Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৮ আগস্ট, ২০২৬ ০৫:১৩ পূর্বাহ্ণ

মনুষ্যত্বের জয়গান - মোঃ মুজিবুর রহমান

মনুষ্যত্বের জয়গান

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানুষ—শব্দটি ছোট হলেও এর অর্থ অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক। পৃথিবীতে অসংখ্য প্রাণী রয়েছে, কিন্তু মানুষকে মহান আল্লাহ বিশেষ মর্যাদা, বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিচারবোধ ও নৈতিক চেতনা দান করেছেন। তাই মানুষের পরিচয় শুধু তার আকৃতি বা নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তার চরিত্র, বিবেক, আচরণ, দয়া, ন্যায়পরায়ণতা, সততা ও মানবিকতার মাধ্যমে। মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়া সহজ, কিন্তু প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠা একটি সাধনার বিষয়। যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলে, অন্যের অধিকার রক্ষা করে, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কল্যাণকর কাজ করে—সে-ই প্রকৃত অর্থে মনুষ্যত্বের পরিচয় বহন করে।

মহান আল্লাহ মানুষকে সম্মানিত করে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “আর অবশ্যই আমি আদমসন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।” —সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০। এই মর্যাদা মানুষের জন্য যেমন সম্মানের, তেমনি দায়িত্বেরও। মানুষকে জ্ঞান-বুদ্ধি দেওয়া হয়েছে, যাতে সে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে; বিবেক দেওয়া হয়েছে, যাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেকে সংযত রাখতে পারে; আর ঈমানের পথ দেখানো হয়েছে, যাতে সে নিজের জীবনকে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালিত করতে পারে। সুতরাং মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন সে তার বিবেক ও নৈতিকতার মর্যাদা রক্ষা করে।

মানুষের ভেতরে যেমন ভালো প্রবৃত্তি রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু দুর্বল প্রবণতা। লোভ, হিংসা, ক্রোধ, অহংকার, বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা ও প্রতিহিংসা যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তাহলে মানুষের বিবেক দুর্বল হয়ে যায়। তখন মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের অধিকার নষ্ট করতে পারে, মিথ্যা বলতে পারে, প্রতারণা করতে পারে, দুর্বলকে অবহেলা করতে পারে এবং অন্যায়ের পথ বেছে নিতে পারে। এই অবস্থায় মানুষের বাহ্যিক আকৃতি মানুষের মতো থাকলেও তার আচরণে পাশবিকতার প্রকাশ ঘটে। তাই মানুষের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম বাইরের কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে নয়; নিজের ভেতরের লোভ, ক্রোধ, অহংকার ও অন্যায় প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে।

পাশবিকতা শুধু হিংস্র আচরণের নাম নয়। অন্যের অধিকার হরণ করা, দুর্বলকে অত্যাচার করা, অসহায়কে অবজ্ঞা করা, প্রতারণা করা, মিথ্যা বলা, মানুষের সম্মান নষ্ট করা, ক্ষমতার অপব্যবহার করা, অন্যের কষ্টে আনন্দ পাওয়া এবং অন্যায় জেনেও নীরব থাকা—এসবই পাশবিকতার বিভিন্ন রূপ। অন্যদিকে মনুষ্যত্ব হলো দয়া, মমতা, ভালোবাসা, সততা, ন্যায়, ক্ষমা, বিনয়, সহমর্মিতা ও পরোপকারের সমন্বিত প্রকাশ। তাই আমাদের জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত—নিজের ভেতরের পাশবিক প্রবণতাকে সংযত করে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করা।

ইসলাম মানুষের চরিত্র গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম শুধু নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; বরং মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ, ন্যায়পরায়ণতা, আমানত রক্ষা, সত্যবাদিতা, প্রতিবেশীর অধিকার সংরক্ষণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, দরিদ্র-অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার শিক্ষাও দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সৎকর্ম ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।” —সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০। এই আয়াত মানবিক ও নৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি নির্দেশ করে।

মনুষ্যত্বের প্রথম শর্ত হলো ন্যায়পরায়ণতা। নিজের স্বার্থের সঙ্গে অন্যের অধিকার জড়িয়ে গেলে অনেক মানুষ ন্যায়ের কথা ভুলে যায়। কিন্তু প্রকৃত ন্যায়পরায়ণতা হলো—নিজের বিরুদ্ধে গেলেও সত্য ও ন্যায়কে গ্রহণ করা। কেউ আমাদের আপনজন হলেও তার অন্যায়কে সমর্থন করা যাবে না; আবার কেউ আমাদের বিরোধী হলেও তার ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করা যাবে না। ন্যায়ের এই ভারসাম্যই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি।

