সিনিয়র শিক্ষক
১৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:২২ অপরাহ্ণ
সাপের যম বেজি: প্রকৃতির কাছে মানুষের এক অমোঘ শিক্ষা
সাপের যম বেজি: প্রকৃতির কাছে মানুষের এক অমোঘ শিক্ষা
*লোককথার যম, বিবর্তনের যোদ্ধা—আর মানুষের ভুলের এক জীবন্ত স্মারক*
ফণা উত্থিত। চোখে আগুনের ঝিলিক। বিষদাঁতের সামান্য এক স্পর্শেই নেমে আসতে পারে মৃত্যু। ঠিক তখনই, সেই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে এক ক্ষুদ্র প্রাণী—লোমশ, চঞ্চল, নির্ভীক। বেজি।
গ্রামবাংলার প্রবীণেরা তাই একে ডাকেন সাপের 'যম'। সাপ ছোবল হানে—বেজি সরে যায়, কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে, কখনো এক লাফে পেছনে। মুহূর্তের ব্যবধানে আবার ফিরে আসে, তীক্ষ্ণ আক্রমণ চালায় সাপের মাথা লক্ষ্য করে। দর্শকের চোখে এ যেন মৃত্যুর সঙ্গে এক নাচ—ক্ষিপ্রতা আর বিষের চিরন্তন দ্বৈরথ।
কিন্তু প্রকৃতির আসল গল্প লোককথার চেয়েও বিস্ময়কর। বেজি সাপের যম বটে, তবে সে বিষে অমর নয়। তার শরীরে লুকিয়ে আছে কোটি বছরের বিবর্তনের এক নিখুঁত হাতিয়ার—আর তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি লুকিয়ে আছে জাপানের এক দ্বীপে, যেখানে মানুষ একদিন ভেবেছিল, সাপের শত্রুকে সাপের দেশে ছেড়ে দিলেই সাপ কমবে। প্রকৃতি সেদিন শিখিয়েছিল—বাস্তুতন্ত্র কোনো সরল অঙ্ক নয়।
## প্রাণিতাত্ত্বিক পরিচয়
বাংলাদেশে ছোট বেজি বা নকুল নামে পরিচিত এই প্রাণীটির আধুনিক বৈজ্ঞানিক নাম Urva auropunctata; পুরোনো সাহিত্যে ও জাপানের সরকারি নথিতে এখনও ব্যবহৃত হয় Herpestes auropunctatus নামটি।
জগৎ: Animalia — প্রাণিজগৎ
পর্ব: Chordata — কর্ডাটা
শ্রেণি: Mammalia — স্তন্যপায়ী
বর্গ: Carnivora — মাংসাশী
পরিবার: Herpestidae — হারপেস্টিডি
গণ: Urva
প্রজাতি: Urva auropunctata
প্রচলিত নাম: Small Indian mongoose
বাংলা নাম: ছোট বেজি, নকুল
বাংলাদেশের জাতীয় রেড লিস্টে (২০১৫) এই প্রজাতিকে মূল্যায়ন করা হয়েছে Least Concern (LC) হিসেবে—দেশের অন্যতম বিস্তৃত ও সাধারণ মাংসাশী স্তন্যপায়ী।
## সাপের যম হওয়ার রহস্য
বেজি সাপকে ঘায়েল করে বটে, কিন্তু তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিষ-প্রতিরোধী কোনো 'অমৃত' নয়। তার অস্ত্র তিনটি—
- গতি, যা তাকে ছোবলের মুহূর্ত-পূর্ব সংকেত পড়তে শেখায়
- দিক পরিবর্তনের অসাধারণ ক্ষিপ্রতা, যা তাকে শেষ মুহূর্তে সরে যেতে দেয়
- সুযোগ বুঝে আক্রমণ করার প্রবৃত্তি, যা তাকে ধৈর্য ধরে সঠিক ফাঁক খুঁজতে শেখায়
তবে এখানেই শেষ নয়। বিবর্তন তার শরীরে গড়ে তুলেছে আরও গভীর, আরও নীরব এক প্রতিরক্ষা—কোষের ভেতরে, রক্তের আড়ালে।
## বিষের রসায়ন: কেন বেজি সহজে হার মানে না
সাপের বিষ কোনো একক পদার্থ নয়—প্রজাতিভেদে তাতে মেশানো থাকে নানা প্রোটিন ও পেপটাইড টক্সিন। গোখরার মতো এলাপিড সাপের বিষে বিশেষভাবে ভয়ংকর একটি উপাদান হলো α-neurotoxin, যা স্নায়ু-পেশির সংযোগস্থলে থাকা nicotinic acetylcholine receptor (nAChR)-কে চেপে ধরে সংকেত-প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। গুরুতর ক্ষেত্রে পেশি অবশ হয়ে বন্ধ হয়ে যায় শ্বাসপ্রশ্বাসও।
