বিআরটিএ-র নিজস্ব ওয়েবসাইট বা পোর্টাল থেকে যাচাই করে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

 

মোঃ মনিরুল হক

সহকারী শিক্ষক

আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়

০১৭২২ ২৭৩২৭২

[email protected]2

মন্তব্য করুন