ক্ষমতা ও শক্তির প্রকৃত সৌন্দর্যও ন্যায়পরায়ণ ব্যবহারে। শক্তিশালী হওয়া অপরাধ নয়; বরং শক্তি আল্লাহর একটি পরীক্ষা। একজন মানুষ যদি তার শক্তি দিয়ে দুর্বলকে রক্ষা করে, অসহায়কে সাহায্য করে এবং অন্যায় প্রতিহত করে, তাহলে তার শক্তি মানবতার সম্পদ। কিন্তু শক্তির অহংকারে যদি সে অন্যকে অপমান করে, ভয় দেখায় বা অধিকার হরণ করে, তাহলে সেই শক্তি ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃত শক্তিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, প্রতিশোধের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সংযম দেখাতে পারে এবং অন্যায়ের সামনে নীতিকে বিসর্জন দেয় না।

অহংকার মানুষের মনুষ্যত্বকে ক্ষয় করে। অহংকারী ব্যক্তি নিজের জ্ঞান, সম্পদ, সৌন্দর্য, ক্ষমতা বা পদ-মর্যাদাকে কেন্দ্র করে অন্যকে ছোট মনে করতে শুরু করে। অথচ মানুষের এসব অর্জন চিরস্থায়ী নয়। আজ যার সম্পদ আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে; আজ যার ক্ষমতা আছে, কাল সে ক্ষমতাহীন হতে পারে; আজ যে সম্মানের আসনে আছে, কাল সে সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়াতে পারে। তাই মানুষের উচিত নিজের অবস্থান নিয়ে অহংকার না করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং অন্য মানুষের প্রতি বিনয়ী আচরণ করা।

লোভও মনুষ্যত্বের বড় শত্রু। প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে অন্যায়ভাবে আরও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে ধীরে ধীরে বিবেকহীন করে দিতে পারে। লোভের কারণে মানুষ অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করতে পারে, প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে এবং ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা ভুলে যেতে পারে। অথচ পৃথিবীর কোনো সম্পদই মানুষের সঙ্গে চিরদিন থাকে না। মানুষের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত থাকে তার কর্ম ও চরিত্রের ফল। তাই হালাল উপার্জন, সন্তুষ্টি, দানশীলতা ও সংযমের জীবনই শান্তির জীবন।

মনুষ্যত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো সহমর্মিতা। অন্যের দুঃখকে অনুভব করার ক্ষমতা মানুষের হৃদয়কে কোমল রাখে। ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে খাবার তুলে দেওয়া, অসুস্থ মানুষের খোঁজ নেওয়া, বিপদগ্রস্তকে সাহস দেওয়া, হতাশ ব্যক্তিকে আশার কথা বলা, শোকাহত মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া—এসব মানবিক আচরণ সমাজকে সুন্দর করে। একজন মানুষের জন্য বড় কোনো কাজ করার সুযোগ সব সময় আসে না; কিন্তু প্রতিদিন ছোট ছোট মানবিক কাজ করার সুযোগ আমাদের সামনে থাকে।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা শুধু কথায় প্রকাশ করলে চলবে না; আচরণেও তার প্রমাণ দিতে হবে। মুখে মানবতার কথা বলে যদি কেউ দুর্বলকে অপমান করে, কর্মচারীর অধিকার নষ্ট করে, প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় অথবা পরিবারের মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, তবে তার মানবতার দাবি অসম্পূর্ণ। প্রকৃত মানবতা শুরু হয় নিজের ঘর থেকে। পরিবারের সদস্যদের প্রতি সম্মান, সন্তানদের প্রতি স্নেহ, মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মর্যাদা, ভাই-বোনের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রতিবেশীর প্রতি সৌজন্য—এসবের মধ্য দিয়েই মানবিকতার বাস্তব চর্চা শুরু হয়।