বেজির শরীরে এই একই receptor-এর গঠনে ঘটেছে সূক্ষ্ম কিন্তু সিদ্ধান্তকারী পরিবর্তন। ইসরায়েলি গবেষক Barchan ও তাঁর সহকর্মীদের ১৯৯২ সালের গবেষণায় দেখা যায়, বেজির nAChR α-subunit-এর বিষ-সংবেদনশীল অঞ্চলে ১৮৭, ১৮৯ ও ১৯৪ নম্বর অবস্থানের অ্যামিনো অ্যাসিড বদলে গেছে—এবং সেই receptor আর ল্যাবরেটরিতে α-বাংগারোটক্সিনকে বাঁধতেই পারে না। পরবর্তী গবেষণা (Asher et al., ১৯৯৮) দেখায়, এই পরিবর্তিত receptor টক্সিনের প্রতি প্রায় দুইশো গুণ কম সংবেদনশীল, অথচ স্বাভাবিক স্নায়ু-সংকেতবাহী acetylcholine-এর প্রতি তার আকর্ষণ বরং বেড়ে যায়।
সহজ কথায়—বিষাক্ত অণুটি যেখানে receptor-এ বসার কথা, সেখানে যেন একটি আণবিক প্রতিবন্ধক তৈরি হয়ে গেছে। ফলে α-neurotoxin আর আগের মতো শক্তভাবে 'ডক' করতে পারে না। ২০২২ সালে Royal Society-র Biology Letters-এ প্রকাশিত এক গবেষণা আরও দেখায়, বেজির এই প্রতিরোধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—হারপেস্টিড পরিবারের মিরক্যাটসহ একাধিক প্রজাতিতে স্বতন্ত্রভাবে (convergent evolution) ঠিক একই ধরনের রূপান্তর ঘটেছে, যা প্রমাণ করে সাপ আর সাপ-শিকারির মধ্যে এই রাসায়নিক লড়াই কতটা প্রাচীন ও পুনরাবৃত্ত।
তবু এই প্রতিরোধ সম্পূর্ণ বিষ-প্রতিরোধ নয়। সব সাপের বিষ এক রকম নয়, সব টক্সিনের বিরুদ্ধেও বেজি সমান সুরক্ষিত নয়—একটি বিষধর সাপের কামড় আজও তার জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই বেজির প্রকৃত শক্তি আসলে তিনটি উপাদানের যোগফল: বিবর্তনগত রাসায়নিক সহনশীলতা, অসাধারণ ক্ষিপ্রতা, আর শিকারি বুদ্ধি।
## প্রজনন: ছোট দেহ, দ্রুত বংশবিস্তার
ছোট ভারতীয় বেজির গর্ভধারণকাল প্রায় ৪৯ দিন। সাধারণত একবারে দুটি শাবক জন্মালেও, রেকর্ডে পাঁচটি পর্যন্ত শাবকের নথি মিলেছে। বাংলাদেশের জাতীয় রেড লিস্ট অনুযায়ী এখানে প্রজনন ঋতু মূলত এপ্রিল থেকে জুলাই। জন্মের পর শাবক সম্পূর্ণ মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে—নিরাপদ গর্ত, ঝোপঝাড়, কাঠ বা ইটের স্তূপ, কিংবা মানববসতির আশপাশের আড়ালেই তাদের প্রথম আশ্রয়।
এই দ্রুত, সফল প্রজননই এক নতুন পরিবেশে বেজির সংখ্যা বিস্ফোরকভাবে বেড়ে ওঠার একটি বড় কারণ। জাপানের আমামি দ্বীপে মানুষ এই ক্ষমতার সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটিই প্রত্যক্ষ করেছিল।
## মানুষের হাতে সাপ-দমনকারী, প্রকৃতির চোখে আগন্তুক
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মানুষ বেজির মধ্যে দেখেছিল এক সহজ সমাধান। ১৯১০ সালে জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে বিষধর হাবু সাপ ও ইঁদুর দমনের লক্ষ্যে দক্ষিণ এশিয়া থেকে বেজি আনা হয়—ঐতিহাসিক নথি বলছে, সংগ্রহ করা হয়েছিল বর্তমান বাংলাদেশের গঙ্গা বদ্বীপ অঞ্চল থেকে।
মানুষের হিসাব ছিল সরল: সাপের শত্রু বেজি, বেজি ছাড়লে সাপ কমবে। কিন্তু প্রকৃতি সেই সমীকরণ মানল না। কারণ ওকিনাওয়ার স্থানীয় কর্মকর্তারা পরে বুঝেছিলেন—বেজি দিনে সক্রিয়, আর হাবু সাপ রাতে; দুজনের দেখাই হতো কালেভদ্রে। বেজি কোনো 'সাপ-খেকো যন্ত্র' নয়—সে একটি সুযোগসন্ধানী মাংসাশী, যে শিকার সহজে মেলে, শক্তি কম খরচ হয়, তার দিকেই ঝোঁকে। দ্বীপের অনেক স্থানীয় প্রাণী সাপের মতো বিপজ্জনক ছিল না—ফলে তারাই হয়ে উঠল সহজ শিকার।
