Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ আগস্ট, ২০২৬ ১০:০৮ অপরাহ্ণ

সাদা প্লাস্টিকের জুতা: শিশুদের জন্য নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি, প্রয়োজন নিরাপদ বিকল্প

বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইউনিফর্মের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেসের সাথে মিলিয়ে সাদা রঙের জুতা পরতে হয়। বাজারে সহজলভ্য এবং সস্তা হওয়ায় এই জুতাগুলোর প্রায় সবই তৈরি হয় প্লাস্টিক দিয়ে—বিশেষত পিভিসি (PVC) বা ইভিএ (EVA) জাতীয় উপাদানে। দাম কম, স্থায়িত্ব বেশি—এই দুই কারণে অভিভাবকরাও সাচ্ছন্দ্যে এই জুতা কিনে দেন। কিন্তু এই সস্তা ও টেকসই জুতার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে একটি নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি।

প্লাস্টিক জুতায় কী রয়েছে

পিভিসি প্লাস্টিককে নমনীয়, রঙিন ও দীর্ঘস্থায়ী করতে উৎপাদনকারীরা এতে ব্যবহার করেন থ্যালেট (phthalates), বিপিএ (BPA) এবং উদ্বায়ী জৈব যৌগ বা ভিওসি-র (VOC) মতো রাসায়নিক উপাদান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও ভোক্তা সংরক্ষণ সংস্থার পরীক্ষায় শিশুদের প্লাস্টিক জুতায় নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি থ্যালেট পাওয়া গেছে। থ্যালেট মূলত হরমোন-বিঘ্নকারী রাসায়নিক, যা শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও প্রজনন-বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী ও নিয়মিত ত্বকের সংস্পর্শে থাকলে এসব রাসায়নিক ত্বকে জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে, আর কিছু গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদী সংস্পর্শকে ত্বকের ক্যান্সারসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া প্লাস্টিক জুতা থেকে নির্গত ভিওসি শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

শিশুদের ত্বক প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় পাতলা ও বেশি ভেদ্য, তাই দীর্ঘ সময় স্কুলে পা ঘেমে থাকলে এসব রাসায়নিক শোষণের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। যেহেতু প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা করে শিশুরা এই জুতা পরে থাকে, তাই এই ঝুঁকিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

কেন এখনই ভাবা দরকার

আমাদের দেশে শিশুদের ব্যবহৃত পণ্যের রাসায়নিক মান পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। ফলে বাজারে থাকা সস্তা প্লাস্টিক জুতার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অভিভাবক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাম ও স্থায়িত্ব দেখেই জুতা নির্বাচন করেন, স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকটি অনেক সময় বিবেচনায়ই আসে না।

বিকল্প কী হতে পারে

সৌভাগ্যক্রমে প্লাস্টিকের বদলে নিরাপদ ও আরামদায়ক কিছু বিকল্প রয়েছে:

  • কাপড়ের (ক্যানভাস) জুতা: সুতি বা ক্যানভাস কাপড়ে তৈরি জুতা বাতাস চলাচল করতে দেয়, পা কম ঘামে এবং রাসায়নিক ঝুঁকিও তুলনামূলক কম।
  • চামড়ার জুতা: প্রাকৃতিক চামড়া টেকসই এবং প্লাস্টিকের তুলনায় স্বাস্থ্যসম্মত, যদিও দাম কিছুটা বেশি।
  • পাটের তৈরি জুতা: পরিবেশবান্ধব ও দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি এটি আরামদায়কও।
  • প্রাকৃতিক রাবার সোলযুক্ত জুতা: সিন্থেটিক পিভিসি সোলের বদলে প্রাকৃতিক রাবার সোল তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প।

দাম কিছুটা বেশি হলেও, একবার কেনা এই জুতা সঠিক যত্নে দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য, ফলে দীর্ঘমেয়াদে খরচও তেমন বাড়ে না।

শেষ কথা

সন্তানের আজকের সুস্থতার সাথে আপোস করে সামান্য কিছু টাকা সাশ্রয় করা কোনো বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নয়। অভিভাবক হিসেবে সচেতন হয়ে সন্তানের জন্য কাপড় বা চামড়ার জুতা বেছে নেওয়া, স্কুল কর্তৃপক্ষকে ইউনিফর্ম নীতিতে নিরাপদ বিকল্প অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ জানানো এবং সরকারের কাছে শিশুদের পণ্যে রাসায়নিক মান নিয়ন্ত্রণের দাবি তোলা—এই তিনটি পদক্ষেপ একসাথে নিলেই আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারি।

মন্তব্য করুন

ব্লগ