পরিবার হলো মানুষের প্রথম শিক্ষালয়। শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না; তারা বড়দের আচরণ দেখেও শেখে। তাই সন্তানকে সত্যবাদী হতে শেখাতে হলে অভিভাবকদের নিজেদের সত্যবাদী হতে হবে। সন্তানকে অন্যকে সম্মান করতে শেখাতে হলে তাকে সম্মানের পরিবেশ দিতে হবে। তাকে দয়া ও সহমর্মিতা শেখাতে হলে পরিবারের দৈনন্দিন আচরণে তার বাস্তব উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। শৈশবে হৃদয়ে যে মূল্যবোধের বীজ বপন করা হয়, ভবিষ্যতে তা চরিত্রের বৃক্ষে পরিণত হয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও মনুষ্যত্ব গঠনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করার পাশাপাশি বিবেকবান ও চরিত্রবান করে। শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এমন মানুষ তৈরি করা, যারা সত্যকে ভালোবাসবে, অন্যায়কে ঘৃণা করবে, মানুষের অধিকারকে সম্মান করবে এবং নিজের জ্ঞান ও দক্ষতাকে সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করবে। শিক্ষিত হয়েও যদি মানুষ দুর্নীতি, প্রতারণা, অন্যায় ও নিষ্ঠুরতার পথ বেছে নেয়, তবে তার শিক্ষা পূর্ণতা পায়নি।

শিক্ষকের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর হাতে শুধু বই তুলে দেন না; তিনি তার সামনে একটি সুন্দর জীবনের আদর্শও তুলে ধরেন। শিক্ষার্থীর চরিত্র, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা বিকাশে শিক্ষকের ভূমিকা গভীর। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ব, সেবামূলক কাজ এবং পারস্পরিক সম্মানের চর্চা থাকা জরুরি।

শিশুরাই আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মাতা। তাই তাদের মনে ছোটবেলা থেকেই মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। তাদের শেখাতে হবে—কাউকে উপহাস করা যাবে না, দুর্বলকে কষ্ট দেওয়া যাবে না, অন্যের জিনিস অনুমতি ছাড়া নেওয়া যাবে না, মিথ্যা বলা যাবে না, অন্যের দুঃখে হাসা যাবে না। তাদের শেখাতে হবে—মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, ভুল করলে ক্ষমা চাওয়া, অন্যের ভুল ক্ষমা করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকার করা মহৎ গুণ।

মনুষ্যত্বের সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধের সম্পর্ক গভীর। ঈমান মানুষের অন্তরে আল্লাহর জবাবদিহির অনুভূতি সৃষ্টি করে। একজন মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে তার প্রতিটি কথা ও কাজ আল্লাহ জানেন এবং একদিন তাকে তার কর্মের হিসাব দিতে হবে, তখন সে অন্যায় থেকে নিজেকে সংযত করার শক্তি পায়। তাকওয়া মানুষকে গোপনেও সৎ থাকতে শেখায়। তাই ইসলামী নৈতিকতা মানুষের বাহ্যিক আচরণের পাশাপাশি অন্তরকেও পরিশুদ্ধ করতে চায়।

তবে ধর্মের নামে অন্যের প্রতি ঘৃণা, অন্যায় বা অবিচার করা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সত্যিকারের ধর্মীয় চেতনা মানুষের মধ্যে আল্লাহভীতি, ন্যায়, দয়া, বিনয়, সংযম ও মানুষের কল্যাণের মনোভাব সৃষ্টি করে। একজন ভালো মুসলমানের চরিত্রে তার ঈমানের সৌন্দর্য প্রকাশ পাওয়া উচিত। তার কথা হবে সত্য, আচরণ হবে সুন্দর, লেনদেন হবে স্বচ্ছ এবং মানুষের প্রতি তার মনোভাব হবে কল্যাণমুখী।

মনুষ্যত্বের অন্যতম বড় পরীক্ষা হলো ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে আচরণ। সবাই আমাদের মতো চিন্তা করবে না—এটাই স্বাভাবিক। মতের পার্থক্য থাকলেও শালীনতা বজায় রাখা, যুক্তিসংগত কথা শোনা এবং অন্যের মর্যাদা রক্ষা করা সভ্যতার পরিচয়। মতের অমিল যেন বিদ্বেষে পরিণত না হয়। কোনো মানুষকে তার মতের কারণে অপমান করা বা অন্যায় করা মনুষ্যত্বের পরিপন্থী।