## আমামি দ্বীপ: ত্রিশ থেকে প্রায় দশ হাজার
১৯৭৯ সালে ওকিনাওয়া থেকে মাত্র প্রায় ৩০টি বেজি ছাড়া হয়েছিল আমামি-ওশিমা দ্বীপে, একই উদ্দেশ্যে—হাবু সাপ ও ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ। কয়েক দশকের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শতাব্দীর শেষ নাগাদ বেজির সংখ্যা পৌঁছে যায় প্রায় ১০,০০০-এ।
তখন শিকার হতে শুরু করে দ্বীপের নিজস্ব, অনন্য প্রাণীরা—বিপন্ন আমামি খরগোশ (যা পৃথিবীতে কেবল এই দ্বীপ ও আরেকটিতেই টিকে আছে এবং IUCN রেড লিস্টে সংকটাপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত), আমামি স্পাইনি র্যাট, বিভিন্ন উভচর-সরীসৃপ, ভূমিতে বাসা করা পাখি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র স্থানীয় প্রাণী। বেজির পেটে ও মলে মিলেছিল এসব প্রাণীর অবশেষ, আর মন্ত্রণালয়ের নথিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বেজির বিস্তার আর স্থানীয় প্রজাতির সংখ্যা-হ্রাসের সরাসরি সম্পর্ক।
যে প্রাণীকে মানুষ একটি সমস্যার সমাধান হিসেবে এনেছিল, সেই প্রাণীই জন্ম দিল আরও গভীর এক সংকটের।
## ৩২,৬৪৭ বেজির শেষযাত্রা
১৯৯৩ সালে স্থানীয় প্রশাসন বেজি ধরার কাজ শুরু করে। ২০০০ সাল থেকে অভিযান জোরদার হয়, আর ২০০৫ সাল থেকে যুক্ত হয় বিশেষজ্ঞ দল, ফাঁদ, স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা এবং প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর। স্থানীয়ভাবে এই কর্মীদের ডাকা হতো 'আমামি মঙ্গুস বাস্টার্স' নামে। ২০১৮ সালে শেষ বেজিটি ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত মোট ৩২,৬৪৭টি বেজি অপসারণ করা হয়েছিল—প্রায় ২০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায়।
কিন্তু কোনো প্রাণীকে 'নির্মূল হয়েছে' বলে ঘোষণা দেওয়া সহজ নয়—একবারও দেখা না পাওয়ার অর্থ নিশ্চিহ্নতা নয়। তাই জাপান দুটি স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক মডেল ব্যবহার করে নির্মূলের সম্ভাবনা যাচাই করে: এলাকাভিত্তিক Harvest-based Model (HBM) এবং সংখ্যাভিত্তিক Rapid Eradication Assessment (REA)। ফলাফল যথাক্রমে ৯৯.৭% ও ৯৮.৯%। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে আমামি-ওশিমা দ্বীপ থেকে ছোট ভারতীয় বেজি সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে—বিশ্বে এই প্রথম, এত বড় ও জনবসতিপূর্ণ কোনো দ্বীপ থেকে একটি প্রতিষ্ঠিত আক্রমণাত্মক শিকারি প্রজাতিকে সফলভাবে সরানো গেল। স্থানীয় গভর্নর একে 'অলৌকিক' বলে অভিহিত করেছিলেন। এ যেন মানুষের নিজের হাতে লেখা এক দীর্ঘ, ব্যয়বহুল প্রায়শ্চিত্ত।
## বাংলাদেশে বেজি: এখনও সাধারণ, কিন্তু অবহেলার নয়
জাপানের গল্প শুনে বাংলাদেশের বেজিকে বিপজ্জনক মনে করা ভুল হবে—কারণ বাংলাদেশ এই প্রজাতির প্রাকৃতিক বিস্তারের মধ্যেই পড়ে। জাতীয় রেড লিস্টের ২০১৫ মূল্যায়নে একে Least Concern হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; এটি দেশের বিস্তৃত এলাকায় পাওয়া যায় এবং প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট—উভয় পরিবেশেই টিকে থাকতে সক্ষম। গ্রামের ঝোপঝাড়, কৃষিজমি, বসতবাড়ির আশপাশ, ইট-কাঠের স্তূপ কিংবা পুরোনো গর্ত—সবই হতে পারে তার আবাস। খাদ্যতালিকায় থাকে ইঁদুর, ছোট সরীসৃপ, সাপ, বিচ্ছু, কীটপতঙ্গ ও পাখির ডিম।
তবে বাংলাদেশের সব বেজি এক প্রজাতির নয়। জাতীয় রেড লিস্টে নথিভুক্ত তিনটি প্রজাতি—
- ছোট ভারতীয় বেজি (Herpestes auropunctatus) — LC
- বড়/ভারতীয় ধূসর বেজি (Herpestes edwardsii) — LC
- কাঁকড়া-খেকো বেজি (Herpestes urva) — NT (Near Threatened)
অতএব 'বেজি' শব্দে একটিমাত্র প্রাণী বোঝা ঠিক নয়। এখানে বেজি এখন তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকলেও বাসস্থান ধ্বংস, সড়ক দুর্ঘটনা, মানুষের হাতে নিধন এবং খাদ্যভিত্তির পরিবর্তন—এই প্রবণতাগুলো দীর্ঘমেয়াদে নজরে রাখা জরুরি।
## বেজি কি আমাদের বন্ধু?
এই প্রশ্নের উত্তরও সরল নয়। বেজি ইঁদুর, পোকামাকড়, সরীসৃপ ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণী খায় বলে কৃষি ও জনবসতির আশপাশে তার উপস্থিতি কিছু ক্ষেত্রে উপকারী মনে হতে পারে। কিন্তু তাকে 'উপকারী প্রাণী' ধরে নিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছেড়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ একটি প্রজাতির উপকারিতা তার নিজস্ব পরিচয়ের চেয়ে বরং তার পরিবেশগত অবস্থানের ওপরই বেশি নির্ভর করে। বাংলাদেশে স্থানীয় বেজি তার নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ; জাপানের দ্বীপে সেই একই প্রাণী হয়ে উঠেছিল আক্রমণাত্মক বহিরাগত (invasive alien species)। এখানেই পরিবেশবিজ্ঞানের অন্যতম গভীরতম শিক্ষা লুকিয়ে।
## আমাদের করণীয়
১. বেজিকে অন্য এলাকায় ছেড়ে দেওয়া নয়—কোনো প্রাণীকে 'ক্ষতিকর প্রাণী নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র' বানিয়ে নতুন পরিবেশে ছাড়া বিপজ্জনক; জাপানের অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে বিশ্বমানের সতর্কবার্তা।
২. স্থানীয় প্রজাতিকে স্থানীয় পরিবেশেই রক্ষা করা—বেজি আমাদের স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্যের অংশ; অকারণ হত্যা নয়, বরং তার স্বাভাবিক আবাস সংরক্ষণ করা উচিত।
৩. সাপ-বেজির লড়াই তৈরি করা এড়ানো—লোককথার রোমাঞ্চ মানুষকে প্রাণীদের মুখোমুখি দাঁড় করাতে প্ররোচিত করে, অথচ প্রকৃতিতে দুজনেরই আছে নিজস্ব পরিবেশগত ভূমিকা।
৪. সাপ দেখলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা—বিষধর সাপ অপসারণের কাজ প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতেই ছেড়ে দেওয়া বিচক্ষণতার পরিচয়।
৫. বেজির প্রকৃত আবাস সংরক্ষণ করা—ঝোপঝাড়, প্রাকৃতিক ঘাসভূমি, কৃষিজমির প্রান্ত, পুরোনো গাছের গোড়া—এসব ছোট ছোট আশ্রয়স্থলই জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি।
৬. স্থানীয় গবেষণা বাড়ানো—বাংলাদেশে বেজির বিস্তার, খাদ্যাভ্যাস, প্রজনন ও মানুষের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে আরও তথ্য প্রয়োজন।
৭. বহিরাগত প্রাণী ছাড়ার আগে ঝুঁকি যাচাই করা—একটি প্রাণী কী খায়, কত দ্রুত বংশবিস্তার করে, তার প্রাকৃতিক শত্রু আছে কি না—এসব না জেনে তাকে নতুন বাস্তুতন্ত্রে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
## প্রকৃতির কাছে বেজির অমোঘ শিক্ষা
বেজি আমাদের কাছে সাপের যম। কিন্তু প্রকৃতির কাছে সে কেবল একজন ক্ষিপ্র শিকারি নয়—সে বিবর্তনের এক বিস্ময়, যার শরীরের প্রতিটি অণুতে লেখা আছে বিষের বিরুদ্ধে লক্ষ বছরের নিঃশব্দ প্রতিযোগিতার ইতিহাস। সে খাদ্যজালের একটি সুতো—নিজে যেমন অন্যকে খায়, তেমনি অন্যেরও খাদ্য হয়। আর জাপানে সে হয়ে উঠেছে মানুষের পরিবেশগত ভুলের জীবন্ত স্মারক।