সমাজে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা মানবিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যে সমাজে শিশু নিরাপদে বেড়ে ওঠে, নারী সম্মানের সঙ্গে চলতে পারে, বৃদ্ধরা অবহেলিত হয় না এবং অসহায় মানুষ সাহায্যের হাত পায়—সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত। কেবল বড় বড় ভবন, সড়ক বা প্রযুক্তির উন্নতি কোনো সমাজের পূর্ণ উন্নতির প্রমাণ নয়; মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়াই উন্নতির প্রকৃত মানদণ্ড।

বর্তমান পৃথিবীতে মানুষের জ্ঞান ও প্রযুক্তি অভাবনীয়ভাবে এগিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে যদি মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ না ঘটে, তাহলে সেই অগ্রগতি মানুষের জন্য শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। মানুষের হাতে যত বেশি ক্ষমতা আসে, তত বেশি নৈতিক দায়িত্বও তৈরি হয়। তাই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি মানবিকতা, নৈতিকতা ও ন্যায়বোধের উন্নয়ন অপরিহার্য।

মানবতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক দায়িত্ববোধ। শুধু নিজের পরিবার ও নিজের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করলে সমাজ সুন্দর হয় না। সমাজের প্রতি প্রত্যেক মানুষের কিছু দায়িত্ব আছে। পরিবেশ রক্ষা, অসহায়কে সাহায্য, জনসম্পদ সংরক্ষণ, আইন মেনে চলা, দুর্নীতি ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকা, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য সৃষ্টি করা—এসবই নাগরিক ও মানবিক দায়িত্বের অংশ।

আমরা যদি সত্যিই পাশবিকতার ওপর মনুষ্যত্বের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে প্রথম পরিবর্তনটি নিজেদের ভেতর থেকেই শুরু করতে হবে। অন্যের দোষ খোঁজার আগে নিজের ভুল সংশোধন করতে হবে। অন্যের কাছে সম্মান চাইলে নিজেকেও অন্যকে সম্মান করতে হবে। সমাজে ন্যায় চাইলে নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। মানুষের কাছে ভালোবাসা চাইলে নিজের হৃদয়েও ভালোবাসা ধারণ করতে হবে।

একটি সুন্দর সমাজ গড়ার জন্য বড় কোনো অলৌকিক পরিবর্তনের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। একজন মানুষ আজ একটি ভালো কাজ দিয়ে শুরু করতে পারে। একজন ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, একজন অসুস্থের খোঁজ নেওয়া, একজন দুঃখীকে সান্ত্বনা দেওয়া, কারও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, একটি অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখা, একটি কটু কথা না বলা, একটি ভুল ক্ষমা করে দেওয়া—এসব ছোট ছোট কাজই মানবতার বড় ভিত্তি নির্মাণ করে।

মনে রাখতে হবে, মানুষ তার সম্পদের জন্য নয়, তার সৎকর্মের জন্য স্মরণীয় হয়। অট্টালিকা একদিন ধ্বংস হতে পারে, সম্পদ একদিন অন্যের হাতে চলে যেতে পারে, পদ-মর্যাদা একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে; কিন্তু একজন মানুষের ভালো কাজ মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে। তাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য শুধু কত বেশি অর্জন করব তা নয়; বরং কত বেশি কল্যাণ করতে পারব, কত মানুষের উপকার করতে পারব এবং কত সুন্দর একটি চরিত্র রেখে যেতে পারব—সেটিও ভাবতে হবে।

মনুষ্যত্বের জয় মানে অন্যকে পরাজিত করা নয়; বরং নিজের ভেতরের অন্যায় প্রবৃত্তিকে পরাজিত করা। ক্রোধকে ধৈর্যে, অহংকারকে বিনয়ে, লোভকে সংযমে, বিদ্বেষকে সৌহার্দ্যে, প্রতিহিংসাকে ক্ষমায় এবং স্বার্থপরতাকে পরোপকারে রূপান্তর করাই মনুষ্যত্বের প্রকৃত বিজয়। যে ব্যক্তি নিজের নফস ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে-ই প্রকৃত অর্থে শক্তিমান।

আমাদের সমাজে এমন মানুষ দরকার, যাদের উপস্থিতিতে অন্যরা নিরাপদ বোধ করবে; যাদের কথায় মানুষ আশ্বস্ত হবে; যাদের আচরণে সম্মান ফুটে উঠবে; যাদের হাতে অন্যের অধিকার নিরাপদ থাকবে; যাদের সম্পদে অসহায়ের অংশ থাকবে; যাদের জ্ঞানে মানুষের কল্যাণ হবে এবং যাদের হৃদয়ে আল্লাহভীতি ও মানবপ্রেম একসঙ্গে বিকশিত হবে।

অতএব, আসুন আমরা আজ একটি নৈতিক অঙ্গীকার করি—লোভের কাছে বিবেক বিক্রি করব না, মিথ্যার কাছে সত্যকে বিসর্জন দেব না, অন্যায়ের কাছে ন্যায়কে পরাজিত হতে দেব না, শক্তির অপব্যবহার করব না, দুর্বলকে অবহেলা করব না এবং মানুষের মর্যাদাকে কোনো স্বার্থের কাছে তুচ্ছ করব না। আমরা এমন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করব, যাদের দ্বারা অন্য মানুষ কষ্ট নয়, বরং নিরাপত্তা, সম্মান, ভালোবাসা ও কল্যাণ লাভ করে।

মানুষ তুমি মানুষ হও—এই হোক জীবনের ব্রত।
সত্য হোক তোমার পথ, ন্যায় হোক তোমার রথ।
দয়া হোক হৃদয়ের ভাষা, সততা হোক পরিচয়,
পাশবিকতার অন্ধকার পেরিয়ে মনুষ্যত্বের হোক জয়।

উপসংহার

মনুষ্যত্ব মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় এবং উত্তম চরিত্র তার শ্রেষ্ঠ অলংকার। মানুষকে আল্লাহ যে বিবেক, বুদ্ধি ও নৈতিক চেতনা দিয়েছেন, তার যথাযথ ব্যবহার করাই মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব। লোভ, হিংসা, ক্রোধ, অহংকার, প্রতারণা ও নিষ্ঠুরতা মানুষকে তার মর্যাদা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়; আর সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা, বিনয়, সততা ও পরোপকার মানুষকে মহৎ করে তোলে। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় পরিবেশ ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে।

আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে যদি আল্লাহভীতি, ঈমান, তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র জাগ্রত হয়, তাহলে পাশবিক প্রবৃত্তির ওপর মনুষ্যত্বের বিজয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। একটি মানবিক মানুষ একটি পরিবারকে আলোকিত করতে পারে; একটি মানবিক পরিবার একটি সমাজকে বদলে দিতে পারে; আর অসংখ্য মানবিক মানুষ মিলেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণময় দেশ ও পৃথিবী গড়তে পারে।

হে মহান আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে ঈমানের আলোয় আলোকিত করুন। আমাদের লোভ, হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, ক্রোধ ও নিষ্ঠুরতা থেকে রক্ষা করুন। আমাদের সত্যবাদী, আমানতদার, ন্যায়পরায়ণ, বিনয়ী, দয়ালু ও সহমর্মী বানান। অন্যের অধিকার রক্ষা করার শক্তি দিন, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দিন, অন্যায় থেকে দূরে থাকার সাহস দিন এবং ক্ষমা ও ধৈর্যের গুণ দান করুন। আমাদের জ্ঞানকে কল্যাণের পথে, শক্তিকে ন্যায়ের পথে এবং সম্পদকে মানুষের উপকারের কাজে ব্যবহারের তাওফিক দিন।

হে পরম দয়াময় রব! আমাদের পরিবারে, শিক্ষাঙ্গনে, সমাজে, রাষ্ট্রে এবং সমগ্র মানবসমাজে শান্তি, ন্যায়, দয়া, সততা, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করুন। পাশবিকতার অন্ধকার দূর করে মনুষ্যত্বের আলোকে উজ্জ্বল করুন। আমাদের এমন মানুষ বানান, যাদের দ্বারা কেউ অন্যায়ভাবে কষ্ট পায় না; বরং মানুষ আমাদের কাছ থেকে নিরাপত্তা, সম্মান, ভালোবাসা ও কল্যাণ লাভ করে।

মনুষ্যত্বের জয় হোক, পাশবিকতার অবসান হোক।
সত্যের জয় হোক, মিথ্যার অবসান হোক।
ন্যায়ের জয় হোক, জুলুমের অবসান হোক।
দয়া ও ভালোবাসার জয় হোক, হিংসা ও বিদ্বেষের অবসান হোক।
আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিময় জীবন প্রতিষ্ঠিত হোক।

আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।

 

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