মানুষ ভেবেছিল, সাপ কমাতে বেজি আনলেই হবে। প্রকৃতি বলেছিল, না। কারণ প্রকৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাণীর সমষ্টি নয়—একটি অরণ্য, একটি দ্বীপ, একটি নদী সবই অসংখ্য সম্পর্কের জটিল বুনন। সেখানে একটি নতুন শিকারি ঢুকলে কেবল একটি প্রজাতি বাড়ে না; বদলে যায় শিকার-শিকারির সমীকরণ, খাদ্যের প্রতিযোগিতা, প্রজাতির বিস্তার—এমনকি গোটা বাস্তুতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
আমামি দ্বীপে ত্রিশটি বেজি থেকে প্রায় দশ হাজারে পৌঁছানোর গল্প তাই কেবল বেজির গল্প নয়—এটি মানুষের অতি-আত্মবিশ্বাসের গল্প। আর ৩২,৬৪৭টি বেজি ধরে শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে নির্মূল ঘোষণা করার গল্পটি মানুষের ভুল স্বীকার করে প্রকৃতিকে পুনরুদ্ধারের এক দীর্ঘ প্রায়শ্চিত্তের আখ্যান।
বেজি তাই দাঁড়িয়ে থাকে দুই মুখ নিয়ে—এক মুখে সাপের যম, অন্য মুখে মানুষের ভুলের নীরব শিক্ষক। তার শরীরের ক্ষুদ্র nAChR অণু আমাদের শেখায়, বিবর্তন কত সূক্ষ্মভাবে জীবনকে পুনর্লিখন করতে পারে। তার দ্রুত বংশবিস্তার শেখায়, একটি ছোট প্রাণীও একটি পরিবেশে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। আর জাপানের ইতিহাস শেখায়—প্রকৃতিকে জয় করার আগে প্রকৃতিকে বুঝতে হয়।
কোনো প্রাণীকে কেবল 'উপকারী' বা 'ক্ষতিকর' বলে বিচার করলে আমরা প্রকৃতির অর্ধেক সত্যই দেখি। প্রকৃতির কাছে কোনো প্রাণী একা নয়—সাপ একা নয়, বেজি একা নয়, মানুষও নয়। সবাই মিলে এক বিশাল জীবনসংগীতের অংশ। সেই সংগীতে একটি সুরকে জোর করে অন্য সুরের জায়গায় বসিয়ে দিলে, সুর হয়তো আর সুর থাকে না।
তাই বেজির সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোধহয় এই—প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে প্রকৃতির নিয়মকে বোঝাই মানুষের বড় জ্ঞান।
তথ্যসূত্র:
১. Ministry of the Environment, Government of Japan — "Declaration of the Eradication of the Small Indian Mongoose in Amami Oshima Island," সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৪
২. The Japan Times — "After Amami-Oshima success, Okinawa's mongoose eradication in focus," সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৪
৩. AFP / Gulf News — "Japanese island eradicates rabbit-killing mongoose," সেপ্টেম্বর ২০২৪
৪. Indianapolis Zoo — "Conservation Lessons from Japan," নভেম্বর ২০২৪
৫. Barchan, D. et al. — "How the mongoose can fight the snake," PNAS, 89(16), ১৯৯২
৬. Asher, O. et al. — "Functional characterization of mongoose nicotinic acetylcholine receptor α-subunit," FEBS Letters, ১৯৯৮
৭. "Widespread convergent evolution of alpha-neurotoxin resistance in African mammals," Biology Letters, Royal Society, ২০২২
৮. IUCN Red List of Threatened Species — Urva auropunctata
৯. বাংলাদেশ জাতীয় রেড লিস্ট, IUCN বাংলাদেশ, ২০১৫ সংস্করণ
মুফিদুল আলম
কক্সবাজার
১৪ আগস্ট, ২০২৬
১
১ মন্তব